Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (169 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ১১-১৫-২০১৭

‘বোকা’ ফারুকীর ‘ব্রিলিয়ান্ট’ সিনেমা ’ডুব’

জাহেদ-উর-রহমান


‘বোকা’ ফারুকীর ‘ব্রিলিয়ান্ট’ সিনেমা ’ডুব’

‘ডুবেছে’ শিরোনামে জনৈক ‘বিখ্যাত’ লেখিকা লিখেছেন ডুব সিনেমার রিভিউ। সামনে আসায় রিভিউটি পড়েছিলাম, তখনও সিনেমাটি দেখা হয়নি। কিছু ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে সিনেমাটি দেখতে বেশ দেরি হয়ে গেল। ডুব দেখার পর মনে প্রশ্ন এসেছে ‘ডুব কি সত্যিই ডুবেছে?’। কাকে আমরা বলবো ‘ডুবা’ আর কাকে বলবো ‘ভাসা’?

মানুষের মতোই শিল্পকে ‘আশরাফ’ আর ‘আতরাফ’ শ্রেণীতে ভাগ করার চেষ্টা এই বিশ্বে বিদ্যমান আছে। এই শ্রেণীভেদ করার জন্য এক ধরণের মানদণ্ডের অস্তিত্বও আছে। শিল্প যেহেতু ভৌত বিজ্ঞান নয়, এর মানদণ্ডেরও ভিন্নতা আছে। নানা ‘স্কুল অব থট’ নানা রকম মানদন্ড আমাদের সামনে হাজির করে। সেগুলো দিয়ে মেপে আমরা ঘোষণা করে দেই এটা ‘ আশরাফ শিল্প’ কিংবা ওটা ‘আতরাফ’। এক ‘স্কুল অব থট’ এর বিচারে ‘আশরাফ সিনেমা’ আরেক ‘স্কুল অব থট’ এর বিচারে হয়ে যেতেই পারে ‘আতরাফ’।

কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এ পাম ডি’অর পাওয়া আব্বাস কিয়ারোস্তামির ‘টেইস্ট অব চেরি’ নিয়ে আলোচনায় বিখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক রজার এবার্ট (আই এম ডি বি এর বিচারে শ্রেষ্ঠতম) তাঁরই প্রিয় দুই চলচ্চিত্র সমালোচক এর সাথে দ্বিমতের কথা উল্লেখ করেছেন। ‘সিনেমাটা একটা মাস্টারপিস’ এই মন্তব্যে তিনি তাদের সাথে দ্বিমত প্রকাশ তো করেছনই, তিনি রীতিমত এটা বলতে চেয়েছেন ওই সিনেমা দেখাটা সময়ের এক রকম অপচয়। এরকম উদাহরণ অনেক আছে। কিয়ারোস্তামির উদাহরণ এখানে দিলাম কারণ ইনি ফারুকীর প্রিয় ডিরেক্টরদের একজন।

আমি এই আলোচনায় ঢুকছি না। কারণ কতগুলো সাবজেক্টিভ মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে কোনো সিনেমাকে আমি ‘আশরাফ’ বা ‘আতরাফ’ তকমা দিয়ে অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়া একেবারেই অনুচিত বলে মনে করি। আর সিনেমাটির ‘শরীর’ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়নও খুব একটা করবো না এখানে, কারণ নানা পয়েন্ট অব ভিউ থেকে এই সিনেমার অনেকগুলো বিশ্লেষণ এর মধ্যেই হয়ে গেছে। আমি বরং দেখতে চাই ভিন্ন একটি দিক। এই পর্যায়ে তিনটি বিষয় একটু দেখে নেয়া যাক।

একজন মধ্যবয়সী মানুষ নিজের মেয়ের বান্ধবীর প্রেমে পড়ে তার আগের পরিবারটি ত্যাগ করে তাকে বিয়ে করা জনিত কারণে তার এবং তার পরিবারের সব মানুষের মধ্যে যে আবেগগত টানাপোড়েন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে, সেটার মধ্যেই এক দুর্দান্ত সাইকোলজিক্যাল ড্রামা হয়ে ওঠার সব উপাদানই আছে। কিন্তু ফারুকী সেটা অজ্ঞাত কোনো ব্যক্তির জীবন না বুঝিয়ে অতি অতি জ্ঞাত একজন ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদকে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন। হ্যাঁ, এই সিমনেমায় ফারুকী হুমায়ূন আহমেদকে বিক্রি করতে চেয়েছেন। এতে আমি কোনো দোষ দেখি না, দেশের সবচাইতে বিক্রযোগ্য মানুষটির জীবনের কোনো নাটকীয় ঘটনা বিক্রি করা যেতেই পারে।

যৌক্তিক অনুমান করাই যায় ফারুকী খুব সচেতনভাবে হুমায়ূন এর বায়োগ্রাফি বিষয়ক তর্কটি বাজারে ছেড়েছিলেন। আমরা মনে করতে পারবো হয়তো এই সিনেমার একজন অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী কলকাতার স্বনামধন্য একটা পত্রিকায় ডুব যে হুমায়ূন এর জীবনের একটা অংশের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে, সেই ‘বোমাটা ফাটান’। এরপর হুমায়ূনের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন এর সাথে এটা নিয়ে নানামুখী বিতর্ক, সিনেমাটির প্রচার নিষিদ্ধ করার আবেদন, সেন্সর বোর্ড কর্তৃক কিছু অংশ কর্তন, এবং সর্বশেষে মুক্তি পাওয়া, ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে দেশের মূল ধারার মিডিয়া ক্রমাগত রিপোর্ট কিরে গেছে। বহু টাকা খরচ করেও ডুব সিনেমার যে প্রচারণা পাওয়া সম্ভব ছিল না, সেটা পাওয়া হয়ে গিয়েছিল একেবারেই বিনে পয়সায়। অনেকেই এই বিতর্ক সৃষ্টিকে পূর্ব পরিকল্পিত বলে মনে করছেন, এবং এমন কৌশলের সমালোচনা করেছেন। আমি করছি না সেটাও, এই ডামাডোলের যুগে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য নানা রকম পাবলিসিটি স্টান্ট এর চর্চা আর নতুন নয় একেবারেই। হতেই পারে।

ডুব সিনেমা নিয়ে একটা টিভি অনুষ্ঠানে সিনেমাটির প্রযোজক জ্যাজ মাল্টিমিডিয়ার প্রধান জনাব আব্দুল আজিজ বলেন, জনাব ফারুকীর স্ক্রিনপ্লে পড়ে তাঁর মনে হয়েছে এই সিনেমা দেখে মানুষ কাঁদবে, আর তাঁর অভিজ্ঞতা বলে, যে সিনেমা দেখে মানুষ কাঁদে সেটা নিশ্চিতভাবেই ব্যবসা করে। এরপর তিনি দ্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন, তিনি এই সিনেমা প্রযোজনা করেছেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন এটা তাঁকে খুব ভালো ব্যবসা দেবে।

তিনটি ঘটনা মিলিয়ে নিলে এটা স্পষ্ট হবে ডুব সিনেমার পরিচালক এবং প্রযোজক একটা ‘সুপার ডুপার হিট’ সিনেমা বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

সিনেমাটি দেখার সময় দারুন ভালোলাগার মধ্যেও বার বার মনের হচ্ছিলো ফারুকী কী ‘বোকা’! এটা কি হতে পারে কোনো ‘সুপার ডুপার হিট’ সিনেমার ভাষা? না, আমি ডুব এর ভাষাকে ‘উন্নত’ বলছি না, তবে এটা বলছি এই সিনেমার ভাষা, আমাদের বেশিরভাগ মানুষের চোখে অভ্যস্ত ক্লাসিক্যাল হলিউড ন্যারেটিভ স্টাইল এর চাইতে অনেকটা আলাদা।

জাভেদ আর মায়া বান্দরবান গেছে এক্সট্রিম লং শটে আমরা তাদেরকে দেখি কিংবা দেখি না, কিন্তু শুনি জাভেদ বলছেন তারা দু’জন স্বামী স্ত্রীর পদে চাকুরী করছেন। আমরা পর্দায় তাঁদের তীব্র ঝগড়া দেখলাম না, মান-অভিমান দেখলাম না, কিন্তু দেখলাম তাঁদের সংসার ভাঙ্গনের মুখোমুখি। আমরা আরও দেখি জাভেদ প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে নিতুকে ঘর থেকে বের করে দেয়। এর পরই আমরা সাবেরীর ক্ষুব্ধ সংলাপে জানতে পারি জাভেদ নিতুকে বিয়ে করেছেন। এই যে প্রতিটি ঘটনা ঘটার প্রেক্ষাপট বয়ান না করে পরবর্তী ঘটনায় চলে যাওয়া, সিনেমার সম্পাদনার ভাষায় ইলিপসিস, অনেক আছে এই সিনেমায়। দর্শককেই ভরিয়ে নিতে হবে এই শুন্যস্থানগুলো। কিন্তু সিনেমাটা দেখার সময় চারপাশে ফিসফাস শুনছিলাম, তাদের অনেকের কাছেই অনেক কিছুই অযৌক্তিক, অদ্ভুত ঠেকছে।

অনেক বেশি লং শট তো বটেই, বহু এক্সট্রিম লং শট (অনেক দূর থেকে দেখা) এবং লং টেইক (না কেটে অনেক লম্বা শট) ব্যবহৃত হয়েছে এই সিনেমায়। অনুমান করি, ফারুকী ঘটনায় খুব কম ইনভলভড হয়ে ঘটনা দেখতে চেয়েছেন, এবং দেখাতে চেয়েছেন। কিন্তু সিনেমা দেখতে দেখতে যখন আমরা আরও বেশি ‘ভয়্যার’ হয়ে উঠি তখন বিষয়বস্তুর সাথে এই দূরত্ব আমাদের অনেকেই মেনে নিতে পারি না। আমরা চাই ঘটনার সাথে ভীষণ নৈকট্য। ওদিকে ক্রমাগত অস্থির হয়ে ওঠা মানুষ যতো দিন যাচ্ছে লং টেইক আর নিতে পারছে না। এজন্য মূলধারার সিনেমাগুলো প্রতি দশক পর পর আমরা দেখবো বর্তমান দশকের শটের গড় দৈর্ঘ্য আগের দশকের চাইতে কমে গেছে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৩০ এর দশকে হলিউড এর সিনেমার এভারেজ শট লেংথ ছিল ১২ সেকেন্ড, যেটা এখন ২.৫ সেকেন্ড এরও কম। আমাদের অনেকেই দীর্ঘ শট নিতে পারি না। আর সেই শটে অনেক মুভমেন্ট না থাকলে তো কথাই নেই।

তেমনি আমরা অনেকেই এটাও নিতে পারি না, যে মানুষটা কথা বলছে তাকে দেখবো না, কিংবা দেখবো না দুজনের কাউকেই। ডুব এ অনেক সময় দেখা গেছে দুই জনের কথোপকথনের সময় আমরা কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না। আমরা আঁড়ি পাতা ‘আংশিক ভয়্যার’ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পছন্দ করি না, আমরা পছন্দ করি দেখে ‘পূর্ণাঙ্গ ভয়্যার’ হতে।

ডুব এ প্রচুর নিস্তব্ধতা আছে, কিন্তু ‘সাউন্ড অব সাইলেন্স’ শুনতে পারি আমরা সবাই? বা পারলেও যদি সচেতন সিদ্ধান্তে শুনতে না চাই? মূল ধারার সিনেমা এবং টিভির নাটক-সিরিয়াল যখন প্রতিটি মুহূর্ত ডায়ালগ দিয়ে এতটাই পূর্ণ থাকে যে চোখ বন্ধ করেও ‘দেখে’ ফেলা যায় আস্ত সিনেমাটা তখন এই নৈঃশব্দ্য খটকা তৈরি করারই কথা; করেছেও।

আর ছিলো হুমায়ূন এর জীবনের সাথে সিনেমাকে মেলানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়া। সিনেমাটা হলে প্রদর্শিত হতে শুরু করার পর বার বার বলা হচ্ছিল হুমায়ূনকে মাথা থেকে সরিয়ে সিনেমাটা দেখতে। কিন্তু বেশিরভাগ দর্শক সেটা করেননি। এর দায় মোটেও দর্শকের না। হুমায়ূনকে মাথায় ঢুকিয়ে দর্শককে হলে নিয়ে যেতে চাইবো, কিন্তু এরপর বলবো ওটা মাথা থেকে সরিয়ে সিনেমা দেখো, এটা স্ববিরোধিতা।

এভাবেই নানা ফ্যাক্টর মিলিয়ে একটা প্রচন্ড হাইপ তৈরি হওয়া একটা সিনেমা দেখতে গিয়ে দর্শক নানাভাবে ধাক্কা খেয়েছে; এটা একেবারেই অনিবার্য ছিলো। আর পাহাড় পরিমাণ প্রত্যাশা নিয়ে পকেটের টাকায় টিকেট কিনে, জ্যামে নাজেহাল হয়ে, সময় ব্যয় করে হলে গিয়ে সিনেমা দেখা দর্শক ধাক্কা খাবার পর ক্ষুব্ধ হতেই পারেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ফারুকী এই প্রতিক্রিয়াগুলোর প্রতি বেশ অসহিষ্ণু আচরণ দেখিয়েছেন। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হয়েছে আবার। আমরা মনে রাখবো, পৃথিবীর তাবৎ শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পাবার পরও, তাবৎ ক্রিটিকদের উচ্ছ্বসিত রিভিউ পাবার পরও কোনো সিনেমা আমার কাছে বাজে মনে হতেই পারে। এবং সেটা নিয়ে যে কোনো রকম মন্তব্য করার অধিকার আমি রাখি। সে কারণে ক্রিটিক রজার এবার্ট এর প্রায় সব ফিল্ম এনালিসিস এর সাথে আমি মোটা দাগে একমত হলেও ‘টেইস্ট অব চেরি’ সম্পর্কে তাঁর মতামত গ্রহন করি না আমি; ওই সিনেমা আমার খুব প্রিয়।

জাভেদকে হুমায়ূন বানানোর চেষ্টায় তাঁর কবরের স্থান নিয়ে দুই পরিবারের বিবাদ, শেষ দৃশ্যে সাবেরীর ভীষণ মেলোড্রামাটিক কান্না, জাভেদ এর কণ্ঠে ‘অবাংলাদেশি’ একসেন্টের বাাংলা, এরকম আরও কয়েকটা বিষয় বাদ দিলে আমার বিবেচনায় ডুব একটা ব্রিলিয়ান্ট ফিল্ম, যেটা আমাদের সিনেমার ইতিহাসে ভিজুয়াল স্টোরিটেলিং এর একটা চমৎকার মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। শিল্পের প্রথাগত যে মানদন্ডগুলো শুরুতে নাকচ করেছিলাম, সেগুলো দিয়ে যদি বিচার করি, তাহলে ডুব নিঃসন্দেহে একটা দুর্দান্ত সিনেমা। শুরুতে করা প্রশ্নের জবাবে তাই বলি, যদি ‘হিট’ না হওয়াকে ডোবা বলি, তবে ডুব হয়তো ডুবেছে, কিন্তু ওই লেখিকা যে বিবেচনায় ডুবকে ডুবেছে বলে দাবি করেছেন, সেই বিবেচনায় ডুব আদৌ ডুবেছে বলে আমি মনে করি না। ডুব ভীষনভাবেই ভেসে আছে, ভেসে থাকবে।

কিন্তু ‘বিস্ময় আজও গেলো না আমার’ একটা ‘সুপার ডুপার হিট’ সিনেমা বানাতে গিয়ে (পারিপার্শ্বিক ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় এটা) এমন একটা সিনেমাটিক ল্যাঙ্গুয়েজ বেছে নেবার মতো এমন ‘বোকামী’ ফারুকী করলেন কীভাবে, যিনি এই এই সেক্টরে কাজ করছেন দীর্ঘ দুই দশক!

এমএ/০১:০০/১৫ নভেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে