Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ১১-০৮-২০১৭

সংবিধানের ৪৫তম বার্ষিকীতে জাতীয় আত্মজিজ্ঞাসা

মিজানুর রহমান খান


সংবিধানের ৪৫তম বার্ষিকীতে জাতীয় আত্মজিজ্ঞাসা

গতকাল ছিল বাংলাদেশ সংবিধান প্রণয়ণের ৪৫তম বার্ষিকী। এদিনে সর্বাগ্রে স্মরণ করার বিষয় হলো, ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বরে প্রণীত সংবিধানের ১৫৩টি অনুচ্ছেদ নানা ঝড়ঝাপ্টা মোকাবিলা করে বেশির ভাগই টিকে আছে।

তবে সংবিধানের আত্মা ও প্রাণ কাগজে-কলমে কতটুকু এবং বাস্তবে দৈনন্দিন কর্মজীবনে তাকে কতটা জাগ্রত রাখতে পেরেছি, সেটা এক বিরাট প্রশ্ন। শুধু প্রশ্ন নয়, জাতীয় জীবনের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এটি একটি প্রাণবন্ত আত্মজিজ্ঞাসার বিষয় হওয়া উচিত।

আরও যে বিষয়টি আজকের দিনে বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে তা হলো, আমরা যে সংবিধান টিকিয়ে রেখেছি, তার মধ্যকার কোন কোন বিধানাবলিকে আমরা সর্বজনীন সংস্কৃতিতে পরিণত করতে পেরেছি? কারণ এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা শুধু সংবিধানে লেখা থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সক্রিয় অংশ তা কার্যত বিশ্বাস করবে না, সেই সাংবিধানিক রক্ষাকবচ রেখেই বা কী হবে?

যেমন রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এমন স্পষ্ট রক্ষাকবচ তৈরি করা হয়েছিল, যা ছিল এক কালজয়ী আলোকবর্তিকা। পঞ্চম সংশোধনীতে তা হারিয়ে যাওয়ার পর আমরা কেন তা আর পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যর্থ হলাম? আওয়ামী লীগকে অবশ্যই তার কৈফিয়ত দিতে হবে।
আমাদের সংবিধানের প্রণেতারা লক্ষ্য কীভাবে স্থির করার চেষ্টা করেছিলেন, তা বাহাত্তরের একটি অপ্রকাশিত খসড়া সংবিধান থেকে তুলে ধরতে চাই।

২২ সেপ্টেম্বর এটি সরকারি ছাপাখানায় মুদ্রিত হয়েছিল। এতে দেখা যাচ্ছে, বাহাত্তরের সংবিধানের মৌলিক অধিকার ভাগের ৩৮ অনুচ্ছেদে গোড়াতেই কিন্তু জামায়াতসহ ধর্মীয় সংগঠন নিষিদ্ধ করার চিন্তা করা হয়নি। এর প্রমাণ হলো ২২ সেপ্টেম্বরে মুদ্রিত সংবিধানের খসড়া। এর মৌলিক অধিকার ভাগে এ রকম কোনো অনুচ্ছেদ দেখা যায় না। বরং সেখানে ৪০ অনুচ্ছেদে লেখা হয়েছিল, ‘জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সমিতি ও ইউনিয়ন গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার থাকিবে।’

ওই খসড়ার রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি ভাগের (যা আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য নয়) ১২ অনুচ্ছেদে লেখা হয়েছিল: ‘এমন অবস্থার সৃষ্টি করিয়া ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়িত করা হইবে, যেখানে ক) সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িকতা, খ) কোন ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা বা রাষ্ট্রীয় পরিপোষকতা দান, গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার, এবং ঘ) কোন বিশেষ ধর্মপালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাঁহার উপর নিপীড়ন বিলুপ্ত হইবে।’

এটা লক্ষণীয় যে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই বিধান দ্বারা সংবিধানেই জামায়াতসহ ধর্মীয় সংগঠনগুলো নিষিদ্ধের বিধান যুক্ত করার চিন্তা ছিল না। কিন্তু ৪ নভেম্বরে এসে ওই বিধান ৩৮ অনুচ্ছেদে যুক্ত করা হয়েছিল। আর তাতে স্বাধীনতাবিরোধী সংগঠন জামায়াত সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
বাহাত্তরের ৪ নভেম্বরে ১২ অুনচ্ছেদকে নেওয়া হলো সংশোধিত আকারে। আর তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাক্যাংশ বাদ পড়ল। ৪ নভেম্বরে লেখা হলো (এখনো বহাল):

১২। ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি বাস্তবায়নের জন্য (ক) সর্ব প্রকার সাম্প্রদায়িকতা, (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান, (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার, (ঘ) কোন বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার উপর নিপীড়ন, বিলোপ করা হইবে।

সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে ‘এমন অবস্থার সৃষ্টি করিয়া ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়িত করা হইবে’, কথাটার ‘এমন অবস্থা সৃষ্টি করিয়া’ বাক্যাংশ বাদ পড়ল। সুতরাং ধরে নিতে হবে যে সংবিধানপ্রণেতারা সতর্ক ছিলেন যে ধর্মনিরেপক্ষতার নীতি বাস্তবায়ন করতে হলে একটি অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করতে হবে। এটাই রাষ্ট্রের মূল কাজ। যদি আমরা ধরে নিই যে ওই পরিবেশ ১৯৭৫ সালে নষ্ট করা হয়েছিল, তাহলে আমাদের অনুভবে এটা পেতে হবে যে আওয়ামী লীগ ২০০৮ সাল-পরবর্তী ৯ বছরে ওই লক্ষ্য অর্জনে কী করেছে? পৃষ্ঠপোষকতা শব্দটিও কিন্তু বাহাত্তরের ৪ নভেম্বরেই বাদ পড়েছিল।

৪৫তম বার্ষিকীতে প্রশ্ন হলো এখন ভারসাম্যটা কোন দিকে? ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের দিকে নাকি রাষ্ট্রধর্মের প্রতি ‘পৃষ্ঠপোষকতা’ প্রদানে? এই ভারসাম্য তৈরির দিকে কোনো আন্তরিক চেষ্টা আমাদের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক জীবনে আছে কি নেই?

২০১১ সালে আমরা কী করলাম? আওয়ামী লীগ আমাদের কী নিশ্চয়তা দিল? চার মূলনীতির সঙ্গে যদি তারা ওই সেপ্টেম্বরের খসড়া বিধানটি এনে দিত, তাহলেও কিন্তু ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রশ্নে আমাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার আরও সুসংহত হতো। রাষ্ট্রকেই যে অবস্থাটা সৃষ্টি করতে হবে, তার স্বীকৃতি মিলত। কিন্তু আমরা ওই অবস্থা সৃষ্টির কোনো প্রয়াস দেখি না। কোনো ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা বা রাষ্ট্রীয় পরিপোষকতা দান বিলুপ্ত করা ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। কিন্তু তা অর্জন করায় দৃঢ়তা নয় বরং আরও আপসকামিতাই লক্ষ করি। একটা ছদ্মবেশ ধরেছে রাষ্ট্র। ওপরে এক রকম, ভেতরে আরেক রকম।

২০১১ সালে মূল ৩৮ অনুচ্ছেদ ফিরিয়ে আনা হলো না এই যুক্তিতে যে ধর্মীয় সংগঠন নিষিদ্ধের বিষয়টি আর বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু তাই বলে উল্লিখিত সেপ্টেম্বরের ১২ অনুচ্ছেদটি প্রতিস্থাপনে কি বাধা ছিল?

আমরা যা বুঝতে পারি, তা হলো মূল বাধা ছিল রাষ্ট্রের সংকল্পের গলদ। এই রাষ্ট্র এখন মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও তারা আত্মা হারিয়েছে। আর আমরা মনে করি, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যে খাবি খাচ্ছে, তা থেকে উতরাতে চাইলে ওই পৃষ্ঠপোষকতার জায়গাটি পরিষ্কার করতে হবে। অন্যথায় আমরা সম্ভবত ভুল পথেই চলতে থাকব। সাম্প্রদায়িকতা ও গণতন্ত্রের পরিপুষ্টি একসঙ্গে চলতে পারে না।

আমরা আপাতত সংবিধান শোধরানোর চেয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবেশ সৃষ্টিতে রাষ্ট্রের অনুকূল পৃষ্ঠপোষকতা দেখতে চাইব। আর আমরা এই উদ্দেশ্য সাধনে রাষ্ট্র বলতে বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে বুঝতে চাই না। বিরোধী দল সর্বতোভাবে যদি ওই ১২ দফার বিরুদ্ধাচরণ করে চলে, তাহলে শুধু সরকারি দলের পক্ষে তা মেনে চলতে আগ্রহ দেখানো কঠিন হয়ে পড়ে।

আমরা লক্ষ করি, নির্বাচন কমিশন মনেই করছে না যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার প্রশ্নে একটা ফয়সালা হওয়া দরকার। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনবর্তমান ৩৮ অনুচ্ছেদটি নিম্নরুপ:

‘৩৮। জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবেঃ তবে শর্ত থাকে যে, কোন ব্যক্তির উক্তরুপ সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার কিংবা উহার সদস্য হইবার অধিকার থাকিবে না, যদি (ক) উহা নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; (খ) উহা ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; (গ) উহা রাষ্ট্র বা নাগরিকদের বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোন দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বা জঙ্গী কার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; বা (ঘ) উহার গঠন ও উদ্দেশ্য এই সংবিধানের পরিপন্থী হয়।’

আমরা মনে করি, বাহাত্তরের সেপ্টেম্বরের সংবিধানের ওই বিধানকে বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

আজ ওই অনুচ্ছেদটির প্রতি আমরা বিশেষ জোর দিচ্ছি, তার অন্যতম কারণ আমরা আজ যে গণতান্ত্রিক পথচলায় হোঁচট খাচ্ছি, আমরা যে একটা ঘূর্ণাবর্তে পড়ে গেছি, তার পেছনে মুক্তিযুদ্ধের ওই মৌলিক চেতনাকে দুর্বল করার একটি বিষয় রয়েছে।

সংবিধানের ৪৫তম বার্ষিকীর কালে এই বিষয়টিকেই আমরা তাই বড় করে দেখছি। আমরা উদ্বিগ্ন যে আওয়ামী লীগ ও অন্য দলগুলোর তরফে উল্লিখিত ৩৮ অনুচ্ছেদের আওতায় কোনো আইন তৈরির গরজ অনুভব না করা। নির্বাচন কমিশন বুঝতেই পারছে না যে, গণতন্ত্র ও একদিন একটি ভোটের অনুষ্ঠান করার মধ্যে মৌলিক তফাত আছে। তারা উদাসীন থাকছে যে ৩৮ অনুচ্ছেদের আওতায় সংবিধানপ্রদত্ত আইনের ঘাটতি গণতন্ত্রের ঘাটতি। এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে গণতন্ত্রের অনুষঙ্গ করতে চাইলে ওই ৩৮ অনুচ্ছেদের আওতায় আইনটি লাগবে।

সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ও তার তোষণ আমাদের আইনের শাসনে উত্তরণ ঘটাতেও বাধা দিচ্ছে।

তবে শেষ করব মার্কিন সংবিধানের মুখ্য রূপকার জেমস মেডিসনকে স্মরণ করে। ২৩০ বছর আগে মেডিসন বিশ্বাস করতেন: জনগণের নজরদারিতে ‘ব্যক্তিস্বাধীনতার পবিত্র আগুনে’ পোড়াই হলো প্রজাতন্ত্রী সরকারের নিয়তি। আর জনপ্রিয় সরকারের সামনে বড় বিপদ হলো উপদলীয় কোন্দল।
এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের সামনে প্রকৃত বিপদ হলো ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি বিশ্বাস হারানো এবং আর নিজ দলের কোন্দলের চেয়ে বিএনপি বা তার মিত্রদের বড় বিপদ হিসেবে বিবেচনা করা।

এমএ/০৮:৫৩/০৮ নভেম্বর 

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে