logo

কেনো বার্গার কিং-স্টারবাকসে হামলা ঢাকার জন্য সতর্কবাণী

কেনো বার্গার কিং-স্টারবাকসে হামলা ঢাকার জন্য সতর্কবাণী

ঢাকা, ১৪ জানুয়ারী- ২০০২ সালে বালি হামলায় দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যুর পর প্রায় অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ের পাশাপাশি দেড় দেশক ধরে ইন্দোনেশিয়া তার আন্তর্জাতিক ইমেজ পুনরুদ্ধারে যে ধারাবাহিক চেষ্টা চালিয়ে গেছে তাতে বড় ধরনের এক আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বৃহস্পতিবারের হামলা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ইন্দোনেশিয়ায় সন্ত্রাসবাদের পুনর্জন্মে বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের বিশেষ করে মুসলিম অধ্যুষিত সবগুলো দেশের আরো বেশি সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে।


তারা বলছেন, ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ভৌগলিকভাবে কাছাকাছির দেশ অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশে তাদের নাগরিকদের জন্য চলাচল যে সীমিত করেছে বৃহস্পতিবারের হামলা তাকে শক্ত ভিত্তি দিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া এর আগে বাংলাদেশে তাদের ক্রিকেট দলের সফর স্থগিতের নামে একরকম বাতিল করে দেয়। পরে তাদের ফুটবল দল কয়েক ঘণ্টার সফরে এসে একটি বিশ্বকাপ বাছাই ম্যাচ খেলে গেলেও বাতিল হয়ে যায় অনুর্ধ-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে তাদের তরুণদলের অংশগ্রহণ।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্য দেশগুলোর জন্য জাকার্তা হামলা ‘আরো বেশি জেগে উঠা’র ডাক দিয়ে গেলেও ইন্দোনেশিয়ার জন্য তা এখনই জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে দেখো দেবে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো বিদোদো যখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় নিয়োজিত তখন এ সন্ত্রাসী হামলায় ইন্দোনেশিয়ার জন্য বহুল প্রত্যাশিত নতুন বিদেশী বিনিয়োগ বড় ধরনের হোঁচট খাবে।


কূটনৈতিক এলাকা ছাড়াও ‘স্টারবাকস’ এবং ‘বার্গার কিং’-কে কেনো সন্ত্রাসী হামলার জন্য বেছে নেওয়া হলো তা এখনো তদন্তের বিষয় হলেও প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের ২৫ কোটি মানুষের দেশটিতে এসব জায়গায় হামলা করে প্রতীকি অর্থে পশ্চিমাদের উপর হামলা করা হয়েছে, বড় ধরনের আওয়াজের মধ্য দিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় জঙ্গিবাদের পুনর্জন্মের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে এ ধারণাই করছেন যে ইন্দোনেশীয় বা ইন্দোনেশিয়ায় জন্ম নেওয়া সন্ত্রাসীরাই জাকার্তা হামলার জন্য দায়ী। একইভাবে ২০০২ সালে বালি নাইটক্লাবে হামলা করে বেশিরভাগ বিদেশীসহ দুই শতাধিক মানুষ হত্যা এবং পরে ম্যারিয়ট হোটেল ও অস্ট্রেলিয়ান দূতাবাসে হামলার ঘটনার জন্য দায়ী ছিলো আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কিত জেম্মাহ ইসলামিয়া যা পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেই সক্রিয়।


গ্রুপটির অনেক সদস্যই ইন্দোনেশিয়ার জাভায় অবস্থিত মাদ্রাসাগুলোতে পড়াশোনা করেছে, অনেকে আল-কায়েদা নেটওয়ার্কের সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ নিয়েছে আফগানিস্তানে। ইন্দোনেশিয়ার সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিশেষ পুলিশদল একের পর এক অভিযানে জেম্মাহর মালয়েশীয় নেতাসহ অনেক সদস্যকে হত্যা করে তাদের নেটওয়ার্ক প্রায় গুঁড়িয়ে দিয়েছিলো বলেই ধারণা করছিলো। জেম্মাহর প্রধান ধর্মীয় নেতা আবু বকর কারাগারে থাকার কারণেও গোয়েন্দারা তাদের পুনর্জাগরণ না হওয়ার বিষয়ে কিছুটা স্বস্তিতেই ছিলো।

সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কগুলো নিয়ে গবেষণা করা ইন্দোনেশিয়া-ভিত্তিক ইন্সটিটিউট ফর পলিসি এনালিসিসি অব কনফ্লিক্টের তথ্য অনুযায়ী, জেম্মাহ নেটওয়ার্ক হিসেবে দুর্বল হয়ে পড়লেও ভালোমতোই বেঁচে ছিলো। নতুন নতুন যে সন্ত্রাসী এবং জঙ্গির জন্ম হয়েছে তারা জেম্মাহর সঙ্গেই তাদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলো। শেষ পর্যন্ত মার্কিনী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিশেষ পুলিশ বাহিনীর জন্য বড় আঘাত হয়ে এসে তারা বৃহস্পতিবারের হামলার ঘটনা ঘটাতে পারলো।


সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক গবেষকরা বলছেন, ইন্দোনেশিয়ার জেম্মাহ ইসলামিয়ার যে সন্ত্রাসীরা প্রশিক্ষণ বা যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য আগে আফগানিস্তানে যেতো তারা বা তাদের উত্তরসূরীরা এখন ইসলামিক স্টেট (আইএস) নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে সিরিয়া বা ইরাকে গিয়ে যুদ্ধ করছে, কেউ কেউ দেশে ফিরে জঙ্গি গ্রুপগুলোকে নতুনভাবে সংগঠিত করছে। তবে, শুধু ইন্দোনেশিয়া নয়, পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এবং দক্ষিণ এশিয়াই টার্গেট হওয়ায় বাংলাদেশও তাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে নয়।

বিশেষ করে বাংলাদেশ যখন জঙ্গিবাদবিরোধী শক্ত অবস্থানে থেকে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে দিচ্ছে, কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য এখনো তাদেরকে রসদ বা জনশক্তি যোগানোর মতো অবস্থায় আছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, তখন দক্ষিণ এশিয়ার একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হিসেবে বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের বড় টার্গেট বলে এদেশটিকে আরো সতর্ক হতে হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।