Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (71 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-২৫-২০১৮

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি

ফরিদুর রেজা সাগর


বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি

বাংলা ঘড়ির একটা দোকান তৈরি করেছিলেন আমার বাবা। 'বাংলা বিচিত্রা'। বাংলা অক্ষর আর শব্দ বসানো হাত ঘড়ি, টেবিল ঘড়ি ও দেয়াল ঘড়ি বাঙালি মানুষের কাছে থাকবে।

তবে কোনো ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডেই বেশিদিন তিনি থাকতে পারতেন না। নতুন করে পরিকল্পনা শুরু করতেন অভিনব নতুন কোনো ব্যবসার। 'বাংলা বিচিত্রা'র রূপও বদলে গেলো। 

সেই কর্মপ্রবাহে বাংলা ঘড়ি থেকে চলে গেলেন বাংলা খাবারে।

চিন্তা করলেন বাঙালির জন্য যদি ভালো খাবার তৈরি করা যায় তাহলে কেমন হবে সেটা? এসব ভাবনা দেশের স্বাধীনতার আগে তাঁর মাথায় এসেছিল।

ঊনসত্তরে, 'পিঠাঘর' নামে একটা দোকান তৈরি করেন তিনি। সেই দোকানের পে-অফ লাইনে লিখেছিলেন, 'বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি'।

বাংলা ঘড়ি দোকান বাংলা বিচিত্রা। বাংলা বিচিত্রার পর পিঠাঘর। তারপরের কর্মকাণ্ডের নাম দিলেন 'সোনার চামচ'। নতুন চিন্তা। নতুন পদক্ষেপ সোনার চামচ। 

বাবা তার আগে হংকং যান। সেখান থেকে তিনি সত্যিকারের একটা সোনার চামচ নিয়ে ফিরেছিলেন। সোনার জলে ধোয়া সোনালি সেই অসাধারণ চামচ। 

বাংলা ঘড়ির দোকানের কিছু অংশ রেখে বাদবাকি জায়গায় বাংলা খাবারের সমারোহ ঘটলো। 

এখন তো বাংলা খাবারের ছড়াছড়ি চারপাশে। হচ্ছে হৈ-হুলেল্গাড়। ভাবা যায়, সেটা হয়েছিল পঞ্চাশ বছর আগে সাধারণ মানুষের জন্য খিচুড়ি রান্না আর পরিবেশনায়! 

সৃজনশীল পিঠার পাশাপাশি খিচুড়ির উপস্থাপনা।

ভুনা খিচুড়ি আর হাঁসের মাংস। তার সঙ্গে গিলা-কলিজি। আর নানা পদের সুস্বাদু আচার। 

এ আয়োজন সম্ভার নিয়ে বাবার পিঠাঘরের যাত্রা শুরু। তখন তিনি নিজেও নিশ্চিত হতে পারছিলেন না, কোন ব্যবসাটা ক্রেতারা ধরবে।

তখনকার সময়ে এমন চিন্তার প্রকাশ এখনও বিস্ময় জাগায়। 

সেই দোকানে হাজির হই। মাঝে মাঝে বাবার হাত ধরে। কখনও বা একা একা। যদি দোকানটিতে বসতাম, বাবা খুশি হয়ে মাঝে মাঝে দু'টাকা দিতেন। 

দু'টাকা বুক পকেটে ঢুকিয়ে চলে যেতাম সদরঘাটে। হেঁটে হেঁটে বুক চিতিয়ে সদরঘাট। 

বই কিনে কিছু টাকা বাঁচলে শেয়ারে রিকশা করে ফেরা হতো আবার গুলিস্তানে। 

তেমন চমৎকার সময়গুলো পার করার সময় আব্বা একদিন বললেন, 'তুমি যেয়ো না। থাকো। তোমাকে নিয়ে এক জায়গায় যাবো আজ।' 

কথাটা বলে আমার বাবা একটা বাংলা ঘড়ি যত্ন নিয়ে খুব সুন্দর করে প্যাকেট করতে লাগলেন। 

কম বয়সী কৌতূহল নিবৃত্ত করতে না পেরে প্রশ্ন করলাম, 'কেন এভাবে প্যাকেট করছেন?'

বাবা ছোট করে মাথা নাড়লেন, 'দরকার আছে।'

তারপর দেখলাম দারুণ একটা ঝুড়িতে পিঠায়-পিঠায় সাজিয়ে নিচ্ছেন। জীবনে প্রথম দেখলাম, ঝুড়িতে দুর্দান্তভাবে পিঠা সাজানো যায় এবং তাতে সৌন্দর্য শুধু বাড়ে না, খাওয়ার একটা অদম্য স্পৃহাও তৈরি হয়। 

তিনি নিজের হাতে সুন্দর করে পিঠা সাজানোর পর রাংতা কাগজে মুড়লেন ঝুড়িটা।

পাটিসাপটা পিঠা। ভাঁপা পিঠা। নকশি পিঠা। নকশি পিঠা দিয়ে এক জায়গায় সাজিয়ে লেখা- 'বঙ্গবন্ধু'।

'বঙ্গবন্ধু' লেখাটা পড়ে কেন জানি মন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো। তখনও কিছুই জানি না। কিছুই বুঝি না। বাবার এ আয়োজনের আসল উদ্দেশ্যটুকুও আমার তখনও অজানা। 

যদিও বাবা আমার প্রশ্নের উত্তরে আগেই বলেছেন, 'দরকার আছে। তুমি যেয়ো না। থাকো।' তবু আবারও প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকতে পারলাম না। 

আবারও প্রশ্ন করি, 'বাবা, বঙ্গবন্ধু কেন লিখেছেন?'

বাবা এবার আর কিছু না লুকিয়ে রহস্য ভেঙে দিলেন, 'আজ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। তোমাকে নিয়ে আজ তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে আমরা যাবো।'

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে বাবা যাবেন। তাঁর সঙ্গে শুভেচ্ছাসঙ্গী হয়ে আমিও যাবো? কথাটা ভেবে চুপচাপ লুকিয়ে একটা চিমটি কেটে দেখতে ইচ্ছে হলো। 

শেখ মুজিবুর রহমান নাম যাঁর, লাখো-কোটি জনতা অন্তর থেকে যাঁকে ডাকেন, বঙ্গবন্ধু। যিনি জাতির জনক। ফরিদপুরের গোপালগঞ্জে জন্ম নেওয়া যে মানুষটির বাবা ছিলেন দেওয়ানি আদালতের সেরেস্তাদার, সাধারণ জীবনে বেড়ে ওঠা সেই মানুষটির ডাকে আমরা বাংলাদেশ নামে একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি, সেই অনন্য সাধারণ মানুষটিকে তাঁর জন্মদিনে আমি দেখতে যাবো? মুখোমুখি দেখবো বাবার হাত ধরে? কীভাবে তা এ কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে? বাবা বলার পরেও আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। 

বাবা আমার ধ্যান ভাঙিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, আমাদের দোকানের বানানো পিঠা, আর বাংলা ঘড়ি এসব কিছু নিয়ে আমরা তাঁর কাছেই যাচ্ছি।'

সেদিনটি ছিল ১৭ মার্চ, ১৯৭৫। 

সবকিছু গুছিয়ে আমরা রওনা দিলাম। বাবার পাশে বসে রাস্তায় যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে বাবাকে দেখছি আর ভাবছি, বাবা সত্যিই আমাকে কি বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে যাচ্ছেন?

রমনা পার্কের উল্টোদিকে তখন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা।

সেখানে রওনা হয়ে একসময় আমরা পৌঁছে গেলাম।

উপহার আর আমাকে নিয়ে অপেক্ষা করতে শুরু করলেন বাবা। মিনিটের পর মিনিট পার হয়। বঙ্গবন্ধু আর বের হন না। বঙ্গবন্ধুর আর দেখা পাই না। আমার তৃষ্ণার্ত চোখ এদিক-ওদিক দেখে। প্রচুর মানুষ চারপাশে। শুধু বঙ্গবন্ধুর দেখা নেই। একপাশে চোখ যেতে দেখি, কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলা থেকে কিশোর-কিশোরীরাও এসেছে বঙ্গবন্ধুর কাছে, জন্মদিনের ফুল উপহার দেওয়ার জন্য। বুঝতে দেরি হলো না, বঙ্গবন্ধু ছোটদের অনেক ভালোবাসেন।

কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, আমার বাবাকে কি বঙ্গবন্ধু চেনেন? দেখা করবেন তো? দেখা হলে কথা বলবেন তো?

টাঙ্গাইলের সংসদ সদস্য শামসুল হক সাহেব বাবার বিশেষ বন্ধু। উনিও তখন বাইরে দাঁড়িয়ে বাবার সঙ্গে গল্প করছিলেন। ওনাকে আমি খাবার দাবার-এ অনেকবার আড্ডা দিতে দেখেছি। তখন খাবার দাবার-এর নাম সোনার চামচ। 

বাবার মুখেই শুনেছি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বাবার পরিচয় অনেক দিনের। আমার বোন কেকা ফেরদৌসীকে নিয়ে বাবা যেতেন ওয়াইজঘাটে, সেখানে কেকা গান শিখতে যেতো। বঙ্গবন্ধুও তখন সেখানে যেতেন তাঁর কন্যা শেখ রেহানাকে নিয়ে একই জায়গায়। শেখ রেহানা বাফায় নাচ শিখতেন। দুই পিতার তখন সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে কথা হতো নানা বিষয়ে। তখন থেকে বাবার সঙ্গে তাঁর ভালোই আলাপ, জেনেছি বাবার কাছ থেকেই। 

কিন্তু বাস্তবে সেই পর্বত সমান মানুষটিকে দেখতে পেয়ে খানিক বিমর্ষতা পেয়ে বসেছিল।

একসময় বঙ্গবন্ধু বাইরে এলেন। ভারী চশমার ফাঁকে হাস্যোজ্জ্বল চোখ দুটি হাসছে।

বাবার খুব কাছে এসে দাঁড়ালেন। বাবার হাত ধরে দাঁড়ালেন। বাবার খুশিভরা চেহারার দিকে আমি তখন তাকিয়ে আছি।

বঙ্গবন্ধু খানিক অনুযোগের সুরে বললেন, 'কী ব্যাপার ডাক্তার, তুমি ভেতরে আমার কাছে কী কার্ড পাঠিয়েছ? আমি তো সেই কার্ড দেখে একদমই বুঝতে পারছিলাম না!'

বাবা শুধু তাঁর নাম লেখা একটা কার্ড পাঠিয়ে ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু বললেন, 'চিরকুটে শুধু ডাক্তার লিখে পাঠালেই হতো। তাতেই তো সঙ্গে সঙ্গে আমি বুঝে যেতাম!' 

বঙ্গবন্ধুর মুখে এমন কথা শুনে আমি তো আরও অবাক। ডাক্তার লিখলে হতো মানে?... ডাক্তার লিখলে বাবাকে বঙ্গবন্ধু চিনবেন কেন?... তার মানে আমার বাবা কখনও ডাক্তারি করতেন, যা আমাদের জানা নেই? 

চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে দেখলাম, বাকিটা সময় সারাক্ষণ বাবার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ডাক্তার- ডাক্তার সম্বোধন করেই কথা বললেন। কুশল বিনিময়ে বলছিলেন, ডাক্তার তুমি কেমন আছো? ছবির কাজ করছো তো? তোমার শরীর ভালো ডাক্তার? ইত্যাদি ইত্যাদি।

মনে মনে ভাবছিলাম, বঙ্গবন্ধুকে কি আমি প্রশ্নটা করবো, আপনি আমার বাবাকে কেন ডাক্তার হিসেবে ভাবছেন? 

ডায়ালে লেখা বাংলা ঘড়ি দেখে বঙ্গবন্ধুর চোখ দুটো বড় হয়ে গেলো। বললেন, 'বাহ, তোমার বাংলা ঘড়িটা তো বেশ সুন্দর। খুশি হলাম তোমার ঝুড়িতে সাজানো পিঠাগুলো পেয়েও। আমি চেষ্টা করবো, সমস্ত সরকারি অফিসে তোমার বাংলা ঘড়ি প্রচলন করার জন্য।' 

বাবার হাত ধরে বাইরে এসে বাবাকে প্রশ্ন করলাম, আব্বা, উনি সারাটা সময় ডাক্তার বলে ডাকছিলেন কেন?

বললেন, বঙ্গবন্ধু 'রাজধানীর বুকে' ছবিটি একবার দেখেছিলেন। সেই থেকে আমি ডাক্তার। 

বাকিটা বলতে হলো না বাবাকে। বুঝে গেলাম, 'রাজধানীর বুকে' ছবিতে বাবার ভূমিকা ছিল ডাক্তারের। সেই থেকে বাবা ডাক্তার। তারপর থেকে যখনই বাবার সঙ্গে দেখা হতো, বাবাকে তিনি ডাক্তার বলেই ডাকতেন। 

ফেরার সময় মনে হচ্ছিল আমার মতো সৌভাগ্যবান ছেলে ক'জন আছে, যে কি-না জাতির পিতাকে দেখতে পেলো স্বচক্ষে! কিন্তু একবারও মনে হয়নি এটাই হবে আমাদের বঙ্গবন্ধুর শেষ জন্মদিন পালন।

সেদিনকার ফার্স্টইয়ারে পড়া আমি বুঝতে পেরেছিলাম রাজনৈতিক ব্যস্ততার সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান গান ভালোবাসতেন, সিনেমা দেখতেন, দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের খবর রাখতেন। যার প্রভাব এখন তার যোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাঝে দেখতে পাই। এটা আমাদের জন্য বড়ই সৌভাগ্যের।

সূত্র: সমকাল
এমএ/ ১০:৩৩/ ২৫ মার্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে