Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৮-০৫-২০১৭

শেখ কামালের স্মৃতি  

রফিকুল ইসলাম


শেখ কামালের স্মৃতি
 

শেখ কামালকে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম দেখি স্বাধীনতার আগে না পরে সেটা ঠিক মনে নেই। তবে স্বাধীনতার পরে শুনলাম সে সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র এবং আবাহনী নামে ধানমণ্ডিতে একটি ক্লাব গঠন করেছে। একদিন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে ঢুকছি। আমতলায় যে আমগাছটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা কেটে ফেলেছিল—পরে সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন, তখন আমরা তাঁকে দিয়ে বটগাছটি রোপণ করাই। ওই সময় ডাকসুর ভিপি ছিলেন আ স ম আবদুর রব এবং জিএস আবদুল কুদ্দুস মাখন। সভাপতি ছিলেন উপাচার্য মোজাফফর আহমদ চৌধুরী। আমি ছিলাম ট্রেজারার। যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের সময় কেনেডি বাংলাদেশকে সমর্থন করেছিলেন, তাই বাংলাদেশে আসার পর তাঁকে আবেগময় সংবর্ধনা জানানো হয়।

যা হোক, সেই আমগাছের সেই মঞ্চটিতে একদল ছেলে গান গাচ্ছিল। গানটি হচ্ছে, ‘এমন একটা মা দে-না, যে মায়ের সন্তানেরা...’

ওই দলে ফেরদৌস ওয়াহিদ, শেখ কামাল এবং আমার মনে হয় ফিরোজ সাঁইও ছিলেন।

শেখ কামালকে জানতাম, তার খেলার প্রতি ঝোঁক ছিল।

কিন্তু দেখলাম সংগীতেও তার নেশা।
এরই মধ্যে একদিন রব, মাখন ও কামাল আমার কাছে হাজির। আমাকে বলল, ‘ভারতের কলকাতায় গড়ের মাঠে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী মেলা হচ্ছে। ডাকসু থেকে একটি নাট্যদল আমরা ভারতে নিয়ে যেতে চাই। সেখানে আমরা নাটক করব। আপনি আমাদের একটা নাটক সিলেক্ট করে দেন। আমরা জানি আপনি ভালো নাটক করতেন। স্যার, এই সফরে আপনি আমাদের নাটকটি পরিচালনা করবেন। ’

আমার মনে হলো, ১৯৫৭ সালে আমি প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছি। বার্নার্ড শর ‘ইউ নেভার ক্যান টেল’ নাটক, যা মুনীর চৌধুরী কর্তৃক অনূদিত ‘কেউ কিচ্ছু বলতে পারে না’। ১৯৫৭ সালে শিক্ষক হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উৎসবে এই নাটকটি নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি তাদের এই নাটকটির কথা বললাম। কামাল এই নাটকে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছিল। অবশ্য এর আগে এই নাটকটি কার্জন হলে বেশ কয়েকবার মঞ্চস্থ করি। কলকাতার সফর সামনে রেখে রিহার্সাল শুরু হয়। টিএসসিতে মাসখানেক নিয়মিত বিকেল ৩টা থেকে রাত ৭-৮টা পর্যন্ত রিহার্সাল থাকত। নাটকটিতে মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জাহানারা ইমামের বোন তাহমিদা সায়িদা। সে সময়  সে বাংলার ছাত্রী ছিল।

আমরা সদলবলে পৌঁছলাম ভারতে। প্রফেসর মনিরুজ্জামান ও সংগীতশিল্পী আবদুল লতিফও আমাদের সঙ্গে গিয়েছিলেন। কলকাতায় শ্রী অন্নদাশঙ্কর রায় আমাদের অভ্যর্থনা জানান। অন্নদাশঙ্কর বিখ্যাত সাহিত্যিক ছিলেন। সেখানে গড়ের মাঠে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী মেলায় সফলতার সঙ্গে পর পর কয়েকবার নাটকটি মঞ্চস্থ করি। আমাদের এই নাটক দেখতে এসেছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা পাহাড়ি সান্যাল, কবি বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ আরো অনেকে। অন্নদাশঙ্কর বাংলাদেশের শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় এই মেলাটির আয়োজন করা হয়। বালিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

কলকাতায় কামালের আগে থেকেই একটা পরিচিতি ছিল। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময় সে কলকাতায়ই ছিল। বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক আমাদের নাটক দেখতে আসেন। তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘মেঘে ঢাকা তারা’। ঋতিক ঘটক পরে বাংলাদেশে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’  ছবিটি পরিচালনা করেন। তিনি এসেছিলেন কারণ, তিনি বাংলাদেশের সন্তান ছিলেন। তাঁর দেশের শিল্পীরা নাটক করছে দেখে তাঁর আগ্রহের সীমা ছিল না। তিনি সেখানে প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার নিয়ে আসেন এবং আমাদের নাটকের প্রতিটি দৃশ্যের চমত্কার ছবি তোলেন। সেই ছবিগুলো এখন আর পাচ্ছি না। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। আমাদের মঞ্চাভিনয়টি উপভোগ করে কলকাতার লোকজন বেশ সুনাম করেছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের লোক এত সুন্দর করে অভিনয় করতে পারে, সেটা তাদের জানা ছিল না। আমাদের ওই নাটক দেখে একটি বনেদি পরিবার মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানায়।

শেখ কামাল একদিন আমাকে বলল, ‘স্যার, আপনি তো শপিং করলেন না?’ আমি বললাম, আমি তো কলকাতা চিনি না। সে বলল, ‘স্যার! বলেন, কী কী লাগবে?’ আমি বললাম, তোমার ভাবি আমাকে একটা হারমোনিয়াম নিয়ে যেতে বলেছিল। কিন্তু আমি তো জানি না কোথায় হারমোনিয়াম পাওয়া যায়। আবার আমার বাসা তো এয়ারপোর্ট থেকে অনেক দূরে। কিভাবে বহন করব? সে বলল, ‘স্যার, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আপনার বাজেট কত?’ আমি বললাম, এক হাজার টাকা। এই টাকায় কি ভালো হারমোনিয়াম পাওয়া যাবে? সে বলল, ‘দেন না স্যার। ’ এরপর বলল, ‘আমি তো চিনি না। লতিফ ভাই, আপনি চলেন। ’ আমার স্ত্রী বেতারের শিল্পী ছিলেন। তাই লতিফ ভাই তাকে ভালো করেই চিনতেন। কিছুক্ষণ পর দেখি একটা হারমোনিয়াম নিয়ে কামাল হাজির।

বেশ ভালো একটা হারমোনিয়াম। ‘ডয়ার পিন’ নামে কলকাতার একটা ব্র্যান্ডের হারমোনিয়াম। ঢাকায় পৌঁছে নিজের মাথায় করে চারতলার সিঁড়ি বেয়ে হারমোনিয়ামটি আমার বাসায় পৌঁছে দেয় কামাল। আমার স্ত্রী অনেক খুশি হয়েছিলেন। সেই হারমোনিয়ামটি এখনো আমাদের বাসায় আছে। সেটা কামালের স্মৃতি বহন করছে।

বলতে গেলে তার সব কাজেই উৎসাহ ছিল। সে রাজনীতি করত কি না জানি না। খেলাধুলা করত শুনেছি, আমি সেটা চোখে দেখিনি। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যে পদচারণ ছিল, সেটা আমি বেশ কাছ থেকেই দেখেছি। আমি মুগ্ধ না হয়ে পারিনি।

শেখ কামালের সঙ্গে আমার কলকাতা সফর এবং হারমোনিয়াম কিনে দেওয়ার সে গল্প তা এখনো স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে।

সে তো ঠিক অভিনেতা ছিল না। কিন্তু নাটকে সে নায়কের চরিত্রে বেশ ভালো অভিনয় করেছিল। আমাদের টিমে বেশির ভাগ সদস্যই ছিল নতুন। আগে কারো অভিনয় করার অভিজ্ঞতা ছিল না।

আমি যেহেতু ডাকসুর সঙ্গে জড়িত ছিলাম। ডাকসুর সঙ্গে তারাও সম্পৃক্ত ছিল। তাই তার কাছাকাছি আসার সুযোগ হয়। বিটিভির দু-একটি অনুষ্ঠানে কথা বলার জন্য সে আমাকে নিয়ে যায়। আমি বলেছিলাম, ‘দেখো বাবা! আমি কোনো রাজনীতিবিদ নই। আমার যা মনে হয় আমি কিন্তু তা-ই বলব। এতে তোমাদের পছন্দ হোক আর না হোক। ’ সে বলেছিল, ‘স্যার! আপনাকে তো আমরা নিরপেক্ষ হিসেবেই নিয়ে যাচ্ছি। ’ যেহেতু শেখ হাসিনা আমার ছাত্রী ছিলেন। আর সে যেহেতু শেখ হাসিনার ছোট ভাই। তার বড় বোনের শিক্ষক হিসেবে আমাকে যতটুকু সম্মান করা দরকার, কামাল করত। যেটুকু সময় তাকে দেখেছি তার বেশির ভাগই নাটকের রিহার্সালকে কেন্দ্র করে।

বঙ্গবন্ধু আসবেন। ১৫ আগস্ট আমি রেডি হচ্ছি। এমন সময় রেডিওতে শুনলাম ট্র্যাজেডিটা।

ওই সময় আমি রেডিওতে শুনি, ভুট্টো ভাষণ দিচ্ছেন। করাচি রেডিও থেকে। তিনি ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশের স্বীকৃতি দিচ্ছেন। গণচীনও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। তারপর দেখলাম জগন্নাথ হলের ছাত্রদের একজন মেজর শাসাচ্ছে। পরে শুনলাম সে ছিল মেজর ডালিম। সে তাদের শাসিয়ে গেছে। তারপর তো বঙ্গভবনে খন্দকার মোশতাক। তিনি গোপনে সরকার গঠন করলেন। পরে কর্নেল ওসমানীও সেখানে গেলেন। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা বাধ্য হয়েই মন্ত্রী হলেন। কিন্তু জাতীয় চার নেতা মোশতাকের কথায় মদদ দেননি। ফলে তাঁদের প্রাণ দিতে হয়েছিল।

এ জন্য জাতীয় চার নেতার মধ্যে তিনজনকে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের পাশে কবরস্থ করা হয়।

শেখ কামালের স্মৃতি এখনো আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে।

লেখক : শিক্ষাবিদ

এমএ/ ০২:২৮/ ০৫ আগস্ট

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে