Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৭-১৬-২০১৭

এবার এক ফ্রন্টে নয় বহু ফ্রন্টে যুদ্ধ

আবদুল গাফফার চৌধুরী


এবার এক ফ্রন্টে নয় বহু ফ্রন্টে যুদ্ধ

আগামী সাধারণ নির্বাচন দ্রুত এগিয়ে আসছে। নির্বাচনী হাওয়া এবার একটু আগেই বইতে শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন দল। দেশের মানুষের কাছে তাদের জবাবদিহি অনেক। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে ক্লেদও জমে অনেক। এই ক্লেদ সাফসুতরো করে ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে ক্ষমতাসীন দলকে অনেক বেশি সময় ও শক্তি ব্যয় করতে হয়। আওয়ামী লীগকে তাই নির্বাচনের অনেক আগেই নিজেদের গোছানোর কাজে তৎপর হতে হয়েছে। 

এদিক থেকে প্রধান বিরোধী দল (সংসদের বাইরে) হিসেবে বিএনপির দায়দায়িত্ব অনেক কম। দেশের সব মন্দ কাজের দায়িত্ব সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের ধোয়া তুলসী পাতা হিসেবে দাবি করা যায়। বিএনপিও তাই করছে। অতীতে ক্ষমতায় থাকাকালে নিজেদের চেহারাটা কী ছিল, তা জনগণ ভুলে গেছে মনে করে খালেদা জিয়া দেবীমূর্তিতে রাজনৈতিক মঞ্চে নেমেছেন। মুখে বলছেন, সরকার তাদের 'নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার' গঠনের (নির্বাচনকালীন) দাবি মেনে না নিলে তারা আগামী নির্বাচনেও যাবেন না। কাজেই তারা নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নেমে গেছেন। 

২০১৪ সালের নির্বাচনের যত সমালোচনাই বিএনপি করুক, তারা মনে মনে জানে, ওই নির্বাচনে যোগ না দিয়ে তারা চরম ভুল করেছে। আগামী নির্বাচনে যোগ না দিলে তাদের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হতে পারে। অস্তিত্ব একেবারে বিলুপ্ত না হোক, বিএনপি বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত হবে। দলীয় নির্দেশ মান্য না করে বিদ্রোহীরা নতুন বিএনপি গঠন করতে পারেন অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে যোগ দিতে পারেন। বিএনপির এককালের বর্ষীয়ান নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা নাকি ইতিমধ্যেই নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। 

বিএনপির সবচেয়ে বড় মিত্র জামায়াত এবার স্বনামে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। যুদ্ধাপরাধী নেতাদের ফাঁসি হওয়ার পর দলটিরও কোমর ভাঙা। তথাপি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে যে ২০ দলের জোট তাদের মধ্যে বিএনপি এবং বোরকাপরা জামায়াত ছাড়া আর অধিকাংশ দল ঠুঁটো জগন্নাথ। জামায়াতও এখন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বেপরোয়া। সন্ত্রাস দ্বারা এ সরকারের পতন ঘটানো যাবে না- এটা জেনে তারা বিএনপির কভারে নির্বাচনে যেতে চায়। সে জন্য বিএনপির ওপর নির্বাচনে যাওয়ার জন্য জামায়াতের একটা বড় অংশের শক্তিশালী চাপ আছে বলে কোনো কোনো খবরে বলা হচ্ছে। 

দেখেশুনে মনে হয়, বিএনপি এখন যতই মেজাজ দেখাক, তারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যাবে। তাদের শেষ মুহূর্তের আশা, আমেরিকা ও ভারতের মনোরঞ্জন করে তাদের দ্বারা হাসিনা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নির্বাচনকালীন তথাকথিত সহায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতে সরকারকে বাধ্য করা_ সেই আশার গুড়েও বালি পড়বে মনে হয়। আমার কাছে যে খবর এ পর্যন্ত পেঁৗছেছে তাতে মনে হয়, হাসিনা সরকারের চেয়েও ভারতকে আরও অনেক বেশি ছাড় দেওয়ার (তিস্তার পানি বণ্টনসহ) প্রতিশ্রুতি দিয়েও বিএনপি মোদি সরকারের মন এখন পর্যন্ত গলাতে পারেনি। লন্ডনে নাকি ভারতের 'র'র প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিএনপির যুবরাজের পরপর কয়েকটি গোপন বৈঠক ব্যর্থ হয়েছে। 

ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র দপ্তরের কোনো কোনো কর্তাব্যক্তি নাকি বলেছেন, হাসিনা বিদেশি চাপের কাছে যে নতি স্বীকার করেন না, তা হিলারি ক্লিনটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালেই প্রমাণ হয়ে গেছে। এখন বিএনপির অনুরোধে হাসিনাকে নতি স্বীকার করানো দুরাশা। তবে দিলি্লকে এ ব্যাপারে রাজি করাতে পারলে তারা বিএনপির অনুরোধ বিবেচনা করে দেখতে পারেন। বিএনপি আগে দিলি্লকে রাজি করাক। কিন্তু দিলি্ল এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত 'নট নড়ন গচ্ছামি'। বিএনপি তাই হালে পানি পাচ্ছে না। 

আগামী সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি পুরনো অশুভ শক্তিও আবার সংঘবদ্ধ হওয়ার ও ধীরে ধীরে মাথা তোলার চেষ্টা করছে। এরা হচ্ছেন :২০০১ সালের সেই সুশীল সমাজ, ইংরেজি ও বাংলা দুটি 'নিরপেক্ষ' মিডিয়া এবং হাসিনা সরকারের প্রতি বৈরী কয়েকটি বিদেশি রাষ্ট্রের কূটনীতিক। এই জোটের প্রধান দু'জন নেতা ড. কামাল হোসেন ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এদের সঙ্গে কিছু অনুগত বুদ্ধিজীবী আছেন, যাদের কাজ হলো টিভির টক শোতে অংশ নিয়ে খবরের কাগজে কলাম লিখে নিরপেক্ষতার ভান করে নানা রকম পাণ্ডিত্য দেখিয়ে হাসিনা সরকারের সব ক্রেডিবিলিটি ধ্বংস করার চেষ্টা চালানো। এরা আবার অতিকৌশলে ও প্রচ্ছন্নভাবে সক্রিয় হচ্ছেন। 

এই মহলটির সব বিরোধিতা নস্যাৎ করে আওয়ামী লীগ একাধারে দু'দফা ক্ষমতায় থাকতে সফল হওয়ায় এরা কচ্ছপের মতো খোলসের মধ্যে মাথা লুকিয়েছিল। এখন নির্বাচন আসন্ন জেনে এরা আবার আস্তে আস্তে মাথা তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। তথাকথিত সুশীল সমাজ এবং 'নিরপেক্ষ' মিডিয়া গ্রুপটি অসীম আগ্রহে অপেক্ষা করছে, কখন নির্বাচনের দিন-তারিখ ঘোষিত হয় এবং তারা আবার ঘোমটা খুলে মাঠে নামতে পারে। এখন তার রিহার্সাল চলছে মাত্র। আমার ধারণা, এবার তাদের আওয়ামী লীগবিরোধী প্রচারণা আরও সূক্ষ্ম, পরিকল্পিত ও শক্তিশালী হবে। তার পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগকেও তার মিডিয়া শক্তি ও সমর্থক বুদ্ধিজীবী শিবিরকে তৎপর রাখতে হবে; যেটা ২০০১ সালে ছিল না।

আওয়ামী লীগকে যারা সমর্থন করেন, এমন বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক-কলামিস্টদের সংখ্যা কম নয়। তাদের মধ্যে বাম ঘরানার বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিকই বেশি। বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবী-কলামিস্টদের অনেকেই যেমন নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে কখনও বামপন্থি সেজে, কখনও নিরপেক্ষ সেজে আওয়ামী লীগের সমালোচনার নামে বিএনপিকে সমর্থন জানাতে পারেন; আওয়ামী লীগের সমর্থক বুদ্ধিজীবী-কলামিস্টরা তা পারেন না। তারা এখনও একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের উত্তরাধিকার বহন করেন, যে উত্তরাধিকার 'সুশীল সমাজ' নামধারী বুদ্ধিজীবীরা বহন করেন না।

তাই আওয়ামী লীগ সরকার যখন রাজনীতির বাস্তব পরিস্থিতির বিবেচনায় রণকৌশল হিসেবে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাময়িক পিছু হটার নীতি গ্রহণ করে, তখন এদের অনেকের মনে আওয়ামী লীগকে নিদ্বর্িধায় সমর্থন দিতে সংশয় দেখা দেয়। আমি যে একজন বুদ্ধিজীবী নই, আওয়ামী লীগের দীর্ঘকালের সমর্থক একজন লেখক এবং কলামিস্ট, আমার মনেও এই সংশয় দেখা দেয়। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের প্রাঙ্গণের ভাস্কর্য অপসারণ এবং প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বর্জনের সময় আওয়ামী লীগের অতি বড় সমর্থক অনেক বুদ্ধিজীবীর মনে এই সংশয় দেখা দিয়েছিল। তারা সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে তাদের প্রতিবাদ জানাতে বাধ্য হয়েছেন। 

কিন্তু এই প্রতিবাদ যাতে সীমা অতিক্রম না করে, সেদিকেও অনেকে লক্ষ্য রেখেছেন। এই প্রতিবাদ যাতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধিতায় পরিণত না হয় এবং বিএনপি-জামায়াত এই প্রতিবাদকে তাদের প্রচারণার ঢাল করতে না পারে, সে সম্পর্কেও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী মহলের অনেকেই সচেতন ছিলেন। আওয়ামী লীগের উচিত, এই দ্বিধা ও সংশয়গ্রস্ত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের শত্রু বিবেচনা না করে কাছে টেনে নেওয়া এবং আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য ও রণকৌশল সম্পর্কে তাদের এই দ্বিধা-সংশয় দূর করা। দেশের বুদ্ধিজীবীদের যে একটি বড় অংশ বর্তমানে সুবিধাবাদিতা ও নীতি ভ্রষ্টতার পাঁকে নিমজ্জিত, তাদের চক্রান্ত ও প্রচারণা প্রতিরোধ করার জন্য প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী শিবিরের ঐক্য ফিরিয়ে আনা দরকার। তারা ঐক্যবদ্ধ ও সক্রিয়া হলে তাদের প্রতিরোধের সামনে তথাকথিত সুশীল সমাজের সব ধরনের কৌশল ও প্রচারণা ব্যর্থ হতে বাধ্য। কারণ, ২০০১ সালের নির্বাচনের সময়ই এই সুশীল সমাজ ও 'নিরপেক্ষ' মিডিয়া দুটি দেশবাসীর কাছে এক্সপোজড্ হয়ে গেছে। 

দেশের সামনে যে সাধারণ নির্বাচনটি এগিয়ে আসছে, এর গুরুত্ব অপরিসীম। এটা আওয়ামী লীগ, না বিএনপি ক্ষমতায় যাবে তার পরীক্ষা হবে না; হবে বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থাকবে, না ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হবে, তার পরীক্ষা। ভারতের বাম গণতান্ত্রিক শিবির এখন স্বীকার করছে, কংগ্রেসের শাসন যত মন্দ হোক, এই অসাম্প্রদায়িক দলটিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে গিয়ে তারা ভয়ঙ্কর হিন্দুত্ববাদী বিজেপিকে আবার ক্ষমতায় বসার সুযোগ করে দিয়েছেন। নাকের বদলে নরুন পেয়ে এখন তারা পস্তাচ্ছেন।

এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, বাংলাদেশের উগ্র মৌলবাদীরা, বিশেষ করে জামায়াতের ক্যাডারদের একটা বড় অংশ বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে এখন শত্রু ঘাঁটি গেড়েছে। রাজ্যের তৃণমূল সরকার, বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু মুসলমানদের (বিশেষ করে বাংলাদেশ ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে বসবাসরত অবাঙালি মুসলমান) সাম্প্রদায়িক অংশকে তুষ্ট রাখার নীতি গ্রহণ করেছে। পশ্চিমবঙ্গের এই অবাঙালি মুসলমানরা বাংলাদেশের হাসিনা সরকারের ঘোর বিরোধী। অনেকের ধারণা, বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে মমতা ব্যানার্জির দ্বিধাদ্বন্ধ এবং তিস্তার পানি নিয়ে চুক্তি করার বিরোধিতার পেছনে পশ্চিমবঙ্গে শক্তিশালী অবাঙালি মুসলমানদের শীর্ষ নেতাদের প্রভাব কাজ করছে। 

আগামী নির্বাচনে বাংলাদেশের কোমরভাঙা জামায়াতিদের সাহায্য ও সহযোগিতা আসবে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, এমনকি পাশের ত্রিপুরা থেকে। এ সম্পর্কেও আওয়ামী লীগকে সতর্ক থাকতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের একশ্রেণির পত্রপত্রিকায় ইতিমধ্যেই হাসিনা সরকারবিরোধী প্রচারণা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগকে আগামী নির্বাচনে এক ফ্রন্টে নয়, একাধিক ফ্রন্টে লড়াই চালাতে হবে। এ সম্পর্কে তারা যদি আগেভাগে সতর্ক না হয়, সক্রিয় না হয়, তাহলে বিপর্যয় এড়ানো যাবে না। কথায় বলে, 'একা রামে রক্ষা নাই, সুগ্রীব দোসর।' বাংলাদেশেও বিএনপির সুগ্রীব দোসর 'সুশীল সমাজ'। এদের অসাধু চাতুর্য ও প্রচারণাকে ব্যর্থ করতে হলে শুধু রাজনৈতিক ফ্রন্টকে নয়, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ফ্রন্টকেও ঐক্যবদ্ধ ও সক্রিয় করার কাজকে আওয়ামী লীগের অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি কর্তব্য।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে