Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (71 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৪-০৬-২০১৮

বর্ষবরণ বাঙালির প্রাণের উত্‍সব

তুহিন ওয়াদুদ


বর্ষবরণ বাঙালির প্রাণের উত্‍সব

মোগল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তক। বাংলা সন একসময় ‘ফসলি সন’ নামেও পরিচিত ছিল। পুরনো বছরের সব পাওনা মিটিয়ে দিতেই এ সনের প্রবর্তন করা হয়েছিল। আগে ব্যবসায়ীরাও তাদের ক্রেতাদের কাছ থেকে সব পাওনা পরিশোধ করে নতুন বছর থেকে নতুন হিসাব চালু করতেন। নতুন বছরে সব কিছু নতুন করে শুরু করার একটি আনন্দ ছিল। সেই বর্ষবরণের আনন্দ ক্রমেই জাতীয় উত্সবে পরিণত হয়েছে। হালখাতার সঙ্গে নতুন বছর ছিল খুবই অর্থপূর্ণ। এখন পাওনা আদায় কিংবা নতুন করে ব্যবসার খাতা খোলার সঙ্গে আর এর গভীর সম্পর্ক নেই।

বাঙালির জীবনে বহু রকম উত্সব রয়েছে। এর মধ্যে বৈশাখবরণ বাদ দিলে অন্যগুলোতে কোনো না কোনো বিভাজন রেখা আছে। আমরা অনেকেই হয়তো সেই বিভাজ রেখা অতিক্রম করার চেষ্টা করি। সেই চেষ্টা কখনোই পরম পর্যায়ের উন্নীত হয় না। আমাদের ইংরেজি বর্ষবরণও হয়ে আছে। সেখানেও এক প্রকার উত্সবের আমেজ সৃষ্টি হয়। কিন্তু আমাদের মাটি ঘেঁষে, আমাদের রক্তের সঙ্গে মিশে থাকার গন্ধ ইংরেজি বর্ষবরণ উত্সবে পাওয়া যায় না।

মিলি সবে প্রাণের উত্সবে

বৈশাখ আসে আমাদের কাছে প্রাণিত সুর নিয়ে। বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনে বাঙালিদের মধ্যে এক বর্ণিল প্রাণের সমাহার দেখা যায়। উত্সবের রঙে রাঙানো থাকে দিনের প্রতিটি মুহূর্ত। বর্ষবরণ কারোরই ভুলে থাকার সুযোগ নেই। আগে থেকেই বর্ষযাপনের প্রস্তুতি চলতে থাকে। গণমাধ্যমের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখের প্রচারণাও বেড়েছে অনেকখানি। পত্রিকা খুললেই বর্ষবরণ, টেলিভিশন খুললেই পহেলা বৈশাখ, ঘরের বাইরে এলেও পোশাকে লেগে থাকা বৈশাখ। ওই দিন জীবনের পরতে পরতে বৈশাখ আর বৈশাখ।

উত্সবে অনুপস্থিত সম্প্রদায় ভাবনা

অতীতে তাকালে দেখা যায় কখনো বর্ণবৈষম্য, কখনো ধর্মবৈষম্য, কখনো শ্রেণিবৈষম্য আমাদের মধ্যে বিভেদের কালো রেখা ছিল দৃশ্যমান। আমরা যে বাঙালি, আমাদের মধ্যে যে অভিন্ন একটি সম্পর্ক রয়েছে, আমরা যে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি সব কিছুর ঊর্ধ্বে, তা প্রামাণ্য হয়ে ওঠে বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনে। আমরা এ দিনের উত্সবের ওপর কোনো ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণির লেবেল সেঁটে দিই না। সম্প্রদায়গত দূরত্ব কমিয়ে দেয় বৈশাখবরণের আনুষ্ঠানিকতা। মূলত বাংলা বর্ষবরণের রীতি এর বিকাশের সঙ্গে কোথাও সমপ্রদায় ভাবনা যুক্ত হতে পারেনি। ফলে এ উত্সবের মাত্রা হয়ে উঠেছে শাস্ত্র নিরপেক্ষ।

সময় বদলেছে, আবেদন বদলায়নি

এক শ-দু শ বছর আগের সময়ের সঙ্গে এখনকার সময়ের তুলনা করা যেতে পারে, কিন্তু পবির্তনকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আমাদের যোগাযোগ, আমাদের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক সব কিছুতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ফলে আগের দিনের সেই বৈশাখ পুরনোর ধরন অবিকৃত রেখে আসে না। পরিবর্তিত সময়, পরিবর্তিত সংস্কৃতি, পরিবর্তিত সময়ের রং মেখে প্রতিবছর নেমে আসে বাংল বর্ষবরণের ঢং। বাংলা বর্ষবরণে আগের চেয়ে এখনকার দিনে অধিকসংখ্যক বাঙালি যুক্ত হচ্ছে। এখন বৈশাখ এলেই ছোট ছোট জেলা শহরগুলোতেও বৈশাখী কাপড়ের চাহিদা লক্ষ্যণীয়। এমনকি গ্রাম-শহরগুলোতে পোশাকে বৈশাখ ফুটে ওঠে। বৈশাখে যে মিষ্টি খাওয়ার সংস্কৃতি ছিল তার স্থলে কালে কালে আমাদের গ্রাম্যজীবনের খাবার স্থান করে নিয়েছিল। সাধারণ বাঙালি জীবনের অন্যতম খাবার ছিল পান্তা। এই পান্তার সঙ্গে নানা রকম ভর্তা যুক্ত হয়েছিল। গণমাধ্যম একসময় পান্তা-ইলিশের বৈশাখকে আমাদের সঙ্গে পরিচিত করে দিয়েছিল। পান্তার সঙ্গে ইলিশ যদিও অপরিহার্য ছিল না; সময় বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সে কারণে এখন দেখি বর্ষবরণে সবাই বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে অবগাহন করার চেষ্টা করি। আমাদের বাঙালিদের পোশাক হিসেবে অনেককে ধুতি পরতে দেখা যায়, পাঞ্জাবি-শাড়ি পরে সবাই উত্সবে যোগ দেয়। ওই দিনের খাবার তালিকায় যত রকম বাঙালি খাবার আছে, তার প্রাচুর্য লক্ষ করা যায়।

বৈশাখী ভাতা

বাঙালিদের বর্ষবরণ উত্সবকে আরো অর্থবহ করে তুলতে বর্তমান সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তাও যুগান্তকারী। সরকারি চাকরিজীবীদের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখ মাসে ভাতা সুবিধা দেওয়া শুরু হয়েছে। এর কারণই হলো বর্ষবরণে যেন সরকারি চাকরিজীবীরা উত্সব করতে পারেন। পোশাকে-বিনোদনে-খাদ্যে যেন উত্সব আরো ব্যাপকভাবে পালিত হয়। জাতীয়ভাবে আমাদের প্রধান ধর্মীয় উত্সবের পর পরই সরকার এ উত্সবকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারিভাবে এ দিনটিকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, এতে দিনটি আরো অনেক মর্যাদাসম্পন্ন হয়ে উঠবে বলেই মনে করা যায়।

সূর্যোদয়ে বর্ষযাপন

মধ্যরাতে আমরা খ্রিস্টীয় বর্ষবরণ দেখি। কারণ খ্রিস্টীয় বর্ষ গণনার সেই তো শুরু। বাংলার ক্ষেত্রে বরণানুষ্ঠান শুরু হয় সকালেই। বরণ যেন কখনো কখনো আক্ষরিক হয়ে ওঠে। যে সময় নতুন সূর্যোদয়, ঠিক তখনই বরণ। সকালের ঢাকার বটমূলে যে বরণ সংগীতের আয়োজন করা হয়, তাও অনন্য। ২০০১ সালে রমনার বটমূলে বৈশাখকে স্বাগত জানিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মৌলবাদীরা আক্রমণ করেছিল। তার পরও বটমূলে অনুষ্ঠান থেমে নেই; বরং পরবর্তী বছরগুলোতে সকালের লোক সমাগম আরো বেড়েছে।

প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে চলছে বর্ষযাপন

বর্ষযাপনে নানা রকম প্রতিকূলতা আছে। ঝড়ঝঞ্ঝার মৌসুম। ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের বর্ষবরণের কার্যক্রমগুলো পরিচালিত হয়ে আসছে। পাকিস্তান শাসনামলে যখন আমাদের রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতি সব কিছুই ছিল অবরুদ্ধ, সেই সময়ই রমনার বটমূলে বৈশাখের প্রথম দিনে বৈশাখী উত্সব পালন করা হয়ে থাকে।

উত্সবে মানুষের ঢল নামে

বৈশাখের প্রথম দিনে বর্ষবরণ উপলক্ষে মানুষের ঢল নামে। বর্ণিল শাড়ি-পাঞ্জাবি পরা অংশগ্রহণকারীদের পদচারণে প্রাণের স্রোত বয়ে যায় ঢাকাসহ দেশের অন্য শহরগুলো। ঢাকার বটমূলে সূর্যোদয়ে গণমানুষের ঢল নামে। দিনের পর দিন সূর্যোদয়ে বর্ষবরণের পরিধি ক্রমসমপ্রসারণশীল। সারা দেশেই উত্সবে মানুষের ঢল নামে।

বৈশাখী গান-কবিতা

আমাদের ঋতুভিত্তিক অনেক গান আছে। তেমনি অনেক উত্সবভিত্তিক গানও আছে। বৈশাখকে ঘিরে আমাদের অনেক গান আছে। আবার এখনো অনেক গান লেখা হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গান—এসো হে বৈশাখ, এসো এসো/মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ অনেক কবিতা আছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈশাখ শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন—‘হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ!/ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল/জটাজাল,/তপঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ/ভয়াল/কারে দাও ডাক/হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ!’ বৈশাখকে ঘিরে যে অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়, সেখানে বৈশাখকে ঘিরেই চলে সব আয়োজন। লোকসংগীত, লোকনাট্য সেদিন পূর্ণ প্রাণ লাভ করে। সেদিন অনেক স্থানেই বৈশাখী মেলা বসে। যাত্রা গান, পালা গানও সেদিন পরিবেশিত হয়।

মঙ্গল শোভাযাত্রা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার আয়োজনে প্রধান মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জেলা শহরগুলোতে জাঁকজমকপূর্ণ মঙ্গল শোভাযাত্রা পালন করা হয়। প্রত্যন্ত গ্রামেও জমে ওঠে বৈশাখের উত্সব। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্ষবরণ উত্সবের পরম মাত্রা লাভ করে। শিক্ষার্থীরা অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করতে থাকে বর্ষবরণের জন্য। সারা দেশেই মুখোশ, বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি মঙ্গল শোভাযাত্রায় প্রদর্শিত হয়। পুরনো বছরের সব ক্লেদ-অশুভ বিদায় করে নতুন বছরের কল্যাণ কামনায় অনুষ্ঠিত হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা।

বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলা বর্ষযাপন

আমাদের দেশের অনেকেই এখন অভিবাসী। বাঙালি অভিবাসীরা বিদেশে গিয়েও বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ বাংলা বর্ষবরণ উত্সব পালন করে থাকে। বিদেশের মাটিতে এখন ঘটা করে উদ্যাপিত হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিকতা লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানও আন্তর্জাতিকতা লাভ করেছে। কানাডা, লন্ডন অস্ট্রেলিয়ায়ও এখন বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।

মানুষ-মানবতা-মনুষ্যত্বেরই জয়গান

বৈশাখ যাপন বাঙালি জীবনে এক অনন্য উত্সব। আমাদের জীবনে কত উত্সব আছে। সেসব উত্সবে এমন সব লেবেল সেঁটে দেওয়া আছে, যাতে আমরা একত্রে উদ্‌যাপন করতে পারি না। আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি-মেধা-মনন কোনোটাই একটা বিশেষ পর্যায়ে পৌঁছেনি, যেসব উত্সব আমাদের সবার বলে বরণ করতে পারি। কিন্তু বাংলা বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে আমাদের যে উত্সব, সেখানে বর্ণ-শ্রেণি-ধর্ম-নির্বিশেষ উত্সবস্রোতে আমরা অবগাহন করি। আমরা বরাবরই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রচনার কথা বলি। আমাদের এই কথার প্রায়োগিক ক্ষেত্র হচ্ছে আমাদের বৈশাখ যাপন।

আমরা বাংলা বর্ষবরণ ছাড়াও আরবি ও খ্রিস্টীয় বর্ষ বরণ করে থাকি। আরবি বর্ষবরণে আমাদের উত্সব হয় না। খ্রিস্টীয় বর্ষবরণে আমাদের ভিনদেশি সংস্কৃতির পরিচয় মেলে। তবে সেখানে আমাদের প্রাণের যোগ খুবই কম। আমাদের প্রাণের প্রবাহ সৃষ্টি হয় বাংলা বর্ষবরণে। বাংলা-ইংরেজি-আরবি—তিনটি বছরের বর্ষবরণ তিন সময়ে শুরু হয়। বাংলা বর্ষ গণনা হয় সূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে, আরবি বর্ষ গণনা শুরু হয় চন্দ্রোদয়ের মাধ্যমে, আর ইংরেজি বর্ষ গণনা শুরু হয় মধ্যরাতের পর। আমাদের নিত্য কাজে আমরা ইংরেজি তারিখের আশ্রয় নিয়ে থাকলেও বাংলা বর্ষবরণ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির বলে তা আমাদের মর্মে গিয়ে পৌঁছে।

বর্ষবরণ শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে মানবতার জয়গানের অনুষ্ঠান। মনুষ্যত্বের বিকাশই এখানে পূর্ণরূপে পরস্ফুট।

সূত্র: কালের কন্ঠ
এমএ/ ১১:০০/ ০৬ মার্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে