logo

নর্থ কোরিয়াকে কেনো সামলাতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র?

রেজাউল করিম


নর্থ কোরিয়াকে কেনো সামলাতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র?

সিউল, ১১ জানুয়ারি- নর্থ কোরিয়ার সর্বশেষ হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষার পর তর্জন-গর্জন শোনা যাচ্ছে যে, এই অস্ত্র পরীক্ষার ব্যাপারে একটি ‘মহান চুক্তি’ ভঙ্গ করা হয়েছে। ওই চুক্তি অনুযায়ী কোনো দেশ এই ধরণের পরীক্ষা চালাতে পারবে না।

সেই চুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর পর নর্থ কোরিয়ার বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞার কথা বলছে জাতিসংঘ। কড়া শাস্তির দাবি করেছেন মার্কিন আইন প্রণেতারা, কে-পপ (কোরিয়ান ভাষায় প্রতিশোধ) করার কথা বলছে সাউথ কোরিয়া এবং ভয় দেখানোর জন্য আকাশে বিমান বাহিনীর তেজ দেখানোর কথা বলছে উদ্বিগ্ন জাপান। কিন্তু এর একটি দেশও নর্থ কোরিয়ার প্রতি খড়গহস্ত হতে পারছে না। কেনো?

প্রাণঘাতী মারাত্মক এ অস্ত্র তৈরি থেকে অনেক দেশকেই বিরত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। সর্বশেষ উদাহরণ ইরান। পারমাণু বোমা তৈরির সর্বশেষ পর্যায়ের ইউরোনিয়াম তৃতীয় কোনো দেশে পাঠাতে ইরানকে এক রকম বাধ্য করেছে মার্কিনিরা।

তার আগে জার্মানি, লিবিয়া, ইরাক ও সাউথ আফ্রিকাকে হয় কৌশলে; না হয় বল প্রয়োগে থামিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু নর্থ কোরিয়ার ক্ষেত্রে কেনো সেটা হচ্ছে না? আন্তর্জাতিক বিশ্ব থেকে প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন এই ছোট দেশটিকে কেনো সামলাতে বা বসে আনতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র?

যুক্তরাষ্ট্র না পারলে অার কে সামলাবে নর্থ কোরিয়াকে? তাহলে কি কিংম জং উনকে সামলানোর আর কেউ নেই? ঘুরছে সেই প্রশ্নও। অনেকে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র, সাউথ কোরিয়া, জাপান বা জাতিসংঘ নয়, নর্থ কোরিয়াকে সামলাতে পারে একমাত্র দেশ সে হলো চীন। তাও কি পুরোপুরি সত্য?

নর্থ কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং একমাত্র অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মিত্র চীন। এই দেশটিই কি হতে পারে ‘যুদ্ধবাজ’, ‘বিতর্কিত’, ‘মেধাবী’ নেতা কিম জং উনের একমাত্র প্রতিবন্ধক?

ওয়াশিংটন মনে-প্রাণে আশা করছে অস্ত্র পরীক্ষার পর নর্থ কোরিয়ার বিরুদ্ধে সর্বজন সম্মত কিছু একটা করবে চীন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি চীনের প্রতি নর্থ কোরিয়ার সঙ্গে সব ধরনের ‘স্বাভাবিক’ ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। পত্রিকার সম্পাদকীয় লেখকরাও এই ‘বিরক্তিকর আশ্রিত’ প্রতিবেশির সম্পর্কে কিছু একটা করতে বলেছেন।

চীনের জনগণের মধ্যেও একটা অংশ একই রকম ভাবনা ভাবছেন। তাদের ক্ষোভের প্রকাশ দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যেখানে কিম জং উনকে একজন কারারুদ্ধ অপরাধী হিসেবে উপহাস করা হয়েছে।

কিন্তু চীনা সরকার পারমাণবিক পরীক্ষা নিন্দা করেছে। যদিও এটা কল্পনা করা কঠিন যে বেইজিং পিয়ংইয়ংয়ের দিকে এর চেয়ে বেশি আঙুল তুলবে। হয়তো জাতিসংঘ নতুন করে আবার অবরোধ আরোপ করবে।

কিন্তু তাতে কোনো কাজ হবে না। ২০১৩ সালের পরমাণু বোমা পরীক্ষার পরও অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলো চীন। সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একমত হয়ে অবরোধ আরোপেও সায় দিয়েছিলো তারা। কিন্তু এর এক সপ্তাহ পরেই আন্তর্জাতিক পদমর্যাদা ভেঙে দীর্ঘদিনের নিঃসঙ্গ মিত্রকে সমর্থন দেয় চীন।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, চীনের এর চেয়ে বেশি কোনো বিকল্প নেই। নর্থ কোরিয়ার সঙ্গে তার  ‘ঐতিহাসিক সম্পর্ক’। এমন একটা দেশকে বেইজিং ছেড়ে দিলে অন্যরা এর সুযোগ নিতে পারে। তার উপর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের হাতে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে।

তবে নর্থ কোরিয়া ইস্যুতে শুরুর চেয়ে এখন বেশি সমস্যায় পড়েছেন জিনপিং। চীনা অর্থনীতিতে কিছুটা ভাটার টান, যার প্রভাব এরই মধ্যে জনগণের উপর পড়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক গতি যদি ভালো থাকতো, তাহলে কি সমর্থন তুলে নিতে পারতো চীন? উত্তরটা হলো ‘না’।

কারণ চীনের ভয় আছে যে, কিম খুব সহজেই চীনের পরিবর্তে তাদের মূল স্পন্সর হিসেবে রাশিয়াকে গ্রহণ করবে (এই রকম প্রস্তাব এরই মধ্যে রাশিয়া নর্থ কোরিয়াকে দিয়ে রেখেছে)। এর বাইরে বিশ্লেষকরা আরেকটি কারণ বলছেন। সেটা হলো-নর্থ কোরিয়া এবং তার অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বিরুদ্ধে তাক করতে চায় চীন। সত্যি বলতে উল্টো সুর ধরলে এই নর্থ কোরিয়াই চীনের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়াবে।

ভয় আরো আছে। চীন সমর্থন তুলে নিয়ে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাবে। এর ফলে সেখানে মারাত্মক ধরনের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। দেশের বাইরে থাকা অনেক চীনা নাগরিকরা বলছেন, চীন পরমাণু অস্ত্র নিয়ে যতোটা না উদ্বিগ্ন, তার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন নর্থ কোরিয়ার ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ নিয়ে।

চীনের সঙ্গে ১৪০০ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে নর্থ কোরিয়ার। কোনো কারণে অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিলে সেখানকার মানুষ যে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পিপঁড়ের মতো চীনের দিকেই ছুটবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এর ফলে চীনে সন্ত্রাসবাদ ও অশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে, সিরিয়ার কারণে যেমনটা ইউরোপে সৃষ্টি হয়েছে। নর্থ কোরিয়ায় এমনটা হলে ইউরোপের তুলনায় চীনে সেটা হবে ১০ গুণ।

অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক বলছেন, নর্থ কোরিয়া বেইজিংয়ের জন্য রোজ কেয়ামতের বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। কিন্তু নর্থ কোরিয়া নিরাপত্তার ব্যাপারে চীনকে আশ্বাস্ত করেছে এবং করছে। আর তাই মেনে নিচ্ছে চীন।

এর মানে হলো মারমুখো প্রতিবেশীর দ্বারা সৃষ্ট কিছু বিমূঢ়তা ও দুশ্চিন্তা সব সময়ই সহ্য করতে হয়। আর চীনের এই সহ্য ক্ষমতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য কেউ নর্থ কোরিয়াকে সামলাতে পারছে না।