Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.6/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৯-৩০-২০১৭

সাদ কামালীর গল্পের জায়গা-জমি-মানুষ

মাসউদ আহমাদ


সাদ কামালীর গল্পের জায়গা-জমি-মানুষ

প্রথমেই পরিস্কার করে নেওয়া সঙ্গত মনে করি, প্রচল প্রকরণের ভূমি পাশ কাটিয়ে অন্যধরনের গল্প লেখেন সাদ কামালী। তাঁর গল্প বিশেষ মনোযোগও দাবি করে পাঠকের। সরল সুখপাঠ্য গল্পের ভাবালুতার বিপরীতে তিনি গল্পের বিষয়-চিন্তা-প্রকাশভঙ্গিতে এমন স্বতন্ত্র আঙ্গিক ও কৌশল ব্যবহার করেন, বোধের দরোজায় ঝাঁকি খেয়ে ওঠেন পাঠক।
কিন্তু তাঁর গল্পের ভাষা জটিল বা জটপাকানো অবকাঠামোয় নির্মিত হয় না। মনোজগৎ আচ্ছন্ন করে তোলা একধরনের দর্শনঋদ্ধ অনুভব-অভিজ্ঞতায় গল্প বুনে চলেন তিনি। আর একইসঙ্গে তাঁর গদ্যভঙ্গিটি নির্মোহ, কিন্তু অন্তরঙ্গ। ফলে চেনা জীবন ও জগতের গল্প দিয়েই পাঠকের বোধ ও অভিজ্ঞতায় নতুন এক চেতনার রঙ মেখে দেন তিনি, সাদ কামালী।

সাদ কামালীর একটি গল্পগ্রন্থ সাদা রক্ত; ১৩টি গল্প ধারণ করেছে এই বই: ‘প্রাকৃত সম্পর্কের উপকথা’, ‘আসমানে ফিরে যা’, ‘দুধ অথবা বীজের উপকথা’, ‘জননী অথবা আত্মজার গল্প’, ‘সাদা রক্ত’, ‘কীটপতঙ্গের রতিফুর্তি’, মুসিবত’, ‘তেলাপোকার জার্নাল’, ‘পুরান পুরাণ’, ‘টার্গেট মামু বনাম ডোম ওস্তাদ’, ‘মড়ার বংশ’, ‘অপেক্ষা পুরাণ’ এবং ‘লেট মি বি’।

বইয়ের নামগল্প, সাদা রক্ত গল্পে আমরা এক সরল দম্পতি বলা যেতে পারে, দিবানিশি-খেটেখাওয়া নিপুণ-পরিশ্রমী মানুষের মনোবিকলনগন্ধি ও রহস্যময় জীবনাভিজ্ঞতার পাঠ গ্রহণ করে উঠি। কিন্তু তাঁর গল্পবলার ঢঙ ও উপস্থাপনার নৈপুণ্যে সামান্য আটপৌরে গল্পটি হয়ে ওঠে কেমন অলৌকিক অনুভবের। গল্প শুরু হয়েছে এভাবে ‘শেষ আলোটুকু অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার আগে অথবা পশ্চিমে রক্তের ছবি থাকতে থাকতেই শরীরে লেপা সব কাদা মাটি ধুয়ে মুছে মাখন সহজ সাধারণ হয়ে ওঠে।’
যে-কোনো কারণেই হোক, মাখনের মনে কী এক ভয় ঢুকে গেছে যে, মানুষ ঘেমে গেলে ঘাম নয়, রক্ত রেরোয়; ফলে সে কাজে নেমে পড়ার আগেই সমস্ত শরীরে কাদা মেখে নেয়। তার ধারণা ‘চাষাভুষা লোকের শরীরে ঘাম হয় না, চামড়া ফেটে রক্ত বেরোয়। রক্তে শরীর ভেজে, শরীর নেতিয়ে পড়ে, ধুকে ধুকে অথবা আচমকা মরে’।

সে আরও ভাবে যে, রক্তের রঙ শুধু লালই নয়, সাদাও। তাই শরীরের রক্ত ধরে রাখতে কাজে নামার আগেই চোখদুটি বাদে সমস্ত শরীরে নিপুণভাবে কাদা মেখে নিতে ভোলে না। তার এই অভ্যাসে বন্ধু বা অন্যরা তাকে টিটকারি মারে, সে গা করে না। যেমন মাখনের পাশে কাজ করে শুকুর, সে ‘হাঁটুভেঙ্গে বসে বোরোধানের গোছা মাটিতে পোঁতে, মাখনের পায়ে সে হাঁটু দিয়ে ধাক্কা দেয়, বলে তোর সোনায় ক্যাদা মাখায়ছোস, দেহিস সাদা রক্ত কিন্তুক ওহেন দিয়ে পরে বেশি।
এতে মাখন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না, নীরবে কাজ করে চলে, সমান্তরাল লাইন ভেঙ্গে সে একাই এগিয়ে থাকে; কিন্তু দলের সবাই জানে, মাখন ইচ্ছে করলে কাদার মধ্যে শুকুরকে গুঁজে দিতে পারে ওর শক্তির পরিচয় সবার জানা আছে।’
এ এক প্রতীকী চিত্রকল্পময় গল্প, যে গল্প স্ত্রী আলো ও মাখনের; তাদের খাপছাড়া দাম্পত্যজীবনের। খাপছাড়া, কারণ ঘাম ও রক্তের ব্যাপারটা অন্যসবার কাছে সরল মনে হলেও মাখনের জন্য তা নয়; সতত ভীত থাকে সে ভয়েই সে ধীর পায়ে হাঁটে, কথা বলে, হাসে; এমনকি, বেচারা বউ আলো জানে, খাটাখাটুনির ভয়ে সঙ্গম কর্মটি থেকেও সে বিরত থাকে।

আমরা দেখে উঠি, এই গল্প পাঠকের মনোজগতকে বিভ্রান্ত করে, ঔৎসুক্য জাগিয়ে দেয় কেন এমন হয়? কী কারণ থাকতে পারে এর পেছনে!  গল্পে আমরা দেখি, হঠাৎই, খেত-খামারের কাজ ছেড়ে মাখন চাকরি পায় উপজেলার ইউএনওর অফিসে, দারোয়ান হিসেবে; একদিন মাঝরাতে মাখনের ডাক পড়ে অফিসে, বেচারা মাখন, কী করে স্যারের কথা অমান্য করে! সেদিন রাতে খুব অন্ধকার, আকাশে চাঁদ কেন, তারাও নেই।

স্যারের সিগারেট-লাইটারের আলোয় একঝলকেই মাখন দেখে ওঠে, পায়ের কাছে মায়া ম্যাডাম পড়ে আছে; স্যার বলেন, দালানের পিছনে ভ্যান আছে, ম্যাডামকে কাঁধে করে নিয়ে ভ্যানে তুলে দে। মাখন সরল আর গরীব মানুষ, কিছু বলতে পারে না। পারার কথাও নয়। কিন্তু মনে মনে ঠিকই ভাবে, এই রাতে বাড়ি থেকে ডেকে এনে এই কাজ? ঘুমন্ত মানুষ এত ভারী দুটো গরুর সমান প্রায়; সে বলে ওঠে ‘স্যার উনার শরীল অ্যাতো ভিজা ক্যান! স্যার গাঢ় কণ্ঠে বলে, যে গরম, ঘামাইছে আর কি। হ হ, ঘামাইয়া মনে হয় কালাইয়া গেছে।’
পাঠক কি কিছু বুঝে উঠতে পারছেন, কেন এবং কখন থেকে মাখনের করোটিতে রক্তবিষয়ক জটিলতা ঢুকে পড়ে? গল্প আরও এগোয় মাখনকে আমরা দেখি, ইংরেজি এল অক্ষরের মতো দোতলা দালানের লম্বা করিডোর হেঁটে স্যারের পিছন পিছন অন্যপ্রান্তের সিঁড়ি ধরে নামছে। সে হঠাৎ বলে ‘স্যার উনি কি বেহুশ হইয়া পড়ছে? এ্যামায় কেউ ঘুময়! স্যার কথা বলে না। আহারে, স্যার, ও স্যার উনারা কুথায়? স্যার চাপা গলায় বলে, চুপ থাক, শব্দ করবি না। মাখন কষ্ট করে লম্বা শ্বাস ফেলে। ভ্যানের নিচে হারিকেন ঝুলছে, ওই আলোতে নিশানা বুঝে মাখন মায়া রানী দাস ওরফে মায়া ম্যাডামকে প্রায় ধপাস করে ফেলে, ভ্যান কিছু গড়িয়ে গেলেও চালক নিয়ন্ত্রণেই রাখে।

মাখন হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, এ্যামায় ঘামায়, আমারেও ভিজায় দিছে। স্যার বলে, যা যা পুকুরে গোসল কইরা নে। কেমন জানি গন্ধ লাগে স্যার, ঘামে আঠা আঠা হইয়া গেছে, তা তো করবোই। স্যার কিছু দিবেন না? ইউ এন ও ড্রাইভারকে যেতে বলে নিজেও দ্রুত সরে পড়তে পড়তে বলে, সকালে অফিসে আসিস। মাখন আচ্ছা বলার জন্য মুখ খুলেছে, আ... ছাড়া আর কোনো শব্দ হওয়ার আগেই ঘাড় মাথা জড়িয়ে পিছন থেকে এক বাড়িতে উপজেলার পিছনে ইট খোয়ার ভিতর মুখ থুবড়ে পড়ে। ক্রিকেট ব্যাটের এমন বাড়িতে ছক্কা হতোই।’
সাদা রক্ত গল্পপাঠের পর, পাঠকের একধরনের মিশ্র ও দার্শনিক অনুভূতি হয়, ভ্রু কোঁচকানো মন নিয়ে গল্পের একেবারে শেষে পাঠক নিজেকে আবিস্কার করেন। সাদ কামালীর ভাষায়, গল্পের শেষটুকু আমরা অবলোকন করে উঠি এভাবে ‘আলো বেশ বুদ্ধিমানের মতো বলে, তোমার মনে নাই উপজিলার কামেই রক্ত পড়ছিল।

মাখন দ্রুত বলে, না তুমি কও, কোন দোষে আমার চারকি গেল?
আলোর ঠোঁটে সেই চিকন হাসি এখন ফোটে না, গলার স্বর গভীর হয়ে ওঠে, বলে, তোমার চারকি গেল সাদা রক্তের দোষে, বুঝছো?’
উচ্চাকাঙ্খী বা নিরীক্ষাপ্রবণ গল্পলেখকের ক্ষেত্রে সাধারণত যেটি হয়ে থাকে, গল্পের মুখোশ তৈরি করতে গিয়ে অনেকসময় মুখশ্রী ঢাকা পড়ে যায়। ফলে গল্পের বিন্যাসভঙ্গিতে অধরা থেকে যায় জীবনের সূক্ষ্ণ বা গভীর মাধুর্য-সুষমা, কিংবা অভিঘাতও। সাদ কামালীর গল্পে সেই মুখোশ তৈরির প্রবণতা নেই। বরং আত্মিক সৌন্দর্যেই তাঁর গল্পের কাঠামো বা কলকব্জা নির্মিত হয়েছে।

সাদা রক্ত গল্পেই নয়, গ্রন্থভুক্ত প্রায় সমস্ত গল্পেই, গল্পবয়নে ও নিজের স্বরটিকে আলাদা করে তুলে ধরার অনন্য কৌশলটি তিনি অনায়াস করায়ত্ব করেছেন। শুধুমাত্র ঘটনার অনুপম বর্ণনাতেই তো আর গল্প তৈরি হয় না আরও কিছু থাকতে হয়। জীবন ও ঘটনার মাঝে নতুন চিন্তা ও তাৎপর্য উন্মোচন করতে হয়। গল্পের অন্দর মহল ও বাস্তবতার দেয়ালটি খুলে দিতে জানতে হয়। গল্পকার সাদ কামালীর লেখায় সেসব বৈশিষ্ট্যের উপস্থাপন দেখে উঠি।
তেলাপোকার জার্নাল এই গন্থের আর একটি উল্লেখনীয় গল্প। আমাদের সমাজ-অবকাঠামো এবং ব্যক্তির নানারৈখিক ব্যক্তিগত সংকট যে কতটা গুরুত্ববহ বিষয়, সেদিকে মানুষের নজর নেই বললেই চলে। ব্যক্তি কীভাবে তিলে তিলে ক্ষয়ে যায়, নিঃশেষ হয়ে চলে, জীবনকে অর্থহীন ও ধ্বংসোন্মুখ করে তোলে এরই সূক্ষ্ণ-সুন্দর-উদ্ঘাটন দেখতে পাব এ গল্পে।
গল্প শুরু হয়েছে এভাবে ‘নুরুল ফজল এখন সঙ্গমে অক্ষম। মরা টাকি মাছের মতো ন্যাতানো অঙ্গটি অনাদরে শরীরের সঙ্গে কোনোরকমে আটকে আছে। নুরুল ফজল অথবা নাজনীন বেগম কোনোভাবেই ওই অঙ্গটিতে উত্তেজনা ছড়াতে পারছে না। এমনকি চিকিৎসক এম. এ. ওহাব নুরুল ফজলকে একই সাথে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করার জন্য বলেছে।

একত্রিশ বছরের নুরুল ফজল আরো অনেকের সাথে পরামর্শ করলেও ওই মরা অঙ্গটির কোনো উন্নতি হয় না, বরং সে অনুভব করে অবসাদ, বদহজমে পেট ফেঁপে থাকে, দুর্গন্ধ নির্গত হলে নাজনীন বেগম অন্যত্র শোয়। ঠাণ্ডা শিহরণে নুরুল ফজলের ঘুম আসে না, বাতি জ্বালিয়ে চেষ্টা করে কিছু একটা পড়তে।’
তেলাপোকার জার্নাল গল্পটি আপাত সরলভাবে শুরু হয়, কিন্তু গল্পের শীর্ষবিন্দু কী হতে পারে তার একটা আভাস থেকেই যেন গল্প গতিময় যাত্রাটি শুরু করে; এমন হয়, হতে পারে: কোনো একটি সংকটকে ঘিরে ব্যক্তিক বা সামাজিক, গল্প এগিয়ে চলে। এবং আমরা একটা ব্যাপার লক্ষ করে উঠব সাদ কামালীর গল্পে, তিনি অতিনাটুকেপনা বা অতিরিক্ত ভাবাবেগকে প্রশ্রয় দেন না। ঘটনা ও বিষয়ের অনুভব, বা জীবনের নিপুণ অভিঘাতকে ভেঙে বা সাজিয়ে আখ্যানের গুরুত্বকে বিশ্লেষণ করেন।

একত্রিশ বছর বয়সের একজন সুস্থ সবল এবং কর্মঠ মানুষের পুংলিঙ্গটি কেন মরা টাকি মাছের মতো অকেজো হয়ে পড়ে, সেইসঙ্গে তার জীবনের সমস্ত কাজ ও অনুভূতিতে স্থবিরতা নেমে আসে গল্পকার ঘটনার নিপুণ বর্ণনা এবং জীবনের টুকরো টুকরো শিল্পকাঠামোয় তা উন্মোচন করতে থাকেন। 
গল্পের প্রধান চরিত্র দুটি নাজনীন এবং তার স্বামী নুরুল ফজল; গল্পের ফাঁকে দুএকটি চরিত্র, যেমন নাজনীনের বড় বোন বা অফিসের কূটপরামর্শদাতা ব্যক্তি হয়তো টুক করে ঢুকে পড়ে; কিন্তু সমস্ত গল্পেই আমরা এই দম্পতিরই সুখ-দুঃখ-সংকট কিংবা দীর্ঘশ্বসের আলোছায়া দেখে উঠব। নুরুল ফজলের খোলা চোখের সামনে সাদা ছাদ, দেয়ালে বাঁধানো ফ্রেমে দুটি ছবি, বিয়ের আগের ও পরের, তাদেরই; ছবি দেখতে দেখতে হঠাৎ তিনি আবিস্কার করে ওঠেন একটি তেলাপোকা সেখানে আত্মগোপন করে আছে।

এবং এই তেলাপোকাটি বরাবরই, ভিলেন হয়ে, নুরুল ফজলের জীবনকে অনুসরণ করে চলে, তাঁর নিজের ধারণা তেমনই। তবারক ইসলামের পরামর্শে চাকরি থেকে ব্যবসা-অফিস বদল-কাজে না যাওয়া-স্ত্রীর অভিসার ইত্যাদি এবং সেই তেলাপোকাটি, চাল চালিয়ে যায়। নুরুল ফজল জীবনের আশা ছেড়ে দিয়ে বিপন্নবোধ করেন। নাজনীন সান্ত্বনা দেয় ‘শরীর ঠিক হয়ে যাবে, তুমি আবার সক্ষম হবে।’ কিন্তু স্ত্রী পরকীয়ায় মগ্ন, নুরুল ফজল টের পান। এবং এই যে জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে চলা নানারকম তাপ-চাপ-ব্যর্থতা-অস্থির ও বিপন্ন জীবন তিনি যাপন করেন দিন যায়, আর তিনি একটু একটু করে তাঁর পৌরুষ হারাতে থাকেন।

শুধু কি এই? গল্পকার, ধীরে ধীরে বাস্তবতার দেয়ালটি খুলে দেন অফিস এবং চারপাশের মানুষ তো বটেই, তাঁর স্ত্রীও বহুরূপী মানুষ এক; সময় ও পরিবেশভেদে সে তার চরিত্রের পেখম ছড়িয়ে দেয়।
গল্পে দেখা যায়, নাজনীন নিয়মিত ভিন্ন বিছানাতেই রাত্রিযাপন করছে, দাম্পত্য-সম্পর্কটুকুও কেমন আলগা হয়ে পড়েছে। একদিন ‘সকালে কিছু না খেয়েই নুরুল ফজল অফিসে রওনা দেয়। তার পেট ভরা লাগছে, রাতের খাবার হজম হয়নি। চা’ও বানাতে নিষেধ করেছে, বুক জ্বলছে খুব। হাতের ব্রিফকেস অতিরিক্ত ভারি লাগছে। বমি বমি ভাব, মুখে টক স্বাদ। এলামেলো কিছুক্ষণ হেঁটে বাসায় চলে আসে।

নাজনীন তখন ড্রেসারের সামনে শাড়ির ভাঁজ ঠিক করতে করতে কোনো একটা সুর গুনগুন করছিল। হঠাৎ নুরুল ফজলকে দেখে চমকে যায়। নুরুল ফজল দেখে নাজনীনের ঠোঁট চিবুক ঘিরে বেশ প্রসাধন। নাজনীন কৈফিয়ত দেয়ার মতো করে জানায়, বড়ো আপার বাসায় যাচ্ছি, তুমি ফিরে এলে? নুরুল ফজল কিছু না বলে বিছানায় শুয়ে থাকে। সকালে এত সেজে বড়ো আপার বাসায় যাওয়ার কারণও সে জানতে চায় না। প্রবল বমি-ভাব চেপে থাকে।’

কিন্তু কিছুসময় পরে গল্প অন্যদিকে মোড় নেয়, নুরুল ফজল ঘটনার বাস্তবতায় বিপন্ন বিস্ময়বোধে লীন হয়ে পড়েন। কিন্তু গল্পকার, সন্তর্পণে বাস্তবতার দেয়ালটি উন্মোচন করেন, ‘...নুরুল ফজল ঘুমিয়ে পড়েছিল, দরোজায় খুব জোরে কলিংবেলের আওয়াজে চমকে ওঠে। নাজনীনের বড়ো আপা বেশ কিছুক্ষণ থেকে বেল টিপে যাচ্ছিল।

নুরুল ফজল তখনও বলে না, নাজনীন তো আপনার বাসাতেই গেছে, সেই সকালে। বরং বড়ো আপার প্রশ্নের উত্তরে জানালো, দুপুরের মধ্যেই এসে যাবে, আপনি বসেন। বড়ো আপা আর বসে না। না, আমি চলি, এমনি এসেছিলাম, তোমাদের দেখতে।’

গল্পের শেষে এসেও সাদ কামালী পাঠককে চমকে দেন, ঘটনার বয়ন ও শিল্পঅন্বেষার সূক্ষ্ণ চমৎকারিত্বে। জীবনের গভীর চৈতন্যে ঘা দিতে গেলে যে-আত্মলগ্ন নিঃশব্দ অনুসন্ধান প্রয়োজন, সাদ কামালীর গল্পে তার দেখা মেলে। তাঁর রচনাশৈলীর ইঙ্গিতময় অভীপ্সা ও প্রসাদগুণ তারই সাক্ষ্য দেয়।
সাদ কামালীর গল্প পড়তে গিয়ে, কখনো এমন হয় পাঠের গতি থেমে যায়, ভাবনাও। যেমন ‘প্রাকৃত সম্পর্কের উপকথা’ গল্পটির কথাই ধরা যাক লৌকিক-অলৌকিক-মিথ-ইতিহাস ইত্যাদির মিশেলে এ এক অদ্ভুত গল্প। একহিসেবে একে কাব্যিক প্রবন্ধ-গল্প বলেও আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। ইঙ্গিতবাহী মনোরম বাক্য ও ইতিহাসগন্ধি গল্পের আবহ দেখে এখানে উঠি; যেমন গল্পকার লিখছেন, ‘...রাখাল চিনতে পারে লীলাময়ীর এই স্বাস্থ্যোজ্জ্বল সখীকে। রস কৌতুক তার অঙ্গের ভূষণ। তেমন কৌতুক আর দেহভঙ্গিমায় বলে, কি গো রাখালরাজ, আজ বুঝি খুব বিরহ হলো?’
অথবা ‘মনে পড়লো? লীলাময়ীর কণ্ঠ মাদক রসে ভারি। চওড়া লোমহীন বুকে রাখাল লীলাময়ীকে জড়িয়ে ধরে রাখে। অশ্বথ গাছের পাতাদের হঠাৎ শিহরণ থেমে যায়, উঁচু ডালের ঘুঘু দম্পতি বিহ্বল হয়ে থমকে থাকে, কোনো কাতর স্বর বের হয় না। একজোড়া ঘাসফড়িং ঘাসের শিষের ওপর বসবার কসরত থামিয়ে আনমনা হয়ে পড়ে। এই হঠাৎ নৈঃশব্দের ভিতর শুধু লীলাময়ীর কোমরের বিছা খুলে ঘাসে পড়ার মৃদু শব্দের সঙে কাঁচুলির বন্ধন ঘের মুক্ত করে দেয় রাখাল।’

কিন্তু গল্প পাঠের অবকাশে মনে হতে থাকে এ যেন এক প্রবন্ধ-গল্প! গল্পের অনুপম ও সরল পাঠানন্দ খুঁজে পেতে বেগ ধরে যায়। লীলাময়ী-রাখাল, সে আসলে ভরতচন্দ্র; তাকে, অন্যায়ের বিচারের জন্য সশস্ত্র প্রহরায় রাজ দরবারে ডেকে পাঠানো হয়; এবং এখানে আছে রাজা স্বয়ং, শকুন্তলা, দেবী প্রমুখ। এভাবে কোনো কোনো গল্প বোধের কার্নিশে থমকে যাওয়া হাওয়া বইয়ে দেয়। এ কী গল্প!

লেখালেখি জীবনচর্চারই একটি অংশ, আর ব্যক্তি তিনি কীভাবে জীবন ও জগৎকে অবলোকন করেন, ধারণ ও লালন করেন, তার সৃজনকর্মে সেসবের স্বকীয় প্রতিফলন ঘটে। সাদ কামালীর এই বইয়ের তেরোটি গল্প বিষয় ও ভাবনার ভূগোলে স্বতন্ত্র ও অভিনব। নানামুখি জীবনের রঙ ও ঘ্রাণ এতে মিশে আছে, গল্প বুননের কৌশলে এবং শিল্পের সৌরভে।

তাঁর গল্প পাঠ এক নবতর অভিজ্ঞতার অর্জনও বটে। গল্পকারের অনুসন্ধিৎসু ও সংবেদী চোখ ব্যক্তি-সমাজ-সময়কে অবলোকন করে গেছে আর বলে চলেছে সরল গল্পও, এমন কিন্তু নয়; বরং জীবনের প্রতি আশ্চর্য এক কৌতুকময়তা এবং মানবচরিত্রের সূক্ষ্ণ ও জটিল বিন্যাসকেও খুলে দিয়েছেন তাঁর গল্পের জমিনে।

এআর/১৮:৫০/৩০ সেপ্টেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে