logo

ইরানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব

রেজাউল করিম


ইরানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব

ঢাকা, ১৭ জানুয়ারি- ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব। এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিশ্ব অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে তা নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা। কেউ কেউ বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না, তবে এর উল্টো মত যে নেই তাও না।

শর্ত পূরণ করায় পরমাণু সংক্রান্ত অর্থনৈতিক সব ধরনের অবরোধ তুলে নিয়েছে পশ্চিমারা। অশোধিত তেল সহ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে শিপিং, বিমা ও বাণিজ্যের উপর থেকে।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে স্বাগত জানিয়ে জার্মান-ইরান চেম্পার অব কমার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাইকেল টোকাস বলেন, ‘এই দিনটির জন্য আমরা কয়েক বছর ধরে অপেক্ষা করছিলাম। এর ফলে একটা বড় পরিবর্তন হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে আমরা ব্যক্তিগত ও যৌথ মালিকানাধীন ৩০০ মতো ইরানিয়ার কোম্পানির ব্যবসা করতে পারবো। এর আগে এই রকম একটি কোম্পানির সঙ্গেও আমরা কাজ করতে পারিনি। এমনকি রুটি-বিস্কুটের মতো ব্যবসাও বন্ধ ছিলো।’


অনেক ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলেও এখনো কিছু ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। পরমাণু সংক্রান্ত কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে যে সমস্ত ব্যক্তি বা কোম্পানি কালো তালিকাভুক্ত ছিলো তাদের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়েছে। কিন্তু সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে যাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতগুলোতে আর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে না। তবে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ‘নিষেধাজ্ঞা মওকুফের আদেশ’ সম্পূর্ণরুপে বাস্তবায়নের জন্য মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ ইরানের বিপ্লবী গার্ডের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষকতা অভিযোগ রয়েছে। আর এই ইস্যুতে মার্কিন কংগ্রেস একমত নাও হতে পারে।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আগের রেজুলেশন  নাকচ করা হবে।যদিও জাতিসংঘ ও অন্যদের দ্বারা নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ইরানের ব্যবসা বাণিজ্যকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে, তবুও ইইউ নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে তুলনা করে এর অর্থনৈতিক প্রভাবের অবস্থান বা সুযোগকে ছোট করে দেখা হচ্ছে।


নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় বিশ্ব বাজারের চাহিদা অনুযায়ী অশোধিত তেল রফতানি করতে পারবে। ২০১২ সালে অবরোধ আরোপের আগে উত্তোলিত প্রতি পাঁচ ব্যারেল তেলের এক ব্যারেল পরিশোধনের জন্য ইউরোপে যেত। অবরোধ প্রত্যাহারের আগে দিনে ১০ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করতো ইরান। যার অধিকাংশ ক্রেতা চীন, ভারত, জাপান ও সাউথ কোরিয়া। তবে ইরান বলছে, অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা পরপরই তেলের চাহিদা ৫ লাখ ব্যারেল বেড়ে গেছে। ধারণার করা হচ্ছে, আগামী বছর বিশ্বজুড়ে ইরানের তেল রফতানির পরিমাণ দাঁড়াবে ২৫ লাখ ব্যারেল।

তেলের বাজার ভয়াবহ মন্দা চলছে। এর মধ্যে ইরান তেলের বাজারে প্রবেশ করলে তা আরো প্রকট হবে। গত ১১ বছরের মধ্যে তেলের দাম সর্বনিম্নে এসে দাঁড়িয়েছে। কারণ ক্রেতার তুলনায় বাজারের তেল যোগান অনেক বেশি বলেই মনে হচ্ছে। তার উপর ক্রেতা আকর্ষণ করতে ছাড় দেওয়ার চিন্তা করছে।

তেলের বিশ্ব বাজারে ইরান প্রবেশ করলে এর মূল্য নিয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি সৌদি আরবের সঙ্গে এক ধরনের মূল্য যুদ্ধ শুরু হবে। যারা বাজার ধরে রাখতে এরই মধ্যে অনেক কম দামে তেল বিক্রি শুরু করেছে।


নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে বিশ্ব বাণিজ্যে পুরোপুরি প্রবেশ করবে ইরান। তাদের সঙ্গে ভবিষ্যতে ব্যবসার বৃহত্তম মাধ্যম হবে অবশ্যই ব্যাংক। কিন্তু ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করতে কতগুলো ব্যাংক ফের তাদের সংযোগ স্থাপন করবে তা এখনো স্পষ্ট না।

এই সূত্র ধরে জার্মান-ইরান চেম্পার অব কমার্সের ব্যবস্থাপণা পরিচালক মাইকেল টোকাস বলেন, ‘আমি যখন জার্মানির বড় ব্যাংকগুলোর কাছে যাবো, তখন তারা বলবে, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রথম দিন থেকে অন্তত ১ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। এরপর ইরান ও আমাদের সঙ্গে ব্যবসা করার কথা বলুন।’

মার্কিন আর্থিক ও বিচার বিভাগের ইরান, সুদান ও কিউবার উপর নিষেধাজ্ঞার পরও বিকল্প পথে ব্যবসার জন্য প্রায় দুই ডজন ইউরোপীয় ব্যাংককে শাস্তি দিয়েছে। গত ১০ বছরে এসব ব্যাংক ১৪ বিলিয়ন ডলার জরিমানা অথবা মামলা সংক্রান্ত কাজে খরচ করেছে। এর মধ্যে ফরাসি ব্যাংক বিএনপির একাই গেছে ৯ বিলিয়ন ডলার।


ব্রিটিশ ব্যাংকার অ্যাসোসিয়েশনের ক্রাইম ডিরেক্টর জাস্টিন ওয়ালকার বলেন, ‘ব্রিটেনের বেশ কিছু ব্যাংক ইরানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য না বাড়ানো ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে কথা দিয়েছে।’

জার্মান এবং ব্রিটিশ উভয় দেশের ব্যবসায়ী নেতারা ইরানের সাথে ব্যবসা করা জন্যে মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের ‘সবুজ সংকেতের’ আবেদন করেছেন। যাতে করে তারা ইউরোপিয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্লায়েন্টদের সাথে ইরান সংক্রান্ত ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারেন।

মাইকেল টোকাস বলেন, ‘বড় অঙ্কের ক্ষেত্রে আমরা যদি বড় ব্যাংকগুলোকে রাজি করতে না পারি, তাহলে আমাদের অনেকগুলো ছোট ব্যাংকের দিকে তাকাতে হবে।’ তবে তিনি মনে করেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসার ক্ষেত্রে তার দেশের কোনো ব্যাংকই আপত্তি করবে না।

কিন্তু এই ধরনের  ‘ক্ষুদ্র-অর্থায়ন’ ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম সিমেন্স, বা এয়ারবাস থেকে বড় যাত্রীবাহী বিমান কেনা ও ইরানের রেল ব্যবস্থা পরিবর্তনের মতো বড় মাপের প্রকল্পের জন্য অপর্যাপ্ত বলেই মনে করা হচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রয়োগিক যদি পর্যাপ্ত না হয় তাহলে বিকল্প রাস্তা রয়েছে এবং সেটা ভাবাও হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর থেকে নন-মার্কিন ও কোম্পানির ‘অপ্রধান’ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু মার্কিন নাগরিক ও কোম্পানির উপর থেকে বাণিজ্য অবরোধ রেখে দিয়েছে।


লন্ডন ব্রিককোর্ট অ্যাট চেম্বারসের নিষেধাজ্ঞা বিশেষজ্ঞ মায়া লেস্টার বলেন, ‘নন-মার্কিন অধীনস্থ কতোগুলো কোম্পানি রয়েছে সেটা নিয়ে ধোয়াশা আছে।’ পারমাণবিক চুক্তি পত্রে লেখা আছে ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রক্ষায় নন-মার্কিন কোম্পানির জন্য বৈধ। কিন্তু এটি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত অবরোধের প্রাথমিক পর্যায়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। ইরানের অনেক ব্যবসা শুরু আগে অনেক কোম্পানি এবং তাদের আইনজীবীরা একটি সম্পূর্ণ নির্দেশনার জন্য মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের দিকে তাকিয়ে আছেন।