logo

সিরিয়ায় নিহত আইএস কমান্ডার সাইফুলের ‘বাংলাদেশ অধ্যায়’

আব্দুল্লাহ আল সাফি


সিরিয়ায় নিহত আইএস কমান্ডার সাইফুলের ‘বাংলাদেশ অধ্যায়’

ঢাকা, ০৮ জানুয়ারি- জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের তথ্যপ্রযুক্তি ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশী সাইফুল হক ওরফে সুজন সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিমান হামলায় নিহত হওয়ার খবর বিশ্ব গণমাধ্যমে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞান ও  যে দলগত জোরে সাইফুল আইএসের নজরে এসেছিলেন, তার উল্লেখযোগ্য অংশ পরিচালিত হয়েছে বাংলাদেশ থেকে।

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সংগঠনগুলোর সমিতি বেসিসের সদস্য পদ (জি-২৮৭) নিয়ে বাংলাদেশে পরিচালিত হয়েছে তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘আই ব্যাকস লিমিটেড’। সাইফুল ছিলেন ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১০ ডিসেম্বর আইএসের কথিত রাজধানী সিরিয়ার রাকা প্রদেশের কাছে বিমান হামলায় বাংলাদেশি সাইফুল নিহত হন। সাইফুল নিহত হওয়ার পর থেকে তার বড় ভাই আতাউল হক স্পেন অথবা ইউরোপের অন্য কোনো দেশে পালিয়ে আছেন বলে জানা গেছে।

এর আগে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক পড়াশোনা করতে যুক্তরাজ্যের গ্লামারগান বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমানে সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়) গিয়েছিলেন সাইফুল। আর আতাউল হক একজন ডেন্টাল সার্জন হলেও সাইফুলের হাতে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানকে বেশ সফলতার সাথে পরিচালনা করে এসেছেন তিনি।

বাংলাদেশী নাগরিক হওয়ায় এবং যুক্তরাজ্যের ‘ওয়েলস-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স’ এর নেতৃত্বে থাকার সুবাদে সাইফুল-আতাউলের একটি ‘পরিস্কার’ ইমেজ ছিলো সেখানে বাংলাদেশী-ব্যবসায়ী কমিউনিটিতে। সেই সুবাদেই দেশে ব্যবসা শুরু করার পর পুরো প্রতিষ্ঠানের রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আরএনডি) ইউনিট কাজ করেছে বাংলাদেশ থেকে।

বেসিস সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর কাওরান বাজারে আই ব্যাকসের বাংলাদেশ অফিস থেকে কাজ করেছে প্রায় ৬০ জনের মতো একটি দক্ষ জনবল। বেশির ভাগ সময়ে কার্ডিফ অফিসের দেখানো পথেই তাদের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করেছে পুরো টিম।

বেসিসের অন্য সদস্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেছেন, কখনো সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়েনি। খাবার বিষয়ক বিভিন্ন পোর্টাল আর ভ্যাট-ট্যাক্স বিষয়ক প্রযুক্তি বিষয়ক কাজই ছিলো বেশী। বেশ কয়েক বছর ধরে আই ব্যাকসে জিপিএস-জিপিআরএস প্রযুক্তি সহায়ক অ্যাপস তৈরির কাজ হয়েছে।

বাংলাদেশের ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড’ এর কাছেও সাইফুলের প্রতিষ্ঠানের দৌড়ঝাপ ছিলো সম্ভাব্য সেবাদাতা হিসেবে। উন্নত প্রযুক্তির জিপিএস এবংও জিপিআরএস সুবিধাসহ নানা ধরনের যন্ত্রপাতি প্রায় বিনামূল্যে প্রদান করে দীর্ঘ মেয়াদি নানা চুক্তির প্রস্তাবনা ছিলো তাদের পক্ষ থেকে। জিপিআরএস/জিপিএস প্রযুক্তি পণ্য আমদানি করতে লাইসেন্সের জন্য বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)তেও তাদের যোগাযোগ-চেষ্টা ছিলো বলে তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে।

টেলিকম সেক্টরের উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করায় আকারে গড়নে বেশ ‘সম্মানজনক’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আই ব্যাকস কাজ করেছে টেলিনর-ভোডাফোনসহ বেশ কিছু টেলিকম প্রতিষ্ঠানের সাথে। আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ইউএনডিপির সাথেও রয়েছে তাদের কাজের অভিজ্ঞতা।

মুসলিম অধ্যুষিতসহ বিভিন্ন আফ্রিকান দেশে (হাইতি, তানজানিয়া, রুয়ান্ডা ও উগান্ডা) সাইফুলের প্রতিষ্ঠান সরাসরি কাজ করেছে সেদেশের ট্যাক্স সংক্রান্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে।

তাদের খাবার বিষয়ক ব্র্যান্ড ‘ইট নাও (Eat Now)’, ‘আই নেট ফুড (iNetFoods)’ এবং ‘ই টেক আউট (eTakeOut)’ জর্দান, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাজ্যে বেশ জনপ্রিয়।

২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর পোর্টালের বেশীর ভাগই তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের কম্পিউটার প্রকৌশলীদের হাতে।

সাইফুল নিহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হওয়ার পরে বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো অঘোষিতভাবে বন্ধ হয়ে গেছে আই ব্যাকস বাংলাদেশ অফিস।

সরেজমিন আই ব্যাকসের অফিসে গিয়ে সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। অফিসের বিভিন্ন টেলিফোনে চেষ্টা করেও কারো সাথে কথা বলা যায়নি।

আই ব্যাকসের অ্যাকাউন্টস অফিসার নাহিদুদ্দোজা মিয়া ছাড়াও একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা আটক আছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। ওই অফিস থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বিদেশী মুদ্রা, বিদেশী পাসপোর্টসহ নানা প্রযুক্তি পণ্য জব্দ করেছে বলে জানিয়েছেন অভিযান পরিচালিত হতে দেখা কয়েকজন।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, অফিসের প্রবেশ পথে এখন একটি পরিত্যক্ত টেবিল দিয়ে অফিসটি বন্ধ করে রাখা হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে আই ব্যাকসের ঢাকা অফিসের ওয়েবসাইটও।

পাশের এক অফিসের কর্মকর্তা বলেন: প্রথম যখন এই প্রতিষ্ঠানটি এখানে অফিস নেয়, তখন তারা আসলে একটি পুরোদস্তর ‘অফ-শোর অফিস’ হিসেবেই কাজ করতো বলে শুনেছি। শুরুর সময়ে তাদের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারি থাকলেও গত দু’বছর হলো তাদের কর্মী সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যেতে দেখেছি। আইটি ব্যবসায় এমনটি হতেই পারে। তাই সন্দেহ করার মতো কিছু কখনো চোখে পড়েনি।

যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক, অস্ট্রেলিয়া, জর্দান এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ছিলো তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম। সাইফুলের প্রতিষ্ঠানের পার্টনার হিসেবে আছেন ‘ডেভিড লিডস্কিন’ নামে একজন মার্কিন নাগরিক, আছেন এক ব্রিটিশ ও জর্দানি নাগরিকও।

সাইফুলের প্রতিষ্ঠানের আরেক কর্ণধার তার বড় ভাই ডেন্টিস্ট আতাউল হক। সেসঙ্গে ছিলেন সাইফুলের বন্ধু ও সহকর্মী আব্দুল সামাদ, তিনিও একজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। যুক্তরাজ্যের কার্ডিফে বসেই পুরো ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন আব্দুল সামাদ।

সাইফুলের মতো প্রতিভাবান ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতরা কেনো জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করছেন, এই বিষয়ে জ‌ঙ্গিবাদ-মৌলবাদ বিষয়ক গ‌বেষক শাহরিয়ার কবির বলেন, বাংলাদেশসহ ওইসব পশ্চিমা দেশগুলো থেকে তরুণদের যে বড় অংশ জঙ্গি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হচ্ছে, তারা আসলে আইডেন্টি ক্রাইসিসে ভুগছিলো বলে আমার ধারণা।

‘তাদের পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব ও ফ্যান্টাসিজমে আক্রান্ত হয়ে তারা আইএস'সহ নানা জঙ্গি কর্মকাণ্ডে আকৃষ্ট হচ্ছে।’

পশ্চিমা শিক্ষার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে শাহরিয়ার কবির বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাদ্রাসা থেকে ছাত্ররা যে কারণে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে আকৃষ্ট হয়, তার সঙ্গে পশ্চিমা দেশ থেকে জঙ্গি হওয়া তরুনদের কারণ মিলবে না।

তিনি বলেন: পশ্চিমা শিশুদের ভিডিও গেমস আর তাদের চলচ্চিত্র খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, সেগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশই যুদ্ধ নির্ভর। পশ্চিমাদের অস্ত্র ব্যবসার পরিকল্পিত শিকার হচ্ছে সারা বিশ্ব ও তরুণ প্রজন্ম। আর পারিবারিক বন্ধন থেকে আলাদা হয়ে অতিমাত্রায় ইন্টারনেট-ভার্চুয়াল জগতে থাকতে থাকতে তাদের পরিচয় ঘটে আইএসসহ বিভিন্ন জঙ্গিদের সাথে। জঙ্গিদের মগজ ধোলাইয়ের শিকার হচ্ছে তারা। যোগ দিলে সহজেই একটি মেশিনগান টাইপ অস্ত্র হাতে পাচ্ছে, যা অনেক সময় তাদের একটি স্বপ্নের জগতে নিয়ে যায়। গলা কেটে বা গুলি করে হত্যা করে তাদের ব্যক্তিগত হতাশা দূর করার একটি অলীক জগত খুঁজে পায় তারা।

যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য ২০১৪ সালে বিশেষ ভিসার আবেদন করে ব্যর্থ হন সাইফুল হক। এরপর বাংলাদেশে চলে আসেন তিনি। পরিচিতদের কাছে সাইফুল একজন ভদ্র ও বিনয়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

পশ্চিমা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ, বড় ভাইয়ের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি ক্রমেই ধর্মভীরু হয়ে উঠতে থাকেন এবং তার (বড়ভাই’র) শিশুপুত্রকে লালন-পালনের জন্য যুক্তরাজ্য নিয়ে আসেন। ২০১৪ সালে সাইফুল যুক্তরাজ্য ছেড়ে যাওয়ার আগে বলেছিলেন, তিনি সপরিবার বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছেন। সেসময়ই সাইফুল সিরিয়ায় চলে যান বলে পেন্টাগন সূত্রে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।