Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (73 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৮-০৪-২০১৭

মোবাইল চুরির আত্মকাহিনী

মোঃ তাজুল ইসলাম


মোবাইল চুরির আত্মকাহিনী

হাড়িভাঙ্গা; বাংলাদেশের আমের জগতে একটি সুস্বাদু ফল। অনেকেই সারা বছর মুখিয়ে থাকে এই ফলটির জন্য। রুপালী, ল্যাংরা, চুষা… রকমারি মজাদার আমের ভুবনে হাড়িভাঙ্গা এখন সবার উপরে জায়গা করে নিয়েছে। এই আমের কদর এখন বেশি। যখনই এই আম কিনতে যাওয়া হয়, কিছুটা সন্দেহ থাকে কারন এই জাতের আম অনেকটা হিমসাগর আমের মত দেখতে। তবে সাইজে হিমসাগরের চেয়ে বড় হলেও অনেকেই এই আম ভাল করে জানাশুনা না থাকায় কিনতে গিয়ে ভুল করে।  মিটফোর্ড এবং ইসলামপুরের মাঝখানে বাবুবাজার। লম্বা দাঁড়ি এবং টুপি পড়া এক মুরুব্বী অনেক জাতের আম বিক্রি করছেন। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, হাড়িভাঙ্গা আছে কিনা? পিছনের ঢালা থেকে আমায় আম দিয়ে বললেন, ইহা হাড়িভাঙ্গা। আরো বললেন, মধুর মত মিষ্টি, মিষ্টি না হলে মূল্য ফেরত। কেটে খাওয়াতে চাইলেন। আমের সাইজ ছোট হওয়ায় সন্দেহ হল। মনে হল, এটা হাড়িভাঙ্গা না। আম নিয়ে জীবনে অনেক অভিজ্ঞতা। বাজার থেকে চুষা আম কিনে নিয়ে যাই, বাসায় গিয়ে দেখি, অর্ধেক চুষা আর অর্ধেক অন্য জাতের নিম্ন মানের আম। ব্যবসায়ীরা মাপার সময় কখন যে আম পরিবর্তন করে ফেলে তা আজও আমার কাছে রহস্য। বলি, আপনি মুরুব্বী মানুষ। কেটে খাইয়ে চেক করার দরকার নেই। ২ কেজি দিন। পিছনের কাঁধে ব্যাগ নামিয়ে তাতে আম ভরে ব্রীজের নিচ থেকে চকবাজারের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরি।
 
এই দুনিয়ায় যানজট হয় কিন্তু হাঁটার জট হয় কিনা- তা জানা নাই। পুরাতন ঢাকার সব জায়গাতেই হাঁটার জট। ১০ মিনিট হাঁটার জায়গা যেতে ২৫/৩০ মিনিট লাগে। চকবাজারের কাছে এক মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করার জন্য ভিতরে ঢুকি। বাহিরে প্রচন্ড গরম। ভিতরে এসি ঠান্ডা বাতাসে আরাম বোধ করি। ফ্যানের নীচে বসে আরাম করছি আর পিছন থেকে ব্যাগ নামিয়ে মেঝেতে রাখি। রাখতে গিয়ে দেখি ব্যাগের পিছনে চেইন খোলা। চেক করে দেখি, মোবাইল-টা নেই। স্যামসাং গ্যালাক্সী মোবাইল-টা চোর কায়দা করে নিয়ে ভেগে গেল। চোর বেটা ব্রীজের নীচ থেকেই আমাকে ফলো করে এবং যখন জায়গা জায়গা হাঁটার জামে পড়ি কায়দা করে চেইন খুলে ফোনটা হাতিয়ে নিল। হঠাৎ এক বেদনা অন্তরে চেপে ধরল। পাশের বসা ভাইকে আমার ঘটনা জানিয়ে তার মোবাইল থেকে আমার মোবাইলে ফোন দিই, চোর বেটা রিসিভ করে কিন্তু কথা বলে না। মসজিদের ভিতরে আমার চারপাশে বসা ৪/৫ জন মুরুব্বী আমার দিকে তাকাল। কিভাবে চুরি হল, তা শুনতে আগ্রহী। একজন বললেন, আপনাকে থানায় জিডি করতে হবে। কথাটা শুনে অন্তর বিষিয়ে উঠল। এক তো হারানোর বেদনা তারপর এখন যোগ হল, পুলিশ নামক দয়ালু প্রানীদের সাথে সাক্ষাতে যেতে হবে। হারানো এবং পুলিশের চিন্তা- অন্তর চেপে ধরলেও এখন সব কিছু আউট করে অন্তর-কে স্থিরতায় আনতে হবে, আগে নামাজটা আদায় করতে হবে। অন্তর অস্থির হয়ে উঠলে নামাজ আদায় হবে না। একাগ্রতা আসবে না। ধৈর্য্য ধারণ, আর কোন উপায় নেই। নামাজ আদায় করে মসজিদ থেকে চকবাজার থানার উদ্দেশ্যে রওনা হই।
 
সম্ভবতঃ ১৯৫৮ সালে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হয়। শুনেছি, আগেরকার দিনের জমিদার গন খুব অহংকারী, দাম্ভিক প্রকৃতির ছিলেন। তারা সাধারন মানুষদের মানুষ হিসেবে গন্য করতেন না। গ্রামের মানুষ এনং অন্য যে কোন এলাকার মানুষ জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় পায়ে জুতা এবং ছাতি ব্যবহার করতে পারতেন না। জুতা হাতে নিতে হত, ছাতি গুটিয়ে ফেলতে হত। আরো ভয়ংকর প্রথা হয়ত থাকতে পারে। চকবাজার থানায় গিয়ে মনে হচ্ছে কোন জমিদার বাড়িতে এলাম। একটা কঠিন ও বিচ্ছৃঙ্খল পরিবেশ এবং শোষনের বাতাস অন্তরে বইতে শুরু করল। ভিতরে গিয়ে দেখা গেল, কয়েকজন পুলিশ অফিসার আরাম করে কেদেরায় বসে আছেন। সবাই খোশ গল্পে মত্ত। ডোন্ট কেয়ার ভাব। স্বয়ং আজরাইল আসলেও তাদের ডোন্ট কেয়ার ভাব যাবে না। হয়ত আজরাইলকে বলবে “পরে আসেন”। তাদের হুশ আসে যখন আই জি পি বা সরকারি প্রধান/হোমড়া-চোমড়া কর্মকর্তা আসার সময় হলে। যারা চোখ খোলে ঘুমায়, তাদের ঘুম ভাঙ্গানো কঠিন। সামনে বসা অফিসারকে চুরির ঘটনা বললাম। উনি মোবাইলের IME নাম্বার চাইলেন আর জিজ্ঞেস করলেন বাসার ঠিকানা? জানালাম, IME নাম্বার সাথে নেই আর ঠিকানা পল্লবী হওয়ায় পাশের অফিসার বললেন, যেহেতু আপনার মোবাইল ব্যাগ থেকে নিয়ে গেছে, সেটা আর পাওয়া যাবে না। আর বললেন- পল্লবী থানায় গিয়ে জিডি করেন। চাকরীর ডিউটি দিতে কেউ চায় না, ফ্রি বেতন আর আরাম করে টাকা আয় না করলে- পুলিশ হওয়ার স্বার্থকথা কোথায়?
 
থানা থেকে বের হতেই এক ভগ্নিপতির কথা মনে হল। ২০০৪-এ তার মোবাইল ফোনটি খোয়া যায় ফার্মগেট থেকে। যারা এই চুরিগুলা করে তাদের ভিতরে এক বিশাল চক্র থাকে। উপরের লেভেলের এক চক্র মাইক্রোবাস বা কার বা তার চেয়েও বড় কোন ক্রাইম করার জন্য- তারা চুরি হওয়া মোবাইলের অপেক্ষায় থাকে। নীচ লেভেলের চক্র মোবাইল চুরি করে উপরের চক্রের কাছে পাঠায়। তারা সেই মোবাইল ব্যবহার করে রেন্ট-এ-কার থেকে ফোন করে মাইক্রো ভাড়া নেয়, তারপর সুযোগ বোঝে কোন এক জায়গায় ড্রাইভার-কে অচেতন করে গাড়ী নিয়ে পালায়। আমার ভগ্নিপতির ফোন ব্যবহার করে মাইক্রো ছিনতাই করে। যেই মাইক্রো চুরি হয়, তার মালিক ছিলেন উত্তর বঙ্গের এক সংসদ সদস্য। ভগ্নিপতি ইঞ্জিনিয়ার এবং নিকট আত্মীয় রাজনীতিবিদ হওয়ার পরেও ৭/৮ মাস বড় রকমের ঠেলার উপরে ছিলেন। কেইস গোয়েন্দা বিভাগে গড়ায়। সেই ঝামেলা মিটতে তাকে অনেক অন্তর নিংড়ানো কষ্ট পেতে হয়েছে।
 
চকবাজার থানা থেকে বের হয়ে সি এন জি(অটোরিক্সা)-র সন্ধান করি। যে করেই হোক আগে কাষ্টমার কেয়ারে ফোন করে সিম-টা বন্ধ করা জরুরী। এত দামের মোবাইল হারানোর জন্য যে শোক করব, তার আর সময় বা উপায় নেই। শোক করার আগেই হয়ত মানুষ খুনের আসামী হয়ে যেতে পারি। জেলে তারপর ফাঁসির মঞ্চে। এই দেশের আইনের মারপ্যাঁচে রাজাকার-কে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে দেওয়া কোন ঘটনা না। এই সোনার বাংলায় কোন মানুষ শখ করে কিছু করা ঠিক না। এই দেশে ‘শখ’ একটি পাপ এবং অভিশাপ। যে কারো শখের জিনিষ গলার ফাঁসির দড়িতে পরিনত হতে পারে। একজন অটোরিক্সা-কে পেলাম এবং পল্লবীর জন্য যে ভাড়া চাইলেন, তাতে আমার মেজাজ খারাপ হওয়া শুরু করল। মনে মনে বলি, আগে যখন কলেরা হত তখন এলাকা, সমাজ, দেশ মানুষ মরে উজার হয়ে যেত। বর্তমানে এই দেশে কলেরার মত আরেকটা মহামারী দরকার যাতে ১৬ কোটি মানুষ মরে ১৬ লাখে নেমে আসে। এই ১৬ লাখ লোক যেন সুস্থ হয়ে বেচে থাকুক, অসুস্থ ১৬ কোটি লোকের এই দেশে প্রয়োজন নেই।
 
বিকাল ৫ টা থেকে অস্থিরতার ভিতরে ছিলাম। যা হবার হয়ে গেছে, এই নিয়ে দুশ্চিন্তা করে লাভ নেই। শিক্ষা- রাস্তা ঘাটে চলাফেরা করার সময় আরো সাবধান হতে হবে। রাতে ঘুমানোর আগে হাড়িভাঙ্গা আম খেয়ে অন্তর-কে একটু মধুময় করার চেষ্টা করি। আম ঠোঙ্গা থেকে বের করেই বোঝে ফেলি ইহা হাড়িভাঙ্গা না। জঘন্য নিম্ন মানের হিমসাগর। কোন আম পুরাই কাঁচা, কোনটা এতটাই পাকা ও নরম যে, খাওয়া দুষ্কর। দাঁড়ি-টুপি ওয়ালা ব্যবসায়ীরা আরো বেশি প্রতারক হয়। মুরুব্বী বেটাকে বিশ্বাস করেছিলাম। “এই দুনিয়া মুমিনদের জন্য জেল খানা”- যখনই এই কথা মুরুব্বীদের কাছ থেকে বলতে শুনি তখন তাকে সংশোধন করে দিয়ে বলি, “এই দুনিয়া মুমিনদের জন্য জেল খানা নয়, এই দুনিয়া মুমিনদের জন্য দোজখ-খানা। এই দুনিয়ায় থেকে যদি দোজখের আগুনের ভিতরে থাকার অনুভব না পান তাহলে বোঝে নিবেন, আপনি এখনও প্রকৃত মুমিন হতে পারেননি”।
 
পরদিন সকালে পল্লবী থানায় গেলাম জিডি করতে। থানায় ঢুকলেই অস্থিরতা শুরু হয়। জমিদার বাড়ির চেয়েও হয়ত আরো ভয়ংকর কোন বাড়ি। ভিতরে গিয়ে দেখা গেল অফিসার কর্কশ সুরে কথা বলতেছে অন্য সাধারন লোকদের সাথে। এরা আমাদের দেশের সেবক। সেবা দেওয়াই তাদের ধর্ম। সাধারন লোকদের পশ্চাতদেশে কখনও বাঁশ আবার কখনও-বা পুরো বাঁশ-বাগান ঢুকিয়ে তারা সেবা করে। মনে মনে বলি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, জিডি করে বের হয়ে যাওয়া। অফিসার আমার এপ্লিকেশন দেখে বললেন, আপনি মোবাইল হারাইছেন চকবাজার। আপনি চকবাজার থানায় গিয়ে জিডি করেন, এখানে না। শুনার পর নিজেকে ‘ফুটবল’ মনে হল। খেলোয়াড় হল পুলিশ আর আমি ফুটবল। পল্লবী পুলিশ আমাকে ফুটবল মনে করে একবার লাথি দিয়ে চকবাজার থানায় পাঠাবে, চকবাজারের পুলিশ আরেকবার লাথি দিয়ে পল্লবী থানায় পাঠাবে। এই রকম কোটি-কোটি খেলা চলছে আর চলতে থাকেবে দেশব্যপী এবং সাথে দেশ ও জাতি হয়রান ও পেরেশানীতে পুলিশের সেবার জ্বালানীতে জ্বলতে থাকবে।
 
হে আল্লাহ্‌! তুমি এই দেশ ও দেশের মানুষের জন্য রহমত নাজিল কর। একজন সৎ, বুদ্ধিমান, জ্ঞানী, বিচক্ষন, ধৈর্যশীল দেশসেবক এবং শাসক দান কর, যাতে এই দেশ ও জাতি সুস্থ হয়, সবার জীবন শান্তিময় হয়। আমিন।

এমএ/ ০৫:৪৬/ ০৪ আগস্ট

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে