Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (55 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-০৯-২০১৮

ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে

যতীন সরকার


ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে

অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলার পর লক্ষ্য করলাম, শুধু শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়; সারা বাংলাদেশে এমনকি নেত্রকোনার মতো ছোট মফস্বল শহরে যে রকম প্রতিক্রিয়া হয়েছে, লোকজন রাস্তায় বেরিয়ে প্রতিবাদ করেছেন; এটা শুভ লক্ষণ। এটা ফলদায়ক হবে তখনই যখন সারা বাংলাদেশের শুভবুদ্ধি ও মুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ রুখে দাঁড়াবে। ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য একটা সম্মেলন হওয়া জরুরি, যাতে ধর্মান্ধতার বিস্তার ঘটতে না পারে।

এ রকম একটি ঘটনা নিন্দনীয়- এটা বললেই যথেষ্ট বলা হয় না। এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে আমাদের যেভাবে রুখে দাঁড়ানো উচিত ছিল, অতীতে সেভাবে আমরা পারিনি। কেবল জাফর ইকবাল নন, আগে আরও অনেকের ওপরে হামলা হয়েছে, নিহতও হয়েছেন অনেকে। এসব ঘটনায় আমরা দু-একবার আহা-উহু করে ছেড়ে দিয়েছি। 

নতুন প্রজন্মের মধ্যে যাতে সত্যিকারের ধর্মবোধের বিস্তার ঘটে, ধর্মান্ধতা যেন তাদের আচ্ছন্ন না করে, এমন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তা না হলে এ রকম ঘটনা একের পর এক ঘটতেই থাকবে। জাফর ইকবালকে হত্যাচেষ্টার ইস্যুতে আমাদের নেতারা পারস্পরিক বাদানুবাদে লিপ্ত হয়েছেন। এটা দুঃখজনক। আমাদের রাজনীতি নোংরা। এ নোংরা রাজনীতির খেলা নিয়ে কথা কম বলাই ভালো।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে আমাদের শিক্ষার্থীরা ঝুঁঁকে পড়ছে। ছোটবেলায় আমরা পড়েছি- বিজ্ঞান আশীর্বাদ, নাকি অভিশাপ। তখন বিজ্ঞানের আশীর্বাদ বেশি পড়েছি, অভিশাপ কম পড়েছি। কিন্তু ডিজিটাল যুগে বিজ্ঞান একটি অভিশাপে রূপান্তরিত হয়েছে। বিজ্ঞানের যতই আশীর্বাদ থাক না কেন, আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। এই বিষয়ে কথা বলতে গেলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই বিষয়টি নিয়ে কেউ কথা বলে না। শুধু একজন মানুষকেই এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে দেখেছি, তিনি হচ্ছেন অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তার ওপর এই হামলা মূলত মুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন এদেশের সব মানুষের ওপর হামলার শামিল। 

পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্রের অধিবাসীরূপে যেসব ভূতের ভয়ে আমাদের সবার সন্ত্রস্ত থাকতে হতো, সেই পাকিস্তানকে বিদায় দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেও সেই সব ভূত ও ভূতের ভয় থেকে মুক্তি পাইনি। বাংলাদেশের ঘাড়েই তো পাকিস্তান ভূত হয়ে চেপে বসেছে। সেই ভূত প্রতিনিয়ত ধর্ম নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় দেখায়। সেই ভয়ে বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীও সদা কম্পমান। এ গোষ্ঠীর সকলেই ভূতকে সন্তুষ্ট রাখার উপায়ের খোঁজ করে। এরাই অগণিত শহীদের রক্তের অক্ষরে লেখা রাষ্ট্রীয় সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে লোপাট করে দিয়ে 'রাষ্ট্রধর্ম'র কথা প্রবর্তন করেছে, এবং ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকালীন পাকিস্তানি ভূতদের সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। এবং আমাদের মুক্তিবুদ্ধির মানুষদের হত্যা করতে উদ্যত হচ্ছে। 

অকুণ্ঠ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও মৌলবাদবিরোধী না হলে কিছুতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা আর মৌলবাদ-বিরোধিতা একই সূত্রে গাঁথা। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটি হয় না। এখানেও কিন্তু নানা ধরনের দোদুল্যমানতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। একটি বিশেষ ধর্মতন্ত্রকে রাষ্ট্রধর্মরূপে বহাল রাখব, আবার সাম্রাজ্যবাদকে না চটিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ থেকে মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করব- এ রকমটি কী করে সম্ভব হতে পারে; আমার মতো ক্ষুদ্র বুদ্ধির মানুষের পক্ষে তা বোঝা খুবই কঠিন। 

হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান- সব ধর্মের এক বাণী, তা হলো শান্তি। কিন্তু এখন মানুষ ধর্মের নামে সমাজে নানা অনাচার করে বেড়াচ্ছে। সন্ত্রাসী কাজ করছে, জঙ্গি হামলা চালাচ্ছে। একে অপরকে মারছে, শোষণ করছে। মানুষের মনুষ্যত্বই হলো বড় ধর্ম। এই ধর্মের শিক্ষায় মানুষের মাঝে মানবতাবোধ জাগ্রত হয়। সমাজকে কিছু দেওয়ার শিক্ষা দেয়। এতে কোনো হানাহানি নেই, কোনো গোঁড়ামি নেই। সবকিছুর মূলে রয়েছে শিক্ষা। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে ভালোভাবে বাঁচতে শেখায়। সুশিক্ষার অভাবে সমাজে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের সৃষ্টি হচ্ছে। সুশিক্ষার চর্চা করতে হবে। তরুণরাই পারে সমাজকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে। আমাদের সবাইকে সচেতন হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে রুখে দিতে হবে।

ধর্মান্ধ শক্তিকে ভয় না পেয়ে বরং প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কবিগুরু সকলকে এই অভয় মন্ত্র শুনিয়েছেন। সকলকে ডাক দিয়ে বলেছেন-

'মুহূর্ত তুলিয়া শির একত্র দাঁড়াও দেখি সবে,

যার ভয়ে তুমি ভীত সে অন্যায় ভীরু তোমা চেয়ে,

যখনি জাগিবে তুমি তখনি সে পলাইবে ধেয়ে;

যখনি দাঁড়াবে তুমি সম্মুখে তাহার, তখনি সে

পথকুক্কুরের মতো সংকোচে সত্রাসে যাবে মিশে;'

বাংলাদেশের মানুষ প্রকৃত মানুষের ধর্মের অনুসারী, ধর্মকে তারা হৃদয়-কন্দরে একান্ত শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার সঙ্গে লালন করে। ধর্মকে সাম্প্রদায়িকতার যূপকাষ্ঠে তারা বলি দেয় না। ইহলৌকিক ও আধিভৌতিক রাষ্ট্রনীতির অধীন বানিয়ে ধর্মের পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিকতায় সামান্য কালিমা লেপনেও তারা রাজি নয়। 

সূত্র: সমকাল
এমএ/ ১১:০০/ ০৯ মার্চ

স্মরণ

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে