Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.2/5 (281 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০২-২৮-২০১৩

একজন মুক্তিযোদ্ধার স্বদেশ যাত্রা

নজরুল মিন্টো



	একজন মুক্তিযোদ্ধার স্বদেশ যাত্রা

দীর্ঘ ২১ বছর পর মুক্তিযোদ্ধা মুহিবুর রহমান স্বদেশের পথে যাত্রা করলেন। বিগত ২১ বছর ধরে তিনি প্রবাসে জীবনযাপন করছিলেন। ছিলেন একাকী। একাকী থাকতেই পছন্দ করতেন। দেশের মানুষের সঙ্গে এমনকি নিজের আত্মীয়স্বজনের সাথেও তার যোগাযোগ ছিল না। কী এক অজানা ক্ষোভ নিয়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা অবশেষে কানাডায় বছরের পর বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। তার সঙ্গে আমার বেশ ক‘বার সাক্ষাৎ হয়েছে। প্রতিটি সাক্ষাৎই ছিল অকস্মাৎ। আলাপ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তার কোন আগ্রহ ছিল না। দেশের কোনো প্রসঙ্গ তুললেই তিনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। তবু টুকরো টুকরো আলাপ হয়েছে স্মৃতি থেকে তা এ লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

মুহিবুর রহমান ১৯৭৫-এ দেশত্যাগ করেন। না কোনো উচ্চাকাঙ্খা নিয়ে, উচ্চশিক্ষার জন্য নয়। দেশের মানুষের প্রতি অভিমান করেই তিনি দেশ ছেড়ে চলে আসেন।
১৯৭১ সালে মুহিবুর রহমানের বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। রাজনীতির সঙ্গে ঐ বয়সে তার কোনো সংশ্রব ছিল না। ৭ মার্চের ভাষণ এবং অসহযোগ আন্দোলনের ডাক শুনে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের এক অজ পাড়াগায়ে তার জন্ম এবং শৈশব ও কৈশোর সেখানেই কাটিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে দেখার সুযোগ তার কোনদিন হয়নি, এমনকি বড় কোনো রাজনৈতিক নেতার সাথেও তার পরিচয় ছিল না। তিনি নিজ তাগিদে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করেন। তার যুদ্ধে যাওয়ার সংবাদ প্রচার হয়ে গেলে পাকিস্তানিরা রাজাকারদের সহযোগিতায় তার বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। ফেঞ্চুগঞ্জ জাহাজ গুদামের সামনে দিনরাত অমানুষিক নির্যাতন করে অবশেষে একদিন গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে। পাকিস্তানিরা তাদের সহযোগী রাজাকারদের বলেছিল লাশটা যেন মরহুমের বাড়িতে পৌছে দেয় কিন্তু রাজাকাররা বাড়িতে না পৌছিয়ে কুশিয়ারা নদীতে ছুড়ে ফেলে দেয়। দু’দিন পর নদীর শেষ মাথায় একটি লাশ ভেসে উঠতে দেখলে স্থানীয় জেলেরা তুলে নিয়ে গিয়ে বালাগঞ্জ থানার কোনো এক গ্রামে দাফন করে।
দেশ স্বাধীন হলে মুহিবুর রহমান তার এলাকায় ফিরে আসেন। সবাই তার বিরোচিত ভূমিকার জন্য প্রশংসায় তখন পঞ্চমুখ। পুরো এলাকা তার জন্য গর্ববোধ করে। গ্রামের লোক থেকেই তিনি শোনেন কারা তার বাবাকে ধরিয়ে দিয়েছিল। ইতিমধ্যে রাজাকার এবং শান্তি কমিটির লোকজন এসে প্রাণভিক্ষা চায়। তিনি ক্ষমা করতে চাননি কিন্তু তার মায়ের কথা রাখতে গিয়ে তিনি সেদিন নীরব ভূমিকা পালন করেন। একসময় অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ আসে। তিনি অস্ত্র জমা দেন এবং স্বাধীন সোনার বাংলার ভবিষৎ গড়ার জন্য লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকান্ডের খবর পেয়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে যান। আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয়দের সঙ্গে দেখা করেন প্রতিবাদ করার অনুরোধ করেন। কিন্তু নেতারা কেই এগিয়ে আসে না। দেশের সাধারণ নাগরিকরা সেদিন একটি ডাকের অপেক্ষা করছিল একদিন, দুদিন, এক সপ্তাহ। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। যার জন্য জাতি একটি যুদ্ধ করলো, যার কারণে লক্ষ লক্ষ লোক আত্মাহুতি দিল, যাকে উপলক্ষ করে দেশে এত নেতার সৃষ্টি হলো তার নৃশংস হত্যাকান্ডে এসব নেতাদের নীরবতা দেখে মুহিবুর রহমানের অন্তরাত্মা ডুকরে কেদে ওঠে। তার মনে হলো বেঈমানে বেঈমানে ছেয়ে গেছে পুরো দেশ। ১৫ আগস্টের নৃশংসতা দেখে যে পাখিরা নীড় ছেড়ে বের হয়নি, স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল যাদের কলকাকলী, যে ফুলেরা হারিয়েছিল  তাদের নিস্পাপ সৌন্দর্য, তারাও নেমক হারামদের ভূমিকা দেখে মুহিবুর রহমানের মত আশ্চর্য হয়ে যায়। অবশেষে একমুঠো মাটি হাতে তুলে মুহিবুর রহমান তার প্রিয় স্বদেশভূমিকে বিদায় জানিয়ে ভারতে চলে যান এবং বিভিন্ন দেশ ঘুরে ঘুরে একদিন কানাডায় আসেন।
১৯৯৬-এর নির্বাচনের পর একদিন মুহিবুর রহমান আমার ঘরে এসে উপস্থিত। আমি অবাক হলাম। তার চেহারায়ও ছিল বেশ পরিবর্তন। বেশ হাসিখুশি। কোনো ভনিতা না করেই বললেন, ‘আমি দেশে যাচ্ছি’। আর কিছু বললেন না। বসতেও চাইলেন না। আমার হাতে একটি লেখা ধরিয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন।
 
‘‘আবার আমার বাংলার আকাশ এখন স্বচ্ছ নীল,
পাখিরা ডানা মেলে মনের আনন্দে উড়ছে। 
বনে বনে ফুটেছে ফুল,
মুক্ত বাতাস বইছে।
আমার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলা-
আমার শহীদ বাবা যে মাটিতে শুয়ে আছেন
সে স্বদেশ আমার-
আমি সেখানে ফিরে যাচ্ছি।
পাকিস্তানি হানাদারদের কাছ থেকে মুক্ত করেও
যে দেশ ছেড়ে এসেছিলাম একদিন
সে দেশে ফেরত যাচ্ছি।
শত শহীদ জননীর কান্না যে দেশে
একদিন বোবা হয়ে গিয়েছিল 
আমি সেখানে ফিরে যাচ্ছি।
আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা,
আমরণ মুক্তিযোদ্ধা।
দেশের মানুষ আমার প্রতীক্ষায় দিন গুনছে
আমি দেশে যাচ্ছি।’’
 
মুহিবুর রহমানের ভেতর এত কাব্য, এত ক্ষোভ আছে আমার জানা ছিল না। একজন মুক্তিযোদ্ধার মনের ভেতর এত আগুন আমি কোনদিন বুঝতে পারিনি। আমার মনের ভেতর ‘৭১-এর এক চমকপ্রদ অনুভূতি দোল খেলো।
লেখাটা পড়ে আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। মনে হলো অসমাপ্ত। মুহিবুর রহমান যেন আরও কিছু বলতে চান। উত্তেজিত হয়ে বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে। অনেক খোজাখুজি করে অবশেষে তাকে বের করলাম। 
মুহিবুর রহমান আমার হাত ধরে আমাকে তার ঘরে নিয়ে গেলেন। স্যুটকেস খুলে পর পর বিভিন্ন রঙের ২১টি ডায়রি বের করলেন। তারপর আমার উদ্দেশে বললেন- এই ডাইরিগুলোতে গত ২১ বছরের  বাংলাদেশের ঘটনা প্রবাহ লেখা আছে। এই ডাইরিতে রাজাকার-আলবদরদের লিষ্টও আছে।
দেশে গিয়ে আমার প্রথম কাজ দেশের জন্য যারা যুদ্ধ করেছে সেইসব মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা। তারপর তাদের নিয়ে জনমত তৈরি করার কাজে হাত দেবো। দেশের জনগণ চায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক। শুধু উদ্যোগের অভাব। একটা ডাকের অপেক্ষায় মানুষ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতেই হবে। শুধু যুদ্ধাপরাধীদেরই নয়, যারা এদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, যারা এদের লালন করেছে তাদেরও বিচারের কাঠগড়ায়  দেখতে চাই।
 
সর্বশেষঃ গত ১০ নভেম্বর ডাচ এয়ার লাইনস-এ বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহিবুর রহমান স্বদেশের উদ্দেশে কানাডা ত্যাগ করেন।
 
(লেখাটি ১৯৯৬ সালে যুক্তরাজ্য  থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সুরমা পত্রিকার বিজয় দিবসের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।)

প্রধান সম্পাদক

  •  1 2 > 
Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে