logo

প্যারিস ধাঁচেই জঙ্গি জাকার্তায়

প্যারিস ধাঁচেই জঙ্গি জাকার্তায়

গাড়ির আড়াল থেকে চলছে গুলির লড়াই। রাস্তায় পড়ে ছিন্নভিন্ন দেহ। বৃহস্পতিবার জাকার্তায়। ছবি: রয়টার্স।

জাকার্তা, ১৫ জানুয়ারি- মুম্বইয়ের লিওপোল্ড কাফে থেকে প্যারিসের বেল ইকিপ পানশালা। আর এ বার সেই তালিকায় জুড়ল জাকার্তার স্টারবাক্‌সের নাম! তিন শহরের এই তিন রেস্তোরাঁকে মিলিয়ে দিল বেলাগাম রক্তপাত! প্যারিস হামলার ঘা শুকোনোর আগেই এ বার ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী শহর জাকার্তায় হামলা চালাল ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিরা। শহরের সবচেয়ে সুরক্ষিত এবং গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় চলল দিনভর আত্মঘাতী হামলা, ধারাবাহিক বিস্ফোরণ, লাগাতার গুলির লড়াই। আর এই জঙ্গি হানা জনমানসে উস্কে দিল আইফেল টাওয়ারে আলো নেভার স্মৃতি। ফিরিয়ে আনল ২৬/১১-র আতঙ্ক।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৪৯ মিনিট। আত্মঘাতী বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে জাকার্তার গুরুত্বপূর্ণ এবং জনবহুল তামরিন স্ট্রিট। নিশানায় মার্কিন কফিশপ স্টারবাক্‌স। এই তামরিন স্ট্রিটের ঘটনাস্থল থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে রয়েছে প্রেসিডেন্টের বাসভবন, মার্কিন দূতাবাস। আর হামলার লক্ষ্য মার্কিন এই কফিশপের পিছনেই রয়েছে একটি সিনেমা হল। পাশেই সারিনা শপিং মল, হোটেল, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বেশ কয়েকটি ব্যাঙ্ক। এই রাস্তাতেই রয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জের দফতর। ‘হাই প্রোফাইল’ এই রাস্তায় বিস্ফোরণের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ময়দানে নামে জাকার্তার পুলিশ। ঘিরে ফেলা হয় পথ। খালি করে দেওয়া হয় আশপাশের বহুতলগুলো। স্টারবাক্‌সের বিপণির দখল নেয় নিরাপত্তা বাহিনী। প্রকাশ্য রাস্তায় শুরু হয় জঙ্গি-পুলিশ গুলির লড়াই। তারই মধ্যে কফিশপ লাগোয়া সারিনা শপিং মলের সামনে দ্বিতীয় বিস্ফোরণে উড়ে যায় পুলিশ কিয়স্ক। টানা ছ’ঘণ্টা লড়াইয়ের পরে পুলিশ জানায়, অভিযান শেষ হয়েছে। জাকার্তা পুলিশের মুখপাত্র মহম্মদ ইকবাল জানান, স্টারবাক্‌স সংলগ্ন এলাকায় অন্তত ছ’টি বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে জঙ্গিরা। নিহতের সংখ্যা সাত। তিন আত্মঘাতী জঙ্গি-সহ খতম পাঁচ জঙ্গি। একটি সূত্র আবার বলছে, গ্রেফতার হয়েছে আরও দুই জঙ্গি। হামলা চালিয়ে শহরের পশ্চিমে পালিয়ে গিয়েছে দুই সন্দেহভাজন। সেই সঙ্গে নিহত হয়েছেন দুই সাধারণ মানুষ। এক জন ইন্দোনেশিয়ার বাসিন্দা, অন্য জন কানাডার। একাধিক পুলিশকর্মী-সহ আহত ২০। এই হামলার পরে মার্কিন কফিশপের তরফে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে আপাতত জাকার্তার প্রতিটি বিপণি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

জঙ্গি হানার খবর পেয়েই জাকার্তায় ফিরে আসেন জাভা সফররত ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো। ডাকা হয় জরুরি বৈঠক। দেশবাসীকে তাঁর আশ্বাস, আশঙ্কার মেঘ কেটেছে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। জাকার্তার এই হামলায় নিহতদের প্রতি শোকপ্রকাশ করে টুইট করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, প্যারিস হামলার পর পরেই জাকার্তায় বড় ধরনের জঙ্গি-হামলার সতর্কবার্তা ছিল। আইএসের হুমকি-বার্তা বলেছিল, ‘এ বার কনসার্ট হবে জাকার্তায়’। সেই হুমকির কথা মাথায় রেখেই এই হামলায় আইএসের হাত রয়েছে বলে আজ দুপুরেই জানিয়ে দেয় পুলিশ। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই অবশ্য আইএসের সঙ্গে যুক্ত ‘আমাক’ নামে একটি সংবাদ সংস্থার মাধ্যমে দায় স্বীকার করে জঙ্গিগোষ্ঠী। জঙ্গিদের বিবৃতি, ‘‘সশস্ত্র আইএস যোদ্ধারা আজ সকালে ইন্দোনেশিয়ার রাস্তায় হামলা চালিয়েছে। লক্ষ্য ছিল বিদেশি নাগরিক এবং সে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনী।’’

গোয়েন্দারা জানাচ্ছেন, আপাত সহিষ্ণু মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ায় প্রতিপত্তি বাড়াতে কিছু দিন ধরেই তৎপর হয়েছে আইএস। ধর্মের টোপ দিয়ে মগজধোলাই চলছে। শিয়া-সুন্নি বিভেদ তৈরি করে চলছে প্রশিক্ষণ। গোয়েন্দাদের তথ্য বলছে, দু’শোরও বেশি তরুণ দেশ ছেড়ে সিরিয়া পৌঁছেছেন। তাঁদের অনেকেই দেশে ফিরে তৈরি করছেন ‘স্লিপার সেল’। মূলত সুন্নি অধ্যুষিত হলেও জাকার্তায় ১০ লক্ষেরও বেশি শিয়ার বাস। ফলে সুন্নি-জেহাদি আইএসের নিশানায় যে জাকার্তাই উঠে আসবে, সেই আশঙ্কা ছিলই। ইন্দোনেশিয়ার জঙ্গলে গা ঢাকা দেওয়া সন্তোসো নামে এক জঙ্গি আইএসের হয়ে নাশকতার ছক কষছে বলে খবর ছিল পুলিশের কাছে। তবে এখনও সে অধরাই। পুলিশের দাবি, সিরিয়ায় বসে বাহরুন নইম নামে এক জঙ্গি এই হামলার ঘুঁটি সাজিয়েছে। এখন প্রশ্ন, এত তথ্য হাতে পেয়েও কেন এড়ানো গেল না হামলা?

নিরুত্তর পুলিশ। তবে আলোকপাত করছেন বিশেষজ্ঞেরা। তাঁদের মতে, এই হানা ইন্দোনেশিয়ার অন্য হামলা থেকে আলাদা। কী রকম? প্রথমত, হামলার ‘ব্লু প্রিন্টের’ সঙ্গে মিল রয়েছে ২৬/১১-র মুম্বই হানার। অর্থাৎ জনবহুল রাস্তায় একই সঙ্গে একাধিক বিস্ফোরণ। তাতে বিভ্রান্তি বাড়ে প্রতিপক্ষের। দ্বিতীয়ত, নিশানায় রেস্তোঁরা-পানশালা। তাতে বেশি মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়ে।

আর ঠিক সেটাই করেছে জঙ্গিরা। আইএসের এই ‘কনসার্টে’ সত্যিই থমকেছে জাকার্তা। টায়ার ফাটার আওয়াজেও বিস্ফোরণ-ভ্রম হচ্ছে পুলিশের। তবে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এগিয়ে রাখছেন জাকার্তার বাহিনীকেই। তাঁদের মতে, একই ধাঁচের হামলা মোকাবিলায় মুম্বইয়ের লেগেছিল চার দিন। প্রাণ গিয়েছিল ১৭৩ জনের। প্যারিসেও নিহতের সংখ্যা ১৩৭-এ পৌঁছয়। তবে জাকার্তা ঘণ্টা পাঁচেকেই কাবু করেছে জঙ্গিদের। আততায়ী ছাড়া প্রাণ গিয়েছে দু’জনের। বড় বিপদ সামলে পাল্টা মারেও এগিয়ে রয়েছে জাকার্তাই।