Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৮-২৪-২০১৭

আইটেম গানের নামে অশ্লীলতার জোয়ারে ভাসছে ঢালিউড

সাকিব আল রোমান


আইটেম গানের নামে অশ্লীলতার জোয়ারে ভাসছে ঢালিউড

ঢালিউড যে আবারও অশ্লীলতার দিকে ঝুঁকছে ‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা’ ছবিটির মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সত্যিই কি মধু, না বিষ প্রশ্ন সবার মনেই!– বিজ্ঞাপনের কল্যাণে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান ‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা’ সারাদেশে বেশ সাড়া ফেলেছে।

একই নামে নির্মিত সিনেমায় আইটেম গান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা’, যার ভিডিও ইউটিউবে প্রকাশের পর চারদিক থেকে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। কয়েক বছর আগে বাংলা সিনেমা অশ্লীলতায় ভরপুর ছিল।

তবে সেখান থেকে ধীরে ধীরে যখন ‘মার্জিত’ চলচ্চিত্রের দিকে যখন হাঁটছিল ঢালিউড, তখন সিনেমা হলে দেখা গেল দর্শক খরা। কিন্তু তারপরও পিছপা হয়নি। বর্তমানে সিনেমা হলে কিছু হলেও দর্শক ফেরানো সম্ভব হয়েছে। আর ঠিক সেসময় এমন ‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা’ ও ‌'মার ছক্কা' ছবির মুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চলচ্চিত্রপ্রেমীরা।

কদিন পর পরই ছন্দ-বদল হয় ঢাকাই সিনেমায়। যখন যে জোয়ার আসে, সেই জোয়ারেই ভেসে যায় ঢালিউড। আরও বেশি খোলামেলাও চলছে বেশ। চলচ্চিত্রে ফের অশ্লীলতা ফিরেছ কিনা- এমন সংশয়ও প্রকাশ করছেন অনেকে। ভারতের অনুকরণে প্রথম দিকে দেশীয় চলচ্চিত্রে রুচিশীল কিছু গান তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে এ আইটেম গান এখন অশ্লীলতার পর্যায়ে চলে গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ের অধিকাংশ চলচ্চিত্রের আইটেম গানের নায়িকারা প্রায় নগ্ন অবস্থায় ক্যামেরার সামনে দাঁড়াচ্ছেন। এমন কি সুস্থ বিনোদনমূলক চলচ্চিত্র নির্মাণের দাবিকারীরাও আইটেম গানের মাধ্যমে খোলামেলা দৃশ্যের আশ্রয় নিচ্ছেন। আইটেম গানে অভিনয় করার জন্য এমন কিছু অভিনেত্রীর আবির্ভাব ঘটেছে, যারা বিদেশের ডিস্কো কিংবা ক্যাবারে নর্তকীদেরও হার মানাচ্ছেন।

প্রযোজকদের চাহিদার কারণে অনেক সুস্থ ধারার পরিচালকও এ ধরনের নৃত্যের ছবি অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাই সাম্প্রতিক সময়ের নৃত্যরূপী চলমান অশ্লীলতা রোধ করতে না পারলে এ শিল্পটি আবারো গভীর সংকটের মধ্যে পড়বে বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া নায়িকারাও হর হামেশা সোশ্যাল মিডিয়ায় খোলামেলা ছবি পোস্ট করছেন।

আইরিন, আঁচল, পরী মনিসহ সমসাময়িক প্রায় সব নায়িকার খোলামেলা ছবি এখন ফেসবুকে পাওয়া যায়। এতে মন্তব্যের ঘরে কেউ কেউ মজা করে লিখছেন আমাদের নায়িকারা বেশ সাহসী হয়ে উঠছেন। আবার কারো মন্তব্য এভাবে চলতে থাকলে আমাদের সিনেমা সেই অশ্লীলতার যুগেই ফিরে যাবে। সম্প্রতি হলিউড বলিউড এবং টালিউডের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে এখন আমাদের দেশের চলচ্চিত্রেও ঢুকে পড়েছে অশ্লীলতা নামের ভয়ানক বীজ । খোলামেলা দৃশ্যে অভিনয় করলেই নাকি নায়িকা সাহসী! অনেক নায়িকাকেই বলতে শোনা যায় চরিত্রের প্রয়োজনে অভিনয়ে খোলামেলা হতে আপত্তি নেই।

ঢাকাই চলচ্চিত্রে একটা অশ্লীলতার যুগ ছিল। এ নিয়ে অনেক আন্দোলন ও সমালোচনাও হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ময়ূরী, মুনমুন, পলিসহ বেশ কয়েকজন অশ্লীল নৃত্যের নায়িকাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরপর অশ্লীল নৃত্যের ধারাটা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসে। কিন্তু কিছুদিন ধরে ‘আইটেম গান’-এর মধ্যদিয়ে আবারো চলচ্চিত্রে অশ্লীল নৃত্যের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে।

ইদানীং কোনো বাণিজ্যিক ছবিই অশ্লীল ধারার আইটেম গান ছাড়া নির্মিত হচ্ছে না। প্রযোজক-পরিবেশকদের ধারণা হয়ে দাঁড়িয়েছে, চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হলে আইটেম গান রাখতেই হবে। তা না হলে ছবি নাকি ব্যবসা সফল হবে না! তাই নির্মাতারাও ব্যবসার কথা ভেবে চলচ্চিত্রে ধুমধাড়াক্কা আইটেম গানের বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু এসব আইটেম গানের নামে অনেকেই নীরবে চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার চর্চা শুরু করেছেন।

যদিও বিশ্লেষকরা বলেন, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকতে লাগে অভিনয় গুণ। খোলামেলা হলেই টিকে থাকা যায় না। বরং অভিনয়ের প্রতি আস্থা কম থাকলে এ ধরনের কথা বলে অনেকেই আলোচনায় আসতে চান। ঢাকাই চলচ্চিত্রেও ইদানিং ‘সাহসী’ হয়ে উঠার সেই প্রবণতা বেড়েছে আশংকাজন হারেই ।

ইদানিংকালে ঢাকাই চলচ্চিত্রে ‘আইটেম সং’ ব্যবহারের প্রবণতা ব্যাপক হারে বেড়েছে। বাজেট যেমনই হোক চলচ্চিত্র আইটেম গান থাকাটা যেনো বাধ্যতামূলক। এখন দেখার বিষয় পরিচালক-প্রযোজক যে উদ্দেশ্যে চলচ্চিত্রে ‘আইটেম সং’ রাখছেন সে উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে কিনা। আমার স্মৃতি যদি বেঈমানী না করে তাহলে যতোদূর মনে পড়ে ঢাকাই চলচ্চিত্র শুধু মাত্র ‘আইটেম সং’ এর জন্য চলচ্চিত্র হিট হয়েছে এমন কোন নজির নেই। বরং সেটি ব্যবসা করতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়েছে ।

মূলত পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ‘আইটেম সং’ সংস্কৃতি(!) আমাদের চলচ্চিত্র প্রবেশ করছে। কারন এমন দেখা যায় তাদের দেশের চলচ্চিত্র ‘আইটেম সং’ এর জোরে ব্যবসায়িক সফলতা পেয়েছে। এখন কথা হলো, আমাদের সংস্কৃতির সাথে ওদের সংস্কৃতি গুলিয়ে ফেললে হবে না। ওদের সংস্কৃতি যেখানে বিকিনি আর যৌন দৃশ্যের বৈধতা দেয়, সেখানে আমাদের সংস্কৃতি এর ঘোর বিরোধী।

‘আইটেম সং’ এ সাধারনত আমরা দেখতে পাই কথিত ‘আইটেম গার্ল’ স্বল্প বসনা গায়ে জড়িয়ে আশ্লীল অঙ্গভঙ্গি দেয় এবং সেই সাথে আশালীন কথা গুলোকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ছন্দের তালে গান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আর চিত্রগ্রাহকরা আইটেম গার্ল এর শুধূ মাত্র শরীর ধারণ করে, যা পরবর্তীতে পর্দায় দেখা যায়। যেসব দেখিয়ে তরুণ দর্শকদের একপ্রকার ঝাঁকি দিতে সফল হন পরিচালকরা। সেই ঝাঁকিতে তারা পর্দায় আইটেম গার্লের শরীরের স্পর্শকাতর জায়গায় লেজার লাইট মারতে দেখা যায়।

কিন্তু আমি/আপনি যখন পরিবার নিয়ে চলচ্চিত্রটি দেখতে যাব কোন এক ছুটির দিনে তখন যদি দেখেন সিনেমার কাহিনী সুন্দরভাবে এগোনোর এক পর্যায়ে অশ্লীল ‘আইটেম সং’ হাজির তখন আপনি কি করবেন? নিশ্চই হল থেকে বেরিয়ে যাবেন এটাই স্বাভাবিক। তাহলে এখন যদি সিনেমাগুলো শুধু তরুণদের টার্গেট করে নির্মাণ করা হয় তখন আমাদের পরিবার ‘ড্রয়িং রুম’ নির্ভর হয়ে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। হয়তো আমাকেও এক সময় তাই করতে হবে। কেননা আমিতো পারবো না লেজার লাইট মারতে আর পতিতাদের নিয়ে সিনেমা দেখতে।

অশ্লীল ছবির ব্যাপারে সরকার কড়াকড়ি আরোপ করলেও চলতি বছরের প্রথম ছবিটির বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠে অশ্লীলতার। আজাদ খান পরিচালিত ‘দাবাং’ ছবির পোস্টার ও বিভিন্ন দৃশ্য নিয়ে খোদ চলচ্চিত্র মহলেই উঠেছে সমালোচনার ঝড়। ছবিটির অন্যতম নায়ক জায়েদ খানও এ নিয়ে বেশ বিব্রত বলে জানিয়েছিলেন সে সময়।

একটি জাতীয় দৈনিককে দেয়া সাক্ষাতকারে জায়েদ খান সে সময় বলেন, ‘সাধারণত ছবি মুক্তির আগে আমি নিজে থেকে নানা ধরনের প্রচারণার মধ্যে থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু ‘‘দাবাং’’ ছবিটির মুক্তি নিয়ে আমার মধ্যে কোনো ধরনের আনন্দ কাজ করেনি; বরং ছবিটির মুক্তি নিয়ে আমি বেশ অস্বস্তিতে ছিলাম। বলতে পারেন, আমি বেশ বিব্রতও।’

সিনেমার আইটেম গানে নৃত্য পরিবেশনরত এক শিল্পীবিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে সঙ্গীত ও নৃত্যের ভূমিকা অপরিহার্য। তাই চলচ্চিত্রের সঙ্গে নৃত্য ও গানের ওতপ্রোত সম্পর্ক বিরাজমান রয়েছে। কিন্তু দেশীয় চলচ্চিত্রে অশ্লীল নৃত্য প্রদর্শনের বিষয়টি দিনকে দিন বেড়েই চলছে। এ কারণে সপরিবারে ছবি দেখার অবস্থা নেই বললেই চলে। চলচ্চিত্রের দর্শক বাড়ানোর জন্য ইদানীং প্রতিটি ছবিতে ‘আইটেম গান’ নামের অশ্লীল নৃত্য রুচিশীল দর্শককে হতাশ করছে।

শুটিং স্পটে যারা এই নৃত্য দেখেছেন তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ যেন নাচ নয়, আইটেম গানের নামে নায়িকার শরীর দেখানোই এর মূল উদ্দেশ্য ছিল। অশ্লীল নৃত্যের সঙ্গে এতে কুরুচিপূর্ণ গানের কথাও ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব গান রুচিশীল কোনো দর্শক মুখে উচ্চারণ করতেও লজ্জাবোধ করবেন। এ ধরনের আইটেম গানের ছবি একবার কোনো দর্শক সপরিবারে দেখলে, দ্বিতীয়বার আর হলমুখী হবেন না।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, রাস্তায় সিনেমার যে পোস্টার দেখি তাতেই সিনেমাটি দেখার আগ্রহ চলে যায়। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতাকে মেনে এ দেশের সিনেমা নির্মাণ হওয়া উচিত।

মূলত ২০১৩ সালে ‘দেহরক্ষী’ ছবির মধ্যে দিয়ে ঢাকাই ছবিতে ‘আইটেম গান’ নামের অশ্লীল নৃত্য পরিবেশন শুরু হয়। আর যেন পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি অশ্লীল ছবির নির্মাতাদের।

দেশীয় চলচ্চিত্রে লাগামহীনভাবে আইটেম গান কেন ব্যবহার করা হচ্ছে, তা জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নির্মাতা বলেন, ‘আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বাণিজ্যিক ছবিগুলোতে নিয়মিত আইটেম গান ব্যবহার করা হচ্ছে। এ দেশের সিংহভাগ দর্শকই ভারতীয় চলচ্চিত্র দেখেন। তাই এসব দর্শককে দেশীয় ছবি দেখতে আগ্রহী করার জন্য ঢাকাই ছবিতে আইটেম গান ব্যবহার করা হচ্ছে।’

চলচ্চিত্রে এখন যারা এ ধরনের নৃত্য পরিবেশন করছেন তাদের ‘আইটেম গার্ল’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। বর্তমানে আইটেম গার্লদের মধ্যে জনপ্রিয়তার কাতারেও অনেকেই দাঁড়িয়ে গেছেন। এ তালিকায় রয়েছেন- নায়লা নাঈম, বিপাশা কবির, সাদিয়া আফরিন, শিরিন শিলা প্রমুখ।

অন্যদিকে, নায়িকাদের মধ্যে ববি, পরীমনি, অাঁচল, সিমলাসহ অনেকেই আইটেম গানের শিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। এদের মধ্যে খোলামেলাভাবে নৃত্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন নায়লা নাঈম। তন্ময় তানসেনের ‘রানআউট’ ছবিতেও তাকে একই স্টাইলে নৃত্য পরিবেশন করতে দেখা গেছে।

আর/১২:১৪/২৪ আগষ্ট

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে