logo

খালেদার বক্তব্য কি রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল?

আমিনুল ইসলাম মল্লিক


খালেদার বক্তব্য কি রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল?

ঢাকা, ২৭ জানুয়ারি- মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্য ও তার বিরুদ্ধে দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা নিয়ে দেশের সর্বত্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এ নিয়ে আইন ও রাজেনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা তর্ক-বিতর্ক।  ইতোমধ্যে খালেদা জিয়ার এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সুপ্রিমকোর্টের একজন আইনজীবী ও আওয়ামীলীগ নেতা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ফৌজদারী অপরাধের অভিযোগ এনে মামলাও দায়ের করেছেন। এবং সে মামলাটি আদালত আমলে নিয়ে আগামী ৩ মার্চ খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বিএনপিপন্থি ও সমমনা আইনজীবীরা ইতোমধ্যে সরব হয়েছেন দেশের আইন অঙ্গনে। এ নিয়ে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে রাজনীতিতেও। খালেদা জিয়ার এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতারা পক্ষে বিপক্ষে বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন। মামলার প্রতিবাদে সুপ্রিমকোর্ট বারের সদস্যসহ সারা দেশের বিএনপি ও সমমনা আইনজীবীরা বিক্ষোভ ও সমাবেশ অব্যাহত রেখেছেন। এ নিয়ে বাংলামেইলের সঙ্গে কথা হয়েছে দেশের বিশিষ্ট কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে।

সুপ্রিমকোর্ট বারের সাবেক সভাপতি ও বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আব্দুল বাসেত মজুমদার বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নিয়ে খালেদা জিয়া যে বক্তব্য রেখেছেন তাতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করা ঠিক হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন। এ বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত একটি বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘৭১’র শদীদদের বিষয় নিয়ে খালেদা জিয়া এখন আবার নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি করতে চান।’

এ ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্ট বারের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘৭১’র প্রসঙ্গে খালেদা জিয়ার বক্তব্য কোনোভাবেই রাষ্ট্রদ্রোহ হয়নি। খালেদা জিয়া যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সঠিক।’

এই আইনজীবী আরো বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৪(এ)ধারায় রাষ্ট্রদ্রোহের যে সংজ্ঞা রয়েছে খালেদা জিয়ার বক্তব্য তার মধ্যে পড়ে না।’ এ  মামলায় সম্প্রতি আদালত কর্তৃক খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সমন জারির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সমন তার (খালেদা জিয়ার) ওপর আদালত দিয়েছে, আদালতের এ সমনের বিষয়ে তিনি জ্ঞাত আছেন। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা মোকাবেলা করার জন্য যা যা করা দরকার তিনি তাই করবেন।’

তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া সমন গ্রহন করেননি, কিন্তু মামলা মোকাবেলা করবেন। তিনি সমনের বিষয়ে অবহিত হয়েছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আদালতের সমন দেয়ার উদ্দেশ্য তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তা অবগত করা। সমন যে ঝুলিয়ে জারি করা হয়েছে এ বিধান কি আছে? কেউ এটি গ্রহণ করতে না চাইলে আটকে দেয়ার বিধান আছে?’

মাহবুব হোসেন বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আইনগতভাবে যা যা করা দরকার তা তিনি করবেন। তারাই (সরকার) এটি নিয়ে রাজনীতি করছে  এ মামলায় রাষ্ট্রদ্রোহের উপাদান নেই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট এবিএম নুরুল ইসলাম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের বিষয় নিয়ে বক্তব্য দেয়ায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাটি দায়ের করা হয়েছে সে ব্যাপারে মন্তব্য করতে চাই না। তবে আদালত খালেদার বিরুদ্ধে যে সমন জারি করেছেন এতে আদালতে খালেদা জিয়ার হাজির হওয়া উচিত।’

তিনি বলেন, ‘আদালতে গিয়ে খালেদা এক লাইনের একটি আবেদন করতে পারবেন। সেটি হলো বাদির প্রতি খালেদার একটি আবেদন করতে হবে যে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের পূর্ণাঙ্গ জীবন বৃত্তান্ত ৭/১৫ দিনের মধ্যে যেন দাখিল করা হয়।’

সুপ্রিমকোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক ও আওয়ামীপন্থি আইনজীবী অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিএনপিনেত্রী খালেদা জিয়ার বক্তব্য বৃহৎ অর্থে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। কারণ শহীদের সংখ্যা নিয়ে তার (খালেদা জিয়ার) দেয়া বক্তব্যে তিনি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এজন্য এটি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।’

সুপ্রিমকোর্টে বারের বর্তমান সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘শহীদের সংখ্যা নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া যে বক্তব্য রেখেছেন এতে কোনো অপরাধ হয়নি। শহীদের সংখ্যা নিয়ে খালেদা জিয়াই প্রথম কথা বলেছেন এমন তো নয়। এর আগে অনেকেই এ বিষয়ে কথা বলেছেন।’

তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া বলতে চেয়েছেন এই সংখ্যাটি জেনে তাদের সবাইকে স্বীকৃতি দেয়া হোক, ভাতা দেয়া হোক। এতে তো তিনি কোনো অপরাধ করেন।’

উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে গত সোমবার সকালে ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলাটি দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আওয়ামীপন্থি আইনজীবী মোমতাজ উদ্দিন আহমদ মেহেদী। সেইদিনই এ মামলার শুনানি করে দুপুরের দিকে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সমন জারি করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাশেদ তালুকদার।

গত ১৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার একজন আইনজীবীর আবেদনের প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার অনুমতি দেয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা ওই আবেদনে বলা হয়, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ নিয়েও বিরূপ মন্তব্য করেছেন তিনি। এসব সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত এবং প্রতিষ্ঠিত বিষয়। এ বিষয়ে নতুন করে বিতর্কের অবতারণা করায় তার অপরাধ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল।

গত ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে খালেদা জিয়া বলেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। তিনি বলেন, ‘আজকে বলা হয়, এত লাখ লোক শহীদ হয়েছে। এটা নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ না করে খালেদা জিয়া দাবি করেন, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলে মুক্তিযুদ্ধ হতো না। খালেদা জিয়া একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে সবাইকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালে সত্যিকারে যারা সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করেছিল, বিএনপি তাদের বিচার চায়। কিন্তু সেটি হতে হবে আন্তর্জাতিক মানসম্মত, স্বচ্ছ উপায়ে। আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক সম্মান দেয়নি-এমন মন্তব্য করে খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ নিজের ঘরে যুদ্ধাপরাধী পালছে, মন্ত্রী বানাচ্ছে।