Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (45 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-১১-২০১৮

এ সময়ের বিদ্রুপ

রাহাত খান


এ সময়ের বিদ্রুপ

সিরিয়ার আকাশ থেকে মুহুর্মুহু বোমা বর্ষিত হচ্ছে। মাটিতে থেমে থেমে গুলিবৃষ্টি। আর সিলেটে জনসমক্ষে একজন শিক্ষকের মাথায় উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত। দু'জায়গার ঘটনায় বিস্তর পার্থক্য থাকলেও একটা মিল শোনা যায়। সেটা হচ্ছে ধর্ম। ধর্মের অজুহাতে বিদেশে নির্বিচারে গণহত্যা, দেশের মাটিতে বুদ্ধিজীবী হত্যা- সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী মানবতার বিপরীতে এ এক বিদ্রূপই যেন চলছে। গত কিছুদিনে সিরিয়ার বাতাস মানুষের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে। সে নিয়ে সারা পৃথিবীর মানুষ রয়েছে উৎকণ্ঠায়। কিন্তু গত পরশু আমাদের দেশের মাটিতে একজন বুদ্ধিজীবীর ওপর যে আঘাত করা হলো, সেটাই মনে বাজছে মুহূর্তে মুহূর্তে।

জাফর ইকবালের মতো একজন জনপ্রিয় লেখক, একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক এবং মানুষ হিসেবেও যিনি খুব বড়মাপের; তাকে মারার চেষ্টা হলো কেন! আমাদের দেশে কত কুলাঙ্গার আছে; অসৎ, শয়তান আর বেচাকেনার দালাল বুদ্ধিজীবী আছে। তাদের মারার চেষ্টা না করে কেন জাফর ইকবালকে মারার চেষ্টা করা হলো? আমি মনে করি, এর সঙ্গে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ধরে ধরে বুদ্ধিজীবী হত্যার একটা সম্পর্ক আছে। পাকিস্তানের কৌশলটা ছিল- এখানে যত বেশি পারা যায় বাঙালিদের মেরে, বাঙালিদের একটা শিক্ষা দেয়া। পাশাপাশি বাঙালি বুদ্ধিজীবী, যারা বাংলাদেশের কথা বলে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলে, বাঙালির নিজস্বতা ও সংস্কৃতির কথা বলে; তাদের নিকেশ করে দেয়া। এবং পুরো '৭১ জুড়ে তারা অনেকটাই তা পেরেছে। আমাদের দেশে যারা স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী; বিশ্বসভায় পর্যন্ত যারা স্থান পাবার যোগ্য, সে ধরনের মানুষদের তারা ধরে ধরে মেরেছে? এদের কেন মারা হলো? 

কারণ পাকিস্তানিরা এটা চায়নি। ওরা এতটাই বর্বর ছিল যে, ইতিহাসের কথাও ভাবতো না। তাদের সম্ভাব্য পরাজয়, এই গণহত্যা আর বুদ্ধিজীবী নিধনের জন্য বিশ্ব ইতিহাসে পরবর্তীতে তাদের কীভাবে দেখা হবে- এ সবকিছু তাদের ভাবনায় ছিল না। ওরা এতটাই অসভ্য প্রকৃতির। পাকিস্তানের অংশ হবার পরেও পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে আক্রমণ করাটা তাজ্জবের ব্যাপারই বটে। আর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছে বাঙালিরাই বেশি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় রাত বারোটার আগে, আর ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণা হয় বারোটার পর। যে কারণে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট, আর ভারতের স্বাধীনতা দিবস হয় তার পরদিন, ১৫ আগস্টে। সেই রাতে অর্থাৎ পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পশ্চিম পাকিস্তান যখন গভীর অন্ধকারে নিমগ্ন, অন্যদিকে ঢাকায় দুই দুইটা মিছিল বেরিয়েছিল। বাঙালিদের রাজনৈতিক সচেতনতা এ থেকেও অনুমান করা যায়। তা ছাড়া পাকিস্তানের ব্যাপারে তারা কতটা প্রত্যাশী ছিল,সেটাও আন্দাজ করা যায়। কিন্তু পাকিস্তান আর্মি ছিল একটা বর্বর আর্মি। তারা ভাবল যে তারাই দেশ চালাবে। অথচ দেশ চালাবার কথা হচ্ছে রাজনীতিবিদদের। তারা যত খারাপই হোক, দেশ পরিচালনার ভার তাদের- এটাই হচ্ছে রাষ্ট্রনীতি। পাকিস্তান আর্মি এটা মানেনি। আর না মানার কারণে পাকিস্তানে যে কী বিপর্যয় নেমে এসেছে, তার উদাহরণ এখনও চলমান। বাংলাদেশ লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জন করে নিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের কিছু পুরনো শয়তান এখনও আশায় আছে- বাংলাদেশকে একদিন আবারও তারা তাদের পাকিস্তানি বৃত্তে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। সে চেষ্টা-প্রক্রিয়ার অংশই হচ্ছে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের ওপর লাগাতার এ আক্রমণ। হুমায়ুন আজাদকে মারা হলো। অভিজিৎ রায়, ফয়সল আরেফিন দীপন- একের পর এক এভাবে হত্যাতালিকা বড় হতে লাগল। সর্বশেষ আক্রমণ করা হলো মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর। ভাগ্যগুণে তিনি বেঁচে আছেন। কিন্তু তার আঘাতের পরিমাণটাও গভীর। একেবারে বাংলাদেশের শিকড় পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। এসব হত্যা একবাক্যে আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই একাত্তরের ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের কথাই। জাফর ইকবালকে যে ছেলেটি ছুরিকাঘাত করেছে, সে বলেছে- জাফর ইকবাল নাস্তিক। আমি বলছি, নাস্তিক তো তোর কী? আল্লাহ দেখবে, আল্লাহ বিচার করবে! আল্লাহ তো বলেন নাই- কেউ নাস্তিক হলে তাকে মেরে ফেলতে হবে! কোথাও বলেননি। উল্টো শ্রেণি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষকে ভালোবাসাই ইসলাম ধর্মের মূল ধারণা বলে আমি মনে করি। তাহলে এরা এসব পেলো কোথায়? এগুলো পেয়েছে ধর্মের নানা ব্যাখ্যায়। যেসব ব্যাখ্যার বিশৃঙ্খলা মুসলমানদের মধ্যেই বিভেদের সৃষ্টি করেছে। আর আমাদের দেশে এক শ্রেণির মাদ্রাসা, ধর্মীয় আস্তানা আছে, যেখানে এসব শিক্ষা দেয়া হয়।

আমাদের গ্রামে একটা মাদ্রাসা আছে। একবার শুনলাম, তাতে ছাত্রদের ডামি বন্দুক দিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আমি একবার সে মাদ্রাসা-প্রধানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- এ প্রশিক্ষণটা কেন দিচ্ছেন আপনারা! প্রধান শিক্ষক বললেন, না; এটা তো এখন আর দিই না আমরা। বললাম, দিতেন তো। কেন দিতেন? তিনি বললেন, শত্রু যদি আমাদের আক্রমণ করে! আমি বললাম, শত্রু আপনি কোথায় পাচ্ছেন? আপনাকে কে বলেছে? প্রধান শিক্ষকটি বলছিলেন, মুসলমানদের অনেক শত্রু, মুসলমানদেরকে মারা হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। বললাম, তাই বলে ছাত্রদেরকে এভাবে বন্দুকযুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেবেন! না জেনে এসব করবেন না কখনোই। বললাম, আপনার এখানে তো একটা দৈনিক পত্রিকাও দেখলাম না। তাহলে বুঝতাম যে আপনি দেশ-রাজনীতির খবর-টবর রাখেন। তাও তো দেখছি না। এ রকম বহু মাদ্রাসা আছে বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসায় ঢুকে কেউ কেউ ঘাঁটি গেড়েছে; ছাত্রদের মগজ ধোলাই করছে। বিশেষ করে তরুণদেরই এ কাজে উদ্বুদ্ধ করছে। এই যে হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় কী বীভৎস হত্যাকাণ্ড, সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের। মূলত এই দুই ধারাই জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। এদের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে নানাভাবে। তা না হলে এদের তো হত্যাকাণ্ডে যাবার কথা না। মূলত ধর্মীয় উন্মাদনাকে ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা তৈরির যে ষড়যন্ত্র, তারই শিকার এ তরুণরা। জাফর ইকবাল রাজনীতি করতেন না। কিন্তু তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষের শক্তিতে বিশ্বাস করেন। তার বাবাকে পাকিস্তান আর্মিরা মেরে ফেলেছিল। একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ছেলে মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করবে- এটাই তো স্বাভাবিক। আর মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক বলে তো শুধু নয়; এটা সেই ১৯৭১ সাল থেকেই চলে আসছে। 

একটা ব্যাপার হচ্ছে, মাদ্রাসায় কারা পড়ে? এরা আমাদের সন্তানই তো। তাদের ওপর আমাদের সহানুভূতি আছে। এরা কেউ বাধ্য হয়ে যায় মাদ্রাসায়। আমি মনে করি, শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমাদের ঢেলে সাজাতে হবে। শিশু-কিশোরদের এই নানা রকম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভাগ করে ক্রমবিচ্ছিন্ন এক জনসমষ্টি গড়ে তুলছি আমরা। অথচ একটা স্তর পর্যন্ত দেশের শিক্ষা কার্যক্রম একই থাকা উচিত। একেক মাধ্যমে ছেলেমেয়েরা একেক রকম শিখছে। মাদ্রাসায় শেখানো হচ্ছে বাংলা ভাষা কোনো ভাষা না; আরবি হলো আল্লাহর দেয়া ভাষা। আরে, আল্লাহর দেয়া ভাষা তো সব ভাষাই। আল্লাহ তো সব ধর্মের, সব বর্ণের, সব ভাষার মানুষই সৃষ্টি করেছেন। তবু মানুষ ভাষা সাম্প্রদায়িক হয়, ধর্ম সাম্প্রদায়িক হয়, বর্ণ সাম্প্রদায়িক হয়। কেন হয়? ইসলামে তো এসব নিষেধ আছে। মুসলিম জাতীয়তাবাদ বলে কোনো জাতীয়তাবাদ নেই তো। আরবের মুসলমানদের যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তোমরা কারা? তারা বলবে, আমরা আরব। ওখানে তো বলে না যে, আমরা মুসলমান আরব। পাকিস্তান আমলে অবশ্য আমাদের বলতে হতো আমরা মুসলমান বাঙালি। এই গোটা দৃষ্টিভঙ্গিই ভুল, বিকৃত এবং আক্রমণকারী দৃষ্টিভঙ্গি। আমি মনে করি, বাঙালি জাতীয়তাবাদকে যতক্ষণ না সামগ্রিকভাবে দাঁড় করানো যাবে, যতক্ষণ ভাষাকে সঠিকভাবে বিন্যস্ত করা না হবে, ততদিন পর্যন্ত বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। 

পাকিস্তান পন্থা এবং ধর্মীয় মৌলবাদ এখনও আমাদের সেরা সন্তানদের আক্রমণের মুখে রেখেছে- এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। একাত্তরে আমরা কত অসাধারণ শিক্ষককে হারিয়েছি! মুনীর চৌধুরী, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা- এমন শত শত মেধাবী মুখ এখন আমাদের ক্ষতির নাম। এদেরকে বেছে বেছে হত্যা করেছে পাকিস্তানি আর তাদের এদেশীয় দোসররা। যারা এখনও একইভাবে হত্যাকাণ্ডে সক্রিয়। কিন্তু এটা কি কোনো ইসলাম? মানুষ হত্যা করা কি কোনো ইসলাম?

স্বাধীনতার পক্ষে আমরা কথা বলব না কেন? আর পকিস্তান মানেই তো ইসলাম না। সেটা তো হলো একটা বর্বর রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রকে তো আমরা বিদায় করেছি ১৯৭১ সালে। আমরা কি মুসলমান ধর্মে আঘাত করেছিলাম? পাকিস্তান বাহিনী আমাদের ওপর আক্রমণ করেছিল কি আমরা ইসলামের বিরুদ্ধে ছিলাম বলে? আমরা কি ইসলামের বিরুদ্ধে ছিলাম? তাহলে ধর্মের অজুহাত কেন দেওয়া হচ্ছে? তাও আবার হত্যার জন্য! আসলে আমাদের চিন্তাশীল ও জ্ঞানচর্চাকারীদের দমিয়ে দেয়ার জন্য অজস্র অর্থ বিনিয়োগ করে আমাদেরই সন্তানদের ভুল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাদেরই মারার জন্য তৈরি করছে ওই পুরনো শত্রু। কেবল অজুহাত বদলেছে নানা রকম। হত্যার অজুহাত। 

জাফর ইকবালের মতো এ রকম একজন সম্মানিত লোককে এরা আঘাত করেছে। তার ছাত্র, শুভাকাঙ্ক্ষী, ভক্ত, পাঠক এবং বাংলার আপামর শান্তিকামী জনসাধারণ একে ভালোভাবে নেবে না- এটাই স্বাভাবিক। বরং সবাই আরও প্রেরণা পাবে। বাঙালির একটা তেড়িয়া ভাব তো আছেই। এটা মুক্তিযুদ্ধের সময়ই বোঝা গেছে। বহুবার বাঙালি পরীক্ষা দিয়েছে এবং বাঙালি একদিন জিতেছে। আমাদের গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষ মুসলমান। সেই মুসলমানদের তোমরা আবার মুসলমান বানাবে কী করে! এসব অপশক্তির পেছনে নানা রাজনৈতিক গোষ্ঠী আর টাকা কাজ করে, নানা বাণিজ্যের ব্যাপার আছে। 

...লিখতে বসেছিলাম- বিদ্রুপ বিষয়ে। এই যে চলমান সময়- মুক্তবুদ্ধির ওপর ধর্মান্ধদের হামলা, সিরিয়ায় অসহায় শিশুদের নির্মম মৃত্যু আর সব ছাপিয়ে এগুলোই বিদ্রুপ হয়ে ধরা দেয়। মানবতার অপমানের চেয়ে হাস্যকর বিদ্রুপাত্মক ঘটনা আর কী হতে পারে?

সূত্র: সমকাল
এমএ/ ০৯:৩৩/ ১১ মার্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে