logo

তাঁদের হাতেই আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ​

মোসতাকিম হোসেন


তাঁদের হাতেই আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ​

ডিবালা, আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ​ কান্ডারি!

প্রায় চার মাস আগের কথা। বলিভিয়াকে ৭-০ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল আর্জেন্টিনা। অনেকেই হয়তো ম্যাচটার কথা ভুলে গেছেন, প্রীতি ম্যাচের কথা কয়জনই বা মনে রাখে? তবে আজ থেকে পাঁচ বছর পর হয়তো এই ম্যাচটা সবাই মনে রাখবে একটা যুগের শুরু হিসেবে। অ্যাঞ্জেল কোরেয়া ও মাতিয়াস ক্রানেভিতার নামের দুজন তরুণ তুর্কির অভিষেক হয়েছিল ওই ম্যাচে। কুঁড়ি থেকে ফুল হয়ে ফুটতে পারবেন কি না, সেটা এখনই বলা মুশকিল। তবে ভবিষ্যতে আর্জেন্টিনার উজ্জ্বল দুই নক্ষত্র মনে করা হচ্ছে তাঁদের। 

ফুটবলে ‘সোনালি প্রজন্ম’ কথাটা অতি ব্যবহারে ক্লিশেই হয়ে গেছে। তবে আর্জেন্টিনার একটা প্রজন্মের জন্য সেই কথাটা মনে করিয়ে দিতেই হয়। লিওনেল মেসি, গঞ্জালো হিগুয়েইন, সার্জিও আগুয়েরো, অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া—এই দলকে যারা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাঁরা সবাই কাছাকাছি সময়েই জন্মেছেন। অথচ বারবার আশা জাগিয়েও বড় কোনো শিরোপা এখনো তাঁদের কাছে সোনার হরিণ। বিশ্বকাপ ফাইনালের আক্ষেপ তো কোনো দিনই দূর হওয়ার নয়। সময়টাও ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে, আর বড়জোর হয়তো এক-দুটি সুযোগ পাবেন। কিন্তু এরপর? আকাশি-নীল জার্সিদের অনন্ত আক্ষেপ যারা দূর করবেন, তাদের আগমনী বার্তা কই? 

বলিভিয়ার সঙ্গে ওই ম্যাচেই তো একটু পাওয়া গেল। এক মাস পর বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে প্যারাগুয়ের সঙ্গে ম্যাচে সৌরভ ছড়াল আরেকটি কুঁড়ি। ২২ বছর বয়সী পাওলো ডিবালা ওই দিনই প্রথম জাতীয় দলের জার্সি গায়ে নামলেন। জুভেন্টাসের হয়ে যেমন খেলছেন, তাতে ডিবালার মধ্যে নক্ষত্র হয়ে ওঠার সব সম্ভাবনাই তো আছে। ইতালি ও পোল্যান্ডের নাগরিকত্ব থাকার পরও আর্জেন্টিনাকে বেছে নিয়েছেন, আকাশি-নীল জার্সির জন্য ডিবালা কতটা নিবেদিত সেটা বোধ হয় বলে না দিলেও চলে!


অ্যাঞ্জেল কোরেয়া, পারবেন আক্ষেপ ঘোচাতে?

ক্রানেভিতার ও কোরেয়ার কথায় আবার ফিরে আসা যাক। আর্জেন্টিনার হয়ে শেষ পর্যন্ত কতটা কী করতে পারবেন, সেটা অদূর ভবিষ্যতে বলা কঠিন। তবে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের ম্যাচে চোখ রাখলে একটু ধারণা পেতে পারেন। আর্জেন্টিনার ক্লাব সান লরেঞ্জোর হয়ে নিজের প্রথম মৌসুমেই দশ গোল করেছিলেন। অমিত সম্ভাবনা দেখে ১৯ বছর বয়সী কোরেয়াকে গত বছরেই নিয়ে এসেছিল অ্যাটলেটিকো। হৃদযন্ত্রের সমস্যায় অবশ্য প্রথম মৌসুমে মাঠে নামতে পারেননি। তবে এই মৌসুমে বুঝিয়ে দিয়েছেন, লম্বা রেসে ভরসা করার মতো অনেক কিছুই তাঁর মধ্যে আছে। এমনকি কার্লোস তেভেজের সঙ্গেও তুলনা শুরু হয়ে গেছে। 

ক্রানেভিতার অবশ্য কোরেয়া-ডিবালার মতো ফরোয়ার্ডে খেলেন না। খেলার ধরনটা বরং হাভিয়ের মাচেরানোর সঙ্গেই বেশি যায়। লাতিন আমেরিকার রীতি অনুয়ায়ী এর মধ্যেই ‘নতুন মাচেরানো’ তকমাও নামের সঙ্গে জুটে গেছে। শুধু খেলার ধরন নয়, আরেকটা বড়ও মিল আছে। মাচেরানোর মতো ক্রানেভিতারও উঠে এসেছেন রিভার প্লেটের যুব দল থেকে। আলো ছড়াতে শুরু করেছেন এখানেই। পূর্বসূরির দেখানো পথে হেঁটে এর মধ্যেই ইউরোপে চলে এসেছেন, ঠিকানা অ্যাটলেটিকোই। এখনো কোনো ম্যাচে অবশ্য নামা হয়নি, সেটার জন্য ২২ বছর বয়সী মিডফিল্ডারকে নিশ্চয় খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না। 

এই দুজনের তুলনায় বরং ডিবালাই ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে আগে থেকেই মৌতাত ছড়াচ্ছেন। তিন বছর আগেই আর্জেন্টিনা থেকে পাড়ি জমিয়েছেন সিরি ‘আ’র পালের্মোতে। প্রথম দুই মৌসুমে একটু ম্রিয়মাণই ছিলেন, তবে গত মৌসুমেই নিজেকে চিনিয়েছেন ইউরোপিয়ান মঞ্চে। সিরি আ-তে ১৩ গোল করে ও ১০ গোল করিয়ে অসাধারণ একটা মৌসুমই কাটিয়েছেন। পরের মৌসুমে প্রায় ৪ কোটি ইউরো খরচ করে এমনি এমনি তো জুভেন্টাস তাঁকে দলে নেয়নি! 


ইর্তুবে, নতুন আশা জাগাচ্ছেন

আপাতত এই তিনজনই বেশি পাদপ্রদীপের আলোতে, তবে সেটা নিজেদের দিকে টেনে নিতে পারেন আরও বেশ কয়েকজন। ক্রানেভিতার ও কোরেয়ার অ্যাটলেটিকো সতীর্থ লুসিয়ানো ভিয়েত্তোই তো গোলের জন্য বড় ভরসা হতে পারেন। ২২ বছর বয়সী স্ট্রাইকারের দিকেও চোখ রাখতেই হবে। হুয়ান রোমান ইতুর্বেকে যেমন ‘নতুন মেসি’ নামই দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ভেরোনার হয়ে যে ঝলক দেখিয়েছিলেন, রোমার হয়ে গত মৌসুমে অবশ্য চোট আর ফর্মহীনতায় নিজেকে হারিয়ে খুঁজেছেন। কয়েক দিন আগেই নাম লিখিয়েছেন প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব বোর্নমাউথে। নিজেকে নিশ্চয় নতুন করে ফিরে পেতে চাইবেন! 

লুকাস ওকাম্পোসও ডানা মেলতে না মেলতেই কেন যেন গুটিয়ে ফেলেছেন। মোনাকোর হয়ে ২০১২ সাল থেকেই নিজের সম্ভাবনাটা জানান দিচ্ছিলেন। কিন্তু এই এই মৌসুমে ধারে যেতে হয়েছে ফ্রেঞ্চ লিগেরই ক্লাব মার্শেইতে। বয়স অবশ্য মাত্র ২২, নিজেকে প্রমাণ করার আরও অনেক সুযোগ পাবেন। 

এঁদের মতো না হলেও অনুচ্চারে শোনা যাচ্ছে আরও বেশ কয়েকজনের নাম। আর্জেন্টিনারই ভেলেজ সার্সফিল্ডের ২০ বছর বয়সী লুকাস রোমেরোর কথা ধরুন। অনেকেই ডিয়েগো সিমিওনের ছায়া খুঁজে পাচ্ছেন এই বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারের মধ্যে। 

শুধু স্ট্রাইকার বা মিডফিল্ডার কেন, রক্ষণেও আছে বেশ কিছু সম্ভাবনাময় মুখ। এভারটনের ২৪ বছর বয়সী রামিরো ফিউনেস মোরি ও বোকা জুনিয়র্সের ২৩ বছর বয়সী জিনো পেরুজ্জিরা এর মধ্যেই জাতীয় দলের জার্সিও গায়ে চড়িয়ে ফেলেছেন। গোলপোস্টের নিচে সোসিয়েদাদের ২৩ বছর বয়সী জেরেনিমো রুলির মধ্যেও আস্থা খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। 

কিন্তু এ রকম সুবাস তো আগে কতজনই ছড়িয়েছেন। নতুন ম্যারাডোনার অনিঃশেষ মিছিলের পথ ধরে এসেছেন কজনই। এখন হয়তো অনেক নতুন মেসিও আসবেন। হয়তো তাদের মধ্যে কেউ কেউ ম্যারাডোনা, মেসির মতো মহিরুহও হবেন। কে জানে, আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ-অতৃপ্তি হয়তো ঘুচবে তাদেরই কারও হাত ধরে। পুরো আর্জেন্টিনা সেই হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালারই অপেক্ষায়।