Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.9/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৯-২৭-২০১৭

গল্পকার অদ্বৈত মল্লবর্মণ

মাসউদ আহমাদ


গল্পকার অদ্বৈত মল্লবর্মণ

মাত্র ৩৭ বছর বয়সে প্রয়াত হোন চিরকুমার অদ্বৈত মল্লবর্মণ, উত্তরাধিকারহীন। সময়ের জলছাপে মানুষ অদ্বৈতর পরিচয় তাই আড়াল হয়েছে। কিন্তু বংশের উত্তরাধিকার না-রাখলেও এমনকিছু তিনি রেখে গেছেন, মৃত্যুর ছয় দশক পরেও মানুষ তাঁকে প্রেম ও শ্রদ্ধায় সযত্ন স্মরণে রেখেছে; সোনার হরফে লেখা সোনালি মানুষের তালিকায় তাঁকে স্মরণে রাখবেও যতদিন বাংলা সাহিত্য বেঁচে থাকবে।
বাঙালি সমাজে যা হয়, ভিন্নমাত্রার প্রতিভার শিল্পীর বেঁচে থাকার কালে তাঁকে নিয়ে খুব কম ক্ষেত্রেই উচ্ছ্বাস বা মূল্যায়ন জোটে, বরং মেলে অসামান্য অনীহা। ফলে ‘পদ্মনদীর মাঝি’ বা ‘গঙ্গা’ নিয়ে যে স্তুতি ও উচ্ছ্বাস ধরা পড়ে, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ নিয়ে ঠিক ততটা বা কাছাকাছিও নয়। গভীরতর বোধের আলোয় তাঁকে আবিস্কারের চেষ্টা হয়নি।
অদ্বৈত মল্লবর্মণ সময়ের ঘা সয়ে এবং ডিঙ্গিয়ে নিজস্ব সৃষ্টির শিল্পবিভায় মূল্যায়নের কেন্দ্রে চলে এসেছেন। কিন্তু দুঃখ এই যে, জীবিতাবস্থায় এসবের কিছুই তিনি অবলোকন করে যেতে পারেননি।
১৯৫১ সালের ১৬ এপ্রিল মারা যান অদ্বৈত মল্লবর্মণ। মৃত্যুর পর, কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরিতে তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান হয়। এতে সভাপতি ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র; প্রেমেন ‘নবশক্তি’ পত্রিকায় অদ্বৈতর সহকর্মী ছিলেন, বলেন, ‘...খাঁটি সোনা ছিলেন অদ্বৈত। খাদ মেশাতে পারেননি বলে ভেঙ্গে গেছেন। খাঁটি সোনায় যেমন গয়না হয় না খাদ মেশাতে হয়, অদ্বৈত জীবনের বাস্তবের সঙ্গে সেই রকম কিছু উপাদান হয়ত মেশাতে পারেননি।’

প্রেমেন্দ্রের এই কথা থেকে অন্তর্মুখী স্বভাবের এবং আলাপচারিতায় অনভ্যস্ত অদ্বৈতর চরিত্র সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। চুপচাপ স্বভাবের মানুষ অদ্বৈত ‘দেশ’ পত্রিকায় নিবিষ্ট মনে কাজ করতেন। কাজের কথা ছাড়া অন্যকথা তেমন বলতেন না বলে জানিয়েছেন তাঁর সহকর্মীরা। বইপাগল মানুষ অদ্বৈত কলকাতার বেলেঘাটা এলাকায় একা থাকতেন, নিজে রান্না করে খেতেন স্টোভ জ্বালিয়ে। মৃত্যুর এত বছর পর, নিজের সৃষ্টিকর্মও বাঁচিয়েও রেখেছেন তিনি একাই, স্বমহিমায়। সাহিত্যের ইতিহাসে এই মহিমা হাতেগোনা কয়েকজন লেখকই দেখাতে পেরেছেন।
অদ্বৈত মল্লবর্মণ কালজয়ী লেখকের শিরোপা লাভ করেছেন তাঁর অসামান্য উপন্যাস তিতাস একটি নদীর নাম-এর কারণে; যদিও এটি ছাড়াও তাঁর আরও কটি উপন্যাস এবং নানাধরনের রচনা রয়েছে। উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি কবিতা-ছোটগল্প-শিল্পকলা-সঙ্গীত-ফোকলোরবিষয়ক প্রবন্ধ এবং অনুবাদের কাজও করে গেছেন।

জীবতাবস্থায়, সেসব রচনার বেশিরভাগই অগ্রন্থিত পড়ে থাকার বিবরণ মেলে। বহু কবি-সাহিত্যিক জীবদ্দশায় শুধু অবহেলিত নয়, অপমাণিত ও লাঞ্ছিত হয়ে সীমাহীন দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। এক্ষেত্রে বাংলার স্বভাব কবি গোবিন্দ দাসের কথা বলা যায়। জীবৎকালে অবহেলিত হলেও মৃত্যুর পরে অনেকের প্রতিভার স্বীকৃতি আসে।

আবার অনেকে, মৃত্যুর পরে আরও বিস্মৃতির অতলে হারিয়েও যান। অদ্বৈতর ক্ষেত্রে হয়ত তা ঘটেনি, একটি উপন্যাসই তাঁকে পাদপ্রদীপের আলোয় উজ্জ্বল করে রেখেছে। কিন্তু এই উপন্যাসটি ছাড়া, অদ্বৈতর অন্যান্য রচনা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। সে-কারণে তাঁর মতো একজন ব্রাত্য লেখকের সাহিত্যকমের্র বিস্তারিত পরিচয় পেতে মৃত্যুর পর, অন্তত পাঁচটি দশক অপেক্ষা করতে হয়েছে।

ছোটবেলায় অদ্বৈত পড়াশোনা করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এম.ই. স্কুলে। ১৯২৭ সালে সেখান থেকে স্কলারশিপ পেয়ে গ্রামের ছেলে অদ্বৈত ভর্তি হোন ব্রাহ্মণবাড়িয়া অন্নদা হাইস্কুলে।
সেই স্কুলে অদ্বৈতর একক্লাস উপরে পড়তেন সুবোধ চৌধুরী; পরে তিনি কলকাতায় লেখক ও অধ্যাপক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘...তের-চোদ্দ বৎসর বয়স থেকেই অদ্বৈতর কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ভালো ছাত্র হিসেবে তার নাম ছিল, কবি হিসেবেও অদ্বৈত রীতিমত খ্যাতি পেয়েছিলেন। তখন ‘সন্দেশ’ বন্ধ। কুমিল্লা অঞ্চলে শিশুকিশোর পত্রিকা যেত কিছু। অদ্বৈত তখন এসব প্রত্রিকায় কবিতা লিখতেন। এ সময় তিনি কয়েকবার পুরস্কারও পেয়েছেন।’’

সুবোধ চৌধুরী আরও বলেন, ‘...আমরা যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছাত্র তখন দুজনের প্রতিভার উন্মেষ ঘটে। বড়লোক উকিলের বাড়ির জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী আর দরিদ্র মালোর সন্তান অদ্বৈত মল্লবর্মণের। দুজনেই বেশ খ্যাতি পাচ্ছেন। জ্যোতিরিন্দ্র ছিলেন আমার চেয়ে এক বছরের উঁচু ক্লাসে পড়া ছাত্র। অদ্বৈত এক বছরের পরের।

অদ্বৈত লিখতেন কবিতা, জ্যোতিরিন্দ্র কখনও কবিতা লেখেননি। পরে অদ্বৈত হলেন সার্থক ঔপন্যাসিক। বুদ্ধদেব বসু ‘এক পয়সায় একটি গল্প’ সিরিজে তাঁর একটি গল্প ছেপেছিলেন। গল্পটি তখন বেশ খ্যাতি পায়। আরও কিছু গল্প তিনি লিখে থাকবেন।’
এই কথাগুলো উল্লেখের কারণ এই যে, অদ্বৈত বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন, সেই তথ্য তিতাস একটি নদীর নাম-এর সুনামের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে।

অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচনাসমগ্র-তে (অচিন্ত্য বিশ্বাস সম্পাদিত, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা; ফেব্রুয়ারি ২০১১) আমরা তাঁর ৫টি উপন্যাস, ৪টি ছোটগল্প, ৬টি কবিতা, ২৪টি প্রবন্ধ এবং কিছু চিঠিপত্রের সন্ধান পাই। ৪টি ছোটগল্প যথাক্রমে সন্তানিকা, কান্না, বন্দী বিহঙ্গ, স্পর্শদোষ; এখানে কেবল তাঁর কান্না গল্পটি নিয়েই কিছু কথা পাড়তে চাই।

উচ্চাকাঙ্খী বা নিরীক্ষাপ্রবণ গল্পলেখকের ক্ষেত্রে সাধারণত যা হয়ে থাকে, গল্পের মুখোশ তৈরি করতে গিয়ে অনেকসময় মুখশ্রী ঢাকা পড়ে যায়। গল্পের বিন্যাসভঙ্গিতে অধরা থেকে যায় জীবনের মাধুর্য-সুষমা। অভিঘাত। অদ্বৈতর গল্পে সেই মুখোশ তৈরির প্রবণতা নেই। আত্মিক সৌন্দর্যেই তাঁর গল্পের কাঠামো বা কলকব্জা নির্মিত হয়েছে। কান্না গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র গুরুদয়াল; গল্পের শুরুতে দেখা যায় তার পায়ে ব্যথা, হাঁটতে কষ্ট হয়; কিন্তু না হাঁটলে তার চলে না।

সকালবেলা বাড়ি থেকে সে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে, ফেরে দুপুরে বা সন্ধ্যায়; কোনো কোনোদিন ফেরেও না। আপন বলতে তার কেউ নেই, সংসারে একা মানুষ; স্বেচ্ছাচারি জীবনের অধিকর্তা সে। এ নিয়ে প্রতিবেশীরা নানান কথা বলে, সে গায়ে মাখে না। হঠাৎ সে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। কেউ তার খবর বলতে পারে না। গল্পের প্রথমে আমাদের জানা হয়ে যায়, গুরুদয়াল সন্যাসী টাইপের মানুষ লম্বা চুল-দাঁড়ি ও বেশভূষায়ও তা বিদ্যমান।

কিন্তু গল্পকার অদ্বৈত মল্লবর্মণ ধীরে ধীরে বাস্তবতার দেয়ালটি খুলে দেন। গুরুদয়াল আসলে বহুরূপী মানুষ এক। সময় ও পরিবেশভেদে সে তার চরিত্রের পেখম ছড়িয়ে দেয়। সন্যাসভাবটি তার চরিত্রের কৌশল মাত্র। বউ মরে যাওয়ার পর, সে নানানভাবে দিনযাপন করে।
এক প্রতিবেশীর ঠেসমারা বাক্যে গুরুদয়ালের চরিত্রটা এভাবে ধরা পড়ে ‘রেখে দে তোর ভ্রমণের আনন্দ। থাকতো বউটা আজ। এক এক-ঝাড়ায় উঠাতো আর এক মুখ-নাড়ায় বসাতো। অমন করে ঘুরে বেড়ানো তার সাধ্যি ছিল কি, বাড়ির উঠান থেকে পা বাড়ায়। আমি জানি গো, সব জানি, বউটা মরে যেতে না যেতেই।’
গুরুদয়াল কিছুটা আনমনা, বরং ঘোলাটে চরিত্রের মানুষ। শুরুতে গল্পকার জানান, এই জগতে তার আপন বলতে কেউ নেই; পরে বের হয়, একমাত্র পিসীমা ছাড়া। যে মানুষটিকে প্রায় সারাদিন বাড়িতে পাওয়াই যায় না, কিছুদিন সে নিরুদ্দেশও হয়ে যায়, তাই নিয়ে পাড়াপ্রতিবেশীর রংবেরঙের কত কথা। এবং একদিন, হঠাৎ সে ঘরকুনো হয়ে ওঠে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের অন্তরালে নিজেকে আড়াল করে নেয়।
অদ্বৈতর দূর-সম্পর্কীয় পিসী বলেন, ‘যাই বলো না কেন বড়-বউ, ছেলেটার জন্য ভারি কষ্ট হয় আমার। দিন দিন কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে। তবু তার ধর্মে মতি হয়েছে বলে আমার ভারি আনন্দ হয়। দেখিসনি, যতক্ষণ বাড়িতে থাকে কারো সঙ্গে কথাটি বলে না। সে আবার নাম জপ করে। কোনো গোঁসাইর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছে বুঝি!’

কিন্তু আদতে এ-ছিল তার নিপুণ অভিনয়। গল্পকার একটু পরেই গুরুদয়ালের কথা বলছেন এভাবে, ‘এখন সে সারাদিন ঘরে বসিয়া থাকে। ক্বচিৎ বাহির হয়। লোকে দূর হইতেই বলাবলি করে, মানুষটার ভাব-চরিত্র বোঝা ভার। পিসীমার আনন্দ আর ধরে না।’
এবং দেখা যায়, গুরুদয়ালের একটা সম্মানজনক অবস্থান তৈরি হয়, লোকে মান্য করে; এমনকি অনেকে ‘ঝুপ করিয়া মাথা নুয়াইয়া পায়ের ধুলাটাও লইয়া ফেলে।’

গুরুদয়ালের চরিত্রের পেখম আরো বিচিত্র-রূপ ধারণ করে, সে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তাতে অনেকে বিস্মিত হলেও পিসীমা এ-সংবাদ শুনে মা-মনসার চরণে একজোড়া কবুতর মানত করে। আপাত আমাদের মনে হয়, এ-এক সংসারত্যাগী মনুষ্য-সন্যাসীর গল্প। কিন্তু পরে, গল্পপাঠ এগুতে থাকলে, লেখক আমাদের টের পাইয়ে দেন, এটি নিখাঁদ এক প্রেমের গল্প! গুরুদয়াল তার মাথার চুল দশ-আনি ছ-আনি করে কাটায়, ধোপ দুরস্ত কাপড় পরে, একটু সুগন্ধ লাগায়। বউ মরাদের বাড়িঘরের কোনো শ্রী থাকে না। সে, বহুদিন পর, বাড়িঘরের শোভা-সৌন্দর্যের দিকে নজর দেয়।

জীবনের গভীর চৈতন্যে ঘা দিতে গেলে যে-আত্মলগ্ন নিঃশব্দ অনুসন্ধান প্রয়োজন, অদ্বৈতর গল্পে তার দেখা মেলে। তাঁর রচনাশৈলীর ইঙ্গিতময় অভীপ্সা ও প্রসাদগুণ তারই সাক্ষ্য দেয়। গুরুদয়ালের বিয়ের আয়োজন বেশ দ্রুতই এগিয়ে চলে। কদিন মাত্র বাকি, কিন্তু গুরুদয়ালের তর আর সয় না। দুদিন পর পর হবু শশুরের বাড়ি যাওয়া চাই। লোকজন এ নিয়ে কথাও শোনায়, সে ভ্রুক্ষেপ করে না। তবে শেষ পর্যন্ত বিয়ে টেকে না। ভেস্তে যায়।

কন্যার বাপ জানিয়ে দেন, মেয়ের বিয়ে অন্যত্র ঠিক করেছেন। গুরুদয়াল আবার নিরুদ্দেশে পাড়ি জমান। এবার সবাই স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছায় এ যাত্রায় হয় সে জলে ডুবে মরবে না হয় পাগল হয়ে বনে বনে কেঁদে ফিরবে। দিন যায়। মাস দুই না যেতেই গুরুদয়াল ফিরে আসে, একা নয় সস্ত্রীক।
সৌন্দর্যের একজাতীয় ঘ্রাণ থাকে, সবাই সেই অমীয়সুধা অনুভব করেন না। আর শিল্পীহৃদয়ও সবার মাঝে বাস করে না। শিল্পীর সংদেবনশীল মন অদ্বৈতর ছিল। মাত্র ৩৭ বছরের জীবন পেয়েছিলেন তিনি এবং তাঁর শিল্পমানস সেই সময়েই পরিপক্কতা লাভ করতে পেরেছিল। ছাত্রজীবনেই এক চিঠিতে তিনি তাঁর বন্ধুকে পরামর্শ দিয়ে লেখেন ‘সাধনা না করিয়া আত্মপ্রকাশ করিতে নাই। সাধনা যাহা করিবেন নীরবেই করিবেন। আগুন কখনো ছাই ঢাকা থাকে না।’

গল্পের একেবারে শেষে দেখা যায়, গুরুদয়াল কী একটা কাজে কোথাও বেরিয়েছে, লঞ্চে চড়ে। হঠাৎ সেই তরুণীর দেখা পেয়ে যায়, যার সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। লঞ্চে নানানশ্রেণির লোকজন, তবু মেয়েটিকে সে অবজ্ঞা করতে যেয়েও পারে না। তাদের কথাবার্তা হয় এমন 
তোমার কোথায় বিয়ে হয়েছে?
মেয়েটি বলে, বিয়ে হয়নি এখনো। তিন চার দিনের মধ্যেই হবে।
কোথায়?
চন্দনপুর।

ও:, সেই কানা আধবুড়োর সঙ্গেই তো? অবশেষে এই বরটাকেই পছন্দ হলো?
পছন্দের মালিক কি আমি? বাবা টাকা পাবে তাই তো
এবং তারপর ‘আহ্লাদি ঘোমটাটি আরও একটু টানিয়া দিল। গুরুদয়াল বুঝিল ইহা চোখের জল লুকাইবার চেষ্টা। অলক্ষ্যে তাহার চোখের পাতাও ভিজিয়া উঠিল।’
কিন্তু এই ভেজা চোখের গুরুদয়াল, তার পেছনের ইতিহাসের একটি তাজা অভিযোগ এই যে, বাড়িতে তার বউটি যে আছে, কারণে-অকারণে সে প্রায়ই বউটিকে ঠেঙ্গায়, দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বেচারিকে একেবারে নাজেহাল করে; যদিও বউ শব্দটিও করে না। সে এখন, যার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হয়নি, হতে পারতো; তার জন্য চোখের পানি বিসর্জন দিয়ে দিয়ে ফেলে!
গল্পের শেষে এসেও অদ্বৈত পাঠককে চমকে দেন, ঘটনার চমৎকারিত্বে। আহ্লাদি মেয়েটি তাকে দাওয়াত দিয়ে ফেলে, নিজের বিয়েতে। কিন্তু সে এড়িয়ে যায়, কাজের বাহানায়। পরক্ষণে মেয়েটি অভিনব প্রস্তাব দিয়ে বসে :একটা কথা বলব? শুনবে?
কী, বল।
এখনও সময় আছে। বিয়ের আরও দুদিন বাকি। তুমি যদি অমত না হও...
গুরুদয়াল তবু উৎসাহ দেখায় না, মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে; সে হয়তো জানেই না যে লোকটি বিয়ে করে বসে আছে! মেয়েটি শেষ মুহূর্তে অন্য পরিকল্পনার কথা ফাঁদে, বলে ‘এক কাজ করবে?’
কী, বল।

আমি কিছুতেই বুড়োকে বিয়ে করব না, বিয়ের রাতে তুমি যাবে। যা যা করতে হবে, সব আমি ঠিক করে রাখব।
গুরুদয়াল সংক্ষেপে শুধু বলে, হুঁ। 

যেদিন আহ্লাদি মেয়েটির বিয়ে হওয়ার কথা, গুরুদয়াল নানারকম কাজ করে। বউকে কাছে ডাকে, গভীর চোখে দেখে; আহ্লাদি মেয়েটির সঙ্গে বউয়ের তুলনা করে এবং সে নিজে একটু সাজগোজও করে। কিন্তু আহ্লাদি তাকে ফাঁকি দিয়ে বরের সঙ্গে চলে যায়। আড়ালে কতকিছু ঘটে গেছে, গুরুদয়াল টের পায় না। তা হোক, কিন্তু সুখনিদ্রা ভেঙে যাওয়ার পর, নিদারুণ ব্যর্থতায় দারুণ ক্ষুব্ধ হয় সে। ফলে বউকে বেদম পেটায়, প্রতিদিন। এবং কদিনের পিটুনিতে বউ মারা যায়।

আর এখানেও, আত্মীয়স্বজনকে তো বটেই, পাঠককেও অবাক করে দিয়ে গুরুদয়াল বউয়ের জন্য তার মৃতদদেহের পাশে বসে কপাল চাপড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। হিতৈষিরা সান্ত্বনা দেয়, তবু তার কান্না থামে না।
বোকা আত্মীয়-মেয়েদের কেউ কেউ বলতে থাকে, দেখেছিস কেমন মায়া! হাজার হোক স্বামী তো! দুঃখ হলে তারই তো হবে। 

ছোটগল্প এমন এক শিল্প যা উন্মুক্ত করে দেয় তার স্রষ্টাকেও। ছোটগল্পে কবিতার মতো অর্ধোস্ফুট আলোছায়া বা উপন্যাসের বিস্তৃতি নেই। কবিতায় হয় কী একটিমাত্র বাক্য বা স্তবক দিয়েই পাঠকমনে আলোড়ন ও বিমুগ্ধ করার প্রয়াস থাকে। কিন্তু ছোটগল্প একদম বেআব্রু করে দেয় লেখককে।
ফলে গল্পকারের প্রবণতা-মুন্সিয়ানা-কৌশল-দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যায়। কী করেন একজন গল্পকার তার গল্পে? গল্পকার আসলে গল্প নির্মাণের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিহৃদয়ের সুখ ও বেদনার গভীর-গোপন একান্ত কথার উন্মোচন করেন, বলেন  সমাজের কথাও। কখনো ব্যক্তির মনস্তত্ত্ব থেকে কলমকে নিয়তির দিকে নিয়ে যান। এসব ক্রমেই জীবনের পথে উদ্ভাসিত হয়। ব্যক্তির অভিলাস ও চোখের বুদবুদ শেষাবধি সমাজ অভিমুখিনই।

অদ্বৈতর গল্পে জীবনের সূতীক্ষ্ণ অনুভূতি, ক্লেদ, আকাঙ্খা-সংকট-সম্ভাবনাগুলো উঁকি দিয়েছে অভিজ্ঞতার শিল্পিত মাধুর্যে।

একেবারে শেষে এসে, গল্পের মধ্যে লেখককে আমরা ঢুকে পড়তে দেখি; তাতে কিছুটা অস্বস্তি জানান দেয়। যদিও তাতে গল্পের মাধুর্য বা প্রসাদগুণ ক্ষুন্ন হয় না। লোকেরা বলাবলি করে, আহা, গুরুদয়াল কত দরদী!
কিন্তু গল্পের অন্তর্যামী লেখক বলেন, ‘...কিন্তু দরদী সে মোটেই নয় তাহা আমরা জানি বলিয়াই ভাবিতে পারি, যদি এমন একটি দর্পণ থাকিত, যাহা দ্বারা তাহার মনের ভিতরটা স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো দেখা যায়, তবে প্রত্যেকেই বুঝিতে পারিত, গুরুদয়াল আঁখি জলে ভিজিয়া ভিজিয়া যেন বলিতে থাকে, মরিলে তো কিন্তু আর ক’টা দিন আগে কেন মরিলে না।’

অদ্বৈত শিল্পী হিসেবে অনুসন্ধিৎসু এবং সংবেদী। ব্যক্তি-সমাজ-সময়কে অবলোকন করে গেছেন সেই মন নিয়েই, বলেছেন সরল গল্পও এমন কিন্তু নয়। জীবনের প্রতি আশ্চর্য এক কৌতুকময়তা আর মানবচরিত্রের সূক্ষ্ণ ও জটিল বিন্যাসকেও খুলে দিয়েছেন তাঁর গল্পে। কান্না গল্পের শরীরে তেমন কারুকার্য ও বর্ণিল আলোছায়ার দেখা মেলে। কেবল গল্প বলাই নয়, শিল্পের স্বচ্ছতম গুণটিও তাঁর অনায়াসলব্ধ, বোঝা যায়।

লেখক যে-কেউ হতে পারেন। কিন্তু যিনি লেখেন, তিনিই লেখক নন। যেমন দলিল লেখক। কিংবা সাংবাদিকও লেখক নন। সাংবাদিক প্রতিদিন খবরের কাগজে রিপোর্ট ও প্রতিবেদন লেখেন। এসব থেকে একজন সৃজনশীল-লেখক অত্যন্ত মৌলিক এবং স্বতন্ত্র। সাংবাদিকের কাজে তেমন স্বাধীনতা থাকে না। তার হাতে থাকে ক্যামেরা। তারা ঘটনার হুবহু ছবি তোলেন এবং ক্যাপশন লেখেন।

কিন্তু একজন গল্পকারের হাতে থাকে রঙতুলি। গল্পকার, যা ঘটেনি ঘটতে পারত, তার লেখায় তা নির্মাণ করেন। সাংবাদিকতার পরাধীনতা এড়িয়ে গল্পকারকে কল্পনায়ক হওয়ারও প্রস্তুতি রাখতে হয়। অদ্বৈতর এই গল্পে সূতীক্ষ্ণ-অভিজ্ঞতাসিঞ্চিত সেই সম্ভাবনার আভাস পাই, শিল্পিত মাধুর্যে।
একটি সাক্ষাৎকারে দেশ-সম্পাদক সাগরময় ঘোষ বলেন, ‘...দেশ পত্রিকায় আরভিং স্টোনের ‘লাস্ট ফর লাইফ’ অনুবাদ করেছিলেন অদ্বৈত। সেই অনুবাদ দেশ-এ ধারাবাহিক ছাপা হয় ‘জীবন তৃষা’ নামে। এছাড়াও তিনি লিখেছিলেন কিছু ছোট ছোট লেখা। বিশেষ করে মনে পড়ছে তাঁর ‘সাগর তীর্থে’ বলে একটি রিপোর্টধর্মী লেখা। ‘সাগর তীর্থে’ পড়ার পর ভেবেছিলাম, তাঁকে দিয়ে একটি মৌলিক উপন্যাস লেখাব। সে পরিকল্পনা স্বার্থক হলো না। ক্ষয় রোগ নিয়ে গেল তাঁকে।’

মাসউদ আহমাদের জন্ম ৫জুন ১৯৮৫, রাজশাহীতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। লেখালেখির চেষ্টা অনেক দিনের।গল্প দিয়ে শুরু। মূলত ছোটগল্প লেখার চেষ্টা করেন। প্রথম আলো, সমকাল, কালেরকণ্ঠ, বাংলাদেশপ্রতিদিন, উলুখাগড়া, পাক্ষিক অন্যদিনসহ নানা পত্রিকায় গল্প প্রকাশিত হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে কলকাতার ‘দেশ’প্রত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, ‘পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন’ নামের গল্প। বইমেলা ২০১৬-তে প্রথম উপন্যাস ‘নিজের সঙ্গে একা’ এবং ২০১৭তে ‘রূপচানের আশ্চর্য কান্না’ উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। তিনি গল্প বিষয়ক ছোটকাগজ গল্পপত্র সম্পাদনা করেন। সর্বশেষ সংখ্যাটি ‘কথাসাহিত্যের সৈয়দ শামসুল হক’ শিরোনামে বেরিয়েছে, ডিসেম্বর ২০১৬তে; তারও আগে বেরিয়েছে ‘কথাসাহিত্যের জীবনানন্দ’ সংখ্যা।

এআর/১৯:৩৫/২৭ সেপ্টেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে