logo

হোয়াইট হাউসের নেপথ্যে কারা?

কল্লোল কর্মকার


হোয়াইট হাউসের নেপথ্যে কারা?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর সম্প্রতি ইরাক এবং সিরিয়ায় সেনাবাহিনী পাঠানোর পক্ষে ইতিবাচক মতামত দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র নীতিমালা এবং প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী বর্হিদেশে সেনা বা অভিযান চালানোর অনুমতি সর্বশেষ কংগ্রেস থেকেই দেয়া হয়। কিন্তু বিগত ইরাক যুদ্ধ থেকে শুরু করে বর্তমান সিরিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহন পর্যন্ত কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ সেই যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে লড়াই অব্যাহত আছে। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো কঠোর গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেও কিভাবে কংগ্রেসকে এড়িয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন মার্কিন রাষ্ট্রনায়করা? হোয়াইট হাউসই যদি নীতি নির্ধারণের সর্বশেষ কথা হয় তাহলে এই হোয়াইট হাউসের সূতো কে বা কাদের হাতে বাধা?

এবিষয়ে সাংবাদিক এবং বিশ্লেষক মার্টিন বার্গার সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং প্রশাসনের কিছু বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছেন। আর সেই চেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি নীতি নির্ধারক মহলের কিছু দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব অ্যাশটন কার্টারের বিবৃতিতে একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে ইরাক এবং সিরিয়াতে পদাতিক বাহিনী পাঠানোর ব্যাপারে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রস্তুতি সম্পন্ন। কিন্তু কিছুদিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক ভাষণে জানিয়েছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কোনো দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে জড়াবে না। ঠিক এই জায়গাতেই মার্টিন প্রশ্ন রেখেছেন যে, ওবামা যদি দীর্ঘমেয়াদে লড়াই করতে না চান, তাহলে কোন সূত্র ধরে প্রতিরক্ষা সচিব যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার কথা ঘোষণা দিলেন।

‘অ্যাশটন কার্টারের বিবৃতি আমাদের স্পষ্টতই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছে যে কারা ওয়াশিংটনের বস। আজকের এই নতুন আমেরিকার মধ্যে যারা বৃহত পরিসরে অস্ত্র ব্যবসা করছে তাদের হাতেই ‘ওয়াশিংটনের সূতো বাঁধা’। আর এক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্রেফ আজ্ঞাবহ পুতুল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র।’


ওয়াশিংটনের কর্তাব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরেই তাদের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে বেয়নেট ব্যবহার করে তথাকথিত ‘আমেরিকান হেজিমনি’কে জিইয়ে রেখেছে। ওয়াশিংটন ইতোমধ্যেই তাদের জনগণের উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিত না করে, উন্নত অস্ত্র তৈরির মাধ্যমে সেনাবাহিনীর মোট বাজেটের তিন ভাগের একভাগ ব্যয় করে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্যখাতের জন্য বাৎসরিক যে বাজেট বরাদ্দ থাকে, সেই বাজেট থেকেও সেনাবাহিনীর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে, অথচ গত মাসেই বারাক ওবামা স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের কথা বলেছিলেন।

রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইন এবং লিন্ডসে গ্রাহামের সমালোচনা করেছেন সাংবাদিক মার্টিন। কারণ সিরিয়া প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের নেয়া সবগুলো সিদ্ধান্তের পেছনে ছিলেন এই দুই সিনেটর, শুধু তাই নয়, ইরাকের মাটিতে সেনা সংখ্যা আরও তিনগুন বাড়ানোর প্রস্তাবও তাদেরই দেয়া। পাশাপাশি একই সংখ্যক সেনাসদস্যদের সিরিয়ার মাটিতে পাঠানোর যে প্রস্তাব প্রতিরক্ষা সচিবের মুখ দিয়ে বের হয়েছে, তাও মূলত এই দুই সিনেটরের প্রস্তাবনাতেই। সিনেটর গ্রাহাম সিরিয়ায় অভিযান চালানোর যে প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে সৌদি আরব, মিশর এবং তুরস্ক থেকে এক লাখ সৈন্য নেয়ার কথাও বলা হয়েছে। আর এই বিশাল সংখ্যক সেনাবাহিনীর সঙ্গে থাকবে আরও এক লাখ আমেরিকান সৈন্য।

‘সিরিয়াতে যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের যৌথ বাহিনীর আক্রমন বিষয়টি আগেও প্রস্তাব করা হয়েছিল। বিশেষ করে জন ম্যাককেইনের সৌদি আরবের সঙ্গে বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক থাকায় বিশেষ সুবিধা লাভের জন্যই এই প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কারণ দুই দেশ জোট বেধে সিরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করলে অস্ত্র বাণিজ্যের কারণে মূলত লাভবান হবে ম্যাককেইনের মতো ব্যবসায়িরাই।’

এই গোপন খেলোয়াড় বা পুতুলেরা যে শুধু হোয়াইট হাউসকেই নিয়ন্ত্রন করে তা নয়, বৃহদার্থে গোটা বিশ্বকেই তারা নিয়ন্ত্রন করছে। তারা আইএসআইএল’র(দায়েশ) বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য নিজেদের জোট তৈরি করেছে এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে সকল নিয়ম ভঙ্গ করে হামলা চালাচ্ছে। এটা স্পষ্টতই জাতিসংঘ চার্টারের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। কারণ এই অনুচ্ছেদ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি ছাড়া এধরণের সকল কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করে।

‘হোয়াইট হাউসের এই গোপন কর্তাব্যক্তিরা বা কর্মকর্তারা ইরাক অথবা সিরিয়া প্রশ্নে নতুন সেনা অভিযানের পায়তারা এবং এর পক্ষে বিভিন্ন বক্তব্য হাজির করে অন্তত এটা প্রমাণ করতে পেরেছে যে, জাতিসংঘ এবং নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত কোনো কাজের নয় এবং খুব সহজেই এদের এড়িয়ে যা খুশি তাই করা যায়।’

সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধুমাত্র নিউ ইয়র্ক শহরেই এখনও তিন লক্ষাধিক গৃহহীন মানুষ রাস্তায় জীবনযাপন করছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও গৃহায়ন খাত নিয়ে চলছে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্র হোয়াইট হাউস নতুন কোনো দেশে সামরিক আগ্রাসন প্রশ্নে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে পারলেও, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যবিল নিয়ে বছরের পর পর সিদ্ধান্তহীনতায় কাটিয়ে দিতে পারে। শুধু মার্কিন জনগণই নয়, বিশ্বের আপামর সকলেই হোয়াইট হাউসের এই গোপন খেলোয়াড়দের হাতে বন্দী হয়ে আছে।