logo

হাইড্রোজেন বোমা আতঙ্কে বিশ্ব

হাসান জাবির


হাইড্রোজেন বোমা আতঙ্কে বিশ্ব

পিয়ংইয়ং, ২৯ জানুয়ারী- থারমোনিউক্লিয়ার ডিভাইস বা হাইড্রোজেন বোমা হচ্ছে উচ্চ ধ্বংসক্ষমতাসম্পন্ন অপ্রচলিত পরমাণু বোমা। প্রচলিত পরমাণুু বোমার সঙ্গে হাইড্রোজেন বোমার মূল পার্থক্য হচ্ছে এটি বিস্ফোরক নির্গত করা হয় বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায়। প্রচলিত পরমাণুু বোমার চেয়ে অধিক ধ্বংসক্ষমতা সৃষ্টি করাই যেহেতু হাইড্রোজেন বোমার প্রধান উদ্দেশ্য, সে কারণে হাইড্রোজেন বোমার ধ্বংসক্ষমতা বাড়াতে এর ভেতরে আরও একটি অতিরিক্ত ক্ষুদ্রাকৃতির প্রচলিত পরমাণুু বোমা স্থাপন করা থাকে। ফলে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় পরমাণুু বিক্রিয়ার মান উন্নীত হয়ে হাইড্রোজেন বোমা অতিরিক্ত ধ্বংসক্ষমতা সৃষ্টি করে।

হাইড্রোজেন বোমার আরও একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর আকৃতি হয় অপেক্ষাকৃত ছোট। আকৃতিগত কারণে হাইড্রোজেন বোমা ক্ষেপণাস্ত্রে সংযোজন করা সহজতর। অন্যদিকে ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে পরমাণুু আক্রমণ ফলপ্রসূ ও নিখুঁত হওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। উত্তর কোরিয়া নিজের ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। বস্তুত দেশটির গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র ‘তাইপেডং-২’। ক্ষেপণাস্ত্রটির প্রথম দুটি পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হওয়ার কারণে এর আক্রমণ সাফল্য নিয়ে সন্দিহান হয় পিয়ংইয়ং। কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারনে তাইপেডং-২ কিংবা দেশটির অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্রে বৃহৎ আকারের প্রচলিত পরমাণুু যুদ্ধাস্ত্র স্থাপন করা কিছুটা দুরূহ। যে কারণে তাইপেডং-২-এর সাহায্যে দেশটি সাবলীল আক্রমণের অনিশ্চয়তায় নিজের পরমাণুু কৌশলে পরিবর্তন আনতে সচেষ্ট ছিল। যে প্রক্রিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্রের গতি ঠিক রেখে অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের হাইড্রোজেন বোমা ক্ষেপণাস্ত্রের অগ্রভাগে জুড়ে দেওয়াই যৌক্তিক মনে করছে উত্তর কোরিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞরা। ফলে দেশটি তার প্রচলিত আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তার শত্রু রাষ্ট্রগুলোয় আক্রমণ সক্ষমতা অর্জন করল।

যদিও এই সক্ষমতার মাধ্যমে নিজের আত্মরক্ষা নিশ্চিত করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে দেশটি।  উত্তর কোরিয়ার হাইড্রোজেন বোমা তৈরি এবং পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের প্রতিক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ঘটনার পাল্টা সমুচিত জবাব দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।  ’৫৪ সালে হাইড্রোজেন বোমার আধুনিক যুগ শুরু হয় পরমাণুু-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি চমকপ্রদ বৈজ্ঞানিক সাফল্যের সূত্র ধরে। এর অব্যবহিত পর থেকে বর্তমান অবধি শুধু রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ব্রিটেনই এ ধরনের বোমা উৎপাদন ও মজুদ করতে সক্ষম হয়েছে। সংগত কারণেই উত্তর কোরিয়া কর্তৃক সর্বশেষ হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষা বৈশ্বিক সামরিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যময় ঘটনা। এই সাফল্যের সত্যতা নিশ্চিত হলে উত্তর কোরিয়ার পরমাণুু সক্ষমতা অগ্রসরমান শক্তিধর দেশের সংক্ষিপ্ত তালিকায় প্রবেশ করবে। হাইড্রোজেন বোমার অধিকারী হওয়ার গৌরব দেশটির সামরিক আকাক্সক্ষার চূড়ান্ত অর্জন। ফলে কোরীয় উপদ্বীপের বিদ্যমান সমীকরণে উত্তর কোরিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি করে আঞ্চলিক সামরিক উত্তাপে নতুন মাত্রা দেবে নিঃসন্দেহে।   

২০০৬ সাল থেকেই উত্তর কোরিয়া আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর আপত্তি উপেক্ষা করে ধারাবাহিকভাবে পরমাণুু অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়ে আসছে। পিয়ংইয়ংয়ের এই আগ্রাসী তৎপরতায় কোরীয় উপদ্বীপ পরিস্থিতিতে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত পক্ষগুলো যথারীতি উদ্বিগ্ন। সর্বশেষ পরমাণুু অস্ত্র পরীক্ষায় জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ইতিমধ্যে দেশটিকে তিরস্কার করেছে। রাশিয়া ও চীন মনে করে উত্তর কোরিয়ার এই পদক্ষেপ নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট ব্যত্যয়। একই সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও বিনষ্ট করার পদক্ষেপ। তবে এ ঘটনায় সর্বাধিক আতঙ্কিত হয়ে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় দুই মিত্র জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সেনা উপস্থিতি উত্তর কোরিয়া নিজের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সত্যিকার ও গঠনমূলক হুমকি মনে করে। কোরীয় সংকটের সূচনালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত আঞ্চলিক মার্কিন সামরিক উপস্থিতি পিয়ংইয়ংয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে।

উত্তর কোরিয়ার জাতীয় পরিস্থিতি প্রভাবিত করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই সামরিক হুমকি প্রদর্শন করে। সংগত কারণেই আন্তঃকোরীয় সংকট সম্প্রসারিত হয়ে উত্তর কোরিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সামরিক বিরোধের উত্তাপ ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। বস্তুত ২০০৬ সালে কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণুু অস্ত্র মুক্ত ছয় জাতি আলোচনা উত্তর কোরিয়াকে অস্ত্রে উৎপাদন এবং পরীক্ষা থেকে নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হয়। ছয় জাতি আলোচনার ফলাফল অনুসরণ করতে মার্কিন অনীহা উত্তর কোরিয়ার মনে নতুন সন্দেহের উদ্রেক করে। এ পর্যায়ে মার্কিন সামরিক হুমকি মোকাবেলায় দেশটির পরমাণুু আকাক্সক্ষা তীব্র করে। বস্তুত ছয় জাতি আলোচনার ব্যর্থতা কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণুু অস্ত্র মুক্ত রাখার আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া তখনই নিঃশেষ হয়ে যায়।

১৯৫৩ সালে অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধের পরিসমাপ্তি সত্ত্বেও আন্তঃকোরিয়া বিরোধ আধুনিক বিশ্ব রাজনীতিতে সর্বাধিক জটিল ইস্যু। মূলত দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ব্যাপক স্বার্থসংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে কোরীয় সংকটের বহুপক্ষীয় সামরিক উত্তেজনা সর্বদাই অবনতিশীল। সংগত কারণেই আঞ্চলিক সামরিকীকরণের অব্যাহত প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ঘটনা সংকটের সামরিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে উত্তাপ আরও সম্প্রসারিত করবে। হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের সরাসরি সামরিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল। যে ঘটনা খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কার্যকর হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হলো। ফলে উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন সামরিক আধিপত্য স্পষ্টভাবে কৌশলগত দুর্বলতার মুখে পড়ল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে জাপান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত অবিভক্ত কোরিয়ার দুই অংশে মার্কিন এবং সোভিয়েত সামরিক উপস্থিতি আজকের কোরীয় সংকটের ঐতিহাসিক কারণ। বস্তুত সে সময় ইউরোপ রণাঙ্গনে বিজয়ী পরাশক্তিসমূহের মধ্যে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ক্রমেই বিস্তৃত হয়। ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের কারণেই এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় রুশ নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত করে। এই সূক্ষ্ম সমীকরণ পাল্টে দিতে বহুমাত্রিক দৃশ্যপট সৃষ্টি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই সূত্র ধরে কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিন সেনা অনুপ্রবেশে আন্তঃকোরিয়া বিরোধের বীজ রোপিত হয়। কোরীয় পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপের কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবসানের স্বল্প সময়ের ব্যবধানে রাশিয়া ও চীনের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা আরেকটি প্রত্যক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। অবশ্য এর আগেই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ৩৮ ডিগ্রি অক্ষরেখা বরাবর অবিভক্ত কোরিয়া ভেঙে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া নামক দুটি আলাদা রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তী সময়ে পরাশক্তিসমূহের প্রত্যক্ষ মদদে দুই কোরিয়া প্রকাশ্য লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে।

’৯০ পরবর্তী বিশ্ব প্রেক্ষাপটে একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক আধিপত্য, নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার প্রয়াস পায়। শক্তির ভারসাম্যহীন বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য তৎপরতা, অব্যাহত হুমকিতে ক্রমেই ক্ষিপ্ত হয় উত্তর কোরিয়া। কিন্তু গত দশকের শুরু থেকেই বিশ্ব পরিস্থিতির পরিবর্তিত বাস্তবতা কোরীয় উপদ্বীপে শক্তির ভারসাম্য ফেরায়। যে কারণে বিদেশি সেনা উপস্থিতির অবসান করতে উত্তর কোরিয়া দৃঢ় অবস্থান নেয়। এ পর্যায়ে উত্তরোত্তর পিয়ংইয়ং-ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তপ্ত বাকযুদ্ধ, সামরিক উত্তেজনা পরিলক্ষিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মারমুখী সামরিক তৎপরতা সীমিত করতে উত্তর কোরিয়ার পরমাণুু অস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। কোরীয় উপদ্বীপের জটিলতায় মার্কিন অংশীদারত্ব সংযত করবে উত্তর কোরিয়ার এই সাফল্য। কোরীয় উপদ্বীপে সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কা এবং ফলাফল নির্ধারণ করার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত উত্তর কোরিয়ার হাইড্রোজেন বোমা।

ইতিমধ্যে ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে নিজের পরমাণুু অস্ত্র সজ্জিত বি-৫২ বিমান পাঠিয়ে আঞ্চলিক মিত্রদের আশ্বস্ত করে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ নতুন কিছু নয়। কয়েক মাস আগেও দেশটি ওই অঞ্চলে বি-৫২ বিমান পাঠিয়ে চীনের বিরাগভাজন হয়। অন্যদিকে কোরীয় সংকটের গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ এবং উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বিপরীতে দেশটি এই ঘটনায় সৃষ্ট উৎকণ্ঠায় শামিল হয়ে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে একযোগে উত্তর কোরিয়াকে নিন্দা জানায়। কিন্তু এ ধরনের নিন্দা উত্তর কোরিয়াকে সম্পূর্ণভাবে সংযত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নয়। কিন্তু কোরীয় সংকটের বর্তমান অবস্থার অবসান করতে বহুপক্ষীয় আলোচনাই একমাত্র পথ। আর আলোচনার এই পথ নির্বিঘœ রাখতে প্রথমেই ওই অঞ্চলে সব পক্ষের সামরিক তৎপরতা সীমিত করে আঞ্চলিক সন্দেহ অবিশ্বাস দূর করতে হবে।

এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়মিত সামরিক প্রদর্শনী বন্ধ করে তা হলে উত্তর কোরিয়া ও চীনকে চেপে ধরা সক্ষম হবে। কিন্তু সামরিক উত্তাপে সংযুক্ত থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তিমূলক মনোভাব কার্যত আঞ্চলিক সংকট আরও ঘনীভূতই করবে। সর্বশেষ ঘটনা কোরীয় সংকট সমাধানে সামরিক সংঘাত শুরু হলে হাইড্রোজেন বোমাই হবে ফলাফল নির্ধারক। উত্তর কোরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে এই বার্তাই দিয়েছে।