logo

‘মৃত্যু-আতঙ্কে’ ভুগছেন মুসা বিন শমসের!

মোর্শেদ নোমান


‘মৃত্যু-আতঙ্কে’ ভুগছেন মুসা বিন শমসের!

ঢাকা, ১২ জানুয়ারী- মৃত্যু-আতঙ্কে (ডেথ ফোবিয়া) ভুগছেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসের। সেই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসও তাঁকে ভোগাচ্ছে। এসব কারণ জানিয়ে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) চিঠি দিয়ে বলেছেন, কাল বুধবার দুদকের তলবে তিনি হাজির হতে পারছেন না।

আজ মঙ্গলবার এ বিষয়ে চিকিৎসকের সনদ যুক্ত করে দুদককে চিঠি দিয়েছেন মুসা বিন শমসের। চিঠির অনুলিপি দুদক চেয়ারম্যান, সংস্থার দুই কমিশনার, অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগের মহাপরিচালক, একই বিভাগের পরিচালক এবং অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও দুদকের পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলীকে দিয়েছেন। চিঠিতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় দুই থেকে তিন মাস পেছানোর আবেদন করা হয়েছে।

দুদকের একাধিক কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। কাল বুধবার মুসা বিন শমসেরকে তৃতীয়বারের মতো জিজ্ঞাসাবাদের তারিখ নির্ধারিত ছিল।

মুসা বিন শমসেরের আবেদনটি দুদকে জমা দেন তাঁর মালিকানাধীন জনশক্তি প্রতিষ্ঠান ড্যাটকো প্রাইভেট লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক এ টি এম মাহবুব মোর্শেদ। আবেদন জমা দেওয়ার পর দুদক থেকে বের হওয়ার সময় এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্যার (মুসা বিন শমসের) কমপক্ষে দুই থেকে তিন মাস সময় পেছানোর আবেদন করেছেন।’ কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্যার মৃত্যু-আতঙ্কে থাকেন। ডাক্তারি ভাষায় যেটাকে ডেথ ফোবিয়া বলে। এ ছাড়া তাঁর উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস আছে।

মুসা বিন শমসের কখন মৃত্যু-আতঙ্কে থাকেন? জানতে চাইলে ড্যাটকোর এ কর্মকর্তা বলেন, ‘স্যার যখন ঘুমান তখন তাঁর মনে হয় তিনি হয়তো মারা যেতে পারেন। সুইস ব্যাংকে তাঁর বিপুল পরিমাণ টাকা জব্দ থাকায় এ টাকা কবে অবমুক্ত হয়, এসব চিন্তায় হয়তো স্যারের এমন হচ্ছে।’

বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের কথিত বিপুল পরিমাণ সম্পদের রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে ৪ জানুয়ারি তাঁকে আবারও তলব করে চিঠি দেয় দুদক। পরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলী স্বাক্ষরিত ওই তলবি নোটিশে তাঁকে ১৩ জানুয়ারি বেলা ১১টায় সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়।

দুদক সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ৭ জুন দুদকে দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে মুসা বিন শমসেরের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী সুইস ব্যাংকে তাঁর ১২ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ৯৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৭৮ টাকা হিসাবে) ‘ফ্রিজ’ অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়াও সুইস ব্যাংকের ভল্টে ৯০ মিলিয়ন ডলার দামের (বাংলাদেশি প্রায় ৭০০ কোটি টাকা) অলংকার জমা রয়েছে।

গাজীপুর ও সাভারে তাঁর নামে প্রায় ১ হাজার ২০০ বিঘা সম্পত্তি রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মুসা। বর্তমান বাজার দরে এসব জমির দাম ১ হাজার ২০০ কোটি টাকারও বেশি। অধিকাংশ সময় দেশের বাইরে থাকায় এসব সম্পত্তির খাজনা পরিশোধ করে নামজারি করা সম্ভব হয়নি বলে জানান মুসা।

মুসার দেওয়া তথ্য যাচাই করতে দুদকের চাহিদা অনুযায়ী সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু চিঠির উত্তরে ব্যাংকটি জানিয়েছে, সেখানে ওই নামে কোনো হিসাব নেই। তাই ওই ব্যক্তির নামে কোনো সম্পদও নেই। সুইজারল্যান্ড কর্তৃপক্ষের জবাব পাওয়ার পর প্রকৃত তথ্য জানতে মুসাকে আবারও দুদকে তলব করা হয়।

সূত্র জানায়, মুসা বিন শমসেরকে এর আগে দুই দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেও সুইস ব্যাংকের হিসাব নম্বর জানতে পারেনি দুদক। এবারের জিজ্ঞাসাবাদে প্রকৃত তথ্য না জানালে তাঁর বিরুদ্ধে তথ্য প্রদানে অসহযোগিতার অভিযোগে মামলা করা হতে পারে। এ অপরাধে তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। মামলার পর আইন অনুযায়ী অনুসন্ধানও চলতে থাকবে। অনুসন্ধানে নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেলে পরে জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আরেকটি মামলা করা হবে। এ মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

২০১৪ সালের জুন মাসে বিজনেস এশিয়া নামের একটি সাময়িকীতে মুসাকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্রে ওই বছরের ৩ নভেম্বর তাঁর সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। ১৮ ডিসেম্বর প্রায় ৪০ জন ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর বহর নিয়ে দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে হাজির হন তিনি। পরে দুদকের অনুসন্ধান দলটি মুসার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ড্যাটকোতে গিয়ে তাঁকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করে।

জিজ্ঞাসাবাদে মুসা দাবি করেন, ৪২ বছর বিদেশে বৈধভাবে ব্যবসার মাধ্যমেই তিনি ১২ বিলিয়ন ডলার উপার্জন করেছেন। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, মিসর, সিরিয়া, পাকিস্তানসহ অনেক দেশের সরকারি প্রতিরক্ষা ক্রয়সংক্রান্ত পাওনা পরিশোধের অর্থ ওই সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সুইস ব্যাংকে তাঁর হিসাবে জমা হয়েছে।