logo

‘ডেথ ফোবিয়া’ আক্রান্ত মুসা বিন শমসের দুদককে ‘দিয়েছেন’ সব তথ্য

‘ডেথ ফোবিয়া’ আক্রান্ত মুসা বিন শমসের দুদককে ‘দিয়েছেন’ সব তথ্য

ঢাকা, ২৮ জানুয়ারী- দুর্নীতি দমন কমিশনে গিয়ে সুইস ব্যাংকে তার ‘আটকে’ থাকা অর্থের বিষয়ে সব তথ্য দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসের।

‘ডেথ ফোবিয়ায়’ আক্রান্ত হওয়ায় তাকে ঘন ঘন তলব না করতে দুদকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন।

এক বছরের বেশি সময় পর বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফায় রাজধানীর সেগুন বাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন মুসা, আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে যার পরিচিতি ‘প্রিন্স অফ বাংলাদেশ’।

সন্দেহজনক অর্থ-সম্পদ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বেরিয়ে মুসা সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে দাবি করেন, তার কোনো অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত নয়।

“আমি ধোলাইখাল থেকে পানি নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগর গড়িনি ... আর বাংলাদেশ থেকে হুন্ডি করে বিদেশে এত টাকা জমানো সম্ভব নয়।”

“পৃথিবীর ৪০টি দেশের সেনাবাহিনীর সঙ্গে আমার ব্যবসা। সেই সব দেশে যত বিল সেটল হয়েছে, তা সুইস ব্যাংকে ট্রান্সফার হয়েছে। দুদককে আমি সব তথ্য দিয়েছি।”

বাণিজ্য সাময়িকী বিজনেস এশিয়ায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে দুদক ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের বেয়াই মুসার সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়।

ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল, সুইস ব্যাংকে মুসার সাত বিলিয়ন ডলার রয়েছে।

এরপর ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে দুদক কার্যালয়ে হাজির হয়েছিলেন মুসা।

প্রথমবারের মতো বৃহস্পতিবারও বেলা ১১টার দিকে একটি সাদা গাড়িতে দেহরক্ষীসহ দুদক কার্যালয়ে এসে হাজির হন কালো স্যুট ও লাল টাই পরা মুসা।

দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, “তিনি তার দেহরক্ষীদের নিয়ে ঢুকতে চেয়েছিলেন। তবে কমিশন কর্তৃপক্ষের আপত্তির কারণে পরে তিনি একাই প্রবেশ করেন।”

এর আগে একটি দৈনিকে মুসার ৫১ হাজার কোটি টাকা থাকার খবর ছাপা হওয়ার পর ২০১১ সালে তার বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো অনুসন্ধানে নেমেছিল দুদক। কিন্তু পরে সেই প্রক্রিয়া আর এগোয়নি।

১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী টনি ব্লেয়ারকে ৫ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে আলোচনায় আসেন বাংলাদেশের এই ব্যবসায়ী।

‘ডেথ ফোবিয়ায় আক্রান্ত’
দ্বিতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাজির হতে ১৩ জানুয়ারি দুদক কার্যালয়ে উপস্থিত থাকতে চিঠি দেওয়া হয়েছিল মুসা বিন শমসেরকে।

কিন্তু এর একদিন আগে ১২ জানুয়ারি দুদকে তিনি একটি চিঠি পাঠিয়ে অপারগতা প্রকাশ করেন।

দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, “চিঠিতে তিনি (মুসা) লিখেছিলেন, তিনি ডেথ ফোবিয়া রোগে আক্রান্ত, তাকে যেন তিন মাস পরে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তলব করা হয়।”

ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন ১৫ দিন সময় দেয় এই ব্যবসায়ীকে। নতুন দিন ঠিক হয় বৃহস্পতিবার।

‘ডেথ ফোবিয়া’র প্রসঙ্গে মুসা সাংবাদিকদের বলেন, “এটা আসলে এক ধরনের মানসিক রোগ। যখন ওই দুর্ঘটনা (সুইস ব্যাংকে টাকা ফ্রিজ) ঘটল, তখন থেকে আমি এই রোগে আক্রান্ত।

“এখন একটু ভালো, মাঝখানে শরীরের অবস্থা আরও খারাপ ছিল।”

টাকা কেন জব্দ করা হল- প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “এটা এখন বিচারাধীন বিষয়। আমি বাদী হয়ে মামলা করেছি। বিচারাধীন যে কোনো বিষয়ে কথা বলা অবৈধ। তবে আমি মামলায় জয়ী হওয়ার বিষয়ে আশাবাদী।”

‘মূল্যায়ন নেই’
বিলাসী জীবন-যাপনসহ নানা ঘটনায় আলোচনায় উঠে আসা এই ব্যক্তি সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের মূল্যায়ন হচ্ছে না বলেও খেদও প্রকাশ করেন এই ব্যবসা থেকে উঠে আসা মুসা।


মুসার এই ছবি এসেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে

তিনি বলেন, “রেমিটেন্সের কারণে আজ  দেশের এত উন্নতি। অথচ জনশক্তি রপ্তানিকারকদের যথার্থ মূল্যায়ন হচ্ছে না। একটা চিংড়ি বিদেশে পাঠালে সোনার মেডেল দেওয়া হয়, কিন্তু যারা অর্থনীতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন, তারা কী পান?”

জিয়াউর রহমানের আমলে জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসা শুরু করেছিলেন মুসা। প্রথমে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল শাহবাজ ইন্টারন্যাশনাল, পরে নাম পাল্টে হয় ড্যাটকো।

তবে মুসার পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম অস্ত্র ব্যবসার কথাই আগে বলে। একাত্তরে পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার বিবরণও রয়েছে বিভিন্ন বইয়ে।

একাত্তরে ‘বন্দি ছিলাম’
মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার খবর উড়িয়ে দিয়ে মুসা বলেছেন, এটা ভিত্তিহীন অভিযোগ।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত আমি বঙ্গবন্ধুর বাসায় ছিলাম। এরপর তার নির্দেশে নিজ জেলা ফরিদপুরে চলে যাই।

“২১ এপ্রিল ফরিদপুরে পাক আর্মি ঢুকল, ২২ এপ্রিল আমি তাদের হাতে ধরা পড়লাম, আর মুক্তি পেলাম ৯ ডিসেম্বর অর্ধমৃত অবস্থায়।”

“তাহলে আর কী ভূমিকা থাকবে আমার? আমাকে নিয়ে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা ভিত্তিহীন,” বলেন তিনি।

১৯৫০ সালে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার কাজিকান্দা গ্রামে জন্ম নেওয়া মুসার আসল নাম এ ডি এম (আবু দাউদ মোহাম্মদ) মুসা বলে স্থানীয়রা জানায়।

মুসার বাবা শমসের মোল্লা পাকিস্তান আমলে চাকরি করতেন পাট বিভাগের মাঠকর্মী হিসেবে পিএলএ পদে। ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামটের ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় বাড়ি করেন তার বাবা। সেখানেই বেড়ে ওঠেন মুসা।


মুসার একাত্তরের ভূমিকার বিবরণ বইয়ে

ফরিদপুরের মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, মুসার সঙ্গে একাত্তরে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা মেজর আকরাম কোরাইশীর বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। সেনাক্যাম্পে নারী সরবরাহের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ছিল।

২০১০ সালের ‘মুক্তিযুদ্ধে ফরিদপুর’ বইয়ে লেখক আবু সাঈদ খানও একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুসা বিন শমসেরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেছেন।

ফরিদপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবুল ফয়েজ শাহ নেওয়াজ বলেছিলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুসা বিন শমসেরের ভূমিকা পাকিস্তানিদের পক্ষে ছিল।

“৭১ সালের পাক সেনারা ফরিদপুর স্টেডিয়ামের ভেতরে টর্চার সেল তৈরি করেছিল। সেখানে মুসার বেশ যাতায়াত ছিল। সে সময় ফরিদপুরে প্রচার ছিল, মুসা পাক সেনাদের নারীসহ বিভিন্ন কিছু সরবরাহের কাজ করতেন।”

মুক্তিযোদ্ধা একেএম আবু ইউসুফ সিদ্দিকী পাখী বলেন, একাত্তরের ২১ এপ্রিল যখন পাকিস্তানি সৈন্যরা আসি আসি করছে, তখন পুরনো পেট্রোল পাম্পের কাছে মুসা বিন শমসেরকে কিছু বাঙালি যুবককে নিয়ে বিরাট এক পাকিস্তানি পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন তিনি।