logo

ঘনীভূত হচ্ছে বাংলাদেশ-পাকিস্তান কূটনৈতিক সঙ্কট

ঘনীভূত হচ্ছে বাংলাদেশ-পাকিস্তান কূটনৈতিক সঙ্কট

ঢাকা, ০৯ জানুয়ারি- সোমবার থেকে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সার্কের মন্ত্রী পর্যায়ের ‘সাউথ এশিয়ান কনফারেন্স অন স্যানিটেশন’ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে না পাকিস্তান।  না আসার কারণ হিসেবে ভিসা না পাওয়াকে পকিস্তানের তরফে দাবি করা হলেও বাংলাদেশের তরফে জানানো হয়েছে বারবার প্রতিনিধি পরিবর্তন এবং সময়মতো আবেদন না করায় তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

বাংলাদেশে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তান মর্মাহত হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যকার কুটনীতিক সম্পর্ক উত্তপ্ত হওয়া শুরু করে। এরপর জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে বাংলাদেশ থেকে দেশটির এক কুটনীতিককে প্রত্যাহারের করে নিতে বলার পর ‘গুপ্তচর’ অভিযোগ করে বাংলাদেশের এক কুটনীতিককে প্রত্যাহার করে নিতে বলে পাকিস্তান। আর এবার বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সহযোগি সংস্থা সার্কের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ না নেয়ায় এই সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে গেল বছরের নভেম্বরে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর ইসলামাবাদের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পাকিস্তান গভীরভাবে মর্মাহত।’ এছাড়া গত মাসে দেশটির বাংলাদেশ হাইকমিশনে নিযুক্ত কর্মকর্তাদের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ওঠে আসলে দেশটির কূটনীতিক ফারিনা আরশাদকে প্রত্যাহার করে নিতে বলে বাংলাদেশ। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে কোনো ধরনের কারণ না দেখিয়ে পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের কাউন্সিলর (রাজনৈতিক) মৌসুমী রহমানকে প্রত্যাহার করে নিতে বলে দেশটি। আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিরুদ্ধে কোন বক্তব্য না দিলেও পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমে মৌসুমীি রহমানের বিরুদ্ধে গুপ্তচারবৃতির অভিযাগ আনা হয়।

মন্ত্রী পর্যায়ের সার্কের এই সম্মেলনে পাকিস্তানের না প্রসঙ্গে আয়োজকদের একজন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. খায়রুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, পাকিস্তান বারবার তাদের প্রতিনিধি পাল্টেছে এবং তারা সময়মতো ভিসার জন্য আসেননি।’

তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান এখন তাদের মন্ত্রীকেও পাঠাচ্ছে না। মন্ত্রী পর্যায়ের এই সম্মেলনে তাদের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’

ঢাকার আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ইসলামাবাদ প্রাথমিকভাবে ৬০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের তালিকা পাঠিয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের সচিব (এলজিআরডি) ওই সব আমন্ত্রণপত্রে সই করেছিলেন। পাকিস্তান বারবার প্রতিনিধি তালিকা পাল্টানোর কারণে তারা যথাসময়ে ভিসার আবেদন করতে পারেননি।’

অন্যদিকে ঢাকায় পাকিস্তান হাই কমিশনের মুখপাত্র আমব্রিন জান বলছেন, ৬০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের তালিকা বা মন্ত্রীর আসা সম্পর্কে তার কিছু জানা নেই। এ সম্মেলনের জন্য ১৩ সদস্যের প্রতিনিধি দলের অনুমোদন দিয়েছিল ইসলামাবাদ। ওই দলে সব প্রদেশের কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছিল।

তিনি আরো বলেন,  ‘তবে তাদের কারো ভিসা ইস্যু করা হয়নি। ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাই কমিশন ১০ দিন তাদের পাসপোর্ট রেখেছিল। সুতরাং, ইসলামাবাদ থেকে কোনো প্রতিনিধি আসছেন না।’

প্রতি দুই বছর অন্তর সার্কভুক্ত দেশগুলোতে পর্যায়ক্রমে পয়োনিষ্কাশন বিষয়ে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা সেখানে সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ‘দক্ষিণ এশিয়ার  চ্যালেঞ্জ’ স্যানিটেশন নিয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ঠিক করেন। ‘বেটার স্যানিটেশন, বেটার লাইফ’ স্লোগান নিয়ে এবারের সম্মেলনে আফগানিস্তান, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। সম্মেলন শেষে গৃহীত হওয়ার কথা রয়েছে ‘ঢাকা ঘোষণা’।

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কোনো কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের ঘটনা এবারই প্রথম ঘটলেও বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি কূটনীতিককে প্রত্যাহারের ঘটনা এবার তৃতীয়।

এর আগে, ২০০০ সালে পাকিস্তানের উপ-রাষ্ট্রদূত ইরফানুর রাজাকে বাংলাদেশ অবাঞ্চিত ঘোষণা করে বহিষ্কার করে। ঢাকার একটি সেমিনারে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করার পর তাকে বহিষ্কার করা হয়। সেসময় কোন প্রতিক্রিয়া দেখায়নি দেশটি। এছাড়া গত বছরের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তান দূতাবাসের কর্মকর্তা মোহাম্মাদ মাজহার খান জালনোটসহ হাতেনাতে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। পাকিস্তানের একজন ঊর্ধ্বতন কূটনীতিক তাকে মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে দেশত্যাগের আহবান জানায়। এরপর তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে যান। পাকিস্তানের তরফে তখনও কোন প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি। তবে এবার বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তা প্রত্যাহারের ঘটনাকে পাকিস্তানের মুখ রক্ষার চেষ্টা হিসেবে দেখছে ঢাকা।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মাদ শাহরিয়ার আলম মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রাখার জন্য যতটুকু ধৈর্য ধারণ করার দরকার আমরা সেটা করব। পাকিস্তানে কার্যক্রম কমানোর কোনও চিন্তাভাবনা আমাদের নেই।’

বাংলাদেশি কূটনীতিককে প্রত্যাহার করতে বলার পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বুধবার বলেন,‘পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আগের মতোই থাকবে। তবে আমরা বর্তমান পরিস্থিতির উপরও গভীরভাবে নজর রাখছি। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আমরা কোনো আপস করব না।’