Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৯-১৩-২০১৭

মিয়ানমারে নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ চান ১২ নোবেলজয়ী

মিয়ানমারে নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ চান ১২ নোবেলজয়ী

ঢাকা, ১৩ সেপ্টেম্বর- মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়ে খোলা চিঠি লিখেছেন ১২ নোবেল জয়ীসহ ৩০ জন বিশিষ্ট বিশ্ব ব্যক্তিত্ব।

বুধবার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঢাকাস্থ ইউনূস সেন্টার থেকে পাঠানো এক বিবৃতির মাধ্যমে এই খোলা চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। চিঠিতে মিয়ানমার থেকে শরণার্থী প্রবাহ বন্ধ ও তাদের ফিরিয়ে নেওয়া, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান, জাতিসংঘের ট্রানজিট ক্যাম্প স্থাপন ও পীড়িত এলাকা পরিদর্শনসহ ৭ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর কারীদের মধ্যে রয়েছেন- নোবেল জয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, বেটি উইলিয়াম্স, মেইরিড মাগুইর, আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু, অসকার আরিয়াস সানচেজ, জোডি উইলিয়াম্স, শিরিন এবাদী, লেইমাহ বোয়ি, তাওয়াক্কল কারমান, মালালা ইউসাফজাই, স্যার রিচার্ড জে. রবার্টস ও এলিজাবেথ ব্ল্যাকবার্ন।

তাদের সঙ্গে স্বাক্ষরকারী বিশ্ব ব্যক্তিত্বরা হলেন- মালয়েশিয়ার প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ হামিদ আলবার, ইতালির প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, এমা বোনিনো, ব্যবসায়ী নেতা ও সমাজসেবী স্যার রিচার্ড ব্র্যানসন, নরওয়ের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী গ্রো হারলেম ব্রান্ড্টল্যান্ড, উদ্যোক্তা ও সমাজসেবী মো ইব্রাহীম, মানবাধিকার কর্মী কেরী কেনেডী, লিবীয় নারী অধিকার প্রবক্তা, এসডিজি সমর্থক আলা মুরাবিত, ব্যবসায়ী নেতা নারায়ণ মুর্তি, থাইল্যান্ডের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাসিত পিরোমিয়া, আসিয়ানের প্রাক্তন মহাসচিব সুরিন পিটসুয়ান, ব্যবসায়ী নেতা, এসডিজি সমর্থক পল পোলম্যান, আয়ারল্যান্ডের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ম্যারি রবিনসন,জাতি সংঘ সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশান্স নেটওয়ার্ক পরিচালক জেফরে ডি. সাচ, অভিনেতা ফরেস্ট হুইটেকার, এবং ব্যবসায়ী নেতা ও সমাজসেবী জোকেন জাইটজ, অভিনেত্রী শাবানা আজমি, কবি ও গীতিকার জাভেদ আখতার এবং পাকিস্তান মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান আসমা জাহাঙ্গীর।

খোলা চিঠিতে তারা তারা বলেন, রোহিঙ্গা সংকট পর্যালোচনার উদ্দেশ্যে নিরাপত্তা পরিষদের সভা আহ্বান করার জন্য প্রথমে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমরা আবারো মনে করিয়ে দিতে চাই যে, মিয়ানমারের রাখাইন এলাকায় মানবীয় ট্রাজেডি ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ যে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে- তার অবসানে আপনাদের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। আপনাদের এই মুহূর্তের দৃঢ়সংকল্প ও সাহসী সিদ্ধান্তের উপর মানব ইতিহাসের ভবিষ্যত গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক আক্রমণে শত শত রোহিঙ্গা জনগণ নিহত হচ্ছে জানিয়ে চিঠিতে আরো বলা হয়, লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। বহু গ্রাম সম্পূর্ণ জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে, নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, বেসামরিক মানুষদের নির্বিচারে আটক করা হচ্ছে এবং শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে।

আতংকের বিষয়, মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলোকে এই এলাকায় প্রায় একবারেই প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না, যার ফলে দারিদ্র পীড়িত এই এলাকায় মানবিক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। স্থানীয় সরকার সূত্রগুলোর মতে, গত দুই সপ্তাহে তিন লক্ষেরও বেশী মানুষ তাদের জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। মৃত্যুর মুখে নারী, পুরুষ ও শিশুদের এই ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসন থেকে সৃষ্ট পরিস্থিতি প্রতিদিন আরো খারাপ হচ্ছে।

চিঠিতে বলা হয়, সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি পেলে গত বছরের শেষে আমরা কয়েকজন নোবেল লরিয়েট ও বিশ্বের বিশিষ্ট নাগরিক এ বিষয়ে জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে আপনাদের নিকট অনুরোধ জানিয়েছিলাম। আপনাদের হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতির প্রেক্ষিতে নিরীহ নাগরিকদের উপর অত্যাচার বন্ধ এবং রাখাইন এলাকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবার জন্য আমরা আবারো আপনাদের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।

আমরা পরিস্থিতি মোকাবেলায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সম্ভাব্য সকল হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানাচ্ছি, যাতে নিরীহ বেসামরিক মানুষদের উপর নির্বিচার সামরিক আক্রমণ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়, যার ফলে এই অসহায় মানুষগুলোকে নিজ দেশ ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে এবং রাষ্ট্রহীন মানুষে পরিণত হতে না হয়।

মিয়ানমার সরকার যে যুক্তিতে রোহিংঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করছে তা একেবারেই আজগুবি। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে বার্মা স্বাধীন হবার পর এবং পরবর্তী বিভিন্ন সরকারের সময়কালে বার্মা তার সীমানাভুক্ত রোহিঙ্গাসহ সব জাতিগোষ্ঠীকে পূর্ণ নাগরিক বলে স্বীকার করে নেয় এবং সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্বও দেয়।

এটা আশ্চর্যজনক যে, ১৯৮০-র দশকে সেদেশের সামরিক শাসকরা হঠাৎ করেই আবিস্কার করে বসে যে, রোহিঙ্গারা বার্মিজ নয়। এরপর তারা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয় এবং তাদেরকে সে দেশ থেকে বিতাড়িত করার জন্য বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করে। শুরু হয় জাতিগত ও ধর্মীয় নিধনের উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গাদের উপর সুপরিকল্পিত নির্যাতন।

জাতিসংঘ মহাসচিব যথার্থই বলেছেন যে, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ দিনের ক্ষোভ ও অমীমাংসিত দুর্দশা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার একটি অনস্বীকার্য উপাদানে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের শাসকদের অবশ্যই সহিংসতার এই দুষ্ট চক্র বন্ধ করার দৃঢপ্রতিজ্ঞ সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং নিপীড়িত সকলের নিরাপত্তা ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার ২০১৬ সালে যে রাখাইন অ্যাডভাইজরি কমিশন গঠন করেছিল তার সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকারকে উদ্বুদ্ধ করতে আপনারা যেন জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন - সেজন্য আমরা আবারো আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি।

কফি আনানের সভাপতিত্বে গঠিত এই কমিশন - যার অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন মিয়ানমারের নাগরিক - রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান, অবাধ চলাচলের সুযোগ, আইনের চোখে সমান অধিকার, রোহিঙ্গাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যার অভাবে স্থানীয় মুসলিমরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং নিজ ভূমিতে ফিরে আসা মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের সহায়তা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছিল। মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর উপর জঙ্গিদের আক্রমণ এই আশংকাকেই সত্য প্রমাণিত করলো। স্থায়ী শান্তির জন্য গঠনমূলক ব্যবস্থা নেয়া না হলে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে যা পাশ্ববর্তী দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা নিম্নস্বাক্ষরকারীরা নিম্নলিখিত প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপগুলো সুপারিশ করছি:
১। আনান কমিশনের সদস্যদের নিয়ে অবিলম্বে একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা যার কাজ হবে কমিশনের সুপারিশগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন তত্ত্বাবধান করা।
২। দেশটি থেকে শরণার্থীর প্রবাহ বন্ধ করতে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ।
৩। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নিয়মিতভাবে পীড়িত এলাকাগুলো পরিদর্শন করতে আমন্ত্রণ জানানো।
৪। যেসব শরণার্থী ইতোমধ্যে দেশ ত্যাগ করেছে তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করা।
৫। ফিরে যাওয়া শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য জাতিসংঘের অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারে ট্রানজিট ক্যাম্প স্থাপন।
৬। বাস্তবায়ন কমিটির কর্তৃত্বে আনান কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান।
৭। রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অবাধে চলাফেরার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

খোলা চিঠিতে শান্তিতে নোবেল জয়ী ও বিশ্ব নেতারা আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এই ক্রমাগত সহিংসতা বন্ধ করতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কর্মপন্থায় সাহসী পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি। মিয়ানমার সরকারকে জানিয়ে দেয়া দরকার যে, সে দেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও অর্থায়ন রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমার সরকারের নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল।

অপপ্রচার, ঘৃণা ও সহিংসার উস্কানি বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র পরিচালিত সহিংসতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে, বৈষম্যমূলক বিভিন্ন নীতি ও আইন বাতিল করতে হবে এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিশ্ববাসী জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবিক সমস্যা সমাধানে তার ভূমিকা পালন করেছে- এটা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে।

আর/১০:১৪/১৩ সেপ্টেম্বর

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে