Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.8/5 (4 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৯-১৩-২০১৭

বাংলাদেশের বিপদ চিন্তার চেয়েও বড়

ফারুক ওয়াসিফ


বাংলাদেশের বিপদ চিন্তার চেয়েও বড়

মিয়ানমারে নতুন করে রোহিঙ্গা গণহত্যা শুরুর ১৫ দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সীমান্তের শরণার্থীশিবিরে সাহায্য দিতে যাওয়া অসাধারণ ঘটনা। প্রাথমিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর বাংলাদেশ যে মানবিক কর্তব্য পালনের দৃষ্টান্ত রেখেছে, তা ইতিহাস হয়ে থাকবে। মানবতার হাত মেলে রাখার এই উদারতা চালিয়ে যেতে হবে। দূরদর্শী হওয়ারও এখনই সময়। দাতা হলে শুধু হবে না, শান্তির নেতাও হতে হবে বাংলাদেশকে।

আমাদের জন্য যা মানবিক সমস্যা, অনেকের কাছে তা সামরিক সমস্যা। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের চলমান গণহত্যার জাতিগত ও ধর্মীয় কারণ তো আছেই। এসবের আড়ালে পাকিয়ে ওঠা ভূরাজনৈতিক ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে না পারলে আখেরে বাংলাদেশকেই মানবতার জন্য হাহাকার করতে হতে পারে।

ধর্মীয় ও জাতিগত বহু ফাটলরেখায় বিভক্ত মিয়ানমারের অস্তিত্বসংকট আরও প্রবল হয়ে উঠেছে বাণিজ্যিক বিশ্বায়ন এবং তার সহযোগী সামরিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে। শিল্পায়ন হয়নি দেশটিতে। কৃষিজ, খনিজ, গ্যাস, রত্ন ও কাঠ বিক্রি তাদের প্রধান আয়ের উৎস। এসবের বিনিময়েই চীনা ও পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থনে ৫০ বছরের সেনাতন্ত্র অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু এখন তাদের দরকার আরও বেশি।

রাখাইনের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলে অঢেল জ্বালানি সম্পদের খনি আছে। তার নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে চীন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র। ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের কাছে যে কারণে রাখাইন প্রদেশ গুরুত্বপূর্ণ, সেই একই কারণে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষের মনোযোগও এখানে। চীনের মিত্র হিসেবে রাশিয়া ও ইরানও তাই মিয়ানমারকে ছাড় দিয়ে চলেছে।

বিশ্বের দুই পরাশক্তি জোটের দ্বন্দ্ববিন্দুগুলো খেয়াল করলেই রাখাইন অঞ্চলে অশান্তির ভূরাজনৈতিক মাত্রাটা বোঝা যায়। এশিয়ায় চীনের পা রাখার জায়গাগুলো দেখুন: ইরান, সিরিয়া, আফগানিস্তান, উত্তর কোরিয়া, মিয়ানমার। এশিয়ায় বিআরআই প্রকল্পের যাত্রাপথও এসব দেশ।

এদের প্রত্যেকটির সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত জারি রেখেছে। এসব দেশে অশান্তি তৈরি করা গেলে চীনকে অগ্নিবলয়ে ঘিরে ফেলা সম্ভব। চীনকে দুর্বল করা মানে রাশিয়াকেও কোণঠাসা করায় এগিয়ে যাওয়া।

বলকান যুদ্ধের কথা মনে করুন। কীভাবে রাশিয়ার সীমান্তে যুদ্ধ নিয়ে যাওয়া হলো, বসানো হলো ন্যাটোর মিসাইল-প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। তার জন্য যুগোস্লাভিয়াকে কয়েকটি খণ্ডে ভাগ করেও শেষ হলো না, গণহত্যা হলো, আল-কায়েদাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো, বসনিয়া ও কসোভোয় গৃহযুদ্ধ হলো। ইরাক ও সিরিয়াতেও আমরা একই ধরনের জাতিগত ও সম্প্রদায়গত সংঘাতের সামরিকায়ন দেখতে পাচ্ছি।

চীনের সীমান্তে মিয়ানমার, মিয়ানমারের সীমান্তের প্রতিটি রাজ্যেই বিদ্রোহের আগুন। আর এসব রাজ্যের সীমান্তে ভারত ও বাংলাদেশ। মিয়ানমারের আগুন এখনই থামানো না গেলে আমেরিকান বার্নাড লুইসের সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বের বাস্তবায়নের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মিয়ানমারের রাখাইনে বৌদ্ধ বনাম মুসলমান, মধ্য ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খ্রিষ্টান বনাম বৌদ্ধ সংঘাত আরও তীব্র করার অপশক্তির অভাব নেই।

তা হলে বাংলাদেশের বৃহত্তর চট্টগ্রাম, ভারতের মণিপুর, আসাম, নাগাল্যান্ডও আক্রান্ত হবে। স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি বাইরে থেকেও আসতে থাকবে মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান যোদ্ধারা। এক আইএস সামলাতেই বিশ্ব পেরেশান। এ অঞ্চলে তিন বা চার জাতি ও সম্প্রদায়ের আইএসের উদয় হলে কী হবে, কল্পনা করা যায়?

এই হাইব্রিড সহিংসতা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিদ্বেষের দাবানল বইয়ে দিতে পারে। যার প্রধান শিকার হবে চীন; বাংলাদেশ ও ভারতও এর বাইরে থাকতে পারবে না। পরিণামে চীনের বৈশ্বিক অভিযাত্রা মুখ থুবড়ে পড়বে।

বলা বাহুল্য, চীন ও তার মিত্ররা তা হতে দিতে চাইবে না। যা-ই ঘটুক, আমাদের পরিচিত দুনিয়া আর আগের মতো থাকবে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ তো বটেই, অখণ্ডতা নিয়েও তাই ভয় আছে। এসব যে ঘটবেই তা নয়, কিন্তু দুনিয়ার অবস্থা দেখে আশঙ্কাটা থেকে যায়।

এ সমস্যা মোকাবিলার হাতল কিন্তু একটা আছে। তা হলো আসিয়ান। ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দশটি দেশ এর সদস্য। বাংলাদেশকে একসময় এর সম্মানিত সদস্য হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, দূরদর্শিতার অভাবে আমরা তা গ্রহণ করিনি।

যা হোক, রাখাইনে শান্তির বিষয়ে একটি প্রস্তাব এনেছেন আসিয়ানের সদ্যসাবেক মহাসচিব সুরিন পিতসুয়ান। ২০১২ সালের সহিংসতার পর তিনি বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ওপর চলছে অসহনীয় চাপ, যন্ত্রণা ও দুর্ভোগ। আসিয়ানসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই চাপ ও যন্ত্রণা দূর করতে না পারলে ১৫ লাখ রোহিঙ্গা চরমপন্থার দিকে যাবে। তা হলে মালাক্কা প্রণালি থেকে শুরু করে সমগ্র অঞ্চলটিই অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।’

মালাক্কা প্রণালি দুনিয়ার বাণিজ্যিক চলাচলের উল্লেখযোগ্য অংশ। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগ হলো এই প্রণালি। ভারত, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাঘা বাঘা অর্থনৈতিক শক্তি এই নৌপথের ওপর বিপুলভাবে নির্ভরশীল। এ অঞ্চল ঘিরে রয়েছে মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ জনসংখ্যার দেশগুলো।

খ্রিষ্টান ছাড়া বাকিদের প্রত্যেকেরই জনসংখ্যা শত কোটির ওপর। আবার ভারত মহাসাগরে সামরিক প্রাধান্য বজায় রাখা এবং এশীয় অঞ্চলে চীনকে হটিয়ে প্রাধান্য বিস্তার করা এখন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত উদ্দেশ্য ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মসূচি।

এই তিন দেশই এখানে নৌঘাঁটি করার উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। মিয়ানমারকে এত খাতির-তোয়াজেরও সেটাই কারণ।

সাবেক আসিয়ান মহাসচিব আরও লিখেছিলেন, ‘এই অঞ্চলটি সহিংসতার ঝুঁকিতে নিপতিত হলে আসিয়ান ও পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সহযোগিতামূলক সম্পর্কের ক্ষতি হবে।

ব্যাপারটির অনেক বৃহত্তর কৌশলগত এবং নিরাপত্তাগত পরিণাম রয়েছে।’ সুরিনের শেষ কথাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা মুসলমান ও বৌদ্ধদের মধ্যকার ধর্মীয় সংঘাত নয়, এটা নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়। আমাদের খুবই হুঁশিয়ার থাকতে হবে।’ (৩০ অক্টোবর, ২০১২, জাকার্তা পোস্ট)

৯ সেপ্টেম্বরে ব্যাংকক পোস্ট পত্রিকায় তিনি নতুন করে বলেছেন, ‘চিন্তা করুন, যদি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে চরমপন্থী মতাদর্শ বিস্তার লাভ করে, তাহলে মালাক্কা প্রণালির নিরাপত্তা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?’ জাতিসংঘের মহাসচিবও মনে করেন, রাখাইনের মানবিক বিপর্যয়ে শান্তি ও নিরাপত্তার হুমকি মিয়ানমার সীমান্তেই আটকে থাকবে না।

সুরিন পিতসুয়ান এশিয়ার বলকানাইজেশন ঠেকাতে আসিয়ানকে উদ্যোগী হওয়ার ডাক দিয়েছেন। তিনি ১৯৯৯ সালে পূর্ব তিমুরের শান্তিপ্রক্রিয়াকে মডেল ধরে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। সে সময় থাইল্যান্ড ছিল আসিয়ানের সভাপতি। থাই প্রস্তাবে ইচ্ছুক দেশগুলোকে নিয়ে শান্তিরক্ষী বাহিনী গঠন করে পূর্ব তিমুরে মোতায়েন করা হয়।

বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য যে সুরক্ষাবলয় বা সেফ জোন সৃষ্টির কথা বলেছে, তাঁর প্রস্তাব এর কাছাকাছি। তবে এ জন্য ভারত ও চীনকে রাজি করিয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

সেই কাজটা কে করবে? বাংলাদেশকে। ভারত ও চীনের মাঝে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব সকলই স্বীকার করে। রাখাইনে অশান্তি চীন ও ভারতের কাম্য হতে পারে না। বাংলাদেশ যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক এই দুই বৃহৎ প্রতিবেশীর সঙ্গে রাখছে, তার প্রতিদান আদায়ের এখনই সময়।

যে মানবিক দায় বাংলাদেশ পালন করছে, তাকে নিছক ধর্মীয় বা জাতিগত দৃষ্টিতে না দেখে এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ হিসেবে দেখতে হবে। মিয়ানমারের সাত লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় ও ত্রাণ দেওয়ার অধিকারবলে বাংলাদেশ এ প্রস্তাব জোরেশোরে তুলতে পারে।

আসিয়ানের সবাই না হলেও মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াকে পাশে পাওয়া যাবে। বিশ্বমঞ্চে এই শান্তিবাদী কর্তব্যপালনের দায় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সামনে। তিনি উখিয়ায় গিয়েছেন আশ্বাস নিয়ে। আশা করি, জাতিসংঘের আসন্ন অধিবেশনেও যাবেন সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে।

আর/০৭:১৪/১৩ সেপ্টেম্বর

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে