Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (69 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-০২-২০১৮

আমার কোনো দুঃসাহসী ভ্রমণ নাই

শাকুর মজিদ


আমার কোনো দুঃসাহসী ভ্রমণ নাই

আমার কোনো দুঃসাহসী বা রোমাঞ্চকর অভিযাত্রার গল্প নাই। দেশ-বিদেশ ঘুরতে গিয়ে নতুন নতুন যা কিছু দেখেছি অভিভূত হয়েছি। ২০০১ সালে আমেরিকার অ্যারিজোনায় গ্র্যান্ড ক্যানিয়ান দেখতে গিয়েছিলাম। পাড় থেকে নিচে কলোরাডো নদীর দিকে তাকিয়ে শিহরণ বোধ হয়েছিল। আধামাইল গভীর এই খাদের তলায় কলোরাডো নদী বয়ে যাচ্ছে। তার পানির রঙ লালচে। আসলে পাথুরে লালচে গ্রানাইটের বিম্ব পড়তে গিয়ে পানিকে এমন দেখাতো বলে লোকে তাকে এই নামে ডাকতে শুরু করে। অনেক অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকরা সেই নদীর কিনারে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেন। তাদের বেঁচে-বর্তে ফিরে আসার গল্প দেখি টেলিভিশনে। সেগুলো আসল অ্যাডভেঞ্চার।

আগের দিনের পর্যটকদের অ্যাডভেঞ্চারের সুযোগ অনেক বেশি ছিল। তার প্রধান কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। হিমালয়ের চূড়ায় হেঁটে ওঠার মতো অভিযাত্রা যখন শুরু করে তখন উড়োজাহাজ আসেনি। এখন হেলিকপ্টারে চড়ে আমি যদি এভারেস্টে নেমে আয়েশ করে একটা পান খেয়ে আবার হেলিকপ্টারে করে নেমে আসি, আমাকে কেউ বাধা দেবে না। আবার আমার হিমালয় জয় নিয়ে কেউ তালিও বাজাবে না। 

শিহরিত হয়েছিলাম একবার চীনের কুনমিং থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে আলু গুহা দেখে। ৬০ লাখ বছর আগে নাকি মানুষ এখানে বসবাস করতো। সমতল থেকে লিফ্‌ট বেয়ে নামতে হয় গুহামুখে। তার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সোনালি রঙের জলধারা এবং পাথুরে অলংকারের কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। পোল্যান্ডের এক লবণ খনির দেখা পেয়েছিলাম সমতল থেকে ১৫০ ফুট নিচে। গিয়ে দেখি এডিবল সল্ট দিয়ে বানিয়ে রাখা হয়েছে রাজকীয় প্রাসাদ, গির্জা, মানুষের মূর্তি। 

দুইবার সুড়ঙ্গ মাড়াতে গিয়ে ভয় পেয়েছিলাম। একবার ভিয়েতনামের চুচি টানেলে, আরেকবার মিশরের গিজার মহাপিরামিডের ভেতর ঢুকে। দুইবারই খানিকটা যাওয়ার পর কুঁজো হয়ে বা হামাগুড়ি দিয়ে চলতে গিয়ে মনে হয়েছিল, ফেরত চলে আসি। ফিরে আসা যায় না এসব পথ দিয়ে। বর্শার ফলার মতো এটা কেবল একদিকে টানে। এই দুই সুড়ঙ্গ মাড়ানোর পর প্রতিজ্ঞা করেছি- না, এই জীবনে আর সুড়ঙ্গ মাড়াবো না। আমি আমার কথা এখনো রেখেছি। 

দেশ-বিদেশ ঘুরতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি মজা পেয়েছি, যেখানে আমি কোনো মুখের ভাষায় কাউকে আমার মনের ভাব প্রকাশ করাতে পারিনি। চিলির সান্তিয়াগোতে একা একা এক বিকেল হেঁটে বেড়াতে খুব রোমাঞ্চ বোধ হয়েছিল। মনে হয়েছিল, অন্তত ১০টা স্প্যানিশ শব্দ শিখে গেলে সফরটা অন্যরকম হতো। চীনের শিশুয়াংপান্নায় একবার ছিলাম এক সপ্তাহ, প্রায় একা। আমার একমাত্র ইংরেজি জানা চীনা হোস্ট যখন সাথে ছিলেন না তখন সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করে কাজ চালিয়েছিলাম। চীনারা এমন এক জাতি, যারা একটি বিদেশি শব্দও ব্যবহার করে না। ভিন্ন দেশের নামও তারা চীনা ভাষায় ডাকে। যেমন বাংলাদেশকে বলে- মুংজালা।

পাহাড় দেখে মুগ্ধ হয়েছি দূর থেকে। উরুগুয়ের ওপর দিয়ে আন্দিজ পর্বতমালার রূপ দেখিয়ে মুগ্ধ করেছিলেন সান্তিয়াগোগামী বিমানের পাইলট। দূর থেকে হিমালয় আর অন্নপূর্ণা দেখে মুগ্ধ হলেও আল্পসের ১২ হাজার ফুট উপরে উঠে (কলের দড়ি বেয়ে) পাহাড় দেখে হতাশ হয়েছি। নিজেকে বলেছি, খুব সুন্দরের কাছে যেতে নাই। 

তবে চীনের লিজিয়াং-এ ব্ল্যাক ড্রাগন পাহাড়ে কলের দড়ি বেয়ে ১৫ হাজার ফুট ওপরে উঠেই মনে হলো, মাথা ঘুরে পড়ে যাব। আমি শ্বাস নিতে পারছি না, ঘেমে যাচ্ছি। অক্সিজেন সিলিন্ডার আমাদের চীনা দোভাষী আমার নাকের সাথে লাগিয়ে দেয়। আমি নাকের মধ্যে অক্সিজেনের নল ঢুকিয়ে লাইন ভেঙে ফেরত কলের দড়ির গাড়িতে চড়ে নেমে যাই। আমার সাথে আমাদের সঙ্গীসহ পর্যটকরাও। তাদের আর ব্ল্যাক ড্রাগন পাহাড়ের ওপরটা দেখা হলো না, আমারও না।

তবে সেদিনই পাহাড় তলা থেকে নেমে লিজিয়াং-এর নাশিপাড়ার একটা গ্রামে দেখি বড় সাইজের এক ফড়িঙের পেটের ভেতর হোন্ডার মতো এক ইঞ্জিন লাগানো। একজন পাইলট একজন যাত্রীকে নিয়ে যেতে পারে। যেন একটা মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনের সাথে দুই পাশে দুইটা বড় পাখা লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। এটা চড়ে ব্ল্যাক ড্রাগন স্নো মাউন্টেন ঘুরিয়ে দেখা যাবে। 

আমি আছি ট্র্যাভেল ডকুমেন্টারি বানাতে। আমার সঙ্গে এক জাঁদরেল বাংলাদেশি ক্যামেরাম্যান। আমি ১০০ ডলারে টিকিট কেটে দিয়ে বললাম, যান, শটটা নিয়ে আসেন। 

তিনি যাবেন না। তার ভয়। 

আমি বললাম, যাই আমি। আপনি আপনার ক্যামেরা দিয়া শুট করেন, কেমন করে আমি আকাশে উড়ি। 

ফড়িং প্লেনে আমাকে উঠিয়ে পাইলটের সহকারী আমার গায়ে প্যারাস্যুট পরিয়ে দিতে দিতে চ্যাং-ব্যাং ভাষায় বোঝায়, আকাশে প্লেন বিকল হয়ে গেলে কীভাবে এই প্যারাস্যুটের ওপর ভর করে নেমে আসবো তার কৌশল। বছরে ২/৩টা অ্যাক্সিডেন্ট হয় তাদের। তার পরও ব্যবসা খারাপ না। দিনে ৮/১০ জন তারা পায়, যারা ২০ মিনিটের জন্য পাহাড় চক্কর দিতে আসে। আমি আল্লার নাম নিয়ে উঠে বসে পড়লাম ক্যামেরা অন করে, একেবারে ভিউ ফাইন্ডারের দিকে চোখ দিয়ে। পাক্কা ১৭ মিনিটের একটা ক্লিপ নিয়ে আবার তিন চাক্কার ফড়িং প্লেন মাটির রানওয়েতে নেমে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আমাকে সেখানেই নিয়ে আসে, যেখান থেকে উঠিয়েছিল। 

আমি ল্যান্ড করার পর নাকি আমার বাংলাদেশি সহপর্যটকরা বেশি ভয় পেয়েছিলেন। তাদের ধারণা ছিল যে রানওয়ে নামক এই মেঠোপথে যে কোনো সময় উষ্টা খেয়ে ফড়িং প্লেনটা পড়ে যেতে পারে। 

প্লেনের মধ্যেই মহাবিপর্যয়ের শিকার হয়েছিলাম একবার ২০১৫ সালে, আমেরিকায়। নিউইয়র্ক থেকে মিশিগান আসছি, পেন্সিলভেনিয়ায় এক ঘণ্টা জিরিয়ে প্লেনটা মিশিগানের পথে রওনা দিতেই আমি প্লেনের মধ্যে ঘামতে ঘামতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। মুখ দিয়ে ফেনা বেরোয় এবং আমার প্যান্ট নষ্ট হয়ে যায়। আমার সামনের সিটে এক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা ডাক্তার ছিলেন। তিনি সম্ভবত কিছু টোটকা করে কিছুক্ষণের মধ্যে আমার জ্ঞান ফিরিয়ে এনেছিলেন। প্লেন মিশিগানের ডেট্রয়েট বিমানবন্দরে নামতেই এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ৪ সুঠামদেহী আমাকে তুলে নিয়ে এয়ারপোর্টের একটা লাউঞ্জকে মিনি ইমার্জেন্সি ক্লিনিক বানিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আমাকে ছেড়ে দেয়। ঘটনাটি আমার সহপর্যটক ছাড়া কাউকে জানাইনি। 

এমন বিড়ম্বনায় কিছুদিন আগে পড়লাম নিজের দেশেই। এই যাত্রাটি সম্ভবত আমার জীবনের সবচেয়ে দুঃসাহসিক অভিযাত্রা ছিল।

১৬ জানুয়ারি ২০১৮। আমি সিলেট থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার ফ্লাইটে ঢাকা আসব। সিলেট শহরে বন্ধুদের সাথে আড্ডা শেষে সাড়ে ৫টায় একটা সিএনজি চেপে রওনা দিই এয়ারপোর্টের দিকে। শর পেরিয়ে পাহাড়ের এক বাঁকা পথের কাছে মোড় ঘোরাতে গিয়ে দেখি আমাদের সিএনজিকে টোকা দিলো পিছন থেকে কেউ (প্রাইভেট কার)। ঠুনকো সিএনজিটি বাম পাশে হেলে গিয়ে ধাক্কা খেলো এক রিকশাভ্যানের সঙ্গে। এবং সঙ্গে সঙ্গে আছাড় খেয়ে রাস্তার ওপর কর্কশ শব্দে পড়ে গেলো। আর কিছু মনে নাই।

যার মনে আছে, তিনি (সিলেটের তরুণ কবি আজমল আহমদ) সে সময় অন্য গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন। ঘটনার কিছুদিন পর তার ফেসবুকে প্রকাশিত কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি।

'১৬ জানুয়ারি বিকেল ৫টা। সিলেট এর আম্বরখানা থেকে এয়ারপোর্টগামী সিএনজিতে উঠলাম। নিজের কর্মস্থলে ডিউটিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। বিভাগীয় স্টেডিয়াম পার হয়ে লাক্কাতুরা বাগানে জ্যামে পড়ল গাড়ি। কিন্তু অন্যদিনের মতো শুধু জ্যাম না, খুব হট্টগোল মনে হলো সামনে। গাড়ি থেকে নেমে সামনে দ্রুত এগিয়ে গেলাম। গিয়ে যা দেখলাম, চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। একটু আগেই এখানে কারও সঙ্গে সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া সিএনজির দিকে নজর পড়ার সাথে সাথেই নজর কেড়ে নিল দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া, চতুর্দিক থেকে আঘাতপ্রাপ্ত, মৃত মানুষের মতো পড়ে থাকা দু'জন মানুষ। মানুষজন হট্টগোল করছে, গাড়ি অবরোধ করছে কিন্তু ভয়ে কেউই আহত ব্যক্তিদের শরীরে হাত দিচ্ছে না। গোল করে মাঝখানে রেখেছে সবাই। এর কারণ হয়তো পুলিশের অপেক্ষা, নয়তো কোনো ঝামেলায় না জড়ানো। কিন্তু মানুষের জন্য মানুষ টাইপের যতগুলো পড়ালেখা করেছিলাম জীবনে তার সবটুকু মাথায় আসতে থাকল, হৃদয় কাঁদতে থাকল। দু'জন অসহায় মানুষ পড়ে আছে, হয়তো মারাই গেছে, অথচ আমরা তামাশা দেখব? ভিড় ঠেলে কাছে গেলাম। দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া মানুষটি উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে উনার ব্যাগ, জুতাসহ জিনিসপত্র। বিসমিল্লাহ বলে হাত দিলাম শরীরে, চিত করতে চেষ্টা করলাম। আমার সমবয়সী ৩-৪টা ছেলেকে দেখছিলাম বেশ তৎপর হয়ে গাড়ি অবরোধ করছে, মানুষদের আটকাচ্ছে। চিল্লাইয়া তাদের ডাকলাম সাহায্য করার জন্য। এখন আমরা ৩-৫ জন আস্তে করে উনাকে তুলে বসালাম। মুখটা দেখার পরেই আঁৎকে উঠলাম। আরে! এ তো আমাদের শ্রদ্ধেয় শাকুর মজিদ স্যার। অন্তরটা ফেটে গেল। ইতিমধ্যে সন্ধ্যে পেরিয়ে অন্ধকার পড়ে গেছে, আবছা আলোয় স্যারকে কোনোমতে চিনতে পারলাম। আমি ছাড়া আর কেউই অন্ধকারে স্যারকে চিনতে পারেনি। স্যারকে শরীর ও মাথায় হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে উনাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। এবার স্যারের হুঁশ ফিরেছে। তিনি আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছেন। এর আগে দীর্ঘক্ষণ অচেতন হয়ে রাস্তায় পড়ে ছিলেন, ঠিক মৃত লাশ। এবার অসহায়ের মতো তাকাতে পারছেন। কিছুটা খুশি হলাম আমরা। স্যারের কানে কানে বললাম, স্যার, আপনাকে আমি চিনি। আপনি আমাদের স্যার, চিন্তা করবেন না, আমরা আছি। এর মধ্যে এয়ারপোর্ট বাইপাস পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ চলে এসেছে। সিএনজি ও ট্রাক মালিক সমিতির নেতারাও এসেছেন। উনারা গাড়ি অবরোধ করাসহ অন্যান্য বিষয় দেখছেন। আমরা পুলিশের কাছে স্যারের পরিচয় লিপিবদ্ধ করালাম। এবার স্যার নিজেই আস্তে করে উনার ঠিকানা-পরিচয় বলতে পারছেন। জড়িয়ে ধরে রইলাম স্যারকে। হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় তিনি আঘাত পেয়েছেন। তবে বাম হাতের হাড্ডি সব প্রায় ভেঙে টুকরো হয়ে গেছে। এক সুতা পরিমাণও নড়াতে পারছেন না। আমরা দুটি গাড়ি রেডি করে ওসমানী মেডিকেলে দু'জনকে নেয়ার প্রস্তুতি নিলাম। একটি গাড়ি আঘাতপ্রাপ্ত ড্রাইভারকে নিয়ে ইতিমধ্যে রওনা হয়েছে। এবার স্যারকে গাড়িতে তুলব। তিনি এবার জানতে চাইলেন- কী হয়েছে উনার এবং কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। এত বড় আঘাত পেয়ে এতটাই অবশ হয়েছেন যে কিছুই বুঝতে পারছেন না উনার কী হয়েছে। বললাম, স্যার, কিছু হয়নি, ছোট দুর্ঘটনা, ওসমানী মেডিকেলে নিচ্ছি। তিনি বললেন, আমি মেডিকেলে যাব না। আমার ফ্লাইট এখন, ঢাকা যাব; আমাকে কোনোমতে এয়ারপোর্ট পৌঁছে দাও। অবরোধ থেকে একটা প্রাইভেট কার নিয়ে এয়ারপোর্টের উদ্দেশে রওনা হতে হলো। আমরা ৪ জন মিলে খুব সাবধানে স্যারকে গাড়িতে তুললাম, ব্যাগটা তুললাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য, অনেক খোঁজ করেও মোবাইলটা কেউ খুঁজে পেলাম না। স্যারের কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে তার নাম্বারে ফোন দিলাম। কল ঢুকল, কিন্তু কেউ রিসিভ করে না। হয়তো বাগানের কোনো গর্তে পড়ে গেছে, নয়তো খুব খারাপ কারও হাতে গায়েব হয়েছে। এবার গাড়িতে এক পাশে স্যার, আমি মাঝে উনাকে জড়িয়ে ধরে বসলাম। ব্যাগটা আমার কোলেই রাখলাম, একটি ছেলেকে আমাকে সাহায্য করতে ডাকলাম, সেও গাড়িতে উঠল। পরে জানতে পারলাম, তার নাম সাদ্দাম হোসেন। শেষ পর্যন্ত সে আমাকে হেল্প করল। গাড়ি ছাড়তেই স্যারকে বললাম, আপনার কোনো পরিচিত মানুষদের নাম্বার দেন, ফোন করে বলি। তিনি এতটাই আঘাতপ্রাপ্ত ছিলেন যে কারও নাম্বারও মনে করতে পারলেন না। তার উপরে হারিয়ে গেছে মোবাইল। শুধু আস্তে করে বলতে পারলেন- এয়ারপোর্ট ম্যানেজার পরিচিত। আমি তাকে ফোন করি। তিনি বললেন, ইন্নালিল্লাহ, একি হলো! তুমি তাড়াতাড়ি শাকুর ভাইকে নিয়ে ভিআইপিতে আসো। এবার কিছু সাহস ও শান্তি নিয়ে সোজা ভিআইপিতে গেলাম। পৌঁছে আবার উনাকে ফোন দিতেই ১ মিনিটের মধ্যে তিনি আসলেন, সাথে উনার কিছু কর্মচারী। খুব আস্তে করে স্যারকে নামিয়ে হুইল চেয়ারে বসিয়ে ভিতরে নিয়ে গেলাম। হাফিজ স্যারের সহায়তায় এয়ারপোর্টের অন্যান্য কাজ শেষ করে প্রিয় স্যারকে বিমানে তুলে দিলাম।'

এর পরের ঘটনা খুব সংক্ষিপ্ত। আমি হুইল চেয়ারে করে প্লেনের গেটে এসে পৌঁছেছি, একজনের কাছে আমার ব্যাগ। আমি ডান হাত দিয়ে আমার চেতনাহীন বাম হাতটা আঁকড়ে ধরে আছি। লম্বা জ্যাকেটের ভেতর বলে খুব সহজে পোষ মেনেছে নিয়ন্ত্রণহীন অবশ হাত। একবার মনে হয় এটা আমার, আরেকবার মনে হয় অপরের হাত। কিন্তু যেহেত চামড়ার সাথে লেগে আছে, তাই আমিও হাতছাড়া করছি না। বলা যায় না, এই হাত আবারও আমার হার হয়ে যেতে পারে, আগে ঢাকা যাই।

প্লেনের দরোজায় দাঁড়ানো সিনিয়র পার্সার। তিনি মেডিকেল রিপোর্ট চাইলেন।

আমি বলি, ২০ মিনিট আগের ঘটনা। ডাক্তার দেখাতে পারিনি।

তিনি বলেন, এয়ারপোর্টে ডাক্তার আছে। তার কাছে গিয়ে সার্টিফিকেট আনেন।

আমি বলি, ম্যাম, দরোজা বন্ধ হবে এখন। আমাকে ঢাকা যেতে হবে।

তিনি ফোনাফোনি শুরু করেন। খবর পাওয়া গেলো- এয়ারপোর্টে এখন কোনো ডাক্তার নাই।

তিনি বলেন, আপনার অ্যাটেন্ডেন্ট কে?

আমি বলি- কেউ নাই। আমি একা।

-সরি স্যার, উইদাউট অ্যাটেন্ডেন্ট উই ক্যানোট অ্যালাও এনি পেশেন্ট। 

তিনি নিজে হাত দিয়ে আমার ব্যাগটি বিমান সীমানার বাইরে ব্রিজের উপর রেখে দিলেন। এখন দরোজা বন্ধ হবে।

এর মধ্যে দেখি দুইজন পরিচিত লোক আসছে। একজন মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, আরেকজন সুব্রত। দু'জনই আওয়ামী লীগের বড় নেতা। আমাকে ভালো চেনেন। তাদেরকে বললাম ঘটনা।

সিরাজ ভাই বললেন, এটা কোনো বিষয় হলো? আমি আপনার অ্যাটেন্ডেন্ট- এটা বলেই তিনি নিজের হাতে আমার হাতব্যাগ ধরে প্লেনের ভেতর নিয়ে গেলেন।

সিটে বসলাম। একটু মাথা ঘুরছে। ঘামছিও। পানি চাইলাম। পানির গল্গাস হাতে সেই সিনিয়র পার্সার। আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনার কি বমি বমি লাগছে?

-না।

-ব্লিডিং হয়েছে?

-না।

-তাহলে একটু চোট লেগেছে, ঠিক হয়ে যাবে।

-জি ম্যাম।

আমি চোখ বন্ধ করে বসে থাকি। আমার ডান হাত আঁকড়ে ধরেছে বাম হাতের জ্যাকেটের মাথা। বাম হাতের কোনো অস্তিত্ব টের পাচ্ছি না আমি। প্লেন ছাড়বে এখন। খবরটা কাউকে জানানো দরকার। কিন্তু আমার কোনো নাম্বার মনে নাই। সুব্রতদাকে বললাম, ইশতিয়াক রেজার নাম্বার আছে? 

-না। পীর হাবিবের আছে।

আমি পীর হাবিবকে ফোন করে বলি, ইশতিয়াক রেজাকে ফোন করে বলেন জলিকে বলতে, ডা. হানিফ বা ডা. জিয়া ভাইর সাথে যোগাযোগ করে রাখতে। আমি ঢাকা নেমে সরাসরি হাসপাতাল যাব।

পীর হাবিব খুব মনোযোগের সাথে আমার কথা শোনেন। 

আমি ফোন রেখে সিটে বসে থাকি। সিনিয়র পার্সার আমার সিটবেল্ট বেঁধে দেন। এখনই প্লেন ছাড়বে ঢাকার পথে।

এমএ/ ১২:৩৩/ ০২ মার্চ

ভ্রমণ

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে