logo

সাহারায় বৃহত্তম সমুদ্র-কুমিরের জীবাশ্ম তুলে দিল নতুন প্রশ্নও

সাহারায় বৃহত্তম সমুদ্র-কুমিরের জীবাশ্ম তুলে দিল নতুন প্রশ্নও

প্রিটোরিয়া, ১৪ জানুয়ারি- লম্বায় ৩২ ফুট৷ একটা ভলভো বাসের থেকেও বেশি! ওজন? প্রায় সাড়ে তিন টন! চোয়াল? পাঁচ ফুটেরও বেশি লম্বা, যাতে হেসেখেলে সজনে ডাঁটার মতো চিবিয়ে ছিবড়ে করে ফেলা চলে মানুষকে৷ আর পুরো মাথাটা তো এক মানুষের চেয়েও বড়! নামটাও গালভরা৷ ম্যাকিমোসরাস রেক্স৷ মানে, দাম্ভিক সরীসৃপরাজ! এই রাক্ষুসে বর্ণনা কার?

ইনি বিশ্বের ইতিহাসে বৃহত্তম সামুদ্রিক কুমির৷ 'সুপারক্রক' বলতে যা বোঝায়, একেবারে তাই! ১২ কোটি বছর আগে ইনি ঘুরে বেড়াতেন সাহারার সমুদ্রে৷ সমুদ্র? হ্যাঁ, তাই তো! এখন যেখানে আদিগন্তবিস্তৃত ধূ ধূ মরুভূমি, একটা সময় তো সেখানে ছিল সমুদ্রই৷ সেই সমুদ্রেই প্রকাণ্ড সব কাছিম শিকার করে বেড়াত অতিকায় এই কুমির৷ অথবা, সামুদ্রিক খাঁড়ির অগভীর জলে ওত পেতে বসে থাকত হতভাগ্য ডাইনোসরের অপেক্ষায়৷

এই কুমিরেরই জীবাশ্ম আফ্রিকার টিউনিশিয়ায় সাহারা মরুভূমির প্রান্তে খুঁজে পেয়েছে এক গবেষকদল৷ 'ক্রিটেসিয়াস রিসার্চ' বিজ্ঞান পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁদের গবেষণাপত্র৷ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের পৃষ্ঠপোষকতায় এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন ইতালির বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ ফেদেরিকো ফ্যান্টি৷ জীবাশ্ম পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মহাবিলোপ তত্ত্ব নিয়েও নতুন নতুন প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়েছে বিজ্ঞানীদের মনে৷

জীবাশ্ম বলতে গবেষকরা পেয়েছেন খুলির একটা অংশ আর ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন কয়েকটা হাড়৷ তবে এই দানব কুমিরের আয়তন বোঝানোর জন্য তা-ই যথেষ্ট৷ ফেদেরিকো বলছেন, 'এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহই নেই যে, ফুড চেন বা খাদ্যশৃঙ্খলের একেবারে উপরে স্বমহিমায় বিরাজ করত ম্যাকিমোসরাস৷' গত বছর ইউরোপের তিনটি জায়গা থেকে আবিষ্কৃত হয়েছিল এই ম্যাকিমোসরাসেরই তিনটি প্রজাতি, যেগুলোর একটাও অবশ্য 'রেক্স'-এর মতো প্রকাণ্ড চেহারার নয়৷ এবং তারা তিন জনেই বয়সের নিরিখে 'রেক্স'-এর চেয়ে প্রাচীন, ১৫ কোটি বছর আগে জুরাসিক যুগে ছিল তাদের অবাধ বিচরণ৷

যাঁরা সেই তিনটি প্রজাতির জীবাশ্ম খুঁজে পেয়েছিলেন, সেই গবেষকদের অন্যতম এবং এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ স্তেফান ব্রুসেটও প্রশংসা করছেন ফেদেরিকোদের প্রচেষ্টার, 'যেখান থেকে ওঁরা এই জীবাশ্ম খুঁজে পেয়েছেন, সে জায়গাগুলোয় খুব বেশি খোঁড়াখুঁড়ি হয়নি৷ তাই এটা যে চমকপ্রদ আবিষ্কার, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই৷'

কেমন দেখতে ছিল ম্যাকিমোসরাস-কে? এখনকার ঘড়িয়ালের মতো ছঁুচোলো মুখ হলেও তার চোয়াল ছিল প্রকাণ্ড৷ আর ছিল বেঁটেখাটো, জবরদস্ত দাঁত৷ দাঁতের এমন গঠন কেন? ফ্যান্টিদের মতে, শুধু মাংস ছেঁড়াখোঁড়াই নয়, কাছিমদের খোলসও সহজেই ভেদ করে ফেলত এই ধরনের দাঁত৷ ব্রুসেটের মনে হয়েছে, 'এরা ছিল অ্যামবুশ প্রিডেটর৷ অগভীর জলে কাছিম বা মাছ যেমন শিকার করত তারা, তেমন সৈকতের কাছাকাছি আসা ডাইনোসরদের জন্যও অপেক্ষা করত৷'

তবে প্রকাণ্ড হওয়া সত্ত্বেও, বিশ্বের বৃহত্তম কুমিরের রেকর্ড ভাঙতে পারেনি ম্যাকিমোসরাস৷ সে রেকর্ড এখনও দখলে মিষ্টি জলের এক প্রাগৈতিহাসিক বাসিন্দার৷ সার্কোসাকাস ইমপেরাটর নামে এই করাল কুম্ভীর ছিল ৪০ ফিটের বেশি লম্বা , ওজন ছিল আট টনের উপর ! ডাইনোসাকাস নামে আর এক নদী -কুমিরও ছিল ম্যাকিমোসরাসের চেয়ে বড়৷ তাই আয়তনের চেয়েও বিজ্ঞানীদের এখন নজর বেশি কেড়েছে ম্যাকিমোসরাসের দাপিয়ে বেড়ানোর সময়কাল৷ এবং এখানেই মাথাচাড়া দিয়েছে নতুন প্রশ্ন৷

কারণ, ১৪.৫ কোটি বছর আগে (জুরাসিক যুগের শেষে) এক মহাবিলোপের কোপে অসংখ্য প্রজাতি অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন৷ ম্যাকিমোসরাস যে পরিবারের অন্তর্গত, সেই টেলিয়োসরিড-রাও এই মহাবিলোপের ছোবল এড়াতে পারেনি বলেই এত দিন মনে করা হত৷ কিন্তু তা হলে ম্যাকিমোসরাস বেঁচে গেল কী করে? ব্রুসেট বলছেন, 'এই জীবাশ্ম এটাই প্রমাণ করে যে, ওই মহাবিলোপের প্রভাব সর্বগ্রাসী হয়নি৷ তার থাবা এড়াতে পেরেছিল বহু প্রাণীই, বিশেষ করে সামুদ্রিক সরীসৃপেরা৷' তখন বিলুপ্ত হয়নি বটে, কিন্তু পুরোনো গরিমাও আর ফিরে পায়নি ম্যাকিমোসরাস রেক্স৷

টির্যানোসরাস আর হংসচঞ্চু ডাইনোসরদের সমকালীন এই অতিকায় কুমির আস্তে আস্তে মুছে গিয়েছিল পৃথিবীর বুক থেকে৷ আর যে সমুদ্রে ছিল তাদের হিংস্র বিচরণ, সেই সাগর মরুভূমি হয়ে লুকিয়ে রেখেছিল তাদের কঙ্কাল! কুম্ভীর-বিভ্রাট ১২ কোটি বছর আগে এ ভাবেই সমুদ্র দাপিয়ে বেড়াত ম্যাকিমোসরাস রেক্স৷ চিত্রশিল্পীর কল্পনায়৷