logo

উত্তর কোরিয়াকে ‘বশে আনার’ উপায় হতে পারে ইরান অধ্যায়

মিজানুর রহমান


উত্তর কোরিয়াকে ‘বশে আনার’ উপায় হতে পারে ইরান অধ্যায়

সিউল, ০৯ জানুয়ারি- ১৩ বছর আগে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে উত্তর কোরিয়া। সে থেকে এখন পর্যন্ত দেশটি ভূ-অভ্যন্তরে পরীক্ষামূলকভাবে অন্তত তিনটি পরমাণু বোমার পরীক্ষা চালিয়েছে। দেশটির উপর কঠোর আন্তর্জাতিক অবরোধ ও প্রতিটি বিস্ফোরণের পর বিশ্বব্যাপী তীব্র নিন্দা ও আরো অবরোধ আরোপের পরও উত্তর কোরিয়াকে আটকানো যায়নি।

গত সপ্তাহের বুধবার উত্তর কোরিয়া অনেকটা নাটকীয়ভাবে হাইড্রোজেন বোমার সফল পরীক্ষা চালানোর কথা জানায়। অবশ্য উত্তর কোরিয়া ঠিক হাইড্রোজেন বোমারই পরীক্ষা চালিয়েছে কি-না, তা নিয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছেন। আর দেশটিও এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করার প্রয়োজন অনুভব করেনি। কিন্তু ওই ঘোষণাতেই পশ্চিমা বিশ্ব ও তাদের মিত্ররা নড়ে-চড়ে বসেছে। উত্তর কোরিয়াকে সব দিক থেকে আরো কোনঠাসা করার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ সপ্তাহ থেকেই সেটি প্রয়োগ করার কথা রয়েছে।

আধুনিক পরমাণু বোমা তৈরির সব ধরনের সরঞ্জাম উত্তর কোরিয়ার কাছে আছে। তবে দেশটি সর্বপ্রথম ফিশন বোমা তৈরি করে। এটম বোমা নামে পরিচিত ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম নিউক্লিয়াস বোমায় ফিশন প্রক্রিয়ায় বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। কিন্তু হাইড্রোজেন বোমা বা থার্মোনিউক্লিয়ার বোমায় ভারী হাইড্রোজেনের আইসোটোপ ব্যবহার করা হয় এবং এতে ফিউশন প্রক্রিয়ায় বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এ বিস্ফোরণে বহুগুণ বেশি শক্তি নির্গত হয়। 

১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যে বোমা ফেলা হয়েছিল সেগুলো ছিল ফিশন বোমা। এদের মধ্যে হিরোশিমারটি ছিল ইউরেনিয়াম এবং নাগাসাকিরটি ছিল প্লুটোনিয়াম বোমা।

হাইড্রোজেনের বোমা মূলত দু’ধাপে কাজ করে। প্রথম ধাপে একটি ফিশন বোমার বিস্ফোরণ হয়, যেটি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তাপ উৎপন্ন করে। হাইড্রোজেন বোমার আরেক নাম 'নিউক্লিয়ার ফিউশন'। এই বোমার কৌশল হলো দুই বা ততোধিক হাইড্রোজেন পরমাণু জুড়ে অনেক বড় ও ভারী পরমাণুতে পরিণত করা। তাই এর নাম হাইড্রোজেন বোমা। এতে বেরিয়ে আসে 'নিউক্লিয়ার ফিউশনের' তুলনায় কয়েক হাজার গুণ বেশি শক্তি।

ঠিক এই কারণেই ৬ জানুয়ারি উত্তর কোরিয়া হাই্রডাজেন বোমার পরীক্ষা চালানোর যে দাবি করছে, তাতে সন্দেহ করছেন অনেকেই। হতে পারে উত্তর কোরিয়ার আগের পরীক্ষা করা বোমার চেয়ে এটা শক্তিশালী, কারণ এবার অন্তত ৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এর কম্পন অনুভূত ছিল।

কিন্তু উত্তর কোরিয়া যদি আদৌ হাইড্রোজেন বোমা বানানোর সক্ষমতা অর্জন না করেও থাকে, তাহলেও এটা নিশ্চিত যে, দেশটির কাছে গতানুগতিক ফিশন বোমার চেয়ে ভয়ঙ্কর কোনো বোমা আছে এবং তারা হাইড্রোজেন বোমা বানানোর মতো সক্ষমতা অর্জন করেছে।

যদি তাই হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এটি একটি বিরাট হুমকি। উত্তর কোরিয়া দু’ধাপের থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা বানাতে পারল কি পারল না, সেটি আসল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্নটা হচ্ছে, দেশটি পরমাণু যুদ্ধের উস্কানি দিতে পারে। উত্তর কোরিয়া খুবই হালকা বোমা তৈরি করতে পারে, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে এসব বোমা ব্যাবহার করে দেশটি দক্ষিণ কোরিয়ার বড় বড় শহর, জাপান এমন কি যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যন্ত ধ্বংস করে দিতে পারে!

ইতোমধ্যে উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়াকে অফিসিয়ালি সতর্কবার্তা দিয়েছে। দেশটি বলছে, তারা যুদ্ধের দ্বারগোড়ায় রয়েছে। এখন এমন প্রেক্ষপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কী করা উচিত।

এটা অনেকটা স্পষ্ট যে, উত্তর কোরিয়ার উপর নানা ধরনের অবরোধ ও বিধিনিষেধ আরোপের পর পরমাণু কার্যক্রম থেকে তাদের বিরত রাখা যায়নি। তবে এ দাওয়াই যে পুরোপুরি ব্যর্থ, সেটা বলা যাবে না। ইরানের কথা ধরা যাক। ইরানও বহুদিন ধরে পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। পশ্চিমাদের অব্যাহত চাপেও নতি স্বীকার করেনি দেশটি। কিন্তু দেশটির উপর দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে তারা কিছুটা শিথিল হতে বাধ্য হয়েছে এবং গত বছর ইরানের পরমাণু কার্যক্রম নিয়ে আলোচনার দ্বার কিছুটা হলেও উন্মুক্ত হয়েছে।

যদিও ইরান এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কার্যক্রমের মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে। ইরানের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম, কিন্তুে এখনো সেরকম কিছু করার প্রমাণ মেলেনি। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার অবস্থা এর চেয়ে বহুগুন বেশি ভয়ঙ্কর। তাই উত্তর কোরিয়ার সমস্যা দ্রুত নিস্পত্তি করা অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। 

ইরানের সমস্যা মোকাবেলায় বিশ্বনেতারা অন্য সবকিছুকে পেছনে ফেলে ‘বৈশ্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকি’কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান বলেছে, তারা অবশ্যই যেকোনো বিষয়ে সাহায্য করতে রাজি আছে, কিন্তু তার আগে জাতিসংঘ যদি এমন কোনো উদ্যোগ হাতে নেয় যেখানে রাশিয়া ও চীনের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকে, তাহলে সেটি আরো ভালো হবে। 

গত বছর ইরানের সাথে সম্পাদিত পারমাণবিক চুক্তি এ সংক্রান্ত আলোচনায় সফলতার একটি মাইলফলক। ভবিষ্যতে একটি চূড়ান্ত পারমাণবিক বিপর্যয়ের হাত থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে হলে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। 

সূত্র: সিএনএন