Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ১২-০৫-২০১৭

প্রেম ও রাজনীতি

আলফ্রেড খোকন


প্রেম ও রাজনীতি

প্রত্যাখ্যান শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আপনার মনের মধ্যে কী কী বুদ্বুদ তৈরি হলো- উপেক্ষা, অস্বীকার, অবহেলা। ছেলেটিকে মেয়েটির প্রত্যাখ্যান অথবা মেয়েটিকে ছেলেটির প্রত্যাখ্যান- এই প্রাথমিক আবেদনটা যদিও অধিকাংশের কাছে প্রত্যাখ্যানের মৌল আবেগ। আবেগ-উৎকণ্ঠা যা-ই হোক না কেন, প্রত্যাখ্যানের রাজনীতি প্রবল হয়ে উঠছে শীতের এই হিম হিম ভোরবেলা। সেখানে আমি আছি, আছেন আপনিও...

মাহবুব আজীজের টেলিফোনালাপে মনে হয়েছিল, প্রত্যাখ্যান কোনো বিষয়ই না। বসে লিখে দিলেই হবে। তার পর থেকে ভাবনাটা মাথায় চেপেছে। আমার প্রত্যাখ্যান লিখব, না আমাকে প্রত্যাখ্যান লিখব; নাকি আমাদের! নাকি আমার দেখা অন্যের প্রত্যাখ্যান লিখব? অন্যেরটা লিখতে সমস্যা কম। দু-একটা নাম চেপে গেলেই চলে ইত্যাদি। আবার এটাও মনে হয়েছে যে, এই প্রত্যাখ্যানের লেখা চেয়ে সম্পাদককেও ক'বার প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছে লেখকদের কাছ থেকে। ফলে প্রত্যাখ্যানের ভার আর না বাড়াই।

প্রত্যাখ্যান শব্দটির সঙ্গে কি শুধু প্রেম-পরিণয়-প্রণয় জড়িত; না এর সঙ্গে ব্যক্তি সমাজ রাষ্ট্র-রাজনীতি, দেশপ্রেম-অপ্রেম, রীতি-নীতিও জড়িত- এই ভাবনাটাও আমাকে সকাল সকাল পেয়ে বসেছে আজ। এই ধরুন, গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা চেয়ে প্রত্যাখ্যানের গল্প। যেমন রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবে বর্মিদের প্রত্যাখ্যানের কাহিনী। যেমন বিহারি ক্যাম্পে আটকে পড়া বিহারিদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে রয়েছে প্রত্যাখ্যানের গল্প। যেমন গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য শ্রমমূল্য প্রত্যাখ্যান করল মুনাফালোভী মালিকরা। যেমন হিজড়াদের স্বাভাবিক মানবাধিকার প্রত্যাখ্যান করল অহিজড়া মনুষ্যসমাজ। যেমন সুবিধাভোগীরা প্রত্যাখ্যান করল সুবিধাবঞ্চিতদের অধিকার। 

আবার রয়েছে জন্মভূমিকে ভালোবেসে দেশের মানুষের কাছে প্রত্যাখ্যানের গল্প, তেমনি জন্মভূমিকে প্রত্যাখ্যান করে অন্য দেশে পাড়ি জমানোর গল্পও কম নয়। আবার নগরকে প্রত্যাখ্যান করে বুকের ভেতর জল জঙ্গলের কাব্য লিখল কামাল মাহমুদ, আরণ্যকের গভীর অরণ্যে ডুবে রইলেন মুক্তিযোদ্ধা সোহেল আহম্মেদ। আবার পাশ্চাত্যের লোভনীয় সব কাজের প্রস্তাব, বিত্ত-বৈভব, আরাম-আয়েশের সব সুযোগ-সুবিধাকে প্রত্যাখ্যান করে দেশের মানুষের জন্য কাজ করার প্রত্যয়ে ব্রতী হলেন মুক্তিসংগ্রামী প্রফেসর কাজী কামরুজ্জামান। দৃঢ়চিত্তে পুঁজিবাদের মায়াবী হাতছানিকে প্রত্যাখ্যান করলেন তিনি। তারই সতীর্থ আরেক নির্মোহ মানুষ প্রফেসর মাহমুদ উর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য তিল তিল করে গড়ে তুললেন আরোগ্য নিকেতন- ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল। 

দেশের সব পুরস্কারই যিনি পেতে পারতেন- অক্সফোর্ড, ক্যাম্ব্রিজ থেকে যার বই প্রকাশিত হয়, ইংরেজি-বাংলা উভয় ভাষায় যিনি সিদ্ধহস্ত, ভাষা আন্দোলন কিংবা সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে যার রয়েছে অতুলনীয় কাজ, সেই দুর্দান্ত প্রতাপশালী লেখক বদরুদ্দীন উমর কোনো পুরস্কারই গ্রহণ করেননি এখন পর্যন্ত। কার হাত থেকে নেবেন পুরস্কার- এও তো এক দারুণ প্রত্যাখ্যান! 

টগবগে তরুণ, এইচএসসি পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর দিয়ে ঘুরছি। জীবনের একমাত্র লক্ষ্য সংবাদপত্রে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। কারণ তখন আমি মনে করতাম যে সাংবাদিকরাই পারে ব্যক্তি থেকে সমাজ কিংবা রাষ্ট্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে। তাদের দেখার প্রখর চোখ এবং না-বিকানো শক্ত মেরুদণ্ডই এর জন্য যথেষ্ট। তো স্বপ্ন যখন একটু একটু করে মুখ মেলতে শুরু করল, তখনই হোঁচট খেলাম। কারণ সাংবাদিকতা শুরুর কিছুদিনের মধ্যে একটি অনৈতিক অথবা জনক্ষতিকর প্রস্তাব পেলাম অসাধু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। সেদিনই বিক্রি হতে পারতাম টাকার বিনিময়ে! মনে পড়ে একবার বন্ধু সাংবাদিক শওকত মিল্টনকে বরিশালের টাউন হলের ঘাসে বসে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেমন আছিস দোস্ত? মিল্টনের ওই একই উত্তর ছিল। এথিকসটা বিক্রি করতে পারলে ভালোই থাকা যায় বন্ধু! তার পর ঢাকায় ফিরে বাংলাবাজার পত্রিকায় লিখলাম- 'এথিকসটা বিক্রি করতে পারলে'। এথিকসটা বিক্রি করতে পারলে কী না হয়! বাড়ি-গাড়ি-নারী ও ক্ষমতা! 

বিশ্বের সবচেয়ে লোভনীয় পুরস্কার নোবেলও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে! বিশ্বখ্যাত অস্তিত্ববাদের প্রবর্তক দার্শনিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিক জঁ-পল সার্ত্রে ১৯৬৪ সালের ২২ অক্টোবর প্রাপ্ত নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শুধু তাই নয়; ১৯৪৫ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট প্রতিষ্ঠিত ফরাসি সরকারের সর্বোচ্চ সম্মাননা লেজিওঁ দনর পুরস্কারও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। 

লে ডাক থো, ভিয়েতনামের মহান বিপ্লবী, কমিউনিস্ট ও কূটনীতিক ১৯৭৩ সালে শান্তিতে হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল পান, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, 'ভিয়েতনামে এখনও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি- কীভাবে আমি নোবেল নেব?' এসব ঘটনা অর্থাৎ প্রত্যাখ্যানের পর থেকে নোবেল কমিটিও সতর্ক হয়ে ওঠে। আমি বলব, প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। এর পর থেকে যাকে পুরস্কার দেওয়া হয়, তার অনুমোদন নিয়ে তবেই নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। 

আমাদের নোবেল জয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশদের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন নাইট উপাধি। রবীন্দ্রনাথকেও প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছিল তৎকালীন ব্রাহ্মণ সমাজ থেকে। অনুসারী হয়েছিলেন ব্রাহ্মসমাজের। খ্রিস্টান বিয়ে করার অপরাধে বাংলা সাহিত্যের যুগস্রষ্টা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তকেও প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছিল পিতা রাজনারায়ণ দত্তের কাছ থেকে! আবার গায়ত্রী চক্রবর্তীর কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে চিরকুমার জীবন পার করে মরণের পারে চলে গেলেন বাংলা ভাষার অসামান্য কবি ভারতীয় পাটিগণিত শাস্ত্রের অন্যতম পণ্ডিত বিনয় মজুমদার। কবির ভাষায়ই যদি বলি- 'প্রত্যাখ্যাত প্রেম আজ অসহ ধিক্কারে আত্মলীন।' সেই ১৯৬২'র ৭ জুন গায়ত্রী চক্রবর্তীকে উদ্দেশ করে লেখা ফিরে এসো চাকা :

'আমার আশ্চর্য ফুল, যেন চকোলেট, নিমেষেই

গলাধঃকরণ তাকে না করে ক্রমশ রস নিয়ে

তৃপ্ত হই, দীর্ঘ তৃষষ্ণা ভুলে থাকি আবিস্কারে, প্রেমে।

অনেক ভেবেছি আমি, অনেক ছোবল নিয়ে প্রাণে

জেনেছি বিদীর্ণ হওয়া কাকে বলে, কাকে বলে নীল-

আকাশের, হৃদয়ের ; কাকে বলে নির্বিকার পাখি।

অথবা ফড়িং তার স্বচ্ছ ডানা মেলে উড়ে যায়।

উড়ে যায়, শ্বাস ফেলে যুবকের প্রাণের উপরে।

আমি রোগে মুগ্ধ হয়ে দৃশ্য দেখি, দেখি জানালায়

আকাশের লালা ঝরে বাতাসের আশ্রয়ে-আশ্রয়ে।

আমি মুগ্ধ; উড়ে গেছো; ফিরে এসো, ফিরে এসো চাকা,

রথ হ'য়ে, জয় হ'য়ে, চিরন্তন কাব্য হ'য়ে এসো।

আমরা বিশুদ্ধ দেশে গান হবো, প্রেম হবো, অবয়বহীন

সুর হয়ে লিপ্ত হবো পৃথিবীর সকল আকাশে।' 

এটা ঠিক, যে কোনো প্রত্যাখ্যানই ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার জন্ম দেয়। তা হতে পারে ভয়ঙ্কর, হতে পারে বিধ্বংসী, হতে পারে নিঃসঙ্গ আবার সৃষ্টিশীল সুন্দর। কারণ সব ফিরিয়ে দেওয়াও আবার প্রত্যাখ্যান নয়। আগেই বলেছি, প্রত্যাখ্যানের রয়েছে দেশ-কাল-পাত্র। ফলে রয়েছে রীতি-নীতি-চারিত্র্য ও রাজনীতি। 

প্রেমের প্রত্যাখ্যান কখনও কখনও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। সম্প্রতি প্রত্যাখ্যানের কয়েকটি সংবাদ শিরোনাম ছিল এমনই- প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান :স্কুলছাত্রীকে কুপিয়ে হত্যা, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান :কলেজছাত্রীকে বাসায় গিয়ে কুপিয়ে জখম, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় নারী পোশাক শ্রমিককে কুপিয়ে জখম, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় স্কুুলছাত্রীকে ছুরিকাঘাত, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় স্কুলছাত্রীকে অপহরণ। এমন শ'য়ে শ'য়ে শিরোনাম খুঁজে পাওয়া যাবে প্রত্যাখ্যানের। প্রত্যাখ্যানের এই নির্মমতা বর্তমানে যতটা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে, অতীতে এমনটা ছিল না। এর নানাবিধ কারণ আছে, যা সমাজতাত্ত্বিকরা বলবেন। যদিও এই শিরোনামগুলোর সঙ্গে দেহের আকাঙ্ক্ষাই প্রধান হয়ে উঠছে। কারণ অবদমিত এ সমাজে আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে না পারার ফলাফল প্রতিহিংসার এসব হত্যাকাণ্ড বা অপরাধ। 

বলছিলাম, যে কোনো প্রত্যাখ্যানই মারাত্মক! যেমন মিয়ানমার কর্তৃক রোহিঙ্গাদের প্রত্যাখ্যানের ফলাফলও মারাত্মক হবে। তারা বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয়প্রার্থী হয়েছে। এর পর ক্রমে স্থায়ী হতে চাইবে। পাহাড়ি ও বাঙালিরা সংখ্যালঘু হবে। পাহাড় আর নিঝুম থাকবে না। পাহাড়ের বাসিন্দারা অনেক রকম নির্মমতার শিকার হতে থাকবে। খবরও হবে না। যেসব বাঙালিকে ওখানে পুশ করা হয়েছে, তারাও বিপদে পড়বে। শরণার্থী রোহিঙ্গারা আন্তর্জাতিক সাহায্য-সহানুভূতি নিয়ে কিছুদিন কাজ না করে ভালোভাবেই থাকবে। এক সময় সাহায্য ফুরিয়ে যাবে। তখন এসব সহায়-সম্বলহীন মানুষ ক্ষুধার্ত বাঘ হয়ে উঠলে আশ্চর্য হবো, জানি। তখন পাহাড়ের আদি বাসিন্দা ও অভিবাসী বাঙালিরা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। সংস্কৃৃতিতে আঘাত লাগবে। আরও যেসব ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটবে, তা আমি কল্পনা করতে চাই না। সেসব সম্ভাব্য ভয়ঙ্কর ঘটনা লিখে না-ঘটানোই শ্রেয়! আমরা এর কিছুটা অনুমান করে নিই... 

এইভাবে প্রত্যাখ্যানের নীতি ও রাজনীতি লিখতে গেলে এ লেখা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠবে। নুইয়ে পড়বে, ঝুলে যাবে! তাহলে প্রেম প্রত্যাখ্যানের গল্প যাদের শোনাব বলে বসিয়ে রেখেছি সেই ভোরবেলা থেকে, তার কী হবে!

প্রত্যাখ্যান পর্বে এ মুহূর্তে মনে পড়ছে বরিশাল। ১৯৮৮-৮৯। বরিশাল শহরের নবগ্রাম রোডের হাতেম আলী কলেজ হোস্টেলের বিপরীতের একটি বাসার তৃতীয় তলায় ভাড়া থাকি। আমি তখন এই বাসায় একলা থাকি। একটি হাওয়াইন গিটার বাজিয়ে সকাল-সন্ধ্যা পার করি। পাশেই বন্ধু বাদশাদের বাড়ি। তখন শীতকাল। প্রতিদিন উত্তীর্ণ বিকেলে বরিশাল জীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু একটি হাওয়াইন গিটার। দক্ষিণের জানালার পাশে বসে সুর তুলি, গান গাই, ভুল তালে বাজাই- কবি শামসুর রাহমানের 'স্বাধীনতা তুমি'র মতো যেমন ইচ্ছে আমার! মাঝে মাঝে বন্ধু বাদশা এসে হঠাৎ বলে যায়- 'ব্যাডা, বাজাইলে ঠিকমতো বাজা; নাইলে বাজাইস না। কেউ শুনলে হাসবে।' বাদশার প্রবেশ ছাড়া আর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার সুযাগ ছিল না। পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন বৃদ্ধা বাড়িওয়ালা। তার ছেলেটি ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু কোনোদিন তাকে দেখা হয় নাই চক্ষুু মেলিয়া। বাদশা প্রায়ই সন্ধ্যার দিকে আসে। আমিও বিকেল উত্তীর্ণ সন্ধ্যা অবধি বাসা থেকে বাইরে যাই না। সাধের গিটার নিয়ে জানালার পাশে বসি আর কী এক আকর্ষণে ইচ্ছেমতো বাজাই। মনে পড়ে রুশোজ ড্রিম স্বরগামটি আমি সত্যি সত্যি বাজাতে শিখেছিলাম। আর এই স্বরলিপিটি দিয়েই আমার হাওয়াইন গিটারের হাতেখড়ি হয়েছিল ওস্তাদ সুরেন্দ্রনাথ রায়ের কাছে। সেই পর্বে পরে আসি। কারণ সেখানে রয়েছে প্রত্যাখ্যানের এক নির্মম পর্ব। গিটারে সুর তোলামাত্র ওপাশের অদূরবর্তী জানালায় একটি মেয়ে তাকিয়ে থাকত, যতক্ষণ না সন্ধ্যা হয়। তার আকর্ষণে আমিও বাজাতে থাকতাম। কিন্তু শুধু ২/৩ মিনিটের রুশোজ ড্রিম বাজিয়ে কি একটি সন্ধ্যা পার করা যায়! হাওয়াই দ্বীপে বসে রুশো স্বপ্নের মতো এই স্বরলিপিটি আবিস্কার করেছিলেন- গা গা রে সা সা রে রে গা সা। পা পা মা গা গা রে সা রে গা সা।। গা গা মা পা পা ধা ধা পা মা গা। গা গা মা পা পা পা ধা নি সা ধা পা। 

মনে পড়ে সেই বালকবেলায় এর একটি বাংলা তর্জমাও আমি করেছিলাম- প্রেম তুমি আমার জন্য কত কষ্ট সহিলে...। (মনে নেই) আসলে সে সময়, আমার পূর্ণাঙ্গ বালকবেলায় জানালার ওপাশের জানালায় সেই লাল ফ্রক সেই দূর থেকে সেই জলরঙ কিংবা তৈলরঙের মতো দূরত্বে কিছুটা বিলীয়মান একটি বালিকার ছবি রুশোজ ড্রিমকে আরও দীর্ঘ করে তুলত। আমি বাজাতাম, মেয়েটি চেয়ে থাকত। তবে এ জানালা থেকে ওই জানালার দূরত্বে অতটা স্পষ্ট কারও মুখই প্রতিভাত হয়নি কখনও। মনের চোখে আমরা যা পরস্পর ঠিকই দেখে নিতাম। একদিন এক বিকেলে হঠাৎ আমার একলা বাসার দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে দরজা খুলে আমি স্পষ্টতই তার মুখ দেখে মূক হয়ে যাই। কারণ আমি স্বপ্নেও ভাবিনি- মেয়েটি জানালা থেকে ঘরের দরজায় চলে আসবে! কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি তাকে দরজা থেকেই প্রত্যাবর্তনে সমর্থ হই এই বলে যে, এ ঘটনা জানাজানি হলে এই বাসায় আমার থাকাটা অসম্ভব হয়ে উঠবে। এ কথা শুনে মেয়েটি নিঃশব্দে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর বাদশা এলো। আমি তাকে ঘটনাটা বললাম। ও বলল, এই কারণেই তুমি বিকেলে গিটার বেসুরা বাজাও! এই ঘটনার পর আমি আরও বছরখানেক ওই বাসায় ভাড়া ছিলাম। কিন্তু সেদিনের পর থেকে ওই লাল ফ্রক পরা মেয়েটিকে আমি আর জানালায় কখনও দেখিনি। প্রত্যাখ্যানের এই উপহার খুবই নির্মম। 

প্রত্যাখ্যানের বিস্ময়কর ও ধ্রুপদী উদাহরণ সক্রেটিস। কারণ নিজের সম্পর্কে আনীত অভিযোগ যদি শুধু অস্বীকার করতেন, তবে তিনি জীবন ফিরে পেতেন। কিন্তু সেই জীবনকে তিনি প্রত্যাখ্যান করে হেমলক পান করতে করতে মানব সমাজে চিরকালীন হয়ে রইলেন। আর রইল তার অজর উচ্চারণ- ও :ড় ফরব ুড়ঁ :ড় ষরাব নঁঃ যিরপয রং নবঃঃবৎ ড়হষু মড়ফ শহড়ংি. 

১৯৮৮ সাল। জুতা কেনার জন্য বড় ভাইয়ের কাছ থেকে ৫০০ টাকা পেলাম। সেটাই ছিল নিজের পছন্দের জুতা কেনার প্রথম সুযোগ। বরিশাল শহরে বন্ধু বাদশার পাশের বাসার মেয়েটি প্রথম গিটার কিনেছে গত মাসে। কিন্তু এর পরই তাকে হারমোনিয়াম কিনে দেওয়া হলো। ফলে গিটার অনাদরে পড়ে থাকল। সেই সুযোগে বাদশা ঢুকে পড়ল ওদের বাসায়। বাদশার চোখ কখনোই গিটারের ওপর ছিল না। ছিল গিটার-কন্যার দিকে। বাদশাই জানত, একটি গিটারের প্রতি আমার আকাঙ্ক্ষা কতটা প্রবল। নতুন একটি হাওয়াইন গিটারের দাম তখন ৮০০ টাকা। বাদশা এসে আমাকে বলল, 'শোন, লিলির গিটারটা মনে হয় বিক্রি করবে। ও হারমোনিয়াম শেখে। আমি বললে ওর মা না করবে না। তুই কিনবি নাকি?' আমি বললাম, 'আমার কাছে জুতা কেনার ৫০০ টাকা আছে। তুই দেখ, কত টাকায় বিক্রি করবে।' বাদশার তৎক্ষণাৎ উত্তর- 'বয়স ১ দিন হোক আর ১০০ দিন হোক; সেকেন্ড হ্যান্ড মাল সেকেন্ড হ্যান্ডই। অর্ধেক দাম। তুই ভাবিস না; চুপ করে থাক। দেখা যাক কী হয়।' আমি জুতা কিনলাম না। ২/৩ দিনের মধ্যেই বাদশা গিটার নিয়ে হাজির। দে, টাকা দে ৪০০। মুহূর্তেই আমি ওকে ৪০০ টাকা দিয়ে দিলাম। কিন্তু গিটার হলেই তো হবে না। শিখতে হবে। চাই ওস্তাদ। তাই গ্রামে চলে গেলাম। 

গ্রাম মানে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী আগৈলঝাড়া হাটের মধ্যে প্রশস্ত এক বটবৃক্ষের নিচে একটি টিনের বাড়ি। সেখানে বাস করতেন পণ্ডিত সুরেন্দ্রনাথ রায়। তার সম্পর্কে অনেক মিথ। তাকে সাধারণত দেখা যেত না। শুনেছি, গভীর রাতে তিনি ওই ঘরে একা একা বেহালা বাজাতেন। বেদনার বিষণ্ণ সুরে গাছ থেকে পাতা ঝরত! তাকে না দেখার আগেই শুনেছি, তিনি তারের সবক'টি বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। একদিন সাহস করে তার কাছে পৌঁছে গেলাম। জিজ্ঞেস করলেন, বাড়ি কোথায়, কী করি ইত্যাদি। তারপর বললেন, 'সরগাম জানো? বাজাও দেখি।' আমি ভয়ে ভয়ে কোনোমতে সরগামের আরোহণ-অবরোহণ বাজালাম। তিনি চিৎ হয়ে শুয়ে পায়ের ওপর পা তুলে তাল দিলেন। তারপর থামতে বললেন এবং উঠে বসলেন। বললেন, 'খাতা এনেছ?' আমি হাতে বানানো মলাটবন্দি সাদা কাগজের একটি খাতা তার দিকে এগিয়ে দিলাম। 

তিনি আর্ট পেন বের করে সুন্দর করে একটি গিটার আঁকলেন। তারের ওপর সরগাম বসালেন। আর সুরের বংশলতিকার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি লিখে দিলেন। একবার দেখিয়ে দিয়ে বললেন, 'বাজাও।' তার পর বললেন, 'এবার যেতে পার। সপ্তাহে ১ দিন আসবে। বেতন ৪০ টাকা।' আমি সেদিন পৃথিবীর এক দারুণ আনন্দ ও তৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। এর পর কবে সোমবার আসবে তার অপেক্ষা শুরু হলো। ছাত্রছাত্রী সবাই তাকে দাদু বলে ডাকে। আমিও দাদু ডাকতে শুরু করলাম। হাল্ক্কা আলোর এই ঘরটা আমার কাছে আজও পৃথিবীর বিস্ময়ের একটি। কারণ ধীরে ধীরে জানতে পারলাম, তিনি সব রকম বাদ্যযন্ত্র বানাতে ও বাজাতে পারেন। নিজের হাতে বানানো টাইপরাইটারে মেয়েদের টাইপিং শেখাচ্ছেন। গানের কাসে গান। বাঁশির কাসে বাঁশি। তবলার কাসে তবলা। বেহালার কাসে বেহালা। সেতারের কাসে সেতার! একজন মানুষ সুরের এত কিছু জানেন! শ্বেতশুভ্র এই মানুষটির ধবধবে সাদা সিল্ক্কি চুল। একটি সাদা ইংলিশ প্যান্ট ও সাদা বাবা গেঞ্জি পরিহিত। তর্জনী ও মধ্যমার ফাঁকে গোল্ডলিফ সিগারেট খেতেন। চিৎ হয়ে শুয়ে থেকে পায়ের ওপর পা তুলে বলতেন- 'বাজাও'। পায়ে পায়ে তাল রাখতেন তিনি। একমাত্রা এদিক-সেদিক হলেই চোখ তার জ্বলজ্বল করে উঠত! 

ধীরে জানতে পেরেছি, লোকটি পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন সঙ্গীতের হাহাকার নিয়ে। জার্মানি, ইংল্যান্ডে তিনি অর্কেস্ট্রা লিড করেছেন বহু দিন। হারমোনিয়াম বা অনেক বাদ্যযন্ত্রের গায়ে যে 'সুরেন্দ্রনাথ অ্যান্ড কোং' লেখা থাকে, সেটা তারই নাম। এতক্ষণ যে তার কথা বলছি, এর সঙ্গে প্রত্যাখ্যানের সম্পর্ক কী? এই ভাবনা নিশ্চয় আপনাদের মনের কোনে জমা হচ্ছে। তা বলার আগে আরও কিছু কথা বলার আছে। এর এক বছর পর পড়াশোনার জন্য আমাকে আবার শহরে যেতে হলো। দাদু বললেন, 'আমার যা দেওয়ার তা তোমাকে দিয়েছি। এবার নিজের শেখার পালা। মন দিয়ে যত চর্চা করবে ততই উত্তরণ। কোথাও ঠেকলে এসো; তোমাকে আর বেতন দিতে হবে না।' আমি সাহস করে বললাম, 'দাদু, আমি তো একজন লেখক।' উনি বললেন, 'বেশ তো। 

কী লেখ?' বললাম, কবিতা ও ফিচার। তখন দৈনিক সংবাদের সাময়িকী আমাদের কাছে শিল্প-সাহিত্যের আকর। আমি আরও সাহস করে বললাম, 'আমি আপনার একটা ইন্টারভিউ করতে চাই।' উনি বললেন, 'ভালো কথা, কিন্তু আমি তো ইন্টারভিউ দিই না। এসব কথা লোককে জানিয়ে কী হবে? তুমি বরং তোমার লেখা লেখ।' আমার জীবনে সেই প্রথম কেউ আমাকে ইন্টারভিউ দিতে প্রত্যাখ্যান করল। যদিও এই প্রত্যাখ্যানে আমি মোটেও মর্মাহত হইনি। কিন্তু ইতিহাস বা সময় নির্মমভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ফলে আমি দেখেছি মানুষের হাতে সময়ও কীভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়! আমি মর্মাহত হয়েছিলাম তার জীবন কাহিনীতে। শুনেছি, ফুফুকে ভালোবেসে বিয়ে করে সমাজচ্যুত হয়েছিলেন। তার পর বিদেশে চলে যান। জীবনের শেষদিকটায় আবার জন্মভূমিতে ফিরে এসে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন এই মহান শিল্পী। তার মুখে দেখিনি কোনো আফসোস! দেখিনি কোনো ব্যর্থতার চিহ্ন! প্রথাবদ্ধ সমাজ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল বটে! তাই হয়তো তাকে এড়িয়েছিল সবাই। পল্লীসমাজের কূটচালের ঘেরাটোপে তার নাম আজ স্বর্ণাক্ষরে লিখিত নেই। কিন্তু তার মতো মহান শিল্পী আর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের দেখা পাওয়া একজীবনে শুধু নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দীরও অপেক্ষার বিষয়!

গভীর রাতে আজও তার বেহালার বিষণ্ণ সুর বাজে। প্রত্যাখ্যানের যে ব্যথা তিনি পেয়েছিলেন, সে ব্যথা সুর হয়ে, কাব্য হয়ে, জয় হয়ে মহাকালের গর্ভে মিলায়। গভীর রাতে কী নিঃসীম বেদনার গাছ থেকে তাই হয়তো পাতা ঝরে, যেমন এই শীতের রাতে কোনো মহান শিল্পীর ইচ্ছায় নারকেল পাতা থেকে টুপটাপ ঝরছে শিশির। 

এমএ/১০:৪০/০৫ ডিসেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে