logo
সব এমএলএম কোম্পানি লুটেরা

সব এমএলএম কোম্পানি লুটেরা

ডেসটিনিসহ সব মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানিগুলো সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে সম্পদ কুক্ষিগত ও লুটপাট করছে বলে মনে করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান গোলাম রহমান। তিনি বলেন, 'এমএলএমের নামে সারাদেশে লুটপাট চলছে। মানি লন্ডারিং হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করার যে কর্মকা- চলছে; যারা অধিক অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে ঠকাচ্ছে, তাদের শাস্তি হওয়া দরকার।' ডেসটিনি বিষয়ে তিনি বলেন, দুদকের তদন্ত কমিটি ডেসটিনির পরিচালকদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে একটি প্রতিবেদন পেশ করবে এবং তার ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনে তাদের সম্পত্তির হিসাব চেয়েও নোটিশ দেয়া হতে পারে বলে জানান গোলাম রহমান। তবে ডেসটিনি গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা লুটেরা পরিচালক রফিকুল আমীনের দাবি, ১০০ কোটি টাকার কর ফাঁকি এবং প্রতিষ্ঠানের হিসাব থেকে ব্যক্তিগত হিসাবে ১০০ কোটি টাকা সরানোর অভিযোগ এক তরফাভাবে গণমাধ্যমের তৈরি। তারা কোনো ধরনের ট্যাক্স ফাঁকি দেননি। বুধবার দুপুর ১টা ২০ মিনিটের দিকে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যালয়ে ডেসটিনির ট্রি প্লানটেশন প্রকল্পের কাগজপত্র জমা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। রফিকুল আমীন বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ট্যাক্স ফাঁকির যে অভিযোগ দিয়েছে তা সুনির্দিষ্ট নয়। কোন খাতে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া হয়েছে তা বলা হয়নি। কোথায় কোথায় ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া হয়েছে তা জানাতে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়েছে বলে জানান রফিকুল আমীন। এদিকে বুধবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় ডেসটিনির অন্যতম পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন, মেজবাহ উদ্দিন স্বপন, ইরফান আহমেদ সানিকে। মানি লন্ডারিং, অবৈধ ব্যাংকিং ও কয়েকটি অনিয়মের বিষয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। দুদকের নোটিশ অনুযায়ী অপর পরিচালক তারিকুল হুদা সরকারের বুধবার কমিশনে হাজির হওয়ার কথা থাকলেও তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ডেসটিনির তিন পরিচালক তাদের বৈধ আয়, অবৈধ ব্যাংকিং, প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে টাকা হস্তান্তর সম্পর্কে যৌক্তিক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপারেও অকাট্য কোনো যুক্তি দাঁড় করাতে না পেরে কৌশলি উত্তর দিয়েছেন। ব্যক্তিগত হিসাবের বড় অঙ্কের টাকাকে বেতন ভাতা ও ডিভিডেন্টের বলে দাবি করলেও কমিশন তাতে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। একজন পরিচালকের হিসাবে এক মাসে ৬৭ লাখ টাকা বেতন ভাতা হিসাবে কিভাবে স্থানান্তর হয়েছে তা জানতে চায় কমিশন। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় ডেসটিনির ট্রি প্লানটেশনের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে নয় শ' কোটি টাকা সংগ্রহের বিষয়েও। তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছে- তাদের (পরিচালক) টাকার পরিমাণ এত বেশি তাহলে অনারিয়াম ডিভিডেন্টগুলো এত বেশি হলো কেন? তখন তারা জানান, তাদের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আছে। এবং সেই অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের সাথেও তারা জড়িত। সেখান থেকেও তারা বেতন ভাতা পান। তবে দুদকের কাছে তাদের এসব ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। দুদক এসব বিষয়গুলো বিচার বিশ্লেষণ করবে এবং এসব তথ্যে কতটা বিশ্বাসযোগ্য তা যাচাই করবে বলে জানান কমিশনের কর্মকর্তারা। এদিকে ডেসটিনির পরিচালক ও বিভিন্ন কর্মকর্তাদের অ্যাকাউন্টে মাসে কিভাবে ৬০-৭০ লাখ টাকা জমা হয়েছে? এ টাকা সাধারণ গ্রাহকদের কিনা- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে রফিকুল আমীন দাবি করেন, তারা কারো টাকা আত্মসাৎ করেননি; বৈধভাবেই এ টাকা উপার্জন করেছেন। এ ব্যাপারে যুক্তি দেখিয়ে তিনি বলেন, এটার ব্যাখ্যা হচ্ছে আমাদের কোম্পানি কয়টা? এক লোক তো অনেক সময় ১৫-১৬টা কোম্পানির দায়িত্বে থাকে। সেই লোক আবার ডায়মন্ড এক্সিকিউটিভ। নরমাল ডিস্ট্রিবিউটর না। সে লোক আবার বিভিন্ন রকম পণ্য বিক্রি করছে। আমরা প্রত্যেকে যারা পরিচালক তারা প্রত্যেকেই এই কোম্পানির প্রথম দিকের ডিস্ট্রিবিউটর। এগারো বছর আগে আমরা ডিস্ট্রিবিউটর হয়েছি। যে কোনো ধরনের ভলিউমের পণ্য বিক্রি করলে একজন লোক কম বেশি সাড়ে ১০% কমিশন পায়। এই সাড়ে ১০% যদি ৬৭ লাখ হয় তাহলে তাকে ওই পরিমাণ পণ্য বিক্রি করতে হবে। সব মিলিয়ে ডেসটিনির একজন কর্মকর্তা অনায়াসেই ৫০-৬০ লাখ টাকা বৈধভাবে উপার্জন করতে পারেন বলে দাবি করেন রফিকুল আমীন। তিনি আরো বলেন, ডেসটিনি ১১ বছরের প্রতিষ্ঠান। এর কাগজপত্র ১১ দিনে দেয়া সম্ভব না। তারপরও আমরা ৯০ শতাংশ কাগজপত্র জমা দিয়েছি। বাকি কাগজপত্র দিতে আমাদের সময় দিতে হবে। বিভিন্ন অভিযোগকারীর প্রসঙ্গে রফিকুল আমীন বলেন, 'অভিযোগকারীরা তো আমাদের কাছে আসে না। এরা তো সব অদৃশ্য।' অভিযোগকারীদের সম্পর্ক তাহলে শুধু গণমাধ্যমের সঙ্গে কি না এ নিয়েও প্রশ্ন করেন তিনি। দুদকের অনিয়ম তদন্তে কমিশন গঠনের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে রফিকুল আমীন বলেন, কমিশন গঠন মানেই খারাপ কিছু না। 'রফিকুল সরকার আর বাংলাদেশ সরকার এক জিনিস না' মন্তব্য করে রফিকুল আমীন বলেন, যুবকের মতো কমিশন গঠন নেতিবাচক হলেও সব কমিশনই নেতিবাচক নয়। দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত সেলের পরিচালক স্কোয়াড্রন লিডার মো. তাহিদুল ইসলামের বিশেষ তত্ত্বাবধানে উপ-পরিচালক মোজাহার আলী সরদার ও সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তৌফিক ডেসটিনির অর্থ পাচারসহ প্রতারণার বিষয়ে তদন্ত করছেন। প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের এমএলএম (বহুস্তর বিপণন) পদ্ধতিতে গ্রাহকদের কাছ থেকে ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬৬টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে তিন হাজার ৫৯৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছে এবং বিভিন্নভাবে তিন হাজার ৫৮৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে। ট্রি প্লানটেশনের নামে ১৩৩টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ৯২১ কোটি তিন লাখ টাকা সংগ্রহ করে এবং বিভিন্নভাবে ৯০০ কোটি টাকা নিজেরাই তুলে নিয়েছে। ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির নামে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে ৮৩টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে এক হাজার ৪৪৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা সংগ্রহ করে বিভিন্ন উপায়ে এক হাজার ৪১৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। এভাবে মোট পাঁচ হাজার ৯৬১ কোটি ৮২ লাখ টাকা সংগ্রহ করে তার মধ্য থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন ডেসটিনি গ্রুপের পরিচালকরা। দুদকের নোটিশ অনুযায়ী আজ ডেসটিনির পরিচালক হোসনে আরা ইসলাম, ফারাহ দীবা, সেলিনা রহমান ও মিতু রানী বিশ্বাসকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আগামী রোববার জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে পরিচালক নেপাল চন্দ্র বিশ্বাস, শেখ তৈয়বুর রহমান, আবুল কালাম তালুকদার ও জাকির হোসেনকে। এরপর ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীনসহ অন্যদের দ্বিতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কিনা এবং জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব কবে নাগাদ শেষ হবে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানাতে পারেননি দুদক কর্মকর্তারা। কমিশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, এটা নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। যদিও আইনে ১৫ কর্মদিবসের কথা রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে আরো ১৫ দিন দেয়ার বিধান রয়েছে। তবে ডেসটিনির যে বিশাল কর্মযজ্ঞ, তাতে নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না কবে তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, এদের (ডেসটিনি) নাকি ৩ ডজনের বেশি প্রতিষ্ঠান আছে। ইনভেস্টমেন্ট হাজার হাজার কোটি টাকা, কাজেই ৩ জন কর্মকর্তাকে দিয়ে অল্পসময়ে তদন্ত প্রতিবেদন করা অসম্ভব। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে যে সময় দেয়া দরকার, কমিশন সে সময় দেবে।