Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (106 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-০৯-২০১৮

নির্মোহ ইতিহাস নির্মাণে প্রয়াস

বাশার খান


নির্মোহ ইতিহাস নির্মাণে প্রয়াস

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। অধ্যাপক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন সংকলিত ও সম্পাদিত এবং ২০১২ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃক প্রকাশিত 'মুক্তিযুদ্ধের গ্রন্থাবলী' বইয়ে প্রায় চার হাজার বইয়ের তালিকা দেওয়া হয়েছে। এরপর ২০১৭ সাল পর্যন্ত আরও কয়েকশ' গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ইতিহাসবিদ, গবেষক, যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা তাদের বইতে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরেছেন বিভিন্ন আঙ্গিকে। তবে এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের নির্মোহ ইতিহাস হয়ে ওঠার মতো গ্রন্থের সংখ্যা খুবই কম।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামে সহানুভূতি ও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বের কিছু মহৎপ্রাণ নেতা। ওই তালিকায় সবার আগে যাঁর নাম আসে তিনি আমাদের বৃহত্তম প্রতিবেশী দেশ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। মুক্তিযুদ্ধে ভারত ও ইন্দিরা গান্ধীর অবদান নিয়ে গ্রন্থ লেখা হয়েছে অনেক। তবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি, সঠিক পর্যালোচনা ও গবেষণামূলক গ্রন্থের সংখ্যা হাতেগোনা। এই হাতেগোনা গ্রন্থের তালিকা সমৃদ্ধ করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও বর্তমানে বাংলাদেশ উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার ড. আশফাক হোসেন রচিত 'বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী' গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি।

গ্রন্থটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শুধু ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা নিয়েই আলোচনা করা হয়নি, একই সঙ্গে বিস্তারিত বিশ্নেষণ ও পর্যালোচনাও তুলে ধরা হয়েছে। সংশ্নিষ্ট দলিলপত্র যুক্ত করায় গ্রন্থটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকার ঐতিহাসিক মূল্যায়ন, ভারতের রাজ্যসভা ও লোকসভায় ইন্দিরা গান্ধী, সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত ইন্দিরা গান্ধীর বিভিন্ন বক্তব্য ও বিবৃতি, আন্তর্জাতিক ফোরামে ইন্দিরার কূটনীতি এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য কংগ্রেস সরকার ও ইন্দিরাকে আহ্বান জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় জ্যোতি বসুর বক্তৃতা- এই পাঁচটি অধ্যায়ে গ্রন্থটি সাজিয়েছেন লেখক। এই অধ্যায়গুলো রচনায় লেখক সাহায্য নিয়েছেন ১. আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত দলিল, ভারত ও বাংলাদেশেল দলিলপত্র এবং তৎকালীন পত্রপত্রিকা। ২. এ যাবতকালে প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও বিশ্নেষণ এবং ৩. মৌখিক সাক্ষাৎকার (ঙৎধষ ঐরংঃড়ৎু/ঊারফবহপব) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের অবদান এবং আন্তর্জাতিকভাবে ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বড় অবদান যে ইন্দিরা গান্ধীর ছিল- এটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য। তবে সত্য লিখতে গিয়ে অনেকেই পক্ষপাতদুষ্টে অভিযুক্ত হয়েছেন এবং তা লেখকদের রচিত গ্রন্থেই পাওয়া যায়। একটি রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রকে সহযোগিতা যে নিজের রাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই করে এবং এটাই সেদেশের পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্য- সে বিষয়টি ভুলে গিয়েই ইতিহাস লিখতে চেয়েছেন কেউ কেউ। কিন্তু অধ্যাপক আশফাক হোসেন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই পর্ব পর্যালোচনা করেছেন সত্য ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধ ইতিহাসবিদ হিসেবে। যেমন তিনি লিখেছেন, 'বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভারতের শর্তহীন সমর্থনের পেছনে প্রধান দুটি লক্ষ্য ছিল- প্রথমত, মানবিক বিবেচনা এবং দ্বিতীয়ত, জাতীয় স্বার্থ [পৃষ্ঠা- ২২]। 

এরপর এ বিষয়ে প্রামাণ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন তিনি। পাশাপাশি মূল্যায়ন করেছেন ভারত ও ইন্দিরা গান্ধীর অনবদ্য ভূমিকাকেও। তিনি লেখেন, '... ১৯৭১-এ বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতে বৈদেশিক নীতি ও রণনীতির বিষয়ে যে বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞ চলে, সে সমস্ত ঘটনার কেন্দ্রে ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। ...মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন ও সহযোগিতা এবং ভারতের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের যে পর্যায়ক্রমিক স্তর কাঠামো ছিল, তা প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক এবং সমকালীন বিশ্বের একজন বিখ্যাত রাজনীতিক হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী... চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষকে সহায়তা করেছেন [পৃষ্ঠা-১৯]।

আমাদের দেশে দেখা যায়, সরকারি কাজে বিরোধী দল আবার বিরোধী দলের কর্মকাণ্ডে সরকারি দলকে পাইকারি হারে সমালোচনা করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে করে তুলাধোনা। তৎকালীন ভারতের কংগ্রেস সরকারেরও সমালোচনা করত বিরোধী দল। তবে সেটা হতো যৌক্তিক উপায়ে ও উপযুক্ত বিষয়ে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার বিরোধী দলের নেতা জ্যোতি বসু বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করলেও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেখিয়ে বাংলাদেশের প্রশ্নে ইন্দিরা গান্ধীকে শর্তহীন সমর্থন জানান। সংসদে প্রদত্ত বক্তৃতার মতো দলিলাদির ভিত্তিতে অল্প কথায় এ বিষয়টির একটি ডিটেইল পর্যালোচনামূলক বর্ণনা গ্রন্থে তুলে ধরেছেন লেখক। গবেষণা গ্রন্থের শেষে নির্ঘণ্টের সংযোজন গ্রন্থের মানকে শক্তিশালী করে। এই গ্রন্থে নির্ঘণ্ট দেওয়া হয়নি। কোথাও কোথাও কিছু বানান বিভ্রাট ও মুদ্রণজনিত ত্রুটি দেখা গেছে- আশা করা যায়, গ্রন্থের পরবর্তী সংস্করণে তা কাটিয়ে উঠবেন লেখক।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বারবার বিকৃতির চেষ্টা হয়েছে। বর্তমানে সেই চেষ্টার যে ইতি ঘটেছে তাও বলা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে যখন আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে, তখন 'বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী' শীর্ষক নির্মোহ পর্যালোচনামূলক গ্রন্থ আমাদের আশান্বিত করে। মুক্তিযুদ্ধে ভারত ও ইন্দিরা গান্ধীর অবদানের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নির্মাণে গ্রন্থটি লেখক-গবেষকদের ব্যাপক কাজে আসবে- এ কথা নির্দি্বধায়ই বলা যায়। 

লেখক
আশফাক হোসেন
প্রকাশক
সুবর্ণ প্রকাশ
প্রচ্ছদ
আজিজ হাসান
প্রকাশকাল
অক্টোবর ২০১৭ 
পৃষ্ঠা ২০৮

সূত্র: সমকাল
এমএ/ ১১:১১/ ০৯ মার্চ

বইপত্র

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে