Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ১১-১৪-২০১৭

সংসার :প্রত্যেকে যখন ইঁদুর

মোজাফ্‌ফর হোসেন


সংসার :প্রত্যেকে যখন ইঁদুর

স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যে জনপ্রিয় লেখক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাব ঘটে। ছোটগল্প তার সবচেয়ে কম চর্চিত ও কম পঠিত একটি অধ্যায় হলেও ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদের আবেগ-অনুভূতি ও আকাঙ্ক্ষার সবচেয়ে বেশি প্রকাশ ঘটেছে এখানেই। এর একটা কারণ তিনি নিজেই বলেছেন তার শ্রেষ্ঠগল্প গ্রন্থের ভূমিকাতে- 'লিখতে আমার কখনো ক্লান্তি লাগে না। যতক্ষণ লিখি গাঢ় আনন্দে মন ভরে থাকে। অবশ্যি সব লেখার জন্যে এটা সত্যি নয়। ছোটগল্পের কথাই ধরা যাক। এরা আমাকে খুব কষ্ট দেয়।' নিশ্চয় তিনি ভৌতিক, অলৌকিক ও কল্পকাহিনীমূলক গল্প লিখেছেন। কিন্তু তার ছোটগল্পের মূল জায়গা হলো মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের জীবন-বেদনা নিয়ে লিখিত গল্পগুলো। তেমনই একটি গল্প 'সংসার'। কেবল হুমায়ূন-সাহিত্যে নয়, গোটা বাংলাদেশের সাহিত্যেই উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি হিসেবে গল্পটিকে দেখা যেতে পারে। 

গল্পের শুরুতেই আমরা দেখি মজিদ নামে ৪ বছর বয়সী এক শিশুকে তার বাবা কুদ্দুস মিয়া খেলার জন্য ইঁদুর ধরে দিয়েছে। ইঁদুরের লেজ বেঁধে দিয়েছে লাল সুতো দিয়ে। মজিদ ইচ্ছেমতো ইঁদুরটি নিয়ে খেলছে, কিন্তু খেতে দিচ্ছে না। ক্ষুধায় কাতর হয়ে ইঁদুরটি ছটফট করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। মজিদ বাবার কাছে ইঁদুর কী খায় জানতে চাইলে কুদ্দুস জানায়- 'যা পায় খায়। চিড়া, গুড়, মুড়ি, কাগজ, লোহা- খায় না এমন জিনিস নাই।' 

গল্পে ইঁদুরের এ প্রসঙ্গটি এসেছে প্রতীকী অর্থে। এই প্রতীকের মর্মবাণী জানা যায় পরমুহূর্তেই। আমরা দেখতে পাই, তিন সদস্যবিশিষ্ট যে পরিবারটির গল্প এখানে বলা হচ্ছে, তারা আসলে প্রত্যেকে এক একটা ইঁদুর। সুতো আছে সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তিদের হাতে। পরিবারটি সংসার পেতেছে স্যুয়ারেজ পাইপের ভেতর। সংসার চালাই কুদ্দুস মিয়ার বউ, মনোয়ারা। কুদ্দুসের একটা পা অবশ। ঘরে বসে থাকে। অথবা পায়ের দোহাই দিয়ে অলস বসে থাকে আর পরকালে সে যে সুখ পাবে এবং তার স্ত্রী নানা কারণে সুখবঞ্চিত হবে, সেসব কথা বলে। বাপ-ছেলে দু'জনেরই ক্ষুধায় পেট জ্বলে। রাত ন'টার দিকে মনোয়ারা ফেরে, সাথে একটা অপরিচিত পুরুষ। কুদ্দুসকে ক্লান্ত কণ্ঠে মনোয়ারা বলে, 'আপনে মজিদরে লইয়া একটু ঘুইরা আহেন।...মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে মনোয়ারা। তার দিকে তাকিয়ে বড় মায়া লাগে কুদ্দুসের। মজিদের হাতে ধরা সুতার মাথায় ইঁদুর ঝুলতে থাকে। মানুষের নিষ্ঠুরতায় সেই ইঁদুর বড় কাতর বোধ করে।' এখানে এসে ইঁদুর আর এই অসহায় মানুষরা আলাদা থাকে না। টনটনে ব্যথার এই গল্পটিও হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন সহজাত সরল ও তরল কণ্ঠে।

বাংলাদেশের ছোটগল্পে ব্ল্যাক হিউমারের এমন প্রয়োগ খুব বেশি দেখা যায় না। স্যুয়ারেজের পাইপে থাকা নিয়ে কুদ্দুস বলে, '-ও বউ, মনে হইতেছে কবরের ভিতর শুইয়া আছি। মানকের-নেকের আইসা সোয়াল-জোয়াব শুরু করব। মনোয়ারা জবাব দেয়নি। স্বামীর অধিকাংশ কথার সে কোনো জবাব দেয় না। এটা এক ধরনের বেয়াদবি। রোজ হাশরে মনোয়ারা এই বেয়াদবির কারণে বিপদে পড়বে। কুদ্দুস ঠিক করে রেখেছে, সুযোগ-সুবিধামতো বিষয়টা সে স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলবে। সে রকম সুযোগ-সুবিধা হচ্ছে না।' এখানে আমরা দেখতে পাই, লেখক কঠিন বাস্তবতাকে গুরুগম্ভীর স্বরে উপস্থাপন না করে যতটা সম্ভব মূল গল্পের প্রতি অমনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করছেন। হুমায়ূন আহমেদ প্রায়ই এ কাজটা করে থাকেন। 

গল্পে উপহাসের বিষয় হলো কুদ্দুস সম্মান-সচেতন মানুষ। সে ভাবে, রিকশা চালালে সবাই তুই তুই করে ডাকে; এতে সম্মান থাকে না। ইজ্জতকে ছোট করে দেখতে চায় না সে। পরমুহূর্তেই আমরা দেখি সকাল থেকে উপোস শরীর তার। বউ দু'মুঠো ভাতের জন্য অন্যপুরুষকে ঘরে এনেছে। এটাকে আমরা পরিস্থিতিগত উপহাস বা সিচুয়েশনাল আইরনি বলতে পারি। একইভাবে দেখি, মনোয়ারা যখন অন্যপুরুষকে নিয়ে বাড়ি ফেরে শয্যাসঙ্গী হয়ে দুটো টাকা পাবে বলে; কুদ্দুস তখন ভাবে, 'বেহেশতে তার একটা সুন্দর সংসার হবে। মজিদ, শরিফা (মৃত মেয়ে) আর তার স্ত্রী মনোয়ারাকে নিয়ে অতি সুন্দর সংসার।...এখন মনে হচ্ছে বেহেশতের সেই সংসারে মনোয়ারার স্থান হবে না। রোজ হাশরে মনোয়ারা কঠিন বিপদে পড়বে। স্বামীর সুপারিশ সেদিন গ্রাহ্য হবে না, গ্রাহ্য হলে সে অবশ্যই বলত, আল্লাহপাক, এই মেয়ে তার সংসার বড় ভালোবাসে। সে যা করেছে সংসার টিকিয়ে রাখার জন্যই করেছে, স্বামী হয়ে আমি তাকে ক্ষমা করেছি। তুমিও তাকে ক্ষমা করে দাও।' এখানে এসে হুমায়ূন আহমেদ ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে যাপিত জীবনের যে বিপরীত সম্পর্ক সেটা তুলে ধরেছেন। গল্পটিকে আরও কয়েকটি স্তরে পাঠ করা যেতে পারে। বিশেষ করে নারীবাদী ও পুঁজিবাদী সাহিত্য সমালোচনাতত্ত্ব দিয়ে বিশ্নেষণ করলে আরও অনেক কিছু বের হয়ে আসবে।

এমএ/০১:০০/১৪ নভেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে