logo

লোকসংগীতের মুকুটহীন সুরসম্রাট বিদিত লাল দাস আর নেই

সাব্বির আহমদ



	লোকসংগীতের মুকুটহীন সুরসম্রাট বিদিত লাল দাস আর নেই

সিলেট, ৮ অক্টোবর: ‘সাধের লাউ বানাইলো মোরে বৈরাগী’, ‘‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’, ‘কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো’, ‘বিনোদিনী গো তোর বৃন্দাবন কারে দিয়ে যাবি’ এমন বহু জনপ্রিয় গানের সুরস্রষ্টা বিদিত লাল দাস আর নেই। চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তার জনপ্রিয়তা তাকে লোকসংগীতের মুকুটহীন সম্রাটের স্থান দিয়েছে।

সোমবার সকাল ৬টায় ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। একইদিন সন্ধ্যা ৭টায় তার লাশ সিলেটে এসে পৌঁছায়।

গত ৭ সেপ্টেম্বর অসুস্থ অবস্থায় বিদিত লাল দাসকে সিলেটের এলাইড ক্রিটিক্যাল কেয়ার হসপিটালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু তার অবস্থার অবনতি ঘটলে ২১ সেপ্টেম্বর তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। ৪ অক্টোবর থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।

মঙ্গলবার দুপুরে সর্বস্থরের মানুষের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য তার লাশ সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য রাখা হবে। এর পর বিকেলে নগরীর চালিবন্দরস্থ শশানে তার অন্ত্যেস্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হবে।
তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘আমরা সাংস্কৃতিক জগতের এক উজ্জল নক্ষত্র হারালাম।’

আরো শোক প্রকাশ করেছেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, রুপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহমদ আল কবীরসহ অনেক বিশিষ্টজন।

ছোটবেলা থেকে গান শিখতে শুরু করেন অভিজাত পরিবারের সন্তান বিদিত লাল দাস । তার বাবা ভালো সেতারা বাঁজাতেন। গান-বাজানার রেওয়াজ তার বাড়িতে অনেক আগে থেকেই ছিলো।

সুরের মানুষ হিসেবে তাঁর ভুবনজোড়া পরিচিতি থাকলেও ডাক নাম,‘পটল বাবু’ নামে সিলেটে সবাই চেনে। জমিদার পরিবারের সন্তান তিনি। স্বর্গীয় বিনোদ লাল দাস ও প্রভা রাণী দাসের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে সন্তানের মধ্যে বিদিত লাল দাস পঞ্চম। ১৯৩৮ সালের ১৫ জুন জমিদার পরিবারের নবম পুরুষ হিসেবে জন্ম তাঁর।

মাত্র ৭ বছর বয়সে সংগীতকে জীবনসাথী করে নিয়েছিলেন বিদিত রাল দাস। সেই থেকে সংগীত ও সুরসাগরে ভেসে ভেড়ানো। ১৯৪৬ সালে আসামে চলে যান । সেখানে তার শিক্ষা শুরু হয়। বিখ্যাত শিলং সেইন্ট অ্যাডভান্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি।  

১৯৫৯ সালে বাবার অসুস্থতার খবর শুনে সিলেট ফিরে আসেন। তারপর আর শিলংয়ে যাওয়া হয়নি। তার সংগীত শেখার গুরু তাঁর ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ।

১৯৭২ সালে একটি গানের দল গঠন করেন তিনি। লল্ডন, চীনসহ অনেক দেশেই এই দল নিয়ে গান পরিবেশন করেন তিনি।

বিদিত লাল দাস মরমি কবি হাসন রাজাসহ অনেক খ্যাতনামা লোককবির কথাকে সুর দিয়ে গানের ভুবনে খ্যাতি অর্জন করেছেন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে ক`জন শিল্পী দীর্ঘদিন ধরে লোকসঙ্গীত চর্চা করছেন এবং লোকসঙ্গীতের ওপর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে বিদিত লাল দাস ছিলেন অন্যতম। পেয়েছেন অনেক সম্মাননা।

সিলেটের শেখঘাট এলাকায় প্রাসাদ সৃদৃশ বাড়ি তার। বাড়ির সামনে ঘরেই ২০০৪ সাল থেকে ‘নীলম্ব লোকসংগীতালয়’ নামে একটি সংগীতের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন তিনি।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার স্বপ্ন ছিলো সিলেটে হাসন রাজার উপর একটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় অথবা মরমীকবিদের নিয়ে একটি সংগ্রহশালা করা। সুরমা পারের গান নামে তার একটি বইও বেরিয়েছে।

দুই ছেলের জনক বিদিত লাল দাস। এক স্ত্রী কনক রানী দাস। এক ছেলে নীলম ছোট থাকতেই মারা গেছে। আরেক ছেলে বিশ্বজিৎ মেডিকেলে পড়াশোনা করছেন।