Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.4/5 (11 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ১২-১৬-২০১৭

উল্লসিত সবাই পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলছে :জয় বাংলা

আনিসুজ্জামান


উল্লসিত সবাই পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলছে :জয় বাংলা

যখন ১৯৭১ সালের বিজয় দিবসের দিকে তাকাই, তখন দেখতে পাই, উল্লসিত সবাই পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলছে :জয় বাংলা। স্বজন হারানো মানুষ সাশ্রুনয়ন, তবু দেশ যে শত্রুমুক্ত হয়েছে, তার জন্য স্বস্তিবোধ হচ্ছে তারও। ষোড়শ ডিভিশনের পদাতিকেরা তখনও দেখা দেয়নি। সবার চোখেই সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন। তারই মধ্যে উৎকণ্ঠা :বঙ্গবন্ধু কি ফিরে আসতে পারবেন পাকিস্তানের কারাগার থেকে? ধরবেন কি এই বিপর্যস্ত দেশের হাল?

আজ সেদিনের সুখ-দুঃখ আবেগ-উৎকণ্ঠা নেই, মানুষের মধ্যে সেই ঐক্যও নেই। মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি আর প্রত্যেকের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় না। এ জাতির জন্যে কী করেছিলেন বঙ্গবন্ধু, তা জানা নেই অনেকের, অথবা তার স্বীকৃতি নেই সকলের মুখে। মুক্তিযুদ্ধকালের অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে দূরে সরে এসেছে অনেকে।

সপরিবারে বঙ্গবন্ধু-হত্যা, কারাগারে জাতীয় চার নেতার নিধনযজ্ঞ, আরও নানাভাবে রাজনৈতিক নেতার হত্যা, মুক্তিযোদ্ধার হাতে মুক্তিযোদ্ধা বধ, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসন, সংবিধান নিয়ে ছিনিমিনি খেলা- তখন যা অকল্পনীয় ছিল, পরে তা-ই বাস্তবে সংঘটিত হয়েছে। ৪৬ বছরে বাংলাদেশ নানাক্ষেত্রে উন্নতি লাভ করেছে সত্য, কিন্তু এসব কলঙ্কিত অধ্যায়ও তো নির্মম সত্য।

উন্নতি করেছে বটে বাংলাদেশ। যে-দেশ টিকতে পারবে না বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তত্ত্বজ্ঞ মানুষ, সেই দেশের প্রবৃদ্ধি আজ চমকিত করেছে সকলকে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা সত্ত্বেও সে-দেশ খাদ্যে-তরিতরকারিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আরও কিছু কিছু খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি সর্ববাদিসম্মত। তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের ভূমিকা ঈর্ষণীয়। সারা বিশ্বে শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ বাহিনীর ভূমিকা প্রশংসিত। এসবই শ্নাঘার বিষয়।

তারপরও অস্বীকার করা যায় না যে, উন্নয়নের কথা আমরা যতটা ভেবেছি, সম্পদের সুষম বণ্টনের চিন্তা ততটা করিনি। নারীর অগ্রগতি বাংলাদেশের খুব বড় অর্জন, কিন্তু তারই পাশাপাশি পরিবারে এবং পথেঘাটে নারী নির্যাতনও বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্রধর্মের সহাবস্থান। হিন্দু দেবদেবীর প্রতিমা প্রায়ই বিধ্বস্ত হয়, বৌদ্ধমন্দির আক্রান্ত হয়, খ্রিষ্টীয় যাজক আততায়ীর হাতে প্রাণ দেন। কোন মুখে বলব যে, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদাহরণ? অনেক নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মানুষ পীড়নের শিকার- এ কথাই বা ভুলব কী করে?

প্রায় সিকি শতাব্দীর গণতান্ত্রিক শাসনকালে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। জাতীয় সংসদ আজও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেনি। কোনো বিষয়েই জাতীয় ঐক্য নেই। এই অবস্থায় সামনের দিকে এগোনো সহজ নয়।

তবু বাংলাদেশ আত্মসম্মানের পরিচয় দিয়েছে- নির্মীয়মাণ পদ্মা সেতু তার দৃষ্টান্ত। বৈষয়িক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পলাতক রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ- মানবিকতার এ-দৃষ্টান্ত বিশ্বময় প্রশংসিত হয়েছে।

১৯৭১ সালে যে-বিজয় আমরা ছিনিয়ে এনেছিলাম, তা দেশের মানুষ পেয়েছে- কেবল নাগরিক উচ্চ ও মধ্যবিত্তেরা নয়, গ্রামীণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের কাছেও তা পৌঁছেছে। তবে বৈষম্য দূর হয়নি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার মাত্রা হয়তো বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির তালিকা দীর্ঘ হবে। আগামী দিনগুলোতে আমরা কী করতে পারব, তা এক বড় কথা। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক লক্ষ্য কি আমরা অর্জন করতে সমর্থ হবো কিংবা আমরা কি তা করতে চাই। স্বাধীনতা লাভের প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে অনেক কিছুর প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হয়েছে। নতুন পরিস্থিতি নতুন সংকল্প, নতুন সমাধান দাবি করে, তাও আমাদের মনে রাখতে হবে।

শহীদের রক্ত আমরা বৃথা যেতে দেবো না, ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরের উল্লাস আমাদের ধরে রাখতে হবে। সেদিন তো আমাদের অভাব-অনটনের শেষ ছিল না, তবু আমরা শত্রুমুক্ত দেশের বাতাস নিয়েছি বুক ভরে। ২৬ মার্চে বাংলাদেশের বুকে দাঁড়িয়ে ১৬ ডিসেম্বরকে আমরা কেউ প্রত্যক্ষ করিনি- করা সম্ভব ছিল না। তবু আত্মশক্তিতে আস্থা ছিল; প্রত্যয় ছিল, মুক্তি একদিন আসবেই। অনতিক্রম্য বাধা পেরিয়েই তো এসেছে ১৬ ডিসেম্বর। মানুষের ওপরে বিশ্বাস রাখব। এ-মানুষ মাথা নোয়াবার নয়। দেশ এগিয়ে যাবেই; পূরণ হবে আমাদের সব স্বপ্ন।

প্রতি বিজয় দিবস আমাদের সেই বার্তাই দিয়ে যায়।

তথ্যসূত্র: সমকাল
এআর/১০:৫৫/১৬ ডিসেম্বর

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে