logo

পুরো পরিবারকে আইএসে উদ্বুদ্ধ করেন সাইফুল

টিপু সুলতান


পুরো পরিবারকে আইএসে উদ্বুদ্ধ করেন সাইফুল

ঢাকা, ২১ জানুয়ারি- যুক্তরাজ্যে গিয়ে আইএসের (ইসলামিক স্টেট) উগ্র মতবাদে জড়িয়েছিলেন সিরিয়ায় বিমান হামলায় নিহত বাংলাদেশি সাইফুল হক (সুজন)। তরুণ এই কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ও উদ্যোক্তা কেবল নিজেই আইএসে যোগ দেননি, সঙ্গে নিয়েছেন স্ত্রী ও সন্তানদের। সঙ্গে বাবা, ভাইসহ পরিবারের অন্য সদস্যদেরও একই মতবাদে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

ঢাকায় গ্রেপ্তার হয়ে বাবা-ভাইয়েরা কারাগারে। বড় ভাই আতাউল হক (সবুজ) স্পেনে আত্মগোপন করেছেন। এখন নিকটাত্মীয়রা উদ্বিগ্ন সাইফুলের স্ত্রী সায়মা আক্তার (মুক্তা) ও তাঁর তিন সন্তান নিয়ে। সায়মা সন্তানদের নিয়ে সিরিয়ায় আছেন বলে ধারণা আত্মীয়দের। কারণ ২০১৪ সালের আগস্টে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বাংলাদেশ ছাড়েন সাইফুল। এরপর গত ২৯ ডিসেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, ১০ ডিসেম্বর আইএসের কথিত রাজধানী সিরিয়ার রাকা প্রদেশের কাছে বিমান হামলায় সাইফুল নিহত হয়েছেন। তিনি আইএসের হয়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনাকারী, হ্যাকিং কর্মকাণ্ড, নজরদারি প্রতিরোধ প্রযুক্তি ও অস্ত্র উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

সাইফুলের শাশুড়ি আঞ্জুমানারা বেগম বলেন, সর্বশেষ মাস দুয়েক আগে মেয়ে সায়মার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল তাঁর। সায়মাই ফোন করেছিলেন। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ঈদুল ফিতরের আগে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে আসেন সাইফুল ও সায়মা। খুলনার সোনাডাঙ্গায় সাইফুলদের বাসায় ঈদ (২৯ জুলাই) করেন। সপ্তাহ দুয়েক দেশে ছিলেন তাঁরা। ঈদের অল্প কদিন পর তাঁরা আবার দেশ ছাড়েন। এর বেশ কিছুদিন পর সায়মা ফোন করে জানান, তাঁরা ভালো আছেন। তাঁর একটি সন্তান হয়েছে। নাম রেখেছেন ওসমান হক। এরপর মাঝেমধ্যে সায়মা ফোন করতেন।

আঞ্জুমানারা বেগম বলেন, ‘আমরা জানতাম তারা আবার লন্ডনে ফিরে গেছে। এখন পত্রিকায় বেরিয়েছে যে তারা লন্ডনে না গিয়ে অন্য আরেক দেশে গেছে। জামাই মারা গেছে। তিনটা ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে মেয়েটা কোথায় আছে, কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। ওদের চিন্তায় ঘুম হয় না।’

এই দম্পতির দেশ ছাড়ার ব্যাপারে একই রকম তথ্য দেন ঢাকায় থাকা সাইফুলের সৎমা মমতাজ বেগম। তিনি বলেন, সাইফুল ও সায়মা মাঝে মাঝে স্কাইপে কথা বলতেন। তাঁরা কোন দেশে আছেন, তা কখনো বলেননি।

যুক্তরাজ্যের সংবাদপত্র ডেইলি মেইল-এর খবর অনুযায়ী, সায়মা এখন সিরিয়ায় আইএসের কথিত রাজধানী রাকাতেই আছেন। ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের ধারণা, সাইফুল ও সায়মা দম্পতি ঢাকা থেকে তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় গেছেন।

দুজনের পরিবার থেকে জানা গেছে, সাইফুল ও তাঁর বড় ভাই আতাউল বিয়ে করেন যমজ দুই বোনকে। আতাউলের স্ত্রী শায়লা আক্তার (হীরা) বছর পাঁচেক আগে সন্তান জন্মের সময় মারা যান। এরপর শায়লার ছেলে আমানুল হককে লালন-পালন করেন সায়মা। তাঁর নিজের প্রথম সন্তান নোমান হকের জন্ম যুক্তরাজ্যে, ২০১১ সালে। আর সবচেয়ে ছোট ছেলে ওসমানের বয়স এখন এক বছর।

ঢাকা, খুলনা ও গোপালগঞ্জে থাকা সাইফুল ও সায়মার বেশ কয়েকজন নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের সম্প্রতি কথা হয়েছে। সামাজিকভাবে বা পেশাগত ক্ষেত্রে যাতে হয়রানির শিকার না হন এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে তাঁদের নাম প্রকাশ করা হলো না। এই আত্মীয়দের সবারই বক্তব্য, সাইফুল খুব মেধাবী ও বিনয়ী ছিলেন। তিনি আইএসের মতো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের এত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন, এ খবরে তাঁরা সবাই বিস্মিত। তাঁরা বলেন, ২০১৩ সাল থেকে তাঁরা সাইফুলের পোশাকে ও জীবনযাপনে পরিবর্তন দেখতে পান। তাই ধারণা করছেন, ওই সময় থেকে হয়তো সাইফুল আইএসের দিকে ঝুঁকেছেন।

সাইফুলের ফেসবুকেও দেখা যায়, ২০০৩ সালে দাঁড়ি রাখা এবং পাগড়ি ও লম্বা জোব্বা পরা ছবি আপলোড করেন এবং ফেসবুকে ধর্মীয় বিষয়টি নিয়ে স্ট্যাটাস দেন তিনি। ফেসবুকে তিনি সর্বশেষ স্ট্যাটাস দেন মৃত্যুর মাস খানেক আগে গত ৮ নভেম্বর।

সাইফুলের বাবার দিকের এক আত্মীয় বলেন, তিনি ২০১৪ সালে ঈদের সময় খুলনার বাসায় সাইফুলকে দেখে চমকে ওঠেন। লম্বা জোব্বা, পাগড়ি পরা। ‘আমি বলি, ব্যাটা তুমি তো দেখছি বিরাট দরবেশ হয়ে গেছ। তখন সে বলে, এখন আমার অল্প বয়স, এই বয়সের ইবাদত আল্লাহ দ্রুত কবুল করবেন।’ বলছিলেন ওই আত্মীয়। তবে আঞ্জুমানারা বেগম বলেন, তাঁর মেয়ে শায়লা (আতাউলের স্ত্রী) সন্তান জন্মের সময় মারা যাওয়ার পর সাইফুল ক্রমেই ধর্মভীরু হয়ে ওঠেন। বড় ভাইয়ের শিশুপুত্রকে লালন-পালনের জন্য যুক্তরাজ্যে নিয়ে যান।

সাইফুল স্ত্রী সায়মাকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যান ২০০৫ সালে। সায়মা ফেসবুকে খুব কম সক্রিয় ছিলেন। অল্প যেসব স্ট্যাটাস আছে, সবাই ধর্মভিত্তিক। তাঁর সর্বশেষ স্ট্যাটাস গত বছরের ১১ আগস্টে। নিকটাত্মীয়দের ধারণা, সাইফুলই পরবর্তী সময়ে স্ত্রীসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের আইএসের মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করেন। সিরিয়ায় সাইফুল নিহত হওয়ার কিছুদিন আগে ঢাকায় তাঁর বাবা আবুল হাসনাত, ১৫ বছর বয়সী ভাই হাসানুল হক ওরফে গালিব মাহমুদ, ঢাকায় তাঁর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক ও শ্যালক তাজুল ইসলাম শাকিলসহ পাঁচজনকে জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

যদিও ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম বলেন, সিরিয়ায় নিহত সাইফুল বাংলাদেশি নাগরিক কি না, তা এখনো তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেননি। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কোনো দেশ যদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়, তাহলে খোঁজখবর করা হবে।

ঢাকায় গ্রেপ্তার সাইফুলের শ্যালক শাকিল ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে ছিলেন। শাকিলের মা আঞ্জুমানারা বলেন, শাকিল যুক্তরাজ্যে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়া শেষ করে অন্য একটা বিষয়ে ডিপ্লোমা করছিলেন। তিনি বলেন, শাকিল গত বছর দেশে আসেন। তখন আতাউলের দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে জন্ম নেওয়া সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়ে। সন্তানের চিকিৎসার জন্য আতাউল সপরিবারে স্পেনে যান। আর শাকিলকে তাঁদের ঢাকার ব্যবসার (আইব্যাকস) দায়িত্ব দিয়ে যান। মায়ের দাবি, শাকিল উগ্রপন্থায় জড়িত নন।

আতাউলের বর্তমান অবস্থান জানতে চাইলে ছোট ভাই এহসানুল বলেন, আতাউল স্পেনের এক নারীকে বিয়ে করেছেন। ছয়-সাত মাস আগে তিনি স্পেনে গেছেন। গত মাসের শুরুতে ঢাকায় বাবা, এক ভাইসহ অন্যদের গ্রেপ্তারের কদিন পর ফোন করেছিলেন আতাউল। এরপর আর কোনো খবর নেই।

নিকটাত্মীয়রা জানান, সাইফুলের জন্ম ১৯৮৪ সালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার পাকুরতিয়া গ্রামে। বাবা আবুল হাসনাত শুরুতে এলাকায় দাঁতের চিকিৎসা করতেন। প্রায় ২৫ বছর আগে আবুল হাসনাত সপরিবারে চলে যান বরিশালের গৌরনদীতে। কয়েক বছর পর চলে যান বরিশাল শহরে। সেখানে দাঁতের চিকিৎসার চেম্বার খোলেন। সেখানেই এসএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন আতাউল ও সাইফুল। এরপর পরিবারটি ঢাকায় চলে আসে। এরপর থেকে পরিবারটি ঢাকায় আছে, মাঝে ২০১৩-১৪ সালে খুলনায় ছিল।

সাইফুল ২০০৩ সালে এইচএসসি পাস করেন ঢাকার একটি বেসরকারি কলেজ থেকে। এর আগে ২০০২ সালে দুই ভাই আতাউল ও সাইফুল খুলনা শহরের বসুপাড়ার সোলায়মান শেখের দুই মেয়ে শায়লা ও সায়মাকে বিয়ে করেন।

নিকটাত্মীয়দের ধারণা, আর্থিক অনটনে থাকায় ছেলেদের শ্বশুরের টাকায় পড়ানোর লক্ষ্যে এত অল্প বয়সে বিয়ে করান আবুল হাসনাত। এ বিষয়ে শায়লা-সায়মার মা বলেন, আতাউলকে ঢাকার একটি বেসরকারি ডেন্টাল কলেজে ভর্তির টাকা এবং বৃত্তি (স্কলারশিপ) নিয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়ার খরচ তিনি দিয়েছেন। এইচএসসি পাসের পর ২০০৩ সালে সাইফুল বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যে যান। সেখানকার গ্লামরগান বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়েন। ছাত্রাবস্থায় তিনি ২০০৫ সালে আইব্যাকস নামে তথ্যপ্রযুক্তির প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তিনি ব্যবসায় খুবই ভালো করেন বলে যুক্তরাজ্যের সংবাদপত্র টেলিগ্রাফ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়।

পারিবারিক সূত্র জানায়, সাইফুলের বড় ভাই আতাউল ডেন্টাল কলেজে পড়া শেষ করনেনি। তিনি যুক্তরাজ্যে গিয়ে সাইফুলের ব্যবসায় যুক্ত হন। তাঁরা পরে ঢাকায় আইব্যাকসের শাখা খোলেন। আতাউল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

সৎভাই এহসানুলকেও যুক্তরাজ্যে নিয়ে যান সাইফুল। এহসান বলে, সে প্রায় ছয় মাস ওই দেশে ছিল। সেখানে ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানে তাকে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে কিছু শিক্ষা দেওয়া হয়। পরে দেশে ফিরে এসে খুলনায় সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হয় সে। বছর খানেক পর পরিবার আবার ঢাকায় চলে আসে। এরপর গত এক বছরে এহসানকে কোনো স্কুলে ভর্তি করায়নি পরিবার।

সাইফুলের তৃতীয় ভাই গালিবের জন্মের সময় তাঁর মা মারা যান। গালিবকে বড় করেন খুলনায় তার এক খালা। আর অল্প কদিন পর বাবা হাসনাত আবার বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে একমাত্র সন্তান এহসান। এহসানের মতো গালিবও দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বাবা ও ভাইদের সংস্পর্শে এসে পাল্টে যায় বলে অভিযোগ করেন তাকে লালন-পালনকারী খালার পরিবার। খুলনা জিলা স্কুলে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়া গালিব গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করে।

ছোটবেলা থেকে গালিবের লেখাপড়ার তদারক করতেন এক খালাতো ভাই। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে সাইফুল ব্যবসায় ভালো করার পর গালিবের প্রতিও মনোযোগ দেয় তারা। প্রথম দিকে বাবা হাসনাত মাঝে মাঝে গালিবকে তাঁদের কাছে নিয়ে রাখতেন। গালিব ফিরে এসে বলত, তাকে নানা ধর্মীয় বয়ান শোনানো হতো, এসব তার ভালো লাগে না। কিন্তু পরে একপর্যায়ে গালিবের আচরণে পরিবর্তন আসতে থাকে। বলত, আখেরাতের ভালোর জন্য সে ইবাদত করছে।

খালাতো ভাইয়ের দাবি, বাবা-ভাইদের সংস্পর্শে গিয়ে গালিব লেখাপড়ায় মনোযোগ হারায় এবং এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করে। এরপর খুলনা থেকে ঢাকায় বাবার কাছে চলে যায়। পরে সেখানে গ্রেপ্তার হয়। তিনি বলেন, তাঁরা আবার গালিবকে ফিরিয়ে আনতে চান, চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ানোর জন্য আবার রেজিস্ট্রেশনও করা হয়েছে। এভাবে পুরো একটা পরিবার এমন মতাদর্শে যাওয়াটাও আইএসের একটা কৌশল বলে মনে করেন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জাকার্তার ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যানালাইসিস অব কনফ্লিক্টের পরিচালক সিডনি জোনস তাঁর এক বিশ্লেষণে বলেন, আইএস কেবল তরুণদের নয়, তাদের পুরো পরিবারকে নিজেদের মতাদর্শের দিকে টানছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) মনিরুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন দেশে নারীদের মধ্যে উগ্র মতবাদে জড়িয়ে পড়ার বড় ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে পুরো পরিবারে উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্র তৈরি করছে। পরিবারের সবাই এ পথে গেলে তাদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ প্রবণতা বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে বলে তিনি মনে করেন।