Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৯-০১-২০১৭

‘লীনা তাপসী খান-এর পিএইচ.ডি. গবেষণা-য় কুম্ভিলকবৃত্তি‘

সঞ্জয় রায়


‘লীনা তাপসী খান-এর পিএইচ.ডি. গবেষণা-য় কুম্ভিলকবৃত্তি‘

নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয় লীনা তাপসী খান (মহসীনা আক্তার খানম) প্রণীত ‘নজরুল-সঙ্গীতে রাগের ব্যবহার’ শীর্ষক একটি গ্রন্থ। গবেষণামূলক এ বইটির প্রতি পাঠকের আগ্রহ আরো বেড়ে যায় যখন বইটির ‘প্রাসঙ্গিক’-এ দেশের বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ড. রফিকুল ইসলাম লেখেন, ‘… তার এই গবেষণা কর্ম থেকে নজরুল-সঙ্গীতে রাগের ব্যবহার সম্পর্কে একটি বিশদ ধারণা পাওয়া যায়।’

পনেরোটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত ‘নজরুল-সঙ্গীতে রাগের ব্যবহার’ শীর্ষক গ্রন্থ অসংখ্য ভুল তথ্যে জর্জরিত। গবেষক দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘জয় নারায়ণ অনন্ত রূপধারী’ গানটির উল্লেখ করে রাগটি নজরুল-সৃষ্ট বলে উল্লেখ করেছেন এভাবে: ‘জয় নারায়ণ অনন্ত রূপধারী এ গানটিও নজরুল-সৃষ্ট নিশাশাখ রাগে সৃষ্ট’ (পৃষ্ঠা ১১)। অথচ আমরা জানি, বিষ্ণুপুর ঘরানার বিশেষ প্রচলিত এ রাগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও গান রচনা করেছেন (‘বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা’)। নজরুল রচিত গানটি নিশাশাখ রাগের হলেও রাগটি নজরুল-সৃষ্ট নয়। এটি কি ভুল না অজ্ঞতা? গবেষক তৃতীয় অধ্যায়ে ‘নজরুলের মূল গান ও ভাঙা গান’ শিরোনামে একটি তালিকা দিয়েছেন।

এ তালিকার ২ ক্রমিকে নজরুলের ভাঙা গান হিসেবে উল্লেখ করেছেন ‘এ কি তন্দ্রা বিজড়িত আঁখি’ গানটি। প্রকৃতপক্ষে গানটি নজরুল রচিত নয়, রচয়িতা হলেন তুলসী লাহিড়ী। গবেষক ‘কাজরী, ভজন ও শ্যামা সঙ্গীতে রাগের ব্যবহার’ শীর্ষক সপ্তম অধ্যায়ে লিখেছেন,‘থির হয়ে তুই ব’স দেখি মা …’ গানটি তাঁর নিজের সুর করা। গানটির শুরুর অংশে রাগ আশাবরীর ব্যবহার হয়ে রাগ বিলাবলের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়।’ প্রকৃতপক্ষে এই গানটি বাংলা কীর্তন গানে প্রচলিত মনোহরশাহী ঢঙের সুরে রচিত। এ গানের রাগ নির্দেশ করতে চাইলে একে বিষ্ণুপুর ঘরানায় প্রচলিত মিশ্র বিভাষ বলা যেতে পারে। এ ধরনের অজস্র ভুল তথ্যে আকীর্ণ এই গ্রন্থটি। গবেষক ত্রয়োদশ অধ্যায়ের নামকরণ করেছেন ‘নজরুল-সৃষ্ট কতিপয় রাগ ও বন্দিশ’।

এই শিরোনাম দৃষ্টে পাঠক বিভ্রান্ত হয়ে ধরে নিতে পারেন যে, রাগ সৃষ্টি ছাড়াও নজরুল বেশ কিছু বন্দিশ রচনা করেন। প্রকৃত ঘটনা হলো এই অধ্যায়ে স্বরলিপিসহ উল্লিখিত বন্দিশগুলোর রচয়িতা পশ্চিমবঙ্গের নজরুল গবেষক শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নজরুল নন। এছাড়া শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রচিত ‘নজরুল-সৃষ্ট রাগ ও বন্দিশ’ গ্রন্থের ১৬৯ পৃষ্ঠা থেকে ১৯৪ পৃষ্ঠা পর্যন্ত মোট ২৬ পৃষ্ঠা কোনো প্রকার গ্রন্থ-ঋণ স্বীকার ব্যতিরেকে স্ক্যান করিয়ে উক্ত অধ্যায়ে সন্নিবেশিত করে কেবল সহায়ক গ্রন্থাবলীতে গ্রন্থটির নামোল্লেখ করা হয়েছে, যা ন্যায়সঙ্গত নয়।

‘নজরুল রচিত ভাঙা খেয়াল ও ফৈয়াজ খাঁর মূল বন্দিশ’ শীর্ষক চতুর্দশ অধ্যায়েও একই ধরনের কুম্ভিলকবৃত্তির প্রকাশ লক্ষ করা যায় আরো বৃহৎ কলেবরে। এই অধ্যায়ের ১৯৭ পৃষ্ঠা থেকে ২৪৪ পৃষ্ঠা পর্যন্ত মোট ৪৮ পৃষ্ঠা কাকলী সেন প্রণীত ‘ফৈয়াজী আলোকে নজরুল-গীতি’ শীর্ষক গ্রন্থ থেকে হুবহু স্ক্যান করা যা গ্রন্থেও পরিশিষ্টাংশে যেতে পারে, মূল টেক্সটের ভিতরে নয়। নজরুল ইন্সটিটিউট প্রকাশিত ‘নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি’ গ্রন্থমালা থেকে অন্তত ৩০টি গানের সম্পূর্ণ স্বরলিপি স্ক্যানিং করানোর পর মুদ্রণ করে অযথা বইয়ের কলেবর বৃদ্ধি করা হয়েছে।

এটাকে কি পিএইচ.ডি. গবেষণা বলে? এগুলো বড় জোর পরিশিষ্টে ব্যবহার করা যেত। এই গ্রন্থটির সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হলো গ্রন্থটিতে রাগসুর নির্দেশিত নজরুল-সঙ্গীতের কোনো তালিকাই নেই। অথচ গ্রন্থের নামকরণ করা হয়েছে ‘নজরুল-সঙ্গীতে রাগের ব্যবহার’। এই পিএইচ.ডি. থিসিসে নজরুল-সঙ্গীতে রাগের ব্যবহারের আলোচনায় পাঠককে অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে হবে, কেউ কোনো আলোর সন্ধান পাবেন, এ ধরনের আশা করা নিরর্থক। তাহলে এই থিসিসের মাধ্যমে কীভাবে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হলো তা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়।

খুবই জানতে ইচ্ছে করে এই গবেষকের তত্ত্বাবধায়ক এবং পরীক্ষক কে কে ছিলেন? তাঁরা কি কোনো কিছুই দেখেননি! না দেখতে চাননি! সরকারি প্রতিষ্ঠান নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে কীভাবে প্রকাশের অযোগ্য নিম্ন মানের এই পাণ্ডলিপিটি প্রকাশিত হলো? আমরা অবাক ও বিস্মিত হই যখন দেখি ড. রফিকুল ইসলামের মতো একজন স্বনামধন্য গবেষক কোনো বিচার বিশ্লেষণ ছাড়াই গ্রন্থের ‘প্রাসঙ্গিক’-এ লেখেন: ‘নজরুল-সঙ্গীতে যে সকল প্রচলিত, অপ্রচলিত দক্ষিণ ভারতীয় এবং নজরুল-সৃষ্ট রাগ ব্যবহৃত হয়েছে তার একটি সামগ্রিক চিত্র ফুটে উঠেছে।’

গবেষকের পিএইচ.ডি. থিসিসের অধিকাংশ পৃষ্ঠা (২৭৮ পৃষ্ঠার মধ্যে ১৫০ পৃষ্ঠা) অন্যের বই থেকে কুম্ভিলকবৃত্তির মাধ্যমে সরাসরি স্ক্যান করানো এবং অবশিষ্ট পৃষ্ঠাগুলোর অধিকাংশই ভুল তথ্যে ভরা। সেই অভিসন্দর্ভ কীভাবে ডিগ্রি পায়, এবং প্রকাশিত হয় আবার তা জাতীয় পুরস্কারও পায়, সেই প্রশ্নের জবাব দেবে কে ? আরো ভয়াবহ বিষয় এদেঁর খেয়াল-খুশির কাছে দীর্ঘদিন বন্দি নজরুল ইনস্টিটিউট। বিটিভিসহ টেলিভিশন-বেতারের নজরুলের সকল অনুষ্ঠানের কল-কাঠিও তাঁরাই সাধ্যমতো নাড়ান।

আর/১০:১৪/০১ সেপ্টেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে