logo

ঢাকাবাসীকে ২০২০ সালে মেট্রোরেলে চড়াতে চায় সরকার (ভিডিও সংযুক্ত)

আনোয়ার হোসেন


ঢাকাবাসীকে ২০২০ সালে মেট্রোরেলে চড়াতে চায় সরকার (ভিডিও সংযুক্ত)

ঢাকা, ২৮ জানুয়ারি- রাজধানীর বাসিন্দারা ২০২০ সালের শুরুতে মেট্রোরেলে চড়বেন—এমন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এ জন্য আগামী মার্চে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুতের লাইন সরানোর মাধ্যমে শুরু হবে কাজ। এই খোঁড়াখুঁড়ির কাজটি হবে সড়কের মাঝখান দিয়ে, সর্বোচ্চ ছয় ফুট পর্যন্ত চওড়া গর্ত করে। সেবা সংস্থার লাইন সরানোর পর শুরু হবে মূল নির্মাণযজ্ঞ।

মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজের অংশ হিসেবে এক বছর ধরে কয়েক দিনের ব্যবধানে স্থানে স্থানে সড়কের বিভাজকসহ অংশবিশেষ ঘিরে চলছে সেবা সংস্থার লাইন চিহ্নিত করার কাজ। এতেই সড়কের প্রশস্ততা কমে যাওয়ায় ব্যস্ততম সড়কে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। মূল খোঁড়াখুঁড়ি আর নির্মাণযজ্ঞ চলাকালে সড়কগুলোতে যানজট বেড়ে দুর্ভোগ সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অবশ্য প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জনদুর্ভোগ যাতে কম হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আগামী মাস দুয়েকের মধ্যে মেট্রোরেলের ডিপো উন্নয়নের কাজ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির। আর অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরুর কথা আগামী বছরের শেষের দিকে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেল চালুর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার। মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলপথ নির্মাণ শেষ করার কথা ২০২১ সালের মধ্যে। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৪ সাল পর্যন্ত।

ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ সূত্র বলেছে, মেট্রোরেল হবে উড়ালপথে, দৈর্ঘ্য ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার। এর মধ্যে উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে পল্লবী পর্যন্ত বাড়িঘর কম এবং সেবা সংস্থার লাইনও নেই। কিন্তু পল্লবী থেকে মিরপুর ১০, রোকেয়া সরণি, ফার্মগেট, শাহবাগ, দোয়েল চত্বর, জাতীয় প্রেসক্লাব হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত বাকি ১৫ কিলোমিটারের বেশি পথ ঢাকার সবচেয়ে ব্যস্ততম। বিদ্যুৎ বিভাগ, তিতাস গ্যাস, টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি, ঢাকা ওয়াসা, বেসরকারি ইন্টারনেট সেবা ও কেব্ল টিভিসহ ১২টি সেবা ও অন্য সংস্থার লাইনে এই পথ ঠাসা।

প্রায় এক বছর ধরে খোঁড়াখুঁড়ি করে সেবা সংস্থার লাইন চিহ্নিত করা হচ্ছে। এখনো শাহবাগ থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অংশের কিছু কিছু স্থানে লাইন চিহ্নিত করা বাকি। মেট্রোরেলের সমীক্ষা কার্যক্রমে প্রতিটি সেবা সংস্থার প্রতিনিধি রয়েছেন। আলাপকালে তাঁরা বলেছেন, অধিকাংশ পুরোনো লাইন মাটির নিচে অকেজো ঘোষণা করে নতুন করে বসাতে হবে। নিয়মানুযায়ী, সেবা সংস্থার লাইন সরানোর খরচ বহন করবে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ, আর সরানোর কাজ করবে নিজ নিজ সংস্থা। লাইন সরানোর কাজে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ২০১ কোটি টাকা। তবে সেবা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, এত কম টাকায় এ কাজ হবে না।

মেট্রোরেল প্রকল্পের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সব সংস্থা একসঙ্গে খোঁড়াখুঁড়ি করলে যান চলাচলের পথ একেবারে কমে যাবে। আর নির্মাণকাজ শুরু হলে দুর্ভোগ অনেক বাড়বে। তাই সমন্বিতভাবে লাইন সরানোর কাজ করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সহায়তা চাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এক গর্তেই যাতে সব লাইন ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, সেই চিন্তা আছে কর্তৃপক্ষের। তবে লাইন সরানোর সময় গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অন্যান্য সংযোগ বিচ্ছিন্ন হবে না। শুধু পুরোনো লাইন বাতিল করে নতুন লাইনে সংযোগ দেওয়ার সময় একবার সমস্যা হতে পারে। এমন করা হলে জনদুর্ভোগ কম হবে।

জানতে চাইলে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, প্রথমত মেট্রোরেলটি হবে ঢাকার সবচেয়ে ব্যস্ততম ও ভিআইপি সড়কে। দ্বিতীয়ত সেবা সংস্থার লাইন স্থাপন করা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। এই অবস্থায় ঢাকাবাসীকে যন্ত্রণা সহ্য করার মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই।সরকারকেও বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে রিকশাসহ কম গতির যান নিয়ন্ত্রণ, সেনানিবাস ও পিলখানার ভেতরের সড়ক খুলে দেওয়া, ফুটপাত দখলমুক্ত করাসহ নানা উদ্যোগ নিতে হবে। তবে বাস্তবায়িত হলে এই প্রকল্প অন্য যেকোনো প্রকল্পের চেয়ে ঢাকাবাসীর বেশি উপকারে আসবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক দক্ষিণ) মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সেবা সংস্থার লাইন সরানো শুরু হলে দুর্ভোগ বাড়বে ঠিক। তবে আগামী মার্চের দিকে মগবাজার-সাতরাস্তা উড়ালসড়ক চালু হওয়ার কথা। তখন কিছু যানবাহন বিকল্প পথে চালানোর সুযোগ হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ: আগারগাঁও থেকে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর পর্যন্ত সড়ক বিভাজক ঘেঁষে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার ১৩২ কেভি হাই টেনশন বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিশন লাইন আছে। এটি বাতিল করে সড়কের পূর্ব পাশের মাঝখান দিয়ে নতুন করে বসাতে অন্তত ছয় ফুট চওড়া গর্ত করতে হবে। এই লাইন সরাতে প্রায় ৬২ কোটি টাকায় ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এভাবে মেট্রোরেলের পুরো পথেই নানা ক্ষমতার বৈদ্যুতিক কেব্ল সরাতে হবে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের নির্বাহী প্রকৌশলী জাফরুল হাসান বলেন, বেশির ভাগ কাজ রাতেই করা হবে। তবে যান চলাচল যাতে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

মেট্রোরেলের পুরো পথেই তার আছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানির। সংস্থাটির মিরপুর অঞ্চলের সহকারী প্রকৌশলী আলমগীর হোসেন বলেন, শেওড়াপাড়া থেকে মিরপুর ১২ নম্বর পর্যন্ত তাঁদের লাইন সরাতে হবে। এর জন্য দুই ফুট চওড়া গর্ত করতে হবে।

পল্লবী থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের পুরো পথে প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার ১ থেকে ১৬ ইঞ্চি পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাসের পাইপ আছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির। সংস্থাটির নেটওয়ার্ক অ্যানালাইসিস বিভাগের ব্যবস্থাপক কাজী সাইদুল হাসান বলেন, এসব পাইপ তোলার জন্য একবার এবং স্থানান্তর করে বসাতে আরেক দফা রাস্তা কাটতে হবে। এর জন্য তিন ফুট চওড়া ও পাঁচ ফুট গভীর গর্ত খুঁড়তে হবে। কিছু স্থানে পাশাপাশি দুটি লাইন রয়েছে। সেখানে আরও বড় গর্ত করতে হতে পারে।

অবশ্য ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবদুল মান্নান বলেন, ওয়াসার লাইন কমই সরাতে হবে। তবে মেট্রোরেলের স্টেশনের স্থানগুলোতে সমস্যা হবে। অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, মেয়র হানিফ উড়ালসড়ক, কুড়িল উড়ালসড়ক ও মৌচাকে উড়ালসড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে সবচেয়ে সমস্যা হয়েছে সেবা সংস্থার লাইন সরাতে। আগারগাঁও থেকে মিরপুর পর্যন্ত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ লাইনটি বসানো হয়েছে দুই বছর আগে। তিনি বলেন, সরকারি সংস্থাগুলো চোখ বন্ধ করে প্রকল্প নেয় এবং বাস্তবায়ন করে। এর ফলে অন্য প্রকল্পের যে ক্ষতি হবে, কেউ বিবেচনা করে না। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হচ্ছে—গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মাঝখানে অন্তত ১২ ফুট জায়গায় কোনো সেবা সংস্থার লাইন বসানো যাবে না।

মিরপুরের বাসিন্দাদের ঝক্কি: মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের করা সমীক্ষায় এসেছে, পল্লবী থেকে একাধিক গন্তব্যে ৭৫০টি বাস-মিনিবাস চলাচল করে। এগুলো দিনে একাধিকবার চলে। কাজ শুরু হলে পল্লবী থেকে বাস ছাড়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে মিরপুর স্টেডিয়ামের আশপাশে ও মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের আশপাশে ছড়িয়ে পড়বে বাস। এতে মিরপুর এলাকার মানুষকে দুর্ভোগে পড়তে হবে।

সার্বিক বিষয়ে মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিচালক মোফাজ্জল হোসেন বলেন, এখন মূল চ্যালেঞ্জ সেবা সংস্থার লাইনগুলো সরিয়ে ফেলা। সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে সেভাবেই কাজ চলছে। তিনি বলেন, লাইন সরানো ও নির্মাণকালীন মানুষের কিছুটা কষ্ট হবে। তবে প্রকল্পটি সময়মতো বাস্তবায়িত হয়ে গেলে ঢাকাবাসীর মুখে হাসি ফুটবে।