Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (71 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ১২-০৯-২০১৭

দুর্নীতির অর্থ ফেরত দিলে মামলা নয়

মিজানুর রহমান খান


দুর্নীতির অর্থ ফেরত দিলে মামলা নয়

ঘুষ বা দুর্নীতির অর্থ ফেরত দেওয়া হলে মামলা হবে না। দেশে এ ধরনের কোনো আইন বা বিধান নেই। তবু দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৪ কোটি টাকা ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। দুদকের এই কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রক্রিয়া চালু হলে দুর্নীতিবাজেরা আরও উৎসাহিত হবে।

দুদক সূত্রে জানা যায়, এই প্রক্রিয়ায় দুদকের ‘বড় সাফল্য’ হলো হল-মার্ক কেলেঙ্কারির প্রায় ১৩ কোটি টাকা ফেরত পাওয়া। এ ছাড়া আরও অন্তত ১০টি ছোটখাটো ঘটনায় দুদকের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ৯৮ লাখ ৩৩ হাজার টাকা ফেরত পেয়েছেন ভুক্তভোগীরা। যদিও চলমান দুর্নীতির তুলনায় এই অর্থ অতি নগণ্য।

এভাবে মামলা এড়ানোর আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন আছে বলে স্বীকারও করেছেন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে অবস্থা বুঝে আমরা ব্যবস্থা নেব। লাভ-লোকসানের (কস্ট বেনিফিট) বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হবে। আইনি ও নৈতিকতা যেমন, তেমনি বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।’

তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘নৈতিক ও আইনগত উভয় দিক থেকেই এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এক-এগারোর সময়ের ট্রুথ কমিশনের ধারণারও আমরা বিরোধিতা করেছিলাম। কারণ, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিচার নিশ্চিত করতে অপারগ থেকে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা রক্ষাকবচ তৈরিতে সহায়ক হবে না।’

দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান মনে করেন, স্থায়ীভাবে নয়, একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ‘প্লি-বারগেইন’ আইন করা যেতে পারে। তবে এর যৌক্তিকতা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাবে।

প্রসঙ্গত, হল-মার্কের নকশি নিট তার তিনটি মামলার মধ্যে একটিতে টাকা ফেরত দিলেও পরে আর টাকা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নিটের দুটি মামলা চলমান আছে। গত ৯ নভেম্বর সোনালী ব্যাংকের সহকারী ব্যবস্থাপক সুব্রত কুমার দাস দুদক পরিচালককে জানান, নকশি নিট গ্রুপের কাছে এখন পর্যন্ত ব্যাংকের আদায় বা সমন্বয়যোগ্য অর্থের পরিমাণ ৩২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এ বিষয়ে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, একটি প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ায় দুদক হল-মার্কের ওই ১৩ কোটি টাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। দুদক ও আদালত তাতে একমত হয়ে সম্মতি দিলেও তা আইনসিদ্ধ নয়। এর বৈধতা উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হলে তা বাতিল হয়ে যাবে।

এদিকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের গত মার্চের রায় সত্ত্বেও বিগত সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গোয়েন্দা সংস্থার তোলা ১ হাজার ২৩২ কোটি টাকা ফেরত দেয়নি সরকার। এ ছাড়া ট্রুথ কমিশনের সংগৃহীত ৩৪ কোটি টাকা সরকারের কোষাগারেই পড়ে আছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত মার্চে ৯০ দিনের মধ্যে ৬১৫ কোটি টাকা ফেরতের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এর কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী আমীর-উল ইসলাম গতকাল বলেন, টাকা ফেরতদান-সংক্রান্ত (৪০ ব্যবসায়ী থেকে নেওয়া ৬১৫ কোটি টাকা) আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন দাখিল করা হয়েছে। এখন শুনানির প্রস্তুতি চলছে।

দুদক মনে করে, যেকোনোভাবে আত্মসাৎ হওয়া অর্থ ফেরতে কিছু সাফল্য তাদের আছে। বেসিক ব্যাংকের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা এবং হল-মার্কের ২ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকার সিংহভাগই আত্মসাতের শামিল। নামে ঋণ হলেও তার সবকিছুই জাল কাগজপত্র দিয়ে তৈরি। তাই বেসিক ও হল-মার্ক ব্যাংক কেলেঙ্কারির অভিযুক্তদের কাছ থেকে এ পর্যন্ত ফেরত পাওয়া ১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা (বেসিক ব্যাংকের ৫৭৬ কোটি ও হল-মার্কের ৬ গ্রুপের কাছ থেকে ৫৭২ কোটি) আদায় করাকে তারা আত্মসাতের অর্থ পুনরায় রাষ্ট্রের কোষাগারে ফেরত আনা হিসেবে দেখছে।

এ বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, হল-মার্ক ও বেসিক ব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া ১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা মামলা তুলে নেওয়ার কথা বলে আদায় করা হয়নি। তবে হল-মার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকা নিট গ্রুপের কাছ থেকে ২০১৪ সালে প্রায় ১৩ কোটি টাকা মামলা না করার শর্তে ফেরত নেওয়া হয়েছিল।

দুদকের হস্তক্ষেপে টাকা ফেরত
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির বরখাস্ত হওয়া একজন ক্যাশিয়ার গত ৬ নভেম্বর পর্যন্ত ৩৩ লাখ টাকা প্রতিষ্ঠানের কাছে ফেরত দিয়েছেন। বাকি অর্থ সাধ্যমতো ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন তিনি। দুর্নীতি করার জন্য অনুতপ্ত হয়ে তিনি স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি দিয়েছেন দুদকের একজন মহাপরিচালকের কাছে।

এক ব্যক্তি সরকারদলীয় একজন সাংসদকে ব্যবসায় খাটানোর জন্য ৫০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু সাংসদ ওই টাকা মেরে দেন। ৫ মাস আগে দুদকের হস্তক্ষেপে ভুক্তভোগী ২০ লাখ টাকা ফেরত পান।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে ছিলেন সুবীর কান্তি। তিনি এক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে ফ্ল্যাট কিনতে এক কোটির বেশি টাকা দেন। কিন্তু প্রতারণার আশ্রয় নেয় ওই ডেভেলপার। দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, ফ্ল্যাট দূরের কথা, টাকা ফেরত দিতেও অস্বীকৃতি জানান তিনি। পরে দুদকের হস্তক্ষেপে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৩০ লাখ টাকা ফেরত দেন তিনি।

পাবনার শাহজাদপুরে গত ১১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে বিদ্যুতের খুঁটি বসাতে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করার পর ভুক্তভোগীরা টাকা ফেরত পান।

মেহেরপুরের এক উপসহকারী প্রকৌশলী বাড়ি তৈরির নকশা অনুমোদনে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা ঘুষ নেন বলে অভিযোগ ওঠে। গণশুনানির পর এক ভুক্তভোগী ৩ হাজার টাকা ফেরত পান।

ফেনীর সোনাগাজীর এক ইউপি সদস্য ১২ হাজার টাকার মাতৃত্বকালীন ভাতা আত্মসাতের পর মুচলেকা দিয়ে তা ফেরত দেন।

ধানমন্ডির ভূমি অফিসে একটি ফ্ল্যাটের নামজারির জন্য নেওয়া ১ লাখ ২০ হাজার টাকার ঘুষ দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার নির্দেশে ফেরত দেওয়া হয়।

ঢাকার একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ভর্তির অগ্রিম হিসেবে নেওয়া চার লাখ টাকা পরে দিতে বেঁকে বসে। কিন্তু দুদকের হস্তক্ষেপে ওই টাকা দ্রুত ফেরত দেওয়া হয়।

গত মাসে দুদক হটলাইনে ফোন পায় যে বনানীর একটি স্কুল বেআইনিভাবে অতিরিক্ত ফি নিচ্ছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক দুদকের একজন মহাপরিচালকের ফোন পান। মুচলেকা দিয়ে তাৎক্ষণিক ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ফেরত দেন তিনি।

দুদক কর্মকর্তাদের দাবি, এসব ঘটনা স্থানীয়ভাবে আলোড়ন তুলেছে। ভুক্তভোগীরা বিচারের পাশাপাশি অনৈতিকভাবে চাপ দিয়ে নেওয়া অর্থ ফেরত চাইছেন।

কিন্তু আপনারা তো চুনোপুঁটি ধরছেন। জবাবে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ স্মিত হেসে বলেন, ‘যখনই সামর্থ্য আসবে তখন রুই-কাতলা ধরব, তবে আমজনতা কিন্তু চুনোপুঁটিদের দ্বারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাই চুনোপুঁটিও ধরি।’

একমাত্র নজির
প্রায় এক দশকে রাষ্ট্র মাত্র একজন সরকারি কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ আদালতে দণ্ডিত করে তাঁর কাছ থেকে কিছু টাকা কোষাগারে ফেরত নেওয়ার নজির স্থাপন করেছে। গত বছরের ৬ এপ্রিল আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী সাবেক রাষ্ট্রদূত এ টি এম নাজিম উল্লাহ চৌধুরী ৬ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকা কোষাগারে জমা দিয়ে জেল এড়ান।

লুটপাটের অর্থ পুনরুদ্ধারে এতটা দুরবস্থার কারণ কী জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, দুর্নীতিবাজেরা বিচার বিলম্ব, প্রতিহত ও ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে থাকে। বিচারে গতি আনতে হলে বিশেষ ধরনের প্রসিকিউশন টিম গড়তে হবে।

ঘুষ দুদকেও
সম্প্রতি ঘুষ-দুর্নীতির দায়ে দুদকের দুজন কর্মকর্তা বরখাস্ত ও একজন চাকুরিচ্যুত হয়েছেন। হাতেনাতে উদ্ধার করা ১০ হাজার টাকা দুদক কর্মকর্তার কাছে গচ্ছিত ছিল। আলামত নষ্ট করতে তিনি তা গায়েব করেন বলে অভিযুক্ত হন। আরেকজন তদন্ত কর্মকর্তার উচিত ছিল একটি দুর্নীতির মামলায় ১০ জনকে আসামি করার। এর পরিবর্তে মাত্র একজনের বিরুদ্ধে মামলা করায় আদালত অবাক হন। পরে ওই কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হন। আরেকজন সহকারী পরিচালকের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের বাইরে অন্তত পাঁচ কোটি টাকার সম্পদ পাওয়া যায়। তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে নানাভাবে এমন ইঙ্গিত বা আলোচনা আছে যে দুদকের কর্মকর্তারা বড় অঙ্কের টাকা ঘুষ নিচ্ছেন।

টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৭ সালে দেশে শুধু ঘুষের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। আর ২০১৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৮ হাজার ৮২১ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের ২০০১ সালের গবেষণা অনুযায়ী, ঘুষ-দুর্নীতি রুখতে পারলে জিডিপি ২ থেকে ৩ শতাংশ বাড়ত।

সার্বিক বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আজ দুর্নীতিবিরোধী দিবস। আমাদের সুপারিশের ভিত্তিতে মন্ত্রিসভা এই প্রথম দিনটি সরকারিভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, রাজনীতিকেরা দুর্নীতিতে না জড়ালে ৫০ ভাগ দুর্নীতি কমবে। সুতরাং একটা রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখছি। এর সুফল পেতে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেওয়ার প্রমাণ দিতে হবে।’

সূত্র: প্রথম আলো

এফ/ ১৮:৪২/০৯ ডিসেম্বর

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে