Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (44 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৫-১৩-২০১৭

ব্রিসবেনে বৈশাখী মেলা

মুহম্মদ জে এ সিদ্দিকী


ব্রিসবেনে বৈশাখী মেলা

ব্রিসবেন, ১৩ মে- যখন দেশ ছেড়ে এসেছি তখন সেভাবে না বুঝলেও, কিছুদিন পরেই বুঝতে পারলাম আমার দেশ ছেড়ে আসা ঠিক হয়নি। খুব স্বাভাবিক কারণেই দেশ ছাড়ার কয়েক বছরের মাথায় অনেক কিছু থেকে নিজেকে বঞ্চিত হয়ে যেতে দেখলাম। আমাদের জয়শ্রীতে বিশাল একান্নবর্তী পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে ঈদের আনন্দ, যেকোনো ছুটিতে জয়শ্রী বাজারে হানিফের দোকানে চার-পাঁচ দিন টানা আড্ডা দেওয়ার আনন্দ, বইমেলায় ব্যাগ ভর্তি করে বই কিনে রিকশায় বাড়ি ফেরার আনন্দ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস বা ভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে সিলেট শহীদ মিনার অথবা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মুহূর্তগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল।

পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ কিংবা ভরা জোছনায় জয়শ্রীর হাওরে সারা রাত নৌকায় ভেসে বেড়ানো—এখন আর আমার সাধ্যের মধ্যে নেই। মাঝে মধ্যে নিজেকে শেকড় ছাড়া মানুষ বলে মনে হয়। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে বিদেশে প্রথম ঈদের দিন সারা সকাল কেঁদেছিলাম। মা-বাবার মুখ, জয়শ্রীর ঈদগাহ চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল।


এই আমি যখন বিদেশ বিভুঁইয়ে বৈশাখী মেলার কথা শুনি, মঙ্গল শোভাযাত্রার কথা শুনি, পিঠা পুলির কথা শুনি, বাংলাদেশিদের নাচ গান আবৃত্তির কথা শুনি, তখন কি আর বসে থাকতে পারি? গত ৬ মে শনিবার আমাদের ব্রিসবেন শহরের স্টেফোর্ডের কিয়ং পার্কে হয়ে গেল এখানকার বাঙালিদের সবচেয়ে বড় মেলা, যে মেলার জন্য সারা বছর মানুষ প্রতীক্ষায় থাকে, সেই বৈশাখী মেলা। প্রতিবারের মতো এবারও মেলার আয়োজনে ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ইন ব্রিসবেন।

এবারই প্রথমবারের মতো মেলা চলেছে সারা দিন জুড়ে। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মেলার প্রথম পোস্টার যখন ছাড়া হলো, আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। বলে কী? সারা দিন অনুষ্ঠান করার মতো কলাকুশলী এবং শিল্পী ব্রিসবেন শহরে পাবে কোথায়? এ বছর মেলায় আরেকটি নতুন সংযুক্তি ছিল বাংলা ব্যান্ডের ওপেন এয়ার কনসার্ট। সকাল ১১টায় মেলার মাঠে পৌঁছে দেখি বিশাল কিয়ং পার্কের চারপাশে ১৫-২০টি স্টলে বাঙালি খাবার, গয়নাগাটি ও পোশাক আশাকের সমারোহ। কয়েকটি স্টলে ইলিশ পান্তা আর ভর্তার আয়োজনও দেখলাম। চায়ের আয়োজনও ছিল।


অনুপদা ও আমার কাছে এই চায়ের দোকানটি অল্পক্ষণের মাঝেই প্রিয় হয়ে উঠেছিল। কন্ডেন্সড মিল্কের এই চা কমপক্ষে পাঁচবার তো খেয়েছি। এইবারই প্রথম দেখলাম বাংলাদেশিদের স্টলের পাশাপাশি ৩-৪টি বিদেশি স্টলও মেলায় যোগ দিয়েছে। কিয়ং পার্কের বিশাল সবুজ প্রাঙ্গণ চেহারা বদলিয়ে মেতে উঠেছিল লাল, সাদা আর বাসন্তী রঙে। পায়জামা পাঞ্জাবি পড়ে ছোট ছোট বাচ্চারা বাবা-মায়ের হাত ধরাধরি করে হাঁটছে, ফুচকা খাচ্ছে। কী অপূর্ব সুন্দর লাগছিল সবাইকে! অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান শামিমের তথ্য মতে এবার প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশি এবং আড়াই শ বিদেশি মেলায় এসেছিলেন। আমার এত বছরের ব্রিসবেন জীবনে এত বাঙালির সমাগম একসঙ্গে আগে কখনো দেখিনি।


স্টল দেখতে দেখতে হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল অ্যাসোসিয়েশনের স্টলের পাশের জাকারান্ডা গাছের নিচে মাদুরের ওপর রাখা একটি ডোনেশান বক্সের ওপর। আমাদের জয় সেখানে বসে আছে। পাশে তার দুই শিশুপুত্র। বাক্সে লেখা—সুনামগঞ্জ হাওরের দুর্গতদের জন্য সাহায্য করুন। জয়ের মতো আমি নিজেও হাওর পাড়ের মানুষ।

জয় জানাল, সে পাকা ফলের ভর্তা বানিয়ে বিক্রি করছে। বিনিময়ে যা পাবে সব সুনামগঞ্জের দুর্গতদের কাছে পাঠিয়ে দেবে। অনুপদা আমাদের পরিচিত সকলকে উৎসাহিত করছেন। অনেককেই দেখলাম ৫-১০ ডলারের বিনিময়ে ভর্তা কিনে খাচ্ছেন। জয়ের দুই শিশুপুত্রকে দেখলাম ডোনেশান বাক্সে টাকা ভরছে। পরম মুগ্ধতায় উদ্ভাসিত তাদের চোখমুখ। দেশের জন্য কিছু করার এমন প্রত্যয় আর শিক্ষা নিয়েই আমাদের সন্তানেরা বেড়ে উঠুক।

গত বছরের মেলায় অতিথি হয়ে এসেছিলেন কুইন্সল্যান্ড সরকারের মন্ত্রী ড. অ্যান্থনি লেইনহ্যাম। এবারেও তাঁকে অতিথি করা হয়েছে। তিনি আমাদের সঙ্গে মঙ্গল শোভাযাত্রায়ও অংশ নিলেন। সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুনমুন আফরোজ ও সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান শামিমের যৌথ পরিচালনায় এই পর্বটি খুবই উপভোগ্য ছিল। ছোট ছোট বাচ্চারা নেচে গেয়ে শোভাযাত্রায় ঘুরল। আমরাও ঘুরলাম। শোভাযাত্রার ঘুরতে ঘুরতে মনের অজান্তে চলে গিয়েছিলাম শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ফেলে আসা বৈশাখী মেলার দিনগুলোতে।


১৯৯৮ থেকে ২০০১ সালের বৈশাখী মেলায় সারা সিলেট শহর যেন নেমে আসত ক্যাম্পাসের এক কিলোতে। বাসন্তী রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবি আর বেলি ও গোলাপ ফুলে একাকার হয়ে যেত চারদিক। বর্ষবরণের গানগুলোর মাঝে এখনো কানে বাজে মাকসুদের সেই বিখ্যাত গান—‘লেগেছে বাঙালির ঘরে ঘরে একি মাতন দোলা, লেগেছে সুরেরই তালে তালে হৃদয় মাতন দোলা’। মঙ্গল শোভাযাত্রা শেষে, অ্যান্থনি লেইনহ্যাম খুব সংক্ষিপ্ত একটি বক্তব্য রাখেন। এখানকার মন্ত্রীদের কথা বরাবরই খুব উপভোগ্য হয়। তারা আমাদের দেশের মন্ত্রীদের মতো বাচাল না। দুই-চার বাক্যে যা বলার সব বলে দেন। এই ভদ্রলোকের কথা আমি আগেও কয়েকবার শুনেছি। আজকে আবার বিমোহিত হলাম। কয়েকটি বাক্যে তিনি বাংলাদেশি সংস্কৃতিকে পুরোপুরি তুলে ধরলেন।

খুব স্পষ্ট করে বললেন যে, ‘তোমাদের সংস্কৃতি অনেক কালারফুল এবং সমৃদ্ধ’। শিশুদের উপস্থিতি এবং অংশগ্রহণকে তিনি খুব প্রশংসা করলেন। এক ফাঁকে তার সরকার যে বহু সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করে এবং বাঙালি সংস্কৃতি যে তার সরকারের বহু সংস্কৃতি নীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে, তা বলতেও ভোলেননি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি অ্যান্থনি লেইনহ্যামের অংশগ্রহণ এবং এমন স্বীকৃতি ব্রিসবেন বাঙালি কমিউনিটির জন্য একটি বড় পাওয়া।

কারণ আমাদের কমিউনিটির বয়স এখন ২৫ বছরেরও বেশি। আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রবেশ করা শুরু করেছে। মন্ত্রীর এমন বক্তব্য তাদের মনে অবশ্যই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এর পরের টানা দেড় ঘণ্টা একে একে গান, নাচ, আবৃত্তি আর অভিনয় মাতিয়ে গেল ব্রিসবেনের বাঙালি শিশুদের কমিউনিটি স্কুল ‘ব্রিসবেন বাংলা স্কুল’-এর ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। এখানে কিছু কথা বলা প্রাসঙ্গিক। বিদেশে আসার পর অনেকের কাছে প্রায়ই একটি কথা শুনতে হয়, বাংলা সংস্কৃতির চর্চা নাকি দেশের বাইরে হয় না। বিশেষ করে বিদেশে যে সব ছেলেমেয়েরা বড় হয়, তারা নাকি বাংলা সংস্কৃতি তেমন জানে না, রীতিনীতি মানে না, আদবকায়দাও জানে না।

তাদের যতই বাংলাদেশি রীতিনীতিতে দীক্ষিত করা হোক, তারা তা মেনে চলতে চায় না বা পারে না। এইতো কিছুদিন আগেও বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস এসেছিলেন আমাদের গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। একটি ভিডিওতে দেখলাম, ব্রিসবেনের কমিউনিটি সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বাংলা স্কুলের শিশুদের নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রথম জেনারেশন দেশীয় সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করে যায়, সেকেন্ড জেনারেশনে এসে সেটা আর থাকে না।’ কথাটি শুনে খুব বড় একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম। তাহলে কি আমাদের বাচ্চারা বাংলাদেশের কোনো কিছুই ধারণ করবে না? এটা কী ঠিক? আমার কিন্তু তা মনে হয় না।


মেলার এই পর্বে আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম বাঙালি সংস্কৃতিকে যেভাবে উপস্থাপন করল, নিজ চোখে সেটা না দেখলে বিরাট একটি অতৃপ্তি থেকে যেত। প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন ছোট ছোট বাচ্চা ছেলেমেয়ে নাচ-গান, আবৃত্তি ও অভিনয়ে পুরো স্টেজ মাতিয়ে রাখল। শুদ্ধ উচ্চারণে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাংলাদেশের ষড়্ঋতুর যে বর্ণনা দিল তা সত্যি মনে রাখার মতো। আর এদের নাচ এবং গানের কথা কী বলব? ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে’—আরিয়ান, সাবেহ ও নীল অসম্ভব সুন্দর করে গাইল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে’ নিয়ে এল আমাদের জারিবা এবং তার বন্ধুরা। এদের গানের ঘোর কাটতে না কাটতেই লামিয়া, আবসারা, মালিহা, অরিন পরপর নিয়ে এল অনেকগুলো নাচ। সুন্দর সুন্দর সব গানের সঙ্গে যেমন ‘ধিমতানা’ (যাও বলো তারে, মেঘের ওপারে বৃষ্টি বন্দনা জুড়ে ধরণিতল), ‘আকাশে-বাতাসে চল সাথি উড়ে যাই চল ডানা মেলে’ অথবা ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে’ ওরা খুব সুন্দর করে নাচল। ‘সোহাগ চাঁদ বদনী ধ্বনি নাচো তো দেখি’ গানের তালে তালেফা রিশা ও তার বন্ধুদের নাচ দেখতে দেখতে হুমায়ূন আহমেদের একটি নাটকের দৃশ্য মনে পড়ে গেল যেখানে শাওন এবং একদল গায়ক-গায়িকা এই গানটির তালে তালে নাচছেন।

আজ মনে হলো আমাদের ফারিশা এবং তার বন্ধুরাও শাওনের দলটি থেকে কোনো অংশে কম না। নাচের এই পর্বে আমি এবং আমার মেয়ে রিদার জন্য অপেক্ষা করছিল সবচেয়ে বড় বিস্ময়। রিদার বান্ধবী সাহার ‘ভালো করিয়া বাজান গো দোতারা সুন্দরী কমলায় নাচে’ এই গানের সঙ্গে কী অপূর্ব করে নাচল। ওর নাচ এবং নাচের সাজে দেখে রিদা আস্তে করে আমাকে বলল, বাবা দেখো সাহারকে একদম ছোট একটা বাঙালি কনের মতো লাগছে। এখানে মনে রাখতে হবে, এই ৩০ থেকে ৪০ জন ছেলেমেয়ের সবাই এখানে জন্মেছে।

 এখানকার স্কুলে পড়াশোনা করে। এদের কারও বয়স ১০ বছরের বেশি নয়। শুধু তাই নয়, আমাদের এই দ্বিতীয় প্রজন্ম যাদের বয়স পনেরোর ওপরে তারাও মেলায় এসেছে পুরো বাঙালি সেজে। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের থেকেও এদের বেশি বাঙালি মনে হয়েছে। এরা স্টেজে যা করে দেখাল তা আমাদের অনেকেই কখনো করেছে বা করতে পারবে বলে মনে হয় না। ব্রিসবেনের বাঙালি শিশুদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির শক্ত এই গাঁথুনিটি গড়ে দেওয়ার কৃতিত্বের অনেকটাই বাংলা স্কুলকে দিতে হবে।


নাসিমা কালাম মিতুর উপস্থাপনায় এর পরের পর্বটি সাজানো হয়েছিল মূলত আমাদের কমিউনিটির নিজস্ব শিল্পীদের নিয়ে। জেডি, এলিন শারমিন, কুশল, মাহবুব, লাজ পারিশা, মিথুন, বন্দিতা, প্রিন্স, মাইশা রহমান, অজয়, রুদ্র শোভন, কান্তা ও পাশা প্রমুখ প্রায় দুই ঘন্টা নাচ গান এবং আবৃত্তি দিয়ে আমাদের আবিষ্ট করে রেখেছিল। এই পর্বে ব্রিসবেনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে।

তবে ব্রিসবেন বাংলা রেডিওর নিয়মিত কয়েকজন শিল্পীর পরিবেশনা আমাকে বেশি আকৃষ্ট করেছে। বিশেষ করে অবনি মাহবুবের গান এবং স্বাগতা দাসের আবৃত্তি ভোলার মতো নয়। অবনি তার মতো করেই রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছেন কিন্তু স্বাগতা মহাভারতের চরিত্র দ্রৌপদীর নিজস্ব কিছু কথা নিয়ে লেখা একটি কবিতা এবং পশ্চিমবঙ্গের জেলা বাঁকুড়ার আঞ্চলিক ভাষার আরেকটি কবিতা পড়ে আবৃত্তির যে কারুকাজ দেখালেন, তা খুব সচরাচর চোখে পড়ে না।

এই পর্বে আরও দুজন শিল্পীর পরিবেশনা আমার অনেক দিন মনে থাকবে। সুচরিতা দাস এবং ইমন চৌধুরী। সুচরিতা দাস ব্রিসবেনের খুব পরিচিত একজন শিল্পী। অনেক অনুষ্ঠানে তাকে একাই পাঁচটি সাতটি গান গাইতে আমি দেখেছি। ইমন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষক, এখানে কিউইউটিতে পিএইচডি করছেন। ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি’ গানের তালে তার মনকাড়া নৃত্য দেখে আমার পাশে দাঁড়ানো এক অস্ট্রেলিয়ান দর্শকের অভিমত সোজা বাংলায় অনুবাদ করলে হয়-আমি জীবনে খুব কম এমন সুন্দর নৃত্য দেখেছি।


এই পর্বের সমান্তরালে বাচ্চাদের আঁকিবুঁকি, ফানগেম এবং পেইন্টিংয়ের আরেকটি পর্ব চলছিল। অনেকেই বাচ্চাদের গালে হাতে তুলি আর রঙের ব্যবহারে নানান রঙের আলপনা আর ফুলের চিত্র এঁকে দিচ্ছেন। ছবির মতো সুন্দর এই বাচ্চাগুলো গালে, হাতে আলপনা নিয়ে নিয়ে চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কী অপূর্ব রকম ভাবে মানিয়ে গিয়েছিল! আমার মেয়ে রিদা তার বান্ধবী সাহারকে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে ছবি আঁকল। রিদা সাধারণত প্রকৃতির ছবি আঁকে।

মেলায় লাল সাদার এত জমকালো উপস্থিতি দেখেই হোক অথবা সাহারকে বাঙালি পোশাকে দেখেই হোক, সে লাল সাদার জমিনে কুলা এবং প্রজাপ্রতির ছবি আঁকল। এই পর্যায়ে এসে হঠাৎ খেয়াল করলাম, মেলার মাঠ লোকে লোকারণ্য। কারণটি অবশ্য আগেই জানা ছিল তাই অবাক হইনি। মুনমুন আফরোজের পরিচালনায় ঠিক ৪টা থেকেই স্টেজে ওঠার কথা ছিল নব্বই দশকের জনপ্রিয় উইনিং ব্যান্ডের বর্তমান ভোকালিস্ট ও গিটারিস্ট জামান আলী চন্দন।

বাংলাদেশ থেকে কোনো জনপ্রিয় শিল্পী এখানে আনতে অনেক খরচের হিসাব করতে হয়। সাধারণত একটি নির্দিষ্ট টিকিটের বিনিময় মূল্য ছাড়া চন্দনের মতো জনপ্রিয়দের কনসার্টের ব্যয় বহন করাটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ব্রিসবেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন সেই কঠিন কাজটি করে দেখাল। এখানে আমরা যারা প্রবাসী, তাদের প্রায় অর্ধেকের বেশি চন্দনদের সমসাময়িক শিল্পীদের গান শুনে শুনে বড় হয়েছি। সুতরাং চন্দনের গান শুনতে ব্রিসবেনের বাঙালিদের ঢল নামবে সেটা মোটামুটি আমার ধারণাতেই ছিল।

কিন্তু যা ধারণাতে ছিল না সেটা হলো এত বছর পরেও, তিনি ঠিক সেই ৯০ দশকের মতো করেই গাইবেন ও বাজাবেন। উইনিং থেকে যেহেতু চন্দন একাই এসেছিলেন স্থানীয় কয়েকজন তার সঙ্গে বাজিয়েছেন। যদিও তার সঙ্গে যারা বাজিয়েছেন তাদের দু-একজন তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। এর পরেও চন্দনতো চন্দনই। তিনি একাই টেনে নিয়ে গেছেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সবাইকে আটকে রেখেছেন প্রায় তিন ঘণ্টা। একে একে শুনিয়েছেন ‘হৃদয় জুড়ে যত ভালোবাসা’, ‘ইচ্ছে করে’, ‘ওগো সোনার মেয়ে’, ‘ওই দূর পাহাড়ের ধারে’—দর্শক নন্দিত সবগুলো গান।

সভাপতি বিকাশ সিকদার যখন মেলার সমাপ্তি টানতে তার পুরো কার্যকরী পরিষদকে নিয়ে স্টেজে উঠলেন, তখনো আমি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। সংবিৎ ফিরে যখন বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম তখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না যে পুরো একটি দিন এমন উন্মাদনা আর উৎসবের মধ্যে কাটিয়ে দিয়েছি। আমার মতো হতভাগারা যারা বাংলাদেশের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, রূপ, গন্ধ, বর্ণ বুকে নিয়ে মৃতের মতো প্রবাসী জীবনে পড়ে আছে, তাদের জন্য এই রকম অনুষ্ঠান এক পরম পাওয়া। আর এই সুযোগটি করে দেওয়ার জন্য ব্রিসবেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের সকল কর্তাব্যক্তিদের অসংখ্য ধন্যবাদ।


শেষ করার আগে অ্যাসোসিয়েশনের প্রতি দুটি অভিমত দিতে ইচ্ছে করছে। তারা যদি বৈশাখী মেলা এত দেরিতে না করে বৈশাখের প্রথম শনিবারে করেন তাহলে ভালো দেখায়। আর সে কাজটি করার জন্য তারা তাদের বাৎসরিক কার্যসীমা এমনভাবে নির্ধারণ করতে পারেন যাতে বৈশাখী মেলাটি নতুন কমিটির হাতে না পড়ে বিদায়ী কমিটির শেষ অনুষ্ঠান হিসেবে পড়ে। এতে নতুন কমিটিকে দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মাথায় এমন বড় অনুষ্ঠানের ঝামেলায় মধ্য দিয়ে যেতে হবে না। একই সঙ্গে বিদায়ী কমিটির শেষ অনুষ্ঠান হিসেবে থাকলে তারাও এক বছর সময় হাতে নিয়ে আরও জমকালো, আরও পরিপাটি করে বৈশাখী মেলা করতে পারবেন।

আর দ্বিতীয়টি হলো—অ্যাসোসিয়েশনের উচিত বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে শুধু বাঙালি বা পরিচিত গণ্ডির মধ্যে না রেখে অন্যান্য যেসব দেশ বাংলা নববর্ষ পালন করে সেসব দেশের প্রবাসী কমিউনিটিকেও সম্পৃক্ত করা। ভারতের ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ আমাদের সঙ্গেই বাংলা নববর্ষ পালন করে। নেপালেও ‘ফুলেল নববর্ষ’ নামে বাংলা নববর্ষ পালিত হয়। এ দিনটি নেপালে সরকারি ছুটি থাকে।

ব্রিসবেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন যদি ব্রিসবেনভিত্তিক এই সবগুলো কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করতে পারে তাহলে আমাদের সংস্কৃতির যেমন প্রসার ঘটার একটি সুযোগ থাকবে তেমনি এই ‘বৈশাখী মেলা’ এক সময় ব্রিসবেনের অন্যতম প্রধান বহুসাস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও স্বীকৃতি পাবে বলে আমি মনে করি।

আর/১০:১৪/১৩ মে

ইউরোপ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে