Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (75 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ১২-৩০-২০১৭

সেইন নদীর তীরে ইবোলা'র প্রসঙ্গ ও আর্ট থেরাপি

মঈনুস সুলতান


সেইন নদীর তীরে ইবোলা'র প্রসঙ্গ ও আর্ট থেরাপি

পকেটে ককো শ্যানেলের ছোট্ট শিশিটি নিয়ে আমি ফিরে তাকাই আইফেল টাওয়ারের দিকে। হাতে সময় আছে প্রচুর, কিন্তু মন খিন্ন হয়ে আছে, তাই প্যারিস নগরীর আইকন হিসেবে পরিচিত এ মিনারের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে ইচ্ছা হয় না। আমি পদব্রজে উঠে আসি সেইন নদীজুড়ে বিস্তৃত একটি ব্রিজে। ককো শ্যানেল ব্র্যান্ডের পারফিউমটি আমি ক্রয় করেছি মিনিট চল্লিশেক আগে। দস্তায় তৈরি রূপালি রঙের যে ছোট্ট কাসকেটে রাখা আছে শিশিটি, তা দেখতে অতিশয় অভিনব। ধাতব বাক্সটি যেন শিল্পী খোদ সালভেদর দালির হাতে তৈরি বহমান সময়ের তীব্র চাপে গলে বিকৃত হয়ে যাওয়া ঘড়ির অনুকৃতি। এ সৌরভ কি পিনোলোপে ম্যাকবয় ওরফে লোপা'র পছন্দ হবে? ঠিক নিশ্চিত হতে পারি না। সপ্তাহ দুয়েক আগে ভিনটেজ হোস্টেলের লবিতে আমি তাকে দরাজভাবে চুমো খাই। তখন তার শরীর থেকে অবধারিতভাবে ছড়াচ্ছিল স্নায়ু উদ্দীপ্ত করা সৌরভ। কিন্তু তা ককো শ্যানেল না হয়ে যদি ককো পয়জন হয়ে থাকে, তবে কি আমার সব আয়োজন ব্যর্থ হবে? হলে হোক, এ মুহূর্তে, কী বলবো, আই উড লাইক টু বি কেয়ারলেস অ্যাবাউট ইট।

ব্রিজ পাড়ি দিতে গিয়ে ঠিক মাঝ বরাবর এসে আমি বহতা নদীজলের দিকে তাকাই। পকেট থেকে বের করে আরেকবার চেক করি মোবাইল ডিভাইসটি। সিয়েরা লিওনের ফ্রিটাউন থেকে প্রত্যাশিত ই-মেইলটি আসেনি। আমার অফিস থেকে ই-মেইল মারফত কেউ লিখে জানায়নি- মি. সুলতান, ইউ আর অল ক্লিয়ারড্‌ স্যার; অডিট ও প্রোগ্রাম ইভ্যালুয়েশন দুই-ই উতরেছে ভালোয় ভালোয়। অডিটর খুঁজে পায়নি ফান্ডস্‌ ব্যবহারে কোনো নয়ছয়। ইভ্যালুয়েশনেও ধরা পড়েনি প্রোগ্রামের কোনো মারাত্মক খুঁত। কোনো সংবাদ না আসাতে আমি উদ্বেগ বোধ করি। অডিটের রিপোর্ট নেতিবাচক হলে তার প্রভাব পড়বে চাকরির চলমান পারফরমেন্সে। বড় আকারের অসঙ্গতি ধরা পড়লে চাকরিচ্যুত হওয়াও বিচিত্র কিছু না। কাঁধে ভারী জোয়ালের মতো এ উদ্বেগকে বহন করে আমি ব্রিজের সাইডওয়াক ধরে হাঁটি। নিচে ভেসে আসে বিশাল একটি পর্যটনি বোট। ছাদ-খোলা ডেকে বসে আমোদে মেতেছে শতাধিক পর্যটক। আমি তাদের মতো প্রমোদের গড্ডলিকায় গা ভাসাতে পারছি না বলে নিজের প্রতি করুণা হয়। বিড়বিড়িয়ে বলতে ইচ্ছা হয়- ইউ স্টুপিড পুওর গাই, লুক অ্যাট ইউ, প্যারিসে এসেও তুমি ঘুরে বেড়াতে পারছো না হাল্ক্কা চালে, তোমাকে আততায়ীর মতো অনুসরণ করছে সিয়েরা লিওনের ফ্রিটাউনে তোমার কৃতকর্মের ফল।

ব্রিজ থেকে নেমে নদী-পাড়ের প্রশস্ত প্রমেনাদ ধরে আমি পথ চলি। এ সড়কেও আমোদপ্রিয় পথচারীদের কমতি কিছু নেই। এদের কেউ কেউ ক্যামেরায় তুলে নিচ্ছে ছবি। কেউবা কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে সঙ্গীতের সুর-লয়ে মগ্ন হয়ে হাঁটছে। একখানা খালি বেঞ্চ দেখতে পেয়ে আমি বসে পড়ি ওখানে। ঝকঝকে রোদে ভরা সরণির দিকে তাকাতে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। তাই বেসবল ক্যাপ মাথায় দিয়ে চোখ ঢাকি পার্পল শেডের বৃত্তাকার রোদ চশমায়। প্রমেনাদের এক পাশে ব্যাপক উঁচু একটি স্যান্ডস্টোনে বাঁধানো দেয়াল। তা থেকে বেরিয়ে এসেছে চাকলা চাকলা পাথরের টুকরো। কম বয়সী বালক-বালিকারা দেয়াল আঁকড়ে ধরে শিলাখণ্ডে পা দিয়ে বাওয়া-বাওয়ি করছে। নিচের চাতালে দু'জন শিল্পী খুঁটি গেড়ে তাতে রিং ও দড়ি বেঁধে ধীরে-সুস্থে তৈরি করছেন অভিনব কোনো আর্ট অবজেক্ট। 

আমি সবকিছু অবলোকন করি। মানুষজনের পদভারে অত্যন্ত তৎপর প্রমেনাদের ভাইব্রেশন আমাকে ছুঁয়ে যায়। কিন্তু এ দৃশ্যপটের কোনো ডিটেলে আমি মনোযোগ দিতে পারি না। আমার মন কেবলই ফিরে যেতে থাকে ফ্রিটাউনে। ওখানে আমার কাজের মূল্যায়ন হচ্ছে, অডিট হচ্ছে বিগত বছরজুড়ে আমার তত্ত্বাবধানে ব্যয় হওয়া আর্থিক সম্পদের। এ ধরনের তদন্ত আমার অবর্তমানে হচ্ছে বলে আমি দারুণভাবে অস্বস্তিতে ভুগি। আমার কিছু কাজে অসঙ্গতি বের হয়ে আসা অসম্ভব কিছু না। উদাহরণস্বরূপ ১০টি জেনারেটর প্রদানের বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে। ইবোলা প্রাদুর্ভাবের তুঙ্গ মুহূর্তে দাতা সংস্থাগুলোর অনুদানে সিয়েরা লিওনের নানা স্থানে গড়ে উঠেছিল হোল্ডিং সেন্টার। অর্থাৎ কারও দেহে ইবোলার আলামত দেখা দিলে তাকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হতো হোল্ডিং সেন্টারে। ওখানে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করে তারপর পাঠানো হতো হাসপাতালে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকলে রুগ্‌ণ ব্যক্তিকে হোল্ডিং সেন্টারে সেবাদানের ব্যবস্থা করা হতো। প্রচণ্ড গরমে ত্রিপল ও প্লাস্টিকের শিট দিয়ে তৈরি হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে রোগীদের জীবন অসহনীয় হয়ে উঠলে আমার সংস্থা থেকে ত্রাণ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল ১০টি জেনারেটর সংগ্রহের জন্য ফান্ড। এ ফান্ড দিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ স্থানীয়ভাবে ক্রয় করে জেনারেটরগুলো। ভিন্ন একটি দাতা সংস্থা একই পদ্ধতিতে ফান্ড সরবরাহ করে এয়ার কন্ডিশনার খরিদ করার জন্য।

জেনারেটর ক্রয় বাবদ ফান্ড সরবরাহ করতে হয় দ্রুত। পরে আমি সচেতন হই যে, যেহেতু আমাদের বাজেটে ইকুইপমেন্ট শিরোনামে নির্দিষ্ট কোনো লাইন আইটেম নেই, সুতরাং জেনারেটর ক্রয়ের জন্য ফান্ড সরবরাহ করা আমার এখতিয়ার বহির্ভূত। আমার সিদ্ধান্ত মানবিক কারণে আবশ্যিক হলেও টেকনিক্যালি তা ছিল ভুল- আমি তা স্বীকার করে একটি মেমোতে সম্পূর্ণ বিষয় নথিভুক্ত করি। কিছুদিন পরে সাইট পর্যবেক্ষণের সময় জানতে পারি যে, স্বাস্থ্য বিভাগ তিনটি পুরনো ব্যবহার করা জেনারেটর কিনে তা নতুন হিসেবে দেখিয়েছে। এতে কিছু ফান্ড অবশ্যই তছরুপ হয়েছে। প্রতিক্রিয়ায় আমি হোল্ডিং সেন্টারগুলোকে দেওয়া আমাদের অন-গোয়িং অনুদান বন্ধ করে দিতে পারতাম। আমি যদিও স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে লিখিতভাবে প্রতিবাদ করেছি, কিন্তু মানবিক কারণে ফান্ড সরবরাহ বন্ধ করিনি।

আমি উঠে পড়ে আবার নদীতীরের প্রমেনাদ ধরে হাঁটতে শুরু করি। যেসব জটিল কাজে আমি যুক্ত আছি, তা কখনও কখনও আমার মনলোকে সৃষ্টি করে তীব্র স্ট্রেস। তখন পরিচিত কোনো প্রিয়জনের সান্নিধ্য কামনা করা আমার স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। চেষ্টা করি তার সাথে কথা বলে, আউটিংয়ে গিয়ে, একত্রে থিয়েটার দেখে বা কনসার্ট শুনে এ দুঃসময় অতিক্রম করতে। আজ সকালে যখন সিয়েরা লিওনে পেশাগত কর্মসূচিতে অডিট আমার স্নায়ুতে মারাত্মকভাবে চাপ সৃষ্টি করছিল, তখন এ বিষয়টি না ভেবে কিছুটা সময় অন্যভাবে আডেলিনার সাথে কাটাতে চেয়েছিলাম। ইতিমধ্যে তার সাথে আমার সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়েছে। হোটেল ডে আর্টস থেকে বেরিয়ে আমরা ক্যাফেতে বসেছি। আডেলিনা আমাকে নিয়ে গেছে পিয়ারে বনার্ড নামে তার প্রিয় এক শিল্পীর চিত্র প্রদর্শনীতে। কথা প্রসঙ্গে জেনেছি যে, ফুল সরবরাহের পার্টটাইম কাজে যুক্ত থাকলেও আদতে আডেলিনা হোটেল ডে আর্টসের শেয়ার হোল্ডার। সে নিজ থেকে আমাকে বলেছিল, সচরাচর সাড়ে ১১টার পর তার হাতে বেশ কিছুটা সময় ফ্রি থাকে। আমি চাইলে তখন তার সাথে কোথাও বেড়াতে যেতে পারি। আজ যখন সে লবির ফ্লাওয়ার ভাসগুলোতে তাজা ফুল গুঁজে তাতে স্পেয়ার দিয়ে পানি ছড়াচ্ছিল, আমি তাকে একত্রে বাইরে যাওয়ার প্রস্তাব করি। প্যারিসের কিছু স্থাপত্যকলার নির্মাণশৈলী অত্যন্ত অলংকারবহুল। আডেলিনা আইফোনে এসব ইমারতের ছবি দেখিয়ে নিজেই বলেছিল, 'তুমি চাইলে আমরা এক সাথে এগুলো দেখতে যেতে পারি। আই উড বি ডিলাইটেড টু এক্সপ্লেইন দ্য হিসটোরিক্যাল কনটেক্সট্‌ অব বিল্ডিং অল দিস্‌ গর্জিয়াস আর্কিটেক্‌চারস্‌।' এ মন্তব্যের ওপর ভরসা করে আজ যখন আমি সেইন নদীর তীরে তৈরি কয়েকটি দালানকোঠা দেখতে যেতে চাইলাম, সে নিরাসক্তভাবে জবাব দেয়, 'ইটস্‌ নট গোনা ওয়ার্ক টুডে। আমি আমার এক পুরনো বন্ধুর সাথে লাঞ্চ করতে যাচ্ছি। হি রিয়েলি নিডস্‌ মি।' আমি ডেসপারেট হয়ে জানতে চাই, 'আডেলিনা, বাতিল করা যায় না তার সাথে তোমার লাঞ্চের অ্যাপয়েন্টমেন্ট? আজ যে তোমাকে আমার প্রয়োজন অনেক বেশি।' সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে সে আইফোনে তার পুরনো বন্ধু রেমন্ড মিলারের ছবি দেখায়। পনি টেইল করা দীর্ঘ চুলের এ বুড়ো-মতো লোকটির মুখ রেখাবহুল। নানা ধরনের অভিজ্ঞতার চাপে তাকে খানিকটা বার্নড্‌ আউট দেখায়। আমি কিছু না বলে আডেলিনার কব্জিতে চাপ দিলে সে নতমুখী হয়ে বলে, 'দ্য পুওর গাই ইজ হ্যাঙ্গিং আউট অল অ্যালোন। আমাকে সে প্রত্যাশা করছে, আই রিয়েলি হ্যাভ টু গিভ হিম সাম কোয়ালিটি টাইম।' আডেলিনা উঠে চলে গেলে আমি হোটেলের লবিতে একা বসে বসে ভাবি- হাউ অ্যাবাউট মি আডেলিনা, আমার সময় কাটছে খুব খারাপ হালতে। এ উদ্বেগ-সংকুল সময়ে আমিও তো তোমার সঙ্গ প্রত্যাশা করেছিলাম।

সেইন নদীর দু'পাড়কে যুক্ত করেছে অনেক ব্রিজ। এগুলোর একটির চেয়ে অন্যটির ডিজাইন একেবারে আলাদা। আমি চলে আসি ভিন্ন একটি ব্রিজের কাছাকাছি। বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে মৃদুমন্দ লয়ে। আমি হাল্ক্কা পায়ে উঠে আসি ব্রিজের সাইডওয়াকে। বোধ করি স্যান্ডস্টোনে গড়া এ পুলটির নির্মাণ বিগত কোনো শতাব্দীতে। আমি তার নকশা করা রেলিং ও কিছু দূর পরপর দাঁড় করানো রট আয়রনে অলঙ্কৃৃত ল্যাম্পপোস্টগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখি। নিচে নদীজলে ভেসে যায় পাঁচটি পালতোলা কায়াক। আমার সামনে বিয়ের সাজ-পোশাক পরা এক দম্পতি হেঁটে গিয়ে দাঁড়ায় ল্যাম্পপোস্টের কাছে। মেয়েটির লালচে-গোলাপি ব্রাইডাল গাউনে ঝলমল করছে বিকেলের আলো। আমি তাদের দিকে নিরিখ করে তাকাই। মানব-মানবী বোধ করি নদীজলে তাদের যুগল ছায়া খুঁজতে খুঁজতে মাতে নিবিড় আলাপচারিতায়। আমার মনে একটি সামান্য সওয়াল ঘুরপাক করে- আর দে রিয়েলি হ্যাপি দ্য ওয়ে দে লুকড্‌ নাও? এ দম্পতি কি এ মুহূর্তে সত্যি সত্যিই দুশ্চিন্তামুক্ত? আমার ভেতর থেকে উঠে আসে না এ প্রশ্নের কোনো জবাব। তবে মোবাইল ডিভাইসে সুরেলা আওয়াজ হলে বুঝতে পারি। বুঝতে পারি- টেক্সট মেসেজ এসেছে লোপার কাছ থেকে। টেলিফোনের স্ট্ক্রিনে আমি তার গলায় কালো চোকার পরা মুখের কিউট ছবি দেখি। তথ্যবহুল কোনো বার্তার পরিবর্তে সে পাঠিয়েছে কবি রাইনে মারিয়া রিল্ক্কের একটি ছত্র, 'আই ওয়ান্ট টু বি উইথ দোজ হু নোজ সিক্রেট থিংগস্‌ অর এল্‌জ অ্যালোন।' আমি যশস্বী এ ফরাসি কবির উদ্ৃব্দতি নিয়ে মনে মনে তর্পণ করি। আপাত গোপন কোনো শাস্ত্রে আমার দখল না থাকলেও এ মুহূর্তে আমি নিঃসঙ্গ, অলসো ফিলিং লাইক আ বিট রিজেক্টেড্‌। রিল্ক্কের ছত্রটি পাঠিয়ে লোপা যেন তৈরি করে নেয় সম্ভাব্য অভিসারের আবহ।

ব্রিজ থেকে নেমে সেইন নদীর পাড় ধরে আবার হাঁটি। লোপার আবছা ইমেজ, ও কিছুক্ষণের মধ্যে তার এসে পড়ার সম্ভাবনা আমাকে ছায়ার মতো সঙ্গ দেয়। তার সাথে আমার দেখা হয়েছিল ব্রাসেলস্‌ থেকে প্যারিসে আসার পথে, ট্রেনে। প্যারিসের গারে ডে নর্ড রেলওয়ে ইস্টিশান থেকে আমার সাথে হেঁটে হেঁটে ভিনটেজ হোস্টেল অব্দি এসেছিল সে। দিন তিনেক আগে তার কাছ থেকে একটি টেক্সট্‌ মেসেজ পাই। বার্তাটি সাদামাটা ও সরাসরি। আর্ট থেরাপির উল্লেখ করে সে জানতে চেয়েছে- আমি তার কাছ থেকে পার্সোনেলাইজড্‌ সার্ভিস ক্রয় করতে চাই কি-না? আমাকে আরেক বার অন্তরঙ্গভাবে সঙ্গ দেওয়ার বাসনাও সে প্রকাশ করেছে। আজ সকালে আডেলিনা রাজি না হয়ে বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার মিনিট বিশেক পর সে টেলিফোন করে। তখন কথা প্রসঙ্গে সে তার সুহৃদ রেমন্ডের মিলার সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য দেয়।

রেমন্ডকে বলা চলে অবসরপ্রাপ্ত হিপি। পাহাড় বা বনানীতে হাইক করে সে বিরল প্রজাতির অর্কিড সংগ্রহ করতে ভালোবাসে। জাতীয়তার দিক থেকে ফ্রেঞ্চ-আমেরিকান এ বয়স্ক হিপির সাথে আডেলিনার অনেক দিনের যোগাযোগ। বছর কয়েক আগে যুক্তরাষ্ট্রের আপ্যালেচিয়ান ট্রেইলে একাকী হাইক করতে গিয়ে তার ফরাসি স্ত্রী জুডিথ পথ হারায়। বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে ১৩ দিন পর গভীর জঙ্গলে অনাহারে সে মৃত্যুবরণ করে। স্ত্রী বিয়োগের পর থেকে আডেলিনার সাথে গড়ে উঠছে রেমন্ডের গাঢ় সম্পর্ক। নিঃসঙ্গতা প্রখর হয়ে উঠলে রেমন্ড মাঝেসাঝে প্যারিসে আসে। তখন সে আডেলিনার সাথে সময় কাটাতে পছন্দ করে।

আরও পড়ুন: অনুভবে রবীন্দ্রনাথ, কলকাতার পথে প্রান্তরে

রেমন্ড সম্পর্কে আমাকে এত কিছু বলার পেছনের গূঢ় কারণ কী, তা বুঝতে না পারলেও তাদের সম্পর্কের ডেপ্‌থ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাই। আডেলিনার প্রতি যেহেতু আমার কোনো অবলিগেশন নেই, তাই লোপাকে আর্ট থেরাপিতে আমার আগ্রহের কথা জানিয়ে টেক্সট করি। সে সাথে সাথে আজ বিকেলের দিকে সেইন নদীর তীরে একটি লোকেশনে দেখা করে সন্ধ্যা কাটাতে রাজি হয়। সে এসে পৌঁছাবে আরো মিনিট চল্লিশেক পরে। এ সময়টুকু নিরুদ্বেগে কাটানোর জন্য আমি বিশাল বিশাল বৃক্ষে ছাওয়া একটি সরণিতে ঢুকে পড়ি। সড়কের এক পাশে অনেকটি ব্যবহারে জীর্ণ বইয়ের দোকান। আমি একটি দোকানে দাঁড়িয়ে পড়ে পুরনো বইগুলো দেখি। ডিসপ্লে করা হয়েছে শার্ল বদলেয়ার ও ম্যালার্মের কবিতার বই। কিন্তু ভাষা ফরাসি বলে কেনার উদ্যম পাই না। তবে আরও কিছুক্ষণ বইপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটি দোকানে পেয়ে যাই আমেরিকার কবি ওয়াল্ট হুইটম্যানের 'লিভস্‌ অব গ্রাস' বইটি। পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে নজর পড়ে গদ্য কবিতার কয়েকটি ভাবনাঋদ্ধ ছত্রে- 'হ্যাপিনেস, নলেজ, নট ইন অ্যানাদার প্লেস, বাট দিস প্লেস, দিস প্লেস-বাট নট ফর অ্যানাদার আওয়ার, বাট দিস আওয়ার।' আমি পুরনো বইটি খরিদ করতে গিয়ে অসাধারণ এ কাব্যগ্রন্থের বিরল একটি সংস্করণ খুঁজে পাওয়ার এক্সাইটমেন্টে মুহূর্তে সুখী হতে চেষ্টা করি। বইয়ের দোকানে আরও কিনতে পাওয়া যায় চিত্রকর কমিল পিসারোর ল্যান্ডস্কেপে আঁকা একটি র‌্যাপিং পেপার ও কার্ড। কার্ডে আমি লোপাকে উদ্দেশ করে লিখি আমেরিকার কবি মায়া অ্যাঞ্জেলোর দুটি ছত্র- 'ট্রাই টু বি আ রেইনবো ইন সামওয়ানস্‌ ক্লাউড।' তা দিয়ে আমি ককো শ্যানেলের ছোট্ট শিশিটি প্যাকেট করি। বইয়ের দোকানি প্যাকেটের ওপর রূপালি রিবন জড়াতে সহায়তা করেন। তখনই লোপার কাছ থেকে ইলাবরেট টেক্সট্‌ পাই। সে নদীতীরে একটি প্রাসাদের বিশদ বর্ণনা দিয়ে তার সামনের সড়কে দাঁড়াতে অনুরোধ করে। আমি ঘড়ি দেখি। বুঝতে পারি- মিনিট দশেক পর সে এসে পৌঁছে যাচ্ছে এদিকে।

টেক্সটের বর্ণনা অনুসরণ করে বিশাল প্রাসাদটি খুঁজে পেতে অসুবিধা কিছু হয় না। তবে এর চকমিলান স্থাপত্যকলার দিকে তাকিয়ে একটু তাজ্জব হই। আডেলিনার টেলিফোন স্ট্ক্রিনে আমি এ প্রাসাদের ছবি দেখেছিলাম। কথা হয়েছিল, তার সাথে সেইন নদীর তীরে ১৮ শতকে গড়া এ ইমারতটি দেখতে আসব। ঘটনাচক্রে আমি এখানে এসেছিও, তবে অট্টালিকাটির সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি ভিন্ন এক নারীর! আমি পুরুষের মন নিয়ে প্রতিফলন করি- হোয়ার হ্যাজ অল মাই আডমায়ারেশন ফর আডেলিনা গো?

আরও পড়ুন: সান্দাকফুর শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্য

সড়কে অনেকটা হাল্ক্কা-পাতলা বেবিটেক্সি বা মিশুকের মতো যানবাহন দেখে অবাক হই। প্যারিসের রিকশাটি তো দেখতে বেশ পরিপাটি! আমি ছবি তুলতে যাই। তখনই তা থেকে নেমে আসে হাইহিল পরা লোপা। ডিজাইনার জিন্সের সাথে ক্রপ টপ পরে এসেছে। তার কোঁকড়ানো কালো চুলে গাঁথা রোদ চশমা। কাছে এসে হাত ধরতেই তাকে কেমন জানি কলেজছাত্রীর মতো চঞ্চল দেখায়। মেয়েটির খোলা কাঁধে জড়ানো সিল্ক্কের মিহি সুতায় বুনট করা পিচ্‌ রঙের জ্যাকেট। আমি তার গণ্ডদেশে ঠোঁট ছোঁয়াতে গিয়ে দেখি, পাকা পিচ ফলের লালচে-গোলাপি আভার মৃদু বিকিরণে মোহনীয় হয়ে আছে তার নরম মুখ। আমার ছোট্ট চুমোর প্রতিদানে উষ্ণ হাগে ভরে দেয় সে আমার শরীর।

এমএ/০২:৩০/৩০ ডিসেম্বর

ভ্রমণ

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে