Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (9 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৮-২৯-২০১৭

একাত্তরের ২৯ আগষ্ট: আত্মত্যাগী রুমী যে রাতে ধরা পড়লেন

ফরিদা ইয়াছমিন


একাত্তরের ২৯ আগষ্ট: আত্মত্যাগী রুমী যে রাতে ধরা পড়লেন

২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্ব হয়ে পড়েছিল স্তম্ভিত ও বিস্মিত। পরবর্তী সময়ে হামলাকারীদের পরিচয় এই বিস্ময়ের মাত্রা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।

কেননা, এদের মধ্যে কয়েকজন ছিল ঢাকার নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করা উচ্চশিক্ষিত, মেধাবী তরুণ, যাদের মেধা, মননে সমৃদ্ধিশালী হওয়ার কথা ছিল এ দেশের।

বিপথগামী সেসব তরুণের কাছে একটা জিজ্ঞাস্য ছিল যে তারা কি কখনো শোনেনি তাদেরই বয়সী সেসব তরুণের কথা, যাঁরা ১৯৭১ সালে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন দেশমাতাকে পাকিস্তানি হায়েনাদের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য? সুশৃঙ্খল ও অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁরা যেভাবে যুদ্ধ করেছিলেন, তা ছিল রীতিমতো অবিশ্বাস্য।

৪৬ বছর আগে সেই তরুণদের মধ্যে ছিলেন রুমী, বদি, আজাদ, জুয়েল, বকর, হাফিজ এবং নাম না জানা আরও অসংখ্য তরুণ, যাঁদের লাশ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সেই সব বীর মুক্তিযোদ্ধার অসমসাহস, বীরত্ব, আত্মত্যাগ, অগণিত শহীদের রক্ত এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সীমাহীন ত্যাগ ও সংগ্রামের ভেতর দিয়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই স্বাধীনতা।

এমনই এক সাহসী ও আত্মত্যাগী তরুণ, যাঁর সামনে ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি, ১৯৭১ সালে আমেরিকার ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (আইআইটি) ভর্তির সুযোগ পেয়েও সেখানে পড়তে যাওয়ার পরিবর্তে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। স্বাধীনতার জন্য আত্মোত্সর্গীকৃত তরুণটি ছিলেন প্রকৌশলী শরীফ ইমাম ও জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠ সন্তান শাফী ইমাম (রুমী), বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী।

তাঁর জন্ম ১৯৫১ সালের ২৯ মার্চ। মা-বাবার সুযোগ্য পরিচালনা ও নির্দেশনায় গড়ে ওঠা স্পষ্টভাষী, সাহসী ও দৃঢ় চিত্তের রুমী পরিণত হন তারুণ্যের প্রতীকে। দেশপ্রেমিক মা-বাবার সন্তান হিসেবে রুমীও খুব কম সময়ে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আদর্শ নিজের মধ্যে আত্মস্থ করে ফেলেন।

সব শাস্ত্রে ছিল তাঁর গভীর জ্ঞান। মেধাবী ছাত্র রুমী ১৯৭০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে স্টার মার্কস পেয়ে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ইতিমধ্যে আমেরিকার আইআইটিতে তাঁর ভর্তি সম্পন্ন হয়। সবকিছু সুন্দরভাবেই চলছিল।

১৯৭১-এর ২৫ মার্চের কালরাতে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা অত্যন্ত ঘৃণিত ও মানবতাবর্জিত পন্থায় সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে ঘুমন্ত, নিরীহ ও নিরস্ত্র জনগণের ওপর নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। বর্বরতম ও নির্মম গণহত্যার প্রতিবাদে সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িয়ে পড়া ছাড়া বাঙালিদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না, তাঁরা মিলিত হয়েছিলেন মুক্তির অভিন্ন মোহনায়।

দেশের এই চরম সংকটকালে রুমী আমেরিকায় পড়তে যাওয়ার পরিবর্তে মুক্তিযুদ্ধে নিবিড়ভাবে জড়িত থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং মাকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতিদানের জন্য রাজি করান এই বলে, ‘আম্মা, দেশের এই রকম অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তাহলে আমার বিবেক চিরকালের মতো অপরাধী করে রাখবে আমাকে।

আমেরিকা থেকে হয়তো বড় ডিগ্রি নিয়ে এসে বড় ইঞ্জিনিয়ার হব; কিন্তু বিবেকের ভ্রুকুটির সামনে কোনো দিনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। তুমি কি তাই চাও, আম্মা?’ রুমীর সঙ্গে তর্কে না পেরে মা জাহানারা ইমাম তাঁকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেন। রুমী ১৪ জুন প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের মেলাঘরের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন।

প্রশিক্ষণ শেষে আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে অন্য গেরিলাযোদ্ধাদের সঙ্গে রুমী ঢাকায় প্রবেশ করেন এবং ক্র্যাক প্লাটুনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে গেরিলা অপারেশনে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। তবে তিনি খুব তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে যান। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই রুমী ঢাকায় সংঘটিত অপারেশনে অনেক বেশি সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ২৫ আগস্টের অপারেশন।

১৯৭১ সালের ২৫ আগস্ট রুমী আরও পাঁচজন গেরিলাসহ ধানমন্ডির ১৮ নম্বরে দুর্ধর্ষ গেরিলা অপারেশন সম্পন্ন করেন। সে অপারেশনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পাকিস্তানি সেনা হত্যার পর পলায়নকালে পাকিস্তানি আর্মিদের একটি জিপ তাঁদের গাড়িকে অনুসরণ করলে রুমী তাঁর স্টেনগানের বাঁট দিয়ে পেছনের কাচ ভেঙে ফায়ার করলে জিপের চালক গুলিবিদ্ধ হয়, ফলে জিপটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। রুমীর প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের কারণে সেদিন সব গেরিলাযোদ্ধার জীবন রক্ষা পায়।

এ ঘটনার পর নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে ২৯ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ক্র্যাক প্লাটুনের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গেরিলাযোদ্ধা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। সেই কালরাত প্রসঙ্গে জাহানারা ইমাম বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৯ আগস্টের সেই ভয়াল রাত্রির কথা মনে পড়ে।

পাকিস্তানি হানাদার গভীর রাতে আমার বাসায় এসে রুমীকে ধরে নিয়ে যায়। কথা ছিল ফিরিয়ে দেওয়ার, কিন্তু দেয়নি। স্পষ্ট মনে পড়ে সেই নিষ্পাপ, শান্ত, উদীয়মান এক যুবকের কঠিন দেশপ্রেমের ধীরস্থির মুখচ্ছবি।’

কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে রুমী তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের কোনো কিছু স্বীকার করতে নিষেধ করে দেন এবং সমস্ত দায়ভার নিজের ওপর নেন। এই দায়ভার গ্রহণের ভয়াবহ পরিণতির কথা সহজেই অনুমেয়। রুমী জানতেন, শত্রুর হাতে ধরা পড়ার পর কী কী উপায়ে তাঁদের টর্চার সহ্য করে নেওয়া যায়, কী কী পন্থায় টর্চার সহনীয় করে মুখ বন্ধ রাখা যায়। কারণ, তিনি তাঁর নিজস্ব লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত বই থেকে লব্ধ জ্ঞানের আলোকে আগে থেকেই নিজেকে মানসিকভাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গড়ে নিয়েছিলেন।

অমানুষিক নির্যাতনের পর পরিবারের অন্য সদস্যদের দুই দিন পর ছেড়ে দেওয়া হলেও রুমী আর ফিরে আসেননি, যেমন আসেননি ফিরে আলতাফ মাহমুদ, বদি, জুয়েল, আজাদ, বকর, হাফিজসহ আরও অনেক নাম না জানা বাংলার সূর্যসন্তানেরা।

পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরার পড়ার কিছুদিন আগে রুমী তাঁর মাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খালেদ মোশাররফ কী বলেন, জানো? তিনি বলেন, কোনো স্বাধীন দেশ জীবিত গেরিলা চায় না; চায় রক্তস্নাত শহীদ। অতএব মামণি, আমরা সবাই শহীদ হয়ে যাব-এই কথা ভেবে মনকে তৈরি করেই এসেছি।

আইআইটি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি নেওয়া হয়নি রুমীর, কিন্তু মাকে বলা সেক্টর কমান্ডারের বাণী প্রতিফলিত হয়েছিল তাঁর জীবনে। আর তাই রুমীকে নিয়ে স্মৃতিকথায় জাহানারা ইমাম লিখেছিলেন, ‘রুমী ১৯৭১ সালে ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেনি, তবে কিছু একটা হয়েছিল। সে দেশের জন্য শহীদ হয়েছিল।’

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে