Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (65 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০১-১২-২০১৮

শৈশবের এক শীত সকাল হয়ে বরফ রাজ্যে

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ


শৈশবের এক শীত সকাল হয়ে বরফ রাজ্যে

প্রথমে সন্দেহ জেগেছিল করটিয়ার ঐ অল্প ক'টা দিনের ক'টা স্মৃতিই-বা মনে আছে? কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এর সংখ্যা হয়ত সত্যি সত্যি অফুরান। এর ক'টাই বা লেখা যায় বা লেখা উচিত। কিন্তু অন্য কিছু লিখি না-লিখি একদিনের একটা সকালের কথা আমাকে লিখতেই হবে। একটা কবিতা-ভরা সকালের রূপকথা সেটা। প্রায় স্বপ্নের মতোই সকালটা। আমার বয়স তখন হয়ত পাঁচ-সাড়ে পাঁচ। আমি, আমার ছোট ভাই, ছোটবোন আর সেইসাথে আরও দু-একটি ছেলে, হয়ত আমার চাইতেও ছোট, কেন যেন করটিয়া কলেজের মাঠ পেরিয়ে ক্ষেতের ভেতর দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। কীভাবে কেন হাঁটতে শুরু করলাম কিছুই মনে নেই, কেবল মনে আছে বেশ ক'জন মিলে ক্ষেতের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছি তো চলেইছি। চারপাশে মটরশুঁটির ক্ষেত। ঠিক বড় মটরশুঁটি নয়, ছোট এক ধরনের মটরশুঁটি, আমরা 'ছেই' বলতাম সেগুলোকে। ক্ষেতে বসে খোসা ছাড়িয়ে এগুলো খেতে খুব মজা লাগত।

ক্ষেতের ভেতর দিয়ে আমরা হাঁটতে হাঁটতে একটা রহস্যময় জগতের মধ্যে এসে পড়লাম। শীতের শিশির জমে আছে সারা মাঠজুড়ে, সবখানে। দূরে চারপাশে সবুজ গ্রাম। তার গায়ে শিশিরের স্নিগ্ধতা। এপাশে-ওপাশে গন্ধক-হলুদ রঙের ফুলে ভরা শর্ষেক্ষেতের জগৎ। বিলের পাশে বকেরা বসে আছে। মিষ্টি শান্ত সকাল। এসবের মধ্যে দিয়ে, যেন প্রায় একটা রূপকথার ভেতর দিয়ে, হেঁটে চললাম।

হাঁটতে হাঁটতে অনেক মাঠ-ঘাট-প্রান্তর পেরিয়ে একটা গ্রাম এল আমাদের সামনে। সে-গ্রামে দেখা গেল একটা অবস্থাপন্ন বাড়ি। সে-সময় রূপকথার গল্পে রাজবাড়ির যে-বর্ণনা শুনতাম, ঠিক সেরকম বিশাল এলাকা নিয়ে সে-বাড়ি; তার সামনে দিকটায় পাকা দালান, পেছনে অনেক দূরে ছোট ছোট বেশকিছু টিনের চাল ছাওয়া ঘর। শুনলাম মুকুন্দ সাহা নামে একজনের বাড়ি সেটা। মুকুন্দ সাহা নামটাও রহস্যময় লাগল। বাড়ি দেখেই বুঝেছিলাম খুবই অবস্থাসম্পন্ন আর বিত্তবান মানুষ এঁরা। হয়ত এদেশের রাজাই হবেন। আমরা যেতেই তাঁরা খুব খাতির করলেন আমাদের। সে-সময় খুব সম্ভব কোনো পুজো বা ঐ ধরনের কিছু চলছিল ওঁদের বাড়িতে। লুচির সঙ্গে নানারকম মিষ্টি, পায়েস, নারকেলের নাড়ূ, বরফি খেতে দিলেন তাঁরা। রূপকথার মদনকুমার মণিমালারা যেসব দিয়ে নাশতা করে, প্রায় সেসব। বিশাল অবস্থাপন্ন বাড়ি, সেখানকার মুখরোচক খাবার, তার সঙ্গে আশ্চর্য স্নিগ্ধ সুন্দর সকাল। সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আমি যেন সত্যি সত্যিই রূপকথার জগতের ভেতর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছি আর সে-জগতের মতোই না চাইতেই অভাবিত সব জিনিস পেয়ে যাচ্ছি।

'অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডে' অ্যালিস রূপকথার দেশে চলে গিয়েছিল স্বপ্নের ভেতরে। বোধহয় সব মানুষই শৈশবের কোনো-না-কোনো মুহূর্তে এমনিভাবে ওরকম অ্যালিস হয়ে যায়। চারপাশের বাস্তব পৃথিবীটাকে পুরনো খোলসের মতো পিছে ফেলে একটা অলীক জগতের উজ্জ্বল পথে-ঘাটে অবাস্তবভাবে হেঁটে বেড়াতে থাকে।

খাওয়া-দাওয়ার পরে আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। অনেক দূর হেঁটে গেলাম একটা বড় রাস্তা। বড় মানে পিচঢালা নয়। একটা চওড়া মাটির রাস্তা, একটা নদীর ধার-ঘেঁষে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেছে। সেই রাস্তা দিয়ে কিছুটা এগোতেই দেখলাম আধোডোবা একটা লঞ্চ রাস্তার পাশের নদীর অল্প পানিতে ভেঙে জবুথবু হয়ে পড়ে আছে। লঞ্চটাকে এভাবে জরাগ্রস্তের মতো ডুবে থাকতে দেখে আমার মনটা বিষাদাচ্ছন্ন হয়ে গেল। মনে হল, একটা কোনো বড় ধরনের জাহাজডুবির দুঃখময় স্মৃতি যেন ওটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যেন এখানে একটা বড় ধরনের বেদনাদায়ক কিছু ঘটে গিয়েছিল কোনো এককালে, সেই অব্যাহতিহীন দুঃখটা সেখানকার আকাশে-বাতাসের আজও কেঁদে বেড়াচ্ছে। কত অভাবিত কিছুই-না ভাবতে পারতাম আমরা সে-সময়!

এসব দেখতে-দেখতে বিমর্ষ-মনে হেঁটে চলেছি, হঠাৎ আশ্চর্য হয়ে দেখি আমাদের পাশেই একটা রহস্যজনক সবজির ক্ষেত। সে-ক্ষেতের মধ্যে বড় বড় লাতাজাতীয় সবুজ সতেজ পাতাওয়ালা সার-সার ছোট গাছ। গাছের পাতা একটু ফাঁক করলেই দেখা যায় ছোট-বড় কচি কচি খিরাই ধরে আছে। এর আগে আমি কখনও খিরাই দেখিনি। এর ছোট ছোট নরম কাঁটাওয়ালা সবজিগুলোর সবুজ গড়ন দেখে সেগুলোকে রূপকথার ফলের মতোই মনে হতে লাগল। ক্ষেতের আশপাশে কেউ ছিল না, আমরা খুশিমতো খিরাইগুলোকে গাছ থেকে ছিঁড়ে খেয়ে চললাম। বেলা বাড়ার সঙ্গে গলাও শুকিয়ে এসেছিল। সেই ঠাণ্ডা খিরাইগুলো প্রাণটাকে যেন জুড়িয়ে দিল। স্বপ্নের জিনিসকে এমন অপর্যাপ্তভাবে এর আগে কখনও পাইনি।

হাঁটতে হাঁটতে একসময় সবাই চলে গিয়েছিলাম আরও অনেকদূরে। একসময় হঠাৎ দেখি পাশেই বেশ বড়সড় একটা নদী। নদীর উল্টোদিকে বিরাট একটা চর। নদীটাকে দেখে কেন যেন আমার মনটা ছলছল করে উঠল। নদীর ওধারের বিস্তীর্ণ চরের দিকে তাকিয়ে আমার কেবলই মনে হতে লাগল, রূপকথার শেয়াল-পণ্ডিতের গল্পের সেই সন্তানহারা আর্তনাদমুখর কুমির ধূর্ত-শেয়ালকে ধরার জন্য হয়ত ঐ চরের কোনো এক জায়গাতেই মরার মতো ভান করে আজও শুয়ে আছে। নদীটাকে বাঁয়ে রেখে একট হাটের ভেতর দিয়ে কিছুটা হাঁটতেই একসময়-এসে হাজির হয়েছিলাম আমাদের বাসার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই নদীটার ধারে। হঠাৎ কী করে এল নদীটা এখানে? আমরা দুধের সাগর ক্ষীরের সাগর ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমির দেশ সব ঘুরে হঠাৎ আবার বাসার কাছের নদীটার ধারে ফিরে এলাম কী করে! সবকিছুই আমার কাছে ভেল্ক্কিবাজি বলে মনে হতে লাগর। সেই নদীর পাড় ধরে অনেকদূর হেঁটে ফিরে এলাম আমাদের বাসায়।

আরও পড়ুনসেইন নদীর তীরে ইবোলা'র প্রসঙ্গ ও আর্ট থেরাপি

বছর-বিশেক আগে গিয়েছিলাম করটিয়াতে। তখন হেঁটে দেখার চেষ্টা করেছিলাম ছেলেবেলার সেই আশ্চর্য সকালে কোন পথ ধরে কতদূরে আমরা গিয়েছিলাম। খুঁজতে গিয়ে দেখেছিলাম, আমরা সব মিলে আসলে সেদিন হয়ত মাইলখানেকের বেশি হাঁটিনি। কয়েকটা ক্ষেত পার হয়েছিলাম মাত্র। আমাদের পাশের গ্রামেই ছিল মুকুন্দ সাহার বাড়ি। কাজেই কতদূরেই বা যেতে পারি? আসলে আমরা তখন কেবলই কয়েকটি শিশু মাত্র, দুটো ছোট ছোট করুণ পা আমাদের, সঙ্গে কয়েকটা অবোধ অসহায় হৃদয়। কতদূরেই বা যাওয়া সম্ভব আমাদের? খুবই সামান্য জায়গা ঘুরে এসে আমরা পৃথিবীর শেষপ্রান্ত হেঁটে আসার বিস্ময় ও মুগ্ধতা অনুভব করেছিলাম। ছেলেবেলায় বিশ্বাস করার, অবাক হবার এই অপরিমেয় শক্তি ছিল আমারও।

বরফের রাজ্যে

সে অনেক আগের কথা, আমেরিকায় গিয়েছিলাম ঘুরতো, ক্যালিফোর্নিয়া হয়ে আগামীকাল চলে যাব নিউইয়র্কে। সেখানে কিছুদিন থেকে ফের আবার চিরদিনের বাংলাদেশ, আমার বাসা, ঘর-সংসার, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, লেখালেখি, বক্তৃতা, পরিবেশ আর সুশীল সমাজ আন্দোলন, বিষাক্ত বাতাস আর বিষাক্ত পানিতে হতশ্রী আমার প্রিয়তম ঢাকা মহানগরী।

এবার আর লস অ্যাঞ্জেলেস বিমানবন্দর থেকে নয়, নিউইয়র্কের প্লেন ধরতে হবে মাইল পঞ্চাশেক দূরের অরেঞ্জ কাউন্টি এয়ারপোর্ট থেকে। এতে আমাকে পৌঁছে দিতে জাহিদকে বাড়তি শ'খানেক মাইল গাড়ি চালাতে হবে ঠিকই, কিন্তু প্লেন ভাড়া হয়ে যাবে অর্ধেক। আজ অক্টোবরের ২০ তারিখ। ২০০২ সাল। আমার যাত্রা আগামী সকালে। ক্যালিফোর্নিয়ার আবহাওয়া এখনও ঝকঝকে, সোনাঝরা। অক্টোবর ছাড়ি ছাড়ি করলেও উত্তর গোলার্ধের শীত একে এখনও স্পর্শ করেনি। বাইরে বেরোলেই একরাশ ফুটফুটে হাওয়া বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

বিকেলের দিকে জাহিদ অরেঞ্জ কাউন্টিতে আমার ভাগ্নের ভুট্টোর বাসায় আমাকে রেখে এল। ওখানে রাত থেকে সকালে প্লেন ধরব।

এয়ারপোর্ট ভুট্টোর বাসার একেবারেই কাছে। ভোরবেলা সময়মতো গিয়ে প্লেনে উঠে বসলাম। আকাশ মেঘমুক্ত, উজ্জ্বল নীল। সকাল বেলার কচি রোদে চারপাশ ঝলমল করছে। আগেও আমেরিকার ওপর দিয়ে বেশ ক'বার যাতায়াত করেছি। কিন্তু আকাশে মেঘ থাকায় দেশটির আসল চেহারা আমার কাছে আজও রহস্য-ঢাকা। সিট পড়েছে জানালার বাঁ ধারে। কাজেই সোনায় সোহাগা। মন ভরে আমেরিকার প্রকৃতি দেখে নেওয়া যাবে।

আরও পড়ুন: সান্দাকফুর শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্য

প্লেন ছাড়ার ছ'সাত মিনিটও পার হয়নি, জানালা দিয়ে বাঁয়ে তাকাতেই দেখি পাশেই একটা রীতিমতো উঁচু পর্বত- তার পুরনো মাথাটা শাদা বরফে ধবধব করছে। দু'বছরে বারকয়েক অরেঞ্জ কাউন্টিতে গিয়েছি- চারদিকে বহুদূর পর্যন্ত তাকিয়েও দেখেছি, কিন্তু এমন কোনো পর্বতের চিহ্ন তা চোখে পড়েনি। তাহলে মাটি ফুঁড়ে এই তুষার শুভ্র পর্বতটা উঠে দাঁড়াল কোত্থেকে। কোথায় লুকিয়ে ছিল এতদিন? সেই বরফের ঠাণ্ডা যেন গায়ে এসে লাগছে। এমন বরফ-ঢাকা বিস্তীর্ণ পর্বত দেখলে বুকের ভেতরটা শুভ্র প্রশান্তিতে ভরে যায়। বুঝলাম ঠিক ক্যালিফোর্নিয়ায় না হলেও শীত এসে গেছে আমেরিকার প্রকৃতরাজ্যে। হয়ত প্রথমে পর্বত শিখরগুলোকে শুভ্রতায় ঢেকে একটু একটু করে সমভূমির দিকে শীতার্ত হাত বাড়াতে শুরু করবে। আরও কয়েক মিনিট যেতেই নিচে প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল। সকাল বেলার 'কমলা-রঙের' রোদ গোটা দেশের প্রকৃতিজগতের ওপর ঝরে পড়ে এক রমণীয় দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। রবীন্দ্রনাথের গানের লাইনটা মনে পড়ে :'রোদের সোনা ছড়িয়ে পড়ে মাটির আঁচলে'। সেই কুচি কুচি সোনার কণায় সারা প্রকৃতি যেন স্বপ্নের দেশ হয়ে উঠেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে সামনে তাকিয়ে আবার অবাক হই। দেখি চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আগের মতোই বরফ-ঢাকা আরেকটা বিশাল পর্বত। এর ওপর দিয়ে আমাদের প্লেনটা উড়ে যাবে। আবাক হই, একের পর এক এত বরফ-ঢাকা পর্বত বেরোচ্ছে কোথা থেকে। এক সময় দূরে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের সূর্যকরোজ্জ্বল বর্ণাঢ্য দৃশ্য চোখে পড়ল। উজ্জ্বল রক্তিম আভা বিচ্ছুরিত করে দীর্ঘ বিশাল এলাকাজুড়ে ভোরের তরুণ আলোয় সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তুষার শুভ্র পর্বতটা পার হতেই আবারও সে বিস্ময়। আরেকটা বরফ-ঢাকা পর্বত। এরপর আরেকটা। তারপর আরও আরও। অফুরন্ত।

যেদিক চাই, সারা আমেরিকা শুধু যেন আদিগন্ত বিস্তৃত বরফ-ঢাকা চির তুষারের এক অন্তহীন সাম্রাজ্য। সে শুভ্রতার শুচিতার অভ্রভেদী বিপুলতার যেন শেষ নেই। মনে হচ্ছে ক্রমেই যেন সেই অন্তহীন তুষার জগতের ভেতর ঢুকে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলছি। নিজেকে মনে হচ্ছে সেই বরফের দেশের কোনো প্রাগৈতিহাসিক তুষার মানব- এই শাদা হাড়-কাঁপানো বরফরাজ্যেই যার উদ্ভব, এর মধ্যেই যার বিলয়। প্লেনের ভেতরে বসেও গোটা আমেরিকা জোড়া সেই অন্তহীন বরফরাজ্যের শৈত্য বুকের ভেতর অনুভব করতে লাগলাম। জীবনে অনেক রকম সৌন্দর্যের সামনে আমি দাঁড়িয়েছি, কিন্তু এমন বিপুল অপূর্ব তুষারশুভ্র পবিত্রতার জগতে হয়ত কখনও আসিনি।

এমএ/১১:৩০/১২ জানুয়ারি

ভ্রমণ

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে