Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-০৩-২০১৮

স্বপ্নশিল্পের রূপায়ণ

দীপংকর বৈরাগী


স্বপ্নশিল্পের রূপায়ণ

১৯৪৪ সালে গভর্নমেন্ট আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটস প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক চারুশিক্ষার শুভসূচনা করেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। এটি বাংলাদেশের প্রথম চারুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করলেও এ অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে আরও বেশ কিছু জায়গায় নানা রকম শিল্প প্রচেষ্টা দেখা গিয়েছিল। শিল্পী শশীভূষণ পাল বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় সুন্দরবন তীরবর্তী শহর খুলনার দৌলতপুরে ১৯০৪ সালে 'মহেশ্বরপাশা স্কুল অব আর্ট' নামে শিল্পশিক্ষার বীজ বপন করেন, যা স্থানান্তরিত ও বিবর্তিত হয়ে ১৯৮৩ সালে খুলনা আর্ট কলেজ ও ২০০৯ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে রূপ নেয়। শিল্পীর রোপিত সেই স্বপ্নবীজের রূপায়ণ লক্ষ্য করি গত ২৬ ফেব্রুয়ারি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অস্থায়ী প্রদর্শনী কক্ষে। 

গ্যালারির প্রবেশপথেই রয়েছে শিল্পী সুশান্ত রায়ের 'মিনস্টেল অব বেঙ্গল' শিরোনামের শিল্পকর্ম। এক হাতে একতারাসহ অন্য হাত প্রসারিত ভঙ্গিতে দাঁড়ানো বাউলের প্রতিকৃতি যেন প্রদর্শনীতে আসা দর্শনার্থীদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। মিশ্র মাধ্যমের এ শিল্পকর্মের উপস্থাপনে উপকরণ হিসেবে শিল্পী ব্যবহার করেছেন নারিকেলের মালা ও ছোবলা। অস্থায়ী এই শিল্প প্রদর্শনালয়ের সারি সারি কক্ষে আলোক প্রক্ষেপণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এমনভাবে, যাতে প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া চিত্রকর্ম ও কক্ষের বেদিগুলোতে রাখা ভাস্কর্যগুলো যেন উজ্জীবিত হয়ে আছে, যা দর্শনার্থীদের চিত্ররস আহরণে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের চতুর্থ এ বার্ষিক শিল্পকলা প্রদর্শনী শিক্ষাক্রমের একটি অংশ হলেও অধিকাংশ শিল্পকর্ম যেন একাডেমিক সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করে। শিল্পের এ প্রাতিষ্ঠানিক মহামিলনমেলায় শিল্পকর্মগুলো দর্শকদের সঙ্গে এক ধরনের যোগসূত্র তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের শিল্পকর্মে উৎসাহিত করার জন্য তিনটি বিভাগে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার হিসেবে যথাক্রমে শিল্পী শশীভূষণ পাল পুরস্কার, মাধ্যম শ্রেষ্ঠ ও শ্রেণি শ্রেষ্ঠ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। বিভিন্ন বর্ষের মোট ২০০ শিল্পীর মধ্য থেকে ৩৯ জনকে এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। শ্রেষ্ঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী হলেন অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের পীযূষ বিশ্বাস, ছাপচিত্র বিভাগে মোহাম্মদ কাওসার শিকদার ও ভাস্কর্য বিভাগে জাবেদ আল মাহফুজ। 

পীযূষ বিশ্বাস মিশ্র মাধ্যমে চিত্রপটে তুলে এনেছেন গ্রামীণ সরলতাকে। অর্ধবিমূর্ত এ চিত্রকর্মে লোকচিত্রের গাঢ় রঙ ও ফর্মের সঙ্গে আধুনিক চিত্ররীতির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন 'ফার্মার অ্যান্ড গোল্ডেন হারভেস্ট' শিরোনামে। কাওসার শিকদার অ্যাকোয়াটিন্ট মাধ্যমে চিত্রকর্মে পটচিত্রের মতো বহু খণ্ডে আমাদের আদি গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান হারিকেনের বিভিন্ন অংশকে উপস্থাপন করেছেন। জাবেদ আল মাহফুজ স্টোন খোদাই করে গড়েছেন নারী ও শিশুর যুগল অবয়ব। এ কাজে চিত্রকর্মের উপস্থাপন ভঙ্গি ও বিন্যাস ভাস্কর্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জয় কুমার ভৌমিক মিশ্র মাধ্যমে 'ওরিয়েন্টাল' শিরোনামে স্বল্প রঙে যে চিত্র নির্মাণ করেছেন, তার গাঠনিক দুর্বলতা ঢেকেছেন রঙ ও রেখার কুশলী প্রক্ষেপণে।

শিল্পী সজল মিশ্র সাদাকালোনির্ভর মিশ্র রঙ ও রেখার বুনটে যে চিত্রকর্মটি নির্মাণ করেছেন- তা চোখে এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়। অলীক কুমার রাপ্তান তেলরঙে এঁকেছেন 'লেবার'। এ চিত্রকর্মে যেন শিল্পীর বিষয় উপস্থাপনের ব্যস্ততা প্রকটভাবে ফুটে উঠতে দেখা যায়। শিল্পীর সচেতনতাও সম্ভবত সেই ব্যস্ততা উপস্থাপনেরই অনুগামী। 

রাজ সিংহ ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিকে বিচিত্র কম্পোজিশনে তুলে এনেছেন গ্রামীণ জরাজীর্ণ ঘরের জানালা। বিন্যাসের ক্ষেত্রে বড় ক্যানভাসের ওপরে ছোট ক্যানভাস প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন। অলকেশ মণ্ডল তেলরঙে এঁকেছেন গ্রামীণ সামগ্রিকতাকে। যেখানে উঠে এসেছে ঠুঙি, রসের হাঁড়ি, দা ও গামছা। শাহরিন শবনম লিথোগ্রাফে 'কমপ্লেক্স রিলেশনশিপ' শিরোনামে উপস্থাপন করেছেন বিমূর্ত ও অর্ধবিমূর্ত নারী অবয়ব ও নারী প্রতিকৃতি। চিত্রে ভার্টিকাল লাইনের ওপর অর্ধবিমূর্ত নগ্ন নারীর দৃশ্যায়ন যেন শরীরের বাইরেও ভিন্ন কোনো বার্তা দিতে চেয়েছে। গৌতম চৌধুরীর 'ডিলুটেড রিদম' শিরোনামের ভাস্কর্যটি অনন্য। কাঠ কেটে তিনি নারী-পুরুষের যুগল দেহ নির্মাণ করেছেন। সুমাইতা আফরিন ড্রাই পয়েন্টে তুলে ধরেছেন সাইকেলের পশ্চাৎ অংশকে। দেবাংশু কুমার গাইন মেটালে নির্মাণ করেছেন মানব প্রতিকৃতি, যেখানে ডিটেইল নির্মাণ থেকে বেরিয়ে এসে এক্সপ্রেশন ধরার চেষ্টা করেছেন। জেবা ফারিয়া মিতি উডকাটে তুলে ধরেছেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিলুপ্তপ্রায় রিকশাচিত্রকে। যেখানে মগ্ন বাংলা চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকা ও গ্রামীণ নকশা উপস্থাপনে।

প্রদর্শনীর অধিকাংশ শিল্পকর্মে নতুনত্বের ছাপ আছে, কম্পোজিশনের সচেতনতা শিল্পকর্মের নান্দনিক উপস্থাপনের মাধ্যমে উঠে এসেছে। ছাপচিত্র ও ভাস্কর্য বিভাগের শিল্পকর্মের অগ্রগতি লক্ষণীয়। কিউরেটিং, স্থায়ী গ্যালারি ও এ ধরনের প্রদর্শনীর আয়োজন অব্যাহত থাকলে শিল্পী শশীভূষণ পালের লালিত স্বপ্ন একদিন সত্যি মহীরুহে পরিণত হবে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিল্প শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে শিল্পের এই মহোৎসব বাংলাদেশের শিল্পচর্চা, বিশেষ করে প্রান্তিক জনপদের শিল্পচেতনাকে জাগ্রত এবং আরও গতিশীল করবে, যা পরবর্তী উত্তরসূরিদের শিল্পচর্চায় মনোনিবেশের পথকে প্রশস্ত করবে। সে বার্তাই উপস্থাপন করল খুলনার এ শিল্পমহোৎসব।

সূত্র: সমকাল
এমএ/ ০৯:১০/ ০৩ মার্চ

সাহিত্য

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে