logo

দেশে ঐক্যের দৃষ্টান্ত ত্রিপুরা: রাজ্যপাল

দেশে ঐক্যের দৃষ্টান্ত ত্রিপুরা: রাজ্যপাল

আগরতলা, ২২ জানুয়ারি- রাজ্য জুড়ে বর্ণময় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপন করা হল ত্রিপুরা পূ্র্ণরাজ্য দিবস। পূর্ণরাজ্য হিসেবে ৪৪ থেকে ৪৫–এ পাল রাখল ত্রিপুরা। বৃহস্পতিবার আগরতলায় পূর্ণরাজ্য দিবস উদ্‌যাপনের মূল অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন রাজ্যপাল তথাগত রায়। রবীন্দ্র ভবনের এক নম্বর হলের এই অনুষ্ঠানে অতিথিদের মধ্যে ছিলেন উপজাতি কল্যাণমন্ত্রী অঘোর দেববর্মা, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাদল চৌধুরি, বিরোধী দলনেতা সুদীপ রায়বর্মন, এ ডি সি–র মুখ্য কার্যনির্বাহী সদস্য রাধাচরণ দেববর্মা, মুখ্য সচিব ওয়াই পি সিং। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন আগরতলা পুরনিগমের মেয়র ড. প্রফুল্লজিৎ সিনহা।

ত্রিপুরা পূর্ণরাজ্য দিবস উদ্‌যাপনের তিন দিনের অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করে রাজ্যপাল ‘উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে ত্রিপুরা’ শীর্ষক ফোল্ডারের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করেন। বাংলা, ককবরক ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত এই ফোল্ডারে ১৪৪৭ সালের ১৭ মে মহারাজা বীরবিক্রমের মৃত্যু থেকে আজকের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ছবিটা সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৭২ সালের ২১ জানুয়ারি ত্রিপুরা ভারতীয় ইউনিয়নে একটি পূর্ণরাজ্যের মর্যাদা লাভ করে। ওই বছর ২০ মার্চ সাধারণ নির্বাচন হয় ৬০ সদস্যের বিধানসভা গঠনের জন্য। রাজতন্ত্রের অবসানের পর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের প্রক্রিয়ার লড়াই তুলে ধরেন মন্ত্রী বাদল চৌধুরি।

দীর্ঘ রাজন্য শাসনের পর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা যে এমনি–এমনি হয়নি, সে কথা উল্লেখ করে দশরথ দেব, সুধন্যা দেববর্মা, বীরেন দত্তদের লড়াই তুলে ধরেন তিনি। মহারানী কাঞ্চনপ্রভা দেবী ১৯৪৭ সালের ১৩ আগস্ট ত্রিপুরার ভারত ইউনিয়নে যোগদানের সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেন। ১৯৪৮ সালের ১২ জানুয়ারি কাউন্সিল অফ রিজেন্সি ভেঙে দিয়ে এককভাবে কাঞ্চনপ্রভা দেবীকে রিজেন্সি নিযুক্ত করা হয়। ১৯৪৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ত্রিপুরার ভারতভুক্তি সম্পর্কিত দলিল স্বাক্ষর হয়। ত্রিপুরা রাজ্য ভারত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর। পরের বছর, ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ত্রিপুরা বিধানসভাহীন চিফ কমিশনার শাসিত ‘গ’ শ্রেণীভুক্ত রাজ্য হিসেবে পরিগণিত হয়। প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন হয় ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে। উপজাতি কল্যাণমন্ত্রী অঘোর দেববর্মা ইতিহাসটা সামনে এনে ত্রিপুরায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখতে যে কঠিন লড়াই করতে হয়েছে তা উল্লেখ করেন। উপজাতি অংশের জনগণের আর্থ–সামাজিক উন্নয়ন, ভাষা–কৃষ্টি–সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও বিকাশের লক্ষ্যে গঠিত এ ডি সি–র ভূমিকার কথা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন মুখ্য নির্বাহী সদস্য রাধাচরণ দেববর্মা।

সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়েই ত্রিপুরার সার্বিক উন্নয়নের কর্মকাণ্ড এগিয়ে চলেছে বলে সব বক্তাই জানান। শিক্ষা, কৃষি, মৎস্যচাষ, সেচ, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, পানীয় জল, সড়ক ইত্যাদি উন্নয়নের মতো জনমুখী ক্ষেত্রগুলো রাজ্য সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে বলেও উদাহরণ তুলে ধরে জানান পূর্তমন্ত্রী বাদল চৌধুরি। বর্তমানে ত্রিপুরা রাজ্যে সাক্ষরতার হার ৯৬.৮২ শতাংশ। প্রধান অতিথি রাজ্যপাল তথাগত রায়ও জানান, জাতি–বর্ণ–ভাষা নির্বিশেষে শান্তির পরিবেশ বজায় রেখে মিলেমিশে থাকার ক্ষেত্রে ত্রিপুরা ভারতের মধ্যে দৃষ্টান্ত। জাতিদাঙ্গার পরও এটা সম্ভব, প্রমাণ করেছেন এ রাজ্যের মানুষ। যেটা উত্তর–পূর্বাঞ্চলের বাকি রাজ্যে সম্ভব হয়নি। রাজ্যের ঐক্যের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বিরোধী দলনেতা সুদীপ রায়বর্মন বলেন, জাতি–উপজািতর ঐক্য ত্রিপুরাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি জেলা ও মহকুমা সদরেও দিবসটি উদ্‌যাপিত হয়। হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। লোক সাংস্কৃতিক ও ধ্রুপদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল প্রথম দিনে। সমবেত সঙ্গীত, সাংগ্রাই মগ ডান্স, মািমতা নৃত্য, ঝুমুর নৃত্য, মণিপুরি লোকনৃত্য, সমবেত ককবরক সঙ্গীত, হজাগিরি নৃত্য, কাওয়ালি সঙ্গীত, দেশাত্মবোধক নৃত্য দিয়ে সাজানো ছিল প্রথম দিনের অনুষ্ঠান। এদিকে মেঘালয়, মণিপুর ও ত্রিপুরা— এই তিন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা দিবসে রাজ্যবাসীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উন্নয়নের লক্ষ্যে রাজ্যগুলোর যাত্রা সফল হয়ে উঠুক, এই কামনা করেছেন।

আমবাসা থেকে আজকাল প্রতিনিধি জানান: সারা রাজ্যের সঙ্গে আমবাসাতেও পালিত হয় ধলাই জেলাভিত্তিক পূর্ণরাজ্য দিবস। বৃহস্পতিবার িবকেলে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে আয়োজিত হয় শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রা শেষে চান্দ্রাইপাড়া অডিটোরিয়ামে হয় আলোচনাসভা। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ‘উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে ত্রিপুরা’। সভার উদ্বোধন করেন রাজ্যের সমবায় দপ্তরের মন্ত্রী খগেন্দ্র জমাতিয়া। উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক ললিতকুমার দেববর্মা, আমবাসা পঞ্চায়েত সমিতির চেয়ারম্যান তপতী ভট্টাচার্য, জেলাশাসক ড. সন্দীপ রেওয়াজি রাঠোর, জেলা শিক্ষা আধিকারিক শুভরঞ্জন দাস, মহকুমা শাসক মুক্তিপদ পাল ও বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষিকারা। সভায় উদ্বোধকের ভাষণে মন্ত্রী খগেন্দ্র জমাতিয়া ১৯৭২ সালের আগের ত্রিপুরা ও বর্তমান ত্রিপুরার উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরেন। বলেন, ৪০–এর দশকের জনশিক্ষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ত্রিপুরায় রাজন্য শাসনের অবসান ঘটে ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার দাবি ওঠে। গণতন্ত্রকে তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দিয়েছে রাজ্য সরকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জল, কৃষি, সেচ, বিদ্যুৎ— সব দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে ত্রিপুরা। সাক্ষরতায় দেশের শীর্ষে ত্রিপুরা। ত্রিপুরার ঐক্য–সংহতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে আগামী দিনে রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ়সঙ্কল্প আজকের দিন থেকে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। আলোচনাসভায় সভাপতিত্ব করেন আমবাসা পুর পরিষদের চেয়ারপার্সন চন্দন ভৌমিক। সভা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

কল্যাণপুর থেকে আজকাল প্রতিনিধি জানান: কল্যাণপুরেও পালিত হল ৪৫তম পূর্ণরাজ্য দিবস। বৃহস্পতিবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কল্যাণপুরেও পালিত হয় দিবসটি। এদিন সকালে কল্যাণপুরের উপজাতি এলাকার গয়ামফাং উচ্চ বিদ্যালয়ের উদ্যোগে ছাত্রছাত্রীদের সুসজ্জিত মিছিল আর এস পাড়া, ইয়াকরাই, গগন চৌধুরি পাড়া হয়ে বিভিন্ন পথ পরিক্রমা করে। শান্তি, উন্নয়ন, প্রগতির বার্তা ছড়িয়ে শোভাযাত্রায় কয়েকশো কচিকাঁচা অংশ ন‍েয়। প্রধান শিক্ষক উত্তম দেববর্মা জানান, সংহতি জানিয়ে প্রগতির লক্ষ্যে আমােদর এই শোভাযাত্রা।

উদয়পুর থেকে আজকাল প্রতিনিধি: বৃহস্পতিবার সারা রাজ্যের সঙ্গে উদয়পুরেও পালিত হল পূর্ণরাজ্য দিবস। গোমতী জেলাভিত্তিক অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জেলার উপ–শিক্ষা আধিকারিক লক্ষ্মণচন্দ্র দাস। উদয়পুর টাউন হলে। তিনি বলেন, সামাজিক বিকাশের জন্য সার্বিক িবকাশ প্রয়োজন। তুলে ধরেন ১৯৭২ সাল থেকে ২০১৫ সালের ‘ত্রিপুরার উন্নয়ন ও অগ্রগতি’। এ ছাড়াও বক্তা ছিলেন বিদ্যালয় পরিদর্শক সোমনাথ চক্রবর্তী, বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারাধন সাহা–সহ অন্যরা। সভানেত্রীর আসন অলঙ্কৃত করেন জেলার তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের সহ–অধিকর্তা টিঙ্কু বিশ্বাস। সমগ্র অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় ছিলেন জেলা শিক্ষা দপ্তর, তথ্য–সংস্কৃতি দপ্তর, উদয়পুর পুর পরিষদ ও জেলা প্রশাসন। এ ছাড়াও পূর্ণরাজ্য দিবসে মহকুমার বিভিন্ন স্কুলে আলোচনাচক্র অনুষ্ঠিত হয়। হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ইত্যাদি।

বিলোনিয়া থেকে আজকাল প্রতিনিধি জানান: সারা রাজ্যের সঙ্গে বিলোনিয়া মহকুমায়ও পূর্ণরাজ্য দিবস উদ্‌যাপিত হয়েছে। বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এদিন বিলোনিয়া শহরে মিছিল বের করেন। পরে টাউন হলে জমায়েতে পর্যটনমন্ত্রী রতন ভৌমিক বলেন, এ রাজ্যের মানুষ সঙ্ঘবদ্ধভাবে সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে রাজ্যের মানুষ দেশে ইতিহাস গড়েছেন। সব অংশের মানুষ ত্রিপুরাকে উন্নত রাজ্যে পরিণত করতে প্রয়াস চালাচ্ছেন। এদিনের জমায়েতে বিধায়ক বাসুদেব মজুমদার ছাড়াও জেলাশাসক দেবাশিস বসু, মহকুমা শাসক ব্রহ্মনীত কাউর ও পুর পরিষদের চেয়ারপার্সন শুভ্রা মিত্র উপস্থিত ছিলেন।