Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ১১-১৪-২০১৭

অল্প খরচে স্বল্প সময়ে বরফের রাজ্য, হাত বাড়ালেই হিমালয়

স্বাক্ষর রাহা


অল্প খরচে স্বল্প সময়ে বরফের রাজ্য, হাত বাড়ালেই হিমালয়
বরফে ঢাকা নাথাং ভ্যালি!

কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে গিয়েছিলাম সিকিম-গ্যাংটক-ছাঙ্গু-বাবা মন্দির। সেই ছিল জীবনে প্রথম বরফ দেখা। সময়টা ছিল এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ। 

বরফ তখন গলতে শুরু করেছে। সে সময়ে তো আর হাতের কাছে ইন্টারনেট ছিল না, তাই ওইটুকু বরফেই মন ভরেছিল। সুযোগটা এল অনেক দিন পরে। ২০১৪ সালের মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ। স্বল্প সময় ও অল্প খরচে আবারও বরফ দেখা। কলকাতার বন্ডেল গেটের কাছে একটি ভ্রমণ সংস্থা, সেই সময়ে বিজ্ঞাপন দিত সিকিম-ওল্ড সিল্করুট ঘুরতে যাওয়ার।
 
তাদের সঙ্গে কথা বলে ভ্রমণসূচির একটা খসড়া তৈরি হল—
• দিন ১— কলকাতা থেকে ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি 
• দিন ২— এনজেপি থেকে গাড়িতে সিলেরি গাঁও
• দিন ৩— পর দিন জুলুক ও রাত্রিবাস সেখানেই
• দিন ৪,৫— নাথাং ভ্যালিতে ২ রাত (মন ভরে বরফ উপভোগ করার জন্য)
• দিন ৬— আরিটারে রাত্রিবাস
• দিন ৭— এনজেপি থেকে ট্রেন ধরে কলকাতা

এনজেপি থেকে সিলেরি গাঁও যাওয়ার রাস্তা মন্দ নয়। সমস্যা ছিল শেষ চার কিলোমিটার পথ। স্থানীয়রাই এই রাস্তার নাম দিয়েছে ‘ডানসিং রোড’। এক মুহূর্তের জন্যও গাড়িতে সুষ্ঠুভাবে বসে থাকতে পারছিলাম না। রাস্তা এতোটাই খারাপ। লাফাতে লাফাতেই দুপুর নাগাদ পৌঁছে গেলাম সিলেরি গাঁও। 

কাঠের ঘরবাড়ি। টিনের চাল। হালকা ঠান্ডা। ভিড় নেই বললেই চলে।  দুপুরের খাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়লাম। কিছু দূরে একটি উঁচু টিলা রয়েছে, যেখান থেকে নাকি একই সঙ্গে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা আর তিস্তা। জঙ্গলের পথ পেরিয়ে উঠে গেলাম পাহাড়ের মাথায়। কিন্তু, কোথায় কী! সবই মেঘে ঢাকা। সিলেরিতে থাকার ব্যবস্থা মানে হোম-স্টে। ওখানে হোটেল ব্যাপারটা নেই।

রাতে খেতে খেতে জানলাম, পাহাড়ের উপরে একটা পরিত্যক্ত কেল্লা রয়েছে। পর দিন সকালেই বেরিয়ে পড়লাম কেল্লার পথে। পথেই দেখা হয়ে গেল আমাদের চালকের সঙ্গে। সে বলল, দু’ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসতে, না হলে জুলুক যেতে দেরি হয়ে যাবে।

পা চালিয়ে, মিনিট পঁয়তাল্লিশের মধ্যে যেখানে পৌঁছলাম, সেখানে ঘন জঙ্গল। রাস্তা খুঁজে না, বাধ্য হয়ে  ফেরার পথ ধরলাম। বিকেল চারটে নাগাদ জুলুক পৌঁছে গেলাম। এখানে সবুজ কমই। বেশির ভাগ পাহাড়েই চোখে পড়ল ধাপ চাষ।

পৌঁছতে দেরি হলেও, দিলমায়া রিট্রিট অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য, গরম ভাত, ডাল, আলুরদম আর ডিমের অমলেট নিয়ে।খেয়েদেয়ে খানিক আলিস্যি করছি ঘরের ভেতরে, হঠাৎ এক অদ্ভুত আওয়াজে চমকে উঠলাম সকলে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বরফ পড়ছে। টিনের চালে বরফের আওয়াজ। ঘণ্টা খানেক নাগাড়ে তুষারপাত হয়ে যখন থামল, তখন বাইরেটা পুরো সাদা হয়ে গিয়েছে। রাতে শুনলাম, সিল্ক রুটের পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। 


জুলুকের হেয়ার-পিন বেন্ডস

মনটা ভাল হয়ে গেল পর দিন ঘুম থেকে উঠে। রোদ ঝলমলে সকাল। বরফ গলতে শুরু করলেও, ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রাস্তার আশেপাশে। 

নির্দিষ্ট সময়ে গাড়ি ছাড়ল। কিছুক্ষণ পর থেকেই রাস্তা উপরে উঠতে শুরু করল। পাকদণ্ডী বেয়ে উঠতে উঠতে দূরে নীচে দেখা যাচ্ছিল জুলুক। মাঝে মাঝেই গাড়ি থেমে যাচ্ছিল বরফের জন্য। 

এক সময়ে পৌঁছলাম থাম্বি ভিউ পয়েন্ট, যেখান থেকে সিল্ক রুটের সব ক’টি বাঁক দেখা যায়। আরও খানিকটা পথ এগিয়ে গিয়ে আবারও গাড়ি থামল। একটি তিন মাথার মোড়, মাঝে রয়েছে ভারতীয় সেনা জওয়ানদের শহীদস্তম্ভ। এখান থেকে ডানদিকের রাস্তা চলে গিয়েছে আসল বাবা মন্দিরের দিকে। বাঁদিকের রাস্তা চলে গিয়েছে নাথাং ভ্যালির দিকে, আমাদের গন্তব্য। বরফের পুরু আস্তরণে মোড়া সেই পথ। 

প্রায় ঘণ্টা দেড়েকের অপেক্ষা। সেনাবাহিনির ট্রাক এসে রাস্তা পরিষ্কার করার পরে আবারও শুরু হল আমাদের যাত্রা। কিন্তু, যতই এগিয়ে চলি মনে হয় বরফের আস্তরণও যেন বেড়ে চলেছে। 

দুপুর প্রায় একটা, কিন্তু আকাশ দেখে মনে হচ্ছিল যেন সন্ধে নেমে আসছে। অবশেষে পৌঁছলাম নাথাং ভ্যালির বাংলোয়। ততক্ষণে আবারও বরফ পড়তে শুরু করেছে। 


নাথাং ভ্যালির দফতর বাংলো

বাংলোটি চমৎকার, নাম ‘দফতর বাংলো’। সাহেবি কেতায় সাজানো তিনটি ঘর। বিশাল কাচের জানালা দিয়ে দেখা যায় বিস্তৃত উপত্যাকার মোহময়ী রূপ। একটু দূরে একটি মন্দির। কয়েকটি চমরিগাই চরে বাড়াচ্ছে বরফের মধ্যে। 

বরফের মধ্যেই চললাম মন্দির দেখতে। মূলত রাধা-কৃষ্ণের মন্দির হলেও, আরও অনেক দেবদেবীও ছিলেন সেখানে। দুপুর গড়িয়ে সন্ধে, তা পেরিয়ে রাত হয়ে গেলেও, তুষারপাতের বিরাম নেই। কখনও দানা দানা, কখনও তুলোর মতো। 

এদিকে খবর পেলাম যে, আমাদের ড্রাইবার সাহেব কেটে পড়েছেন। রাতের খাবার শেষ করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। দুটো কম্বলের মধ্যে সেঁধিয়েও যেন কাঁপুনি কমছিল না। 


নাথাং ভ্যালির রাধা-কৃষ্ণ মন্দির

সকালে আবারও ঝলমলে আকাশ। চললাম কাছের একটি পাহাড় চূড়ায়। সেখানে বিএসএনএল-এর টাওয়ার ছিল। আর সেখান থেকে দেখা যায় বিশাল সেনা ক্যাম্প। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ ফটো সেশন চলল। কিন্তু ১১টা বাজতে না বাজতেই, আবারও অন্ধকার হয়ে এল চারপাশ। আর দুপুর থেকে আবার বরফ, বরফ আর বরফ। বিকেলের মধ্যে আবারও সম্পূর্ণ সাদা হয়ে গেল ভ্যালি। 

বাংলোর এক কর্মী সুনীল জানাল, আগামী কয়েক দিন গাড়ি চলাচল করবে কিনা তা নিয়ে বেশ সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু, আমাদের যে আরিটারে বুকিং রয়েছে! তার পর দিন ফেরার ট্রেন ধরতে হবে। সুনীল বলল, ‘‘থাকুন না! খাওয়াদাওয়ার কোনও অসুবিধা হবে না।’’ এই রকম অবস্থার জন্য তারা সব সময়েই তৈরি থাকে। এবং, অতিরিক্ত টাকাও দাবি করে না।

অবশেষে সন্ধে নাগাদ বরফ পড়া বন্ধ হল। আমরা তখন জানলার কাছে বসে, সেনাবাহিনীর গাড়ি দেখা যায় যদি। এক দিকে ফেরার চিন্তা। অন্য দিকে, কেমন একটা মন খারাপ করা অনুভূতি। 

অগত্যা, তাড়াতাড়ি রাতের খাবার সেরে শুয়ে পড়লাম সকলে। মাঝরাতের দিকে হঠাৎই ঘুম ভেঙে যায়। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি, চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে গোটা উপত্যকা। সে এক মোহময় দৃশ্য। সবাইকে ডেকে তুললাম। 


বরফে মোড়া নাথাং ভ্যালি

পরদিন সকাল থেকে আবারও শুরু হল অপেক্ষা। প্রায় সাড়ে ন’টা নাগাদ দূরে একটা আর্মি ট্রাক দেখা গেল। শম্বুক গতিতে এগিয়ে আসছে। আনন্দের হাওয়া বয়ে গেল সকলের মনে। খবর পাঠানো হল সুনীলকেও। সে বলেছিল, রাস্তা পরিষ্কার হলে, তাদের গাড়িতে করে আমাদের রংলি পৌঁছে দেবে। 

জনা দশেক নারী-পুরুষ মিলে বেলচা দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করে চলেছে। আর এক ফুট এক ফুট করে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলেছে। খুব পরিশ্রমের কাজ, কিন্তু তাদের দেখে মনে হচ্ছিল না। হেসে-খেলে-গল্প করে বরফ সরিয়ে চলেছে তারা।

এই ভাবে, প্রায় আড়াই ঘণ্টায় মাত্র দেড় কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পৌঁছলাম মূল সড়কে। সবাইকে বিদায় জানিয়ে গাড়ি ছুটল রংলি বাজারের দিকে। তারপরে আরিটার।

শরীরের রক্ত জমিয়ে দেওয়া ঠান্ডা, আর স্থানীয় মানুষের উষ্ণ আন্তরিকতা— মনে থাকবে সারা জীবন।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে