logo

জিকা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রয়োজন নতুন অস্ত্র

মেহেদী হাসান


জিকা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রয়োজন নতুন অস্ত্র

ঢাকা, ৩১ জানুয়ারি- সপ্তাহের প্রতি কর্মদিবসে সকাল সাতটায় দক্ষিণ ব্রাজিলের শহর পাইরাছিকাবা দিয়ে একটি মশাবাহী কার্গো নিয়ে একটি ভ্যান যায়। প্রায় এক লাখ মশাবাহী কার্গোটি থেকে মশাগুলোকে ভ্যানের জানালা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় এবং মশাগুলো তাদের সঙ্গীদের খুঁজতে উড়ে যায়।

কিন্তু এই মশাগুলো কোনো সাধারণ মশা নয়। জেনিটিক্যালি ইঞ্চিনিয়ার্ড এসব মশার বংশবিস্তার করানো হয় যাতে তারা তাদের সন্তানদের মধ্যে প্রাণঘাতী জিন দিতে পারেন যা তাদের পূর্ণ বয়স্ক হওয়ার আগেই মেরে ফেলবে। ছোট্ট পরীক্ষায় দেখা গেছে এই পদ্ধতি মশার বংশবিস্তার শতকরা ৮০ ভাগ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে।

ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু এবং আরো কিছু প্রাণঘাতী রোগ ছড়িয়ে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটায় এই মশা। মানুষ এবং মশার মধ্যে এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জৈব প্রযুক্তি এরই মধ্যে একটি বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী মানুষকে মশার রোগ থেকে রক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছে বিল গেটসের ফাউন্ডেশন। এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বিল গেটস বলেন, যখন মানুষের মৃত্যুর বিষয়ে কথা আসে তখন দেখা যায় মশার মতো আর কোনো প্রাণীই মানুষের মৃত্যুর জন্য এতোটা দায়ী নয়।

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া তথ্যানুযায়ী ব্রাজিল এবং ল্যাটিন আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েছে মশাবাহী প্রাণঘাতী রোগ জিকা ভাইরাস। আর এরপরই নতুন করে আলোচনায় আসে মশা নিধনের বিষয়টি।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা নিরোধের জন্য নতুন কোনো পদ্ধতির প্রয়োজন। কারণ, কীটনাশক এবং জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলার মতো কাজগুলোতে বড় পরিসরের কোনো উপকার হচ্ছে না।

সাও পাওলোর সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আরতুর টাইমারম্যান এ বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন, প্রায় তিন দশক ধরে আমরা এভাবে মশা নিধনের কাজ করে যাওয়ার পরও গত বছর ব্রাজিলে প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। সুতরাং গুরুতরভাবে নতুন পদ্ধতি ব্যবহার আবশ্যক।

কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে যে কার্যকর সেটা আগে প্রমাণিত হতে হবে এবং তার জন্য কয়েক বছর সময়ের প্রয়োজন। তবে জিকার সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য ভ্যাকসিন খুব তাড়াতাড়ি আবিষ্কার হচ্ছে বলে আশা করা যাচ্ছে না।

সুতরাং বিশেষজ্ঞদের মতে এই সংক্রামক হতে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন মশা নিধনের পূর্ববর্তী কাজগুলোই অবলম্বন এবং মশার কামড়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য রেপেলেন্ট ব্যবহার এবং সারা শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরিধান।

নারীদের গর্ভবতী না হওয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে এবং যদি কেউ গর্ভবতী হন তবে তাকে মশার উপদ্রব আছে এমন স্থান এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, গর্ভবতী মা যদি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন তবে তার বাচ্চা ছোট মাথা এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মায়।

মশা নির্মূলের অপর একটি উপায় হতে পারে ডিডিটি ব্যবহার। তবে পরিবেশের ক্ষতির জন্য অনেক দেশই এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। যদিও অনেকে এখনো এটির ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন তবে অনেক বিশেষজ্ঞই আবার রোগ প্রতিরোধের জন্য এর ব্যবহারের বিরোধিতা করছেন।

ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান অক্সিটেকে জেনেটিক্যালি ইঞ্চিনিয়ার্ড মশা আয়েডেস ইজিপটিকে উন্নতকরণ করেন যা ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য ব্যবহৃত হতো তবে জিকা প্রতিরোধেও এটি বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রতিষ্ঠানটির দেয়া তথ্যানুযায়ী, ব্রাজিলের শহর পারাছিকাবাতে ২০১৫ সালের শেষ দিকে এই মশা ছাড়ার পর সেখানে ক্ষতিকর মশার পরিমাণ ৮২ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে।

ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান এবং পাইরাছিকাবা তাদের চুক্তি এক বছর বাড়িয়েছে যার অংশ হিসেবে তারা ৬০ হাজার মানুষকে মশার উপদ্রব থেকে নিরাপত্তা দিবে। অপরদিকে প্রতিষ্ঠানে নতুন একটি কারখানা খুলছে যার দ্বারা তারা প্রায় তিন লাখ মানুষকে সহায়তা করতে পারবে।

ব্রাজিলের এক কমিশনার ২০১৪ সালে অক্সিটেককে মশা ছাড়ার অনুমতি দিলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো ব্রাজিলের স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে অনুমতি পায় নি।

প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হেডেন প্যারি বলেন, জিকা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ব্রাজিলের আরো কয়েকটি পৌরসভা থেকে আমদের প্রযুক্তি সম্পর্কে লোকজনের আগ্রহের কথা জানতে পেরেছি।

এদিকে অপর একটি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে বিল গেটসের ফাউন্ডেশন।

বিশেষজ্ঞদের মত যে প্রযুক্তিরই ব্যবহার করা হোক না কেন এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্চ লোকজনকে এই রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা করা।