Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (45 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০২-০৩-২০১৮

শকটে দুই প্রাকৃতজন

হামিম কামাল


শকটে দুই প্রাকৃতজন

দক্ষিণ বাংলার কোথাও বেড়াতে যাব বলে বাসে উঠেছি। সামনের সিটে মামীকে নিয়ে বসেছেন ম্যুডি ষাটোর্ধ্ব বড় মামা। চশমার কাচের ওপর দিয়ে উদ্বিগ্ন মামীর দিকে তাকিয়ে বলছেন, যাওয়ার আগেই ওই ব্যাটা মর্কটকে নিয়ে এত ভাবছ কেন, হ্যাঁ? গেলেই দেখবে ওকে শায়েস্তা করার কত পথ বের হয়ে যায়। এত অস্থির হলে চলে!

এমন সময় বাসের দরজাপথ ধরে আরেক ভদ্রলোক ভেতরে এলেন, সস্ত্রীক। তাকে দেখে বড় মামা চমকে ওঠার অবকাশ পাননি। কারণ তখন তিনি জানালার বাইরে অন্ধকারে তাকিয়ে আছেন। ডাস্টবিনে একটা কুকুর আবর্জনার স্তূপে ভক্ষ্য কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে। আর আমরা এদিকে নবাগত ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে আছি অপলক; বিস্ময়ে বিমূঢ়। অবিকল বড় মামা, কী কাণ্ড! সে-ই চোখ, সে-ই নাক, আধভাঙা চোয়াল, কালো গায়ের রঙ। সে-ই পেছনঠেলা কপাল, তাতে হাতে গোনা তিনটি অগভীর ভাঁজ। একই ফ্রেমের কাচের চশমা রুচির সাযুজ্যও প্রকাশ করছে। গায়ে একটা আধপুরনো পশ্চিমি কোট পর্যন্ত আছে। কোটের রঙ খানিকটা গাঢ়, আর এখানেই যা তফাৎ। ভদ্রলোকের পেছন থেকে উঁকি দিলেন তার বধূ :কপালে সিঁদুর, হাতে শাঁখা। বোঝা গেল, তারা সনাতন ধর্মের মানুষ। আর মামা? বলনে, জীবনদর্শনে ততটা নন, কিন্তু চলনে বিশ্বাসী মুসলমান। 

ভদ্রলোক বাসের সব ভরাট সিটে একবার চোখ বুলিয়ে তার স্ত্রীকে নিচু স্বরে বললেন, আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি। আর উপায় কী? তুমি পেছনে গিয়ে বসো। 

আমার সামনে শওকত আলী তখন হাসছেন আর তার লেখা প্রদোষে প্রাকৃতজনের পাতা আমার কোলের ওপর হাওয়ায় উল্টে চলেছে। তাকিয়ে দেখি, দিব্যি যমজপ্রতিম ওই দুটি মানুষ; আত্মীয়তা যাদের রল্প্রেব্দ রল্প্রেব্দ এবং সাদা চোখে ধরাও পড়ে স্পষ্ট। অথচ চিন্তাভাবনা, বিশ্বাসের গন্তব্যে যোজন তাদের ব্যবধান। 

দাঁড়াও পথিকবর! এখানে কিন্তু কালের অভিন্ন একটি ধারার হঠাৎ বাঁক-বিভাজনের চিহ্নটা স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। বোঝা যায়, কোনো এককালে এ মাটির মানুষের ইতিহাস-নদী একটা বড় ধরনের ভূমিকম্পের শিকারে বিভাজিত হয়ে দুইদিকে প্রবাহিত হতে শুরু করেছিল। আর এই দুটি ভাই তখন দুটি পথের আলাদা পথিক হয়ে উঠেছে। সে পথে চাঁদ-সূর্য একই দিকে ওঠে আর অস্ত যায়; মাটিও প্রকৃতিও এক, শুধু মনের বাড়ি গেছে বদলে। সে বাড়ির দেয়ালে নতুন দিনপঞ্জি দোলে। নতুন ইতিহাসের সেই সে প্রদোষকাল। এই প্রদোষ সময়টা কিন্তু সব সময় আধো-আলো আর আধো-অন্ধকারে রান। মেঘে ঢাকা সূর্যের নিচে গন্তব্যের দিশে হারানো সব ভূমিকন্যা, জলপুত্র সমাজবেড়া-কাঁটাঝোপের ভেতর দিয়ে অবিরাম ছোটে আর রক্তাক্ত হয়। তাদের হাসি-কান্না, প্রেম-পার্বণের এমন মনপোড়ানো দিনলিপি সেকালের তালপাতার গায়ে কিছু কিছু লেখা আছে, যা থেকে আগুনের আঁচটা কেবল পাওয়া যায়। উৎসটা দেখা যায় না। প্রদোষে প্রাকৃতজনে আমি যেন সেই উৎসের একটা অংশকে পেয়েছিলাম। 

সেন শাসনামলের শেষদিকের ক'খানি ছেঁড়া পাতার পুঁথি যেন এই রচনা। সপ্তম-অষ্টম শতকের মাৎস্যন্যায়ের ক্ষত খানিকটা কাটিয়ে উঠলেও ধারা কাটতে পারল আর কই বৃহৎ বাংলা? শাসককুলের সবাই সর্বেসর্বা তখন। কেহ কারে নাহি ছাড়ে। জনপদে এলিয়েন-সংক্রমণের ওটাই একেবারে মোক্ষম সময়। সাম্রাজ্যবাদী বহিঃশত্রুরা চিরকাল এ সময়েরই অপেক্ষায় থাকে। বৈশ্বিক ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারায় তখন ধর্মে-মুসলমানরা এগিয়ে, যার মৌতাতে এখনও তারা দাড়িতে আঙুল বুলায়। 

এসব কথা থাক। এ অঞ্চলের আলাপে আসি। যখন একদিকে সমুদ্রপথে আসা আরব কিংবা এশীয় মাইনর অঞ্চলীয় মুসলমান সাধকরা ইসলামকে পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু করেছে, অন্যদিকে একই ধর্মাবলম্বী উচ্চাভিলাষী তুর্কিরা তলোয়ারে বন কেটে লোকালয়ের সোনার কলস ভাঙছে, রক্তের নদী বইয়ে দিতে লেগেছে। শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্বকে ঘুরপথে নিয়ে এলে, প্রতিটি সমাজেই দুই গোত্রীয় মানুষ মিলছে- শোষক আর শোষিত; শিকার আর শিকারি। শিকার চায় ত্রাণ; শিকারি চায় প্রাণ। যখন সকালে মন্দিরের পশ্চিম-পথ আর বিকেলে মন্দিরের পূর্বপথ দিয়ে হাঁটা বারণ, যেন মন্দিরের ছায়াও তাদের ছোঁয়ায় কলঙ্কিত না হয়, তখন শিকাররা আকৃষ্ট হলো ভৃত্যের পেছনে নামাজে দাঁড়ানো সাধকদের কথায়, কাজে। আবার যখন ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারার বিচিত্র হিসাব নিকাশ বুঝে যাওয়া জিঘাংসু কিছু মানুষ, যারা ক্ষমতার মূল থেকে দলছুট, তাদের আকৃষ্ট করল তরোয়ালি করাল তুর্কি সেনাদল। তুর্কিদেরও এমন কিছু পথ-চিনিয়ে লোকাল ফোক দরকার ছিল, লুটের মাল গাঁটে তুলতে দিলেই যারা ভাইয়ের গলায় ছুরি ধারাবে, পরের গোলায় আগুন লাগাবে। 

সমাজের এই বিভক্ত দুটি ধারার জন্যই এসেছিল সুযোগের আশ্চর্য এক পুতুল-কুমির। কেউ তার পিঠে গিয়ে চড়ল, কেউ তার চোয়ালে গিয়ে জুড়ল। 

আমার বোঝাপড়ায় প্রদোষে প্রাকৃতজন উপন্যাস একদিকে তথাগতের স্রোতে ভেসে আসা সেই নির্লিপ্ত পুতুল-কুমিরের ভেসে আসার গল্প। অপরদিকে শ্যামাঙ্গ-লীলার কখনও না-ভোলার এক অবাক প্রেমের গল্প, ও কুমির সেখানে না-বর, না-শাপ। এবং দুইয়ে মিলে, যুগপৎ, বাঙালির সমাজ-মনের অকাট্য সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক দলিল।

সূত্র:সমকাল
এমএ/০২:০০/০৩ ফেব্রুয়ারি

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে