Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৮-১৮-২০১৭

কবি শামসুর রাহমানের সান্নিধ্যে

বিভুরঞ্জন সরকার


কবি শামসুর রাহমানের সান্নিধ্যে

বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৭৪ সালে। ছাত্র ইউনিয়নের একুশে সংকলন ‘জয়ধ্বনি’র জন্য কবিতা আনতে গিয়েছিলাম দৈনিক বাংলা অফিসে। তাঁর কবিতার অনুরাগী পাঠক ছিলাম আরও আগে থেকে। আরও একটি মজার বিষয় হল, এই কবির জন্যই আমি সময় অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও দিনাজপুর সরকারি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম!

নাহ, তিনি আমার জন্য কোনো সুপারিশ করেননি। কিন্তু সময় শেষ হয়ে যাওয়ার পর ভর্তির আবেদন করলে আমাকে একটি বিশেষ পরীক্ষা দিতে হয়। কলেজের অধ্যক্ষ নিজে সেই পরীক্ষা নিয়েছিলেন। আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল পড়াশোনার বাইরে আমি আর কী পছন্দ করি। প্রথমে ছাত্রআন্দোলনের কথা বলতে গিয়েও পরমুহূর্তে বলি, “টুকটাক লেখালেখি করি।”

গম্ভীর কন্ঠে অধ্যক্ষ মহোদয় জানতে চাইলেন, “শামসুর রাহমানের নাম শুনেছ?”

“জি, স্যার। তিনি একজন কবি”– আমি জবাব দিই।

“তাঁর কোনো বইয়ের নাম বলতে পারবে?”

“‘রৌদ্র করোটিতে’।”

“‘করোটি’ মানে কী?

“মাথার খুলি।”

ব্যস, স্যার খুশি হলেন। আমার ভর্তি হতে আার কোনো সমস্যা থাকল না। সেই শামসুর রাহমানের মুখোমুখি হয়ে স্বাভাবিকভাবে আপ্লুত হয়েছিলাম। তাঁকে এই ঘটনা বলায় তিনি আমার প্রতি প্রথম দিনই যেন কিছুটা দুর্বল হলেন। কবিতা পেতে কোনো সমস্যা হয়নি।

কবির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে গত শতকের আশি দশকের শুরুতে আমি কমিউনিস্ট পার্টির সাপ্তাহিক মুখোত্র ‘একতা’ য় সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে যোগ দেওয়ার পর মতিউর রহমানের মাধ্যমে। মতি ভাই ‘একতা’ র সম্পাদক। শামসুর রাহমানের সঙ্গে তাঁর বিশেষ প্রীতির সম্পর্ক। ‘একতা’ র যে কোনো বিশেষ সংখ্যায় রাহমান ভাইয়ের কবিতা ছাপা হত। মতি ভাই আগে টেলিফোনে যোগাযোগ করে দিতেন। আমি তাঁর বাসা থেকে নির্ধারিত দিনে গিয়ে কবিতা নিয়ে আসতাম। এই কবিতা আনতে গিয়ে টুকটাক কথাবার্তার মধ্য দিয়েই তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। পরে আর কোনোদিনই আমি তাঁর স্নেহবঞ্চিত হইনি।

রাহমান ভাইকে যারা জানেন, তাদের এটা অজানা নয় যে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্বল্প ও মৃদুভাষী। তিনি আড্ডায় যোগ দিতেন, মানুষের সান্নিধ্য তিনি পছন্দ করতেন, উপভোগ করতেন। তিনি নিজে কথা বলতেন কম, শুনতেন বেশি। মুখর আড্ডায় তাঁর মৌন উপস্থিতিও অন্য ধরনের স্নিগ্ধ উজ্জ্বলতা ছড়াত। তাঁর মতো অকৃত্রিম, সজ্জন ও হৃদয়বান মানুষ আমাদের সাহিত্যজগতে খুব বেশি নেই বলেই আমার ধারণা।
 
কবিতা আনতে গিয়ে কখনও কখনও দুচার দিন ঘুরতে হয়নি তা-ও নয়। রাহমান ভাই কাউকে ‘না’ বলতে পারতেন না, বানিয়ে অসত্য বলতে পারতেন না। হয়তো আমাকে দেওয়ার জন্য একটি কবিতা লিখে শেষ করেছেন, আর তখনই আরেকজন কেউ কবিতা নিতে এসেছেন। তিনি আমাকে দেওয়ার জন্য লেখা কবিতাটি তাঁকেই দিয়ে দিতেন। হয়তো ভাবতেন, আমি যেহেতু পরে যাব; তাই আর একটি কবিতা লিখে দেবেন। কবিতা তাঁর কলমে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আসত।

একদিন সকালে তাঁর আশেকে লেনের বাসায় গিয়ে কড়া নাড়তেই তিনি দরজা খুলে বেশ বিস্ময়ের সঙ্গে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনাকে কি আজ কবিতা দিতে চেয়েছিলাম?”

আমি বেশ বুঝতে পারলাম আমার জন্য লেখা কবিতা আগের দিনই কেউ হাতিয়ে নিয়েছে। আমি কিছুটা অসহায়ভাবেই বললাম, “আজ কবিতা না পেলে ছাপা সম্ভব হবে না, রাহমান ভাই।”

তিনি আমাকে ভেতরে নিয়ে বসালেন। আমাকে একটু বসতে বলে তিনি বসে গেলেন লেখার টেবিলে। মিনিট ত্রিশের মধ্যেই আমার হাতে তুলে দিলেন একটি সদ্যোজাত কবিতা। রুলটানা কাগজে উজ্জ্বল হস্তাক্ষরের কবিতাটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বিহ্বল হয়ে বসেছিলাম। এভাবে তিনি আমাকে কবিতা দেবেন, ভাবতেও কেমন লাগছিল।

দুই.

শামসুর রাহমানের সান্নিধ্য পাওয়া আমার জন্য ছিল এক বিরল সৌভাগ্যের ব্যাপার। প্রায় তিন দশকের পরিচয়, কত ঘটনা, কত স্মৃতি! কত জায়গায় কতভাবেই না তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। অনেক গুণিজনের মাঝে আমার উপস্থিতি ছিল, ‘হংসমাঝে বক যথা’। সচিত্র সন্ধানীর সম্পাদক-প্রকাশক গাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদের অফিসে-বাসায় কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের জমাটি আড্ডায় উপস্থিত থাকার সুযোগ যাদের হয়নি, তারা যে কী মূল্যবান অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন সেটা বলার মতো নয়। মান্না দের গাওয়া স্মৃতিজাগানিয়া ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’এর সঙ্গ মিলিয়ে আমার বলতে ইচ্ছা করে, “গাজী ভাইয়ের বাসায় আড্ডাটা আজ আর নাই।”

কফি হাউজের আড্ডাবাজ হিসেবে নিখিলেশ, মাইদুল, ডি সুজাসহ কয়েকজনের নাম যেমন মান্না দের গানে উল্লেখ আছে, তেমনি গাজী ভাইয়ের বাসার আড্ডায় উপস্থিত কয়েকজনের নামও উল্লেখ না করলেই নয়। শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, সায়্যিদ আতীকুল্লাহ, কাইয়ুম চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, বেলাল চৌধুরী, রফিক আজাদ, বেনজির আহমেদ, সৈয়দ হায়দার, ত্রিদিব দস্তিদার, সুশান্ত মজুমদারসহ আরও কতজন। সেসব আড্ডায় শুধু খানাপিনা হত না, দেশ-বিদেশের শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি নিয়েও প্রাণবন্ত আলোচনা হত। চিন্তার জগৎ প্রসারণে ওই আড্ডাগুলোর মূল্যবান ভূমিকা ছিল।

গাজী ভাইয়ের বাসায় পশ্চিমবঙ্গের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, নবনীতা দেবসেনসহ অনেকেই একবার নয়, একাধিকবার অতিথি হয়েছেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল গাজী ভাইয়ের বাসায় অসংখ্য আড্ডায় উপস্থিত থাকার। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শামসুর রাহমানের অনুপস্থিতি সেসব আড্ডায় ছিল অকল্পনীয়।

এরশাদ শাসনামলে এক সন্ধ্যায় গাজী ভাইয়ের বাসায় দুই বাংলার কয়েকজন শিল্পী-সাহিত্যিকের উপস্থিতিতে ব্যাপক খানাপিনার আয়োজন হয়েছিল। সব পাট চুকিয়ে আমরা যখন গাজী ভাইয়ের অস্থায়ী ডেরা (সিদ্ধেশ্বরীর কালী মন্দিরের পাশে, নয়া পল্টনে ‘গাজী ভবন’ তখন মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিল) থেকে নিচে নেমেছি, যামিনী পোহাতে তখন আর বেশি বাকি নেই। রাহমান ভাইকে তাঁর বাসায় পৌছে দেওয়ার জন্য গাড়ি অপেক্ষমান। কবি রফিক আজাদ ঢুলুঢুলু অবস্থায় গাড়ির দরজা খুলে রাহমান ভাইকে গাড়িতে উঠতে সাহায্য করলেন। রাহমান ভাই গাড়িতে উঠে বসতেই রফিক আজাদ সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানিয়ে বললেন, “আমি সেদিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন কবিকে স্যালুট করবে মিলিটারি।”

রফিক আজাদের কথা শুনে ত্রিদিব দস্তিদার, সুশান্ত মজুমদারসহ উপস্থিত কয়েকজন রাতের নীরবতা ভেঙ্গে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিলাম।

কাকতালীয় ব্যাপার হল, এর প্রায় এক যুগ পর ১৯৯৮ সালের নভেম্বর মাসে কবিকে ঠিকই মিলিটারি স্যালুট করেছিল। কবি শামসুর রাহমানকে পঞ্চগড়ের বোদা নিয়ে যাচ্ছিলাম একটি সাহিত্য সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য। তখন বিএনপির টানা ৪৮ ঘণ্টর হরতাল চলছিল।

সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের রাস্তা দিয়ে বের হওয়ার সময় কর্তব্যরত দুজন মিলিটারি পুলিশ হয় কবিকে চিনতে পেরে অথবা অন্য যে কারণেই হোক স্যালুট দিয়েছিলেন।

সফরসঙ্গী ত্রিদিব দস্তিদার তখন রফিক আজাদের কথাটি মনে করিয়ে দেওয়ায় আমরা সবাই হেসে উঠি। রাহমান ভাইয়ের চোখেমুখেও দেখিছিলাম এক ঝলক উজ্জ্বল আলো।

তিন.

রাহমান ভাইয়ের সারল্য ছিল প্রবাদতুল্য। তিনি এত বড় কবি, অথচ তাঁর মধ্যে কোনো অহমিকা ছিল না। বিনয় যে মানুষের কত বড় ভূষণ সেটা রাহমান ভাইকে দেখেই বোঝা যেত। তিনি সব মানুষকেই সরল মনে বিশ্বাস করতেন। তাঁর দুয়ার আক্ষরিক অর্থেই সবার জন্য খোলা থাকত। এই খোলা দরজা দিয়েই তো দুই ঘাতক প্রবেশ করেছিল তাঁকে হত্যার জন্য। তিনি কোনো ঘোরপ্যাঁচ বুঝতেন না। তাঁর এই সরলতার সুযোগও কেউ কেউ নিয়েছে বলে শুনেছি।

এরশাদ আমলে দৈনিক বাংলার সম্পাদকের পদ থেকে শামসুর রাহমানকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়। আকস্মিকভাবে আয়-রোজগারের এতদিনের নিশ্চিত পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কবি কিছুটা চাপে পড়েছিলেন। তাই কিছু বাড়তি আয়ের জন্য কলাম লিখতে শুরু করেছিলেন। ওই সময় ‘পূর্বাভাস’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সম্পাদনার দায়িত্বে মোজাম্মেল বাবু। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা কবি মোজা্ম্মেল বাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল সম্ভবত ছাত্রআন্দোলনের সূত্রে। একদিন বাবু আমাকে নিয়ে গেলেন রাহমান ভাইয়ের বাসায়। উদ্দেশ্য কবিকে দিয়ে পূর্বাভাস এ নিয়মিত লেখানো।

মোজাম্মেল বাবু, বর্তমানে একাত্তর টেলিভিশনের হর্তাকর্তা। আগাগোড়াই চটপটে স্বভাবের এবং অতিউদ্যোগী মানুষ। অনর্গল কথা বলতে পারেন। ‘না’কে ‘হ্যাঁ’ করানোয় ওস্তাদ। কবিকে বাবু তাঁর উদ্দেশ্যের কথা বললেন। নিয়মিত অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহে লিখতে হবে, লেখার জন্য সন্মানী দেওয়ার কথাটাও বাবু বলতে ভুললেন না। কবি একটু আমতা আমতা করে বললেন, “আমি গদ্যরচনায় খুব পারদর্শী নই। প্রতি সপ্তাহে কি লিখতে পারব?”

এটা যে কবির বিনয় সেটা আমাদের জানা। বাবু নাছোড়বান্দা। রাহমান ভাইয়ের কাছ থেকে লেখার সম্মতি আদায় করে তবেই তাঁর বাসা থেকে বের হলেন।

কত তুচ্ছ বিষয়ে যে শামসুর রাহমানের মতো একজন কবিকে বিরক্ত করেছি, এখন ভাবলে কষ্ট লাগে। তিনি ভালো মানুষ। আমাদের ভালোবাসার অত্যাচার তিনি সহ্য করেছেন হাসিমুখে। আমার নানা উৎপাতের প্রতি যেন তাঁর এক ধরনের প্রশ্রয় ছিল। একবার আমার পরিচিত এক বন্ধু বললেন, কবি শামসুর রাহমান একটি চিঠি লিখে দিলে তাঁর আমেরিকাপ্রবাসী ভাইয়ের রাজনৈতিক আশ্রয়লাভ সহজ হবে। আমি আমার বন্ধুকে একটি চিঠি তৈরি করে আনতে বললাম। বন্ধু বিলম্ব না করেই চিঠি নিয়ে এলে তাকে নিয়ে কবির বাসায় যাই।

তিনি ওই ছেলেকে চেনেন না, জানেন না। আমার কথা শুনেই ওই চিঠিতে সই করে দিলেন। আমি বললাম, “না পড়েই সই করলেন? আপনার সহায়-সম্পত্তি তো এখন আমার হয়ে গেল!”

রাহমান ভাই একগাল হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, “আপনার ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। আমি জানি, আমার ক্ষতি হয় কিংবা আমি বিপদে পড়ি এমন কিছু আপনি করবেন না।”

এমন সরল মানুষ এখন কোথায় পাই? রাহমান ভাইকে বহুদিন বলছি আমাকে ‘তুমি’ বলার জন্য। কিন্তু দুএকবার বলে তিনি আবার ‘আপনি’তে ফিরে গেছেন।

চার.

আমার বিশেষ অনুরোধ ও চাপাচাপিতে রাহমান ভাই ‘আমার যৌবন, আমার প্রেম’ শিরোনামে একটি অত্যন্ত সুখপাঠ্য গদ্য রচনা করেছিলেন। সেটি ছাপা হয়েছিল ‘অপরাজেয় বাংলা’ নামের একটি স্বল্পায়ু সাপ্তাহিকে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর এইউ (এন্তাজউদ্দিন) আহমেদ নামের এক আওয়ামী-সমর্থক (নাকি ড. কামাল হোসেন ভক্ত!) ওই সাপ্তাহিকটি প্রকাশ করেছিলেন। আমাকে দিয়েছিলেন সম্পাদনার দায়িত্ব।

শামসুর রাহমান সম্ভবত প্রথমবারের মতো ওই লেখায় তাঁর যৌবনের গোপন প্রেম ও প্রণয়ের কথা অকপটে লিখেছিলেন। লেখাটি পাঠকদের ভালো লেগেছিল।

‘অপরাজেয় বাংলা’ র কোনো কপি আমার কাছে না থাকায় পাঠকদের রাহমান ভাইয়ের ওই বিশেষ লেখাটির স্বাদ গ্রহণের সুযোগ দিতে পারলাম না।

কারও কাছে কি আছে ওই সাপ্তাহিকটির কপি?

খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও আমার সুযোগ হয়েছিল রাহমান ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করার, তাঁর সহকর্মী হওয়ার। ‘মাতৃভূমি’ নামের একটি দৈনিক পত্রিকায় আমরা কয়েক মাস একসঙ্গে কাজ করেছি। আমার বিশেষ অনুরোধেই তিনি মাতৃভূমি র প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আমি ছিলাম নির্বাহী সম্পাদক।

মাতৃভূমির প্রধান সম্পাদক হয়েছিলেন তিনি এই শর্তে যে, তাঁর পছন্দ না হলে বা ভালো না লাগলে তিনি যে কোনো সময় দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন। তাঁর উৎসাহ ও পরামর্শে মাতৃভূমি অল্প সময়ের মধ্যেই পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিল। শামসুর রাহমানের মতো একজন কবির সঙ্গে কাজ করেছি, এই সুখস্মৃতি আমাকে আজীবন প্রাণিত করবে।

পাঁচ.

শামসুর রাহমান রাজনীতি করতেন না।কবি ছিলেন। কবিতায় তিনি একটা নিজস্ব ধারা তৈরি করেছেন। স্বকীয়তা, সংবেদনশীলতা, সৃজনশীলতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবিতে পরিণত করেছে। তাঁর হাত ধরে বাংলা কবিতা একদিকে যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে অন্যদিকে কালচক্রে তিনি তাঁর কবিতায় সমসাময়িক ঘটনার প্রভাবও প্রবলভাবেই দৃশ্যমান। বাংলাদেশের রাজনীতির বাঁক পরিবর্তনের যেসব বড় ঘটনা, তা উপজীব্য হয়েছে তাঁর কবিতায়। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আসাদকে নিয়ে লেখা শামসুর রাহমানের কবিতা ‘আসাদের শার্ট’ সংগ্রামী ছাত্র-জনতার কাছে স্লোগানের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং তারপর স্বাধীনতা নিয়ে তিনি যেসব কবিতা লিখেছেন সেগুলো গোটা জাতিকে উদ্দীপ্ত করেছে। ‘স্বাধীনতা তুমি’ , ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ সহ এমন অনেক কবিতা আছে যা মুক্তিকামী জনতাকে অমিত শক্তি জুগিয়েছে। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তাঁর লেখা কবিতা ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’, ‘ধন্য সেই পুরুষ’ এর কথা কি ভোলা যায়? এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে লেখা কবিতা ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’ অনেকদিন অনেককে সাহস দিয়েছে। তাঁর অনেক কবিতায় বিক্ষুব্ধ সময় উঠে এসেছে, কিন্তু সেগুলো কালোত্তীর্ণ কবিতাই হয়েছে।

কবি শামসুর রাহমান সচেতনভাবে না চাইলেও ঘটনাক্রমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীলতার পথ রচনার একজন দিশারী হয়ে উঠেছিলেন। অগণতান্ত্রিক ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে তাঁকে সামনে রেখেই প্রগতিশীলতার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। আপাত শান্ত সৌম্য মানুষটির সব অপশক্তি ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে অবস্থান ছিল অত্যন্ত ঋজু।

১৭ আগস্ট কবির মৃত্যুদিনে তাঁর প্রতি জানাই হৃদয়নিঙড়ানো শ্রদ্ধা।

এমএ/ ০৯:৩০/ ১৮ আগস্ট

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে